Satyajit Ray’s Cover Designs: Prabir Sen’s Role। Robbar
Robbar
  • ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬

প্রচ্ছদের নেপথ্যে

‘এক্ষণ’-এর প্রতিটি সংখ্যার লে-আউট শুধু নয়, সত্যজিৎ রায়ের করা প্রতিটি প্রচ্ছদের ‘ফিনিশ ওয়ার্ক’ করে দিতেন প্রবীর। সত্যজিৎ প্রচ্ছদগুলো কখনওই ‘ফিনিশ’ করতেন না। একটি কাগজে প্রচ্ছদটি এঁকে দিতেন। লেটার প্রেসে ব্লক করার জন্য প্রতিটি রঙের জন্য পৃথক ব্লকের প্রয়োজন হয়। সেসব কাজ করতেন প্রবীর। এবং করতেন ভালোবেসে, কোনও অর্থকরীর কথা চিন্তা না করেই।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ১৫:৩৫   
Facebook WhatsApp Messenger

প্রবীর সেন চলে গেলেন। সংবাদটি কানে আসামাত্র চোখের সামনে ভেসে উঠল তাঁর সৌম্য সুদর্শন চেহারাটি। নিখুঁত দাড়ি-গোঁফ আর কারুবাক উচ্চারণে তাঁকে সবার থেকে আলাদা করে চেনা যেত। সাধারণ বাঙালির উচ্চতা, কিন্তু তাঁর পরনের পাজামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে পায়ে স্নিকার দেখে বেশ লেগেছিল। সে প্রায় ১৯৮৩-’৮৪ সালের কথা। তখন এ পোশাক কেউ ভাবতেও পারেনি। প্রবীরকে প্রথম দেখি ‘সুবর্ণরেখা’য় এক্ষণ-এর দফতরে। প্রবীর ছিলেন এক্ষণ সম্পাদক, নির্মাল্য আচার্যের ডানহাত। এক্ষণের প্রতিটি সংখ্যার লে-আউট শুধু নয়, সত্যজিৎ রায়ের করা প্রতিটি প্রচ্ছদের ‘ফিনিশ ওয়ার্ক’ করে দিতেন প্রবীর। সত্যজিৎ প্রচ্ছগুলো কখনওই ‘ফিনিশ’ করতেন না। একটি কাগজে প্রচ্ছদটি এঁকে দিতেন। লেটার প্রেসে ব্লক করার জন্য প্রতিটি রঙের জন্য পৃথক ব্লকের প্রয়োজন হয়। সেসব কাজ করতেন প্রবীর। এবং করতেন ভালোবেসে, কোনও অর্থকরীর কথা চিন্তা না করেই। ফলে প্রায় প্রত্যেকটি সংখ্যাতেই সম্পাদক কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁর নাম উল্লেখ করতেন সম্পাদকীয় কলমে। প্রবীর কখনও নিজেকে প্রকাশ করতে চাইতেন না। কোনও কাজের প্রশংসা করলেই, ‘না না, ওটা আর এমন কী কাজ। ছাপাটা ভালো হয়েছে বলেই…’ বলে এড়িয়ে যেতেন।

zoom

প্রবীরের অন্য পরিচয় পেলাম ১৯৮৮ সালের বইমেলার সময়। কাঁধের ঝোলা থেকে একটি ছোট্ট মিনিবুক বের করে হাতে দিয়ে বললেন, ‘এইটা বের করলাম। পড়ে বলবেন, কেমন লাগল!’ কালীঘাট পেন্টিং নিয়ে একটি ছোট্ট ইংরেজি পত্রিকা ‘রূপ’। দ্য লিট্ল‌ ম্যাগাজিন অফ আর্ট। প্রশ্ন করেছিলাম, ‘হঠাৎ এটা!’

উত্তরে জানিয়েছিলেন, ‘আর্চারের লেখাটা এত ভালো লেগেছিল, ভাবলাম সবাইকে পড়াই। সঙ্গে ছবিগুলোও দিয়ে দিলাম। ছাপিয়ে বেশ ভালো লাগল।’ ১০ পাতার লেখা, সঙ্গে ২০টি পটচিত্র। পেলেন বলেই যে ছাপিয়ে দিলেন, তা নয়। ডবলু জি আর্চারের পত্নী, মিল্ড্রেডের অনুমতি নিয়েই ছাপানো। তখনই জেনেছিলাম শুধু শিল্পী নন, তাঁর পড়াশোনার ব্যাপ্তি। কত রকম বিষয়েই তাঁর আগ্রহ।

প্রবীরের আগ্রহের নতুন প্রকাশ দেখলাম ‘একদিন’ পত্রিকা প্রকাশের পর। ততদিনে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ছেড়ে যোগ দিয়েছেন সুমন চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত দৈনিক পত্রিকাটিতে। রবিবাসরীয় ক্রোড়পত্রের দায়িত্বে তিনি আর কৃষ্ণেন্দু চাকী। নাম ‘নবপত্রিকা’। ট্যাবলয়েড সাইজের রবিবাসরীয়টি কলকাতা সংবাদপত্র জগতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। কভার স্টোরি ছাড়াও অন্যান্য বিভাগীয় লেখায় পাঠককে মুগ্ধ ও আগ্রহী করে তোলে। সবচেয়ে বিস্মিত হয়েছিলাম, পাতা সাজানো ছাড়াও পত্রিকাটিতে প্রবীর নিজেও কলম ধরেছিলেন। ছোটদের নানা বিষয়ে প্রবীর লিখতে শুরু করেন। মঙ্গলকাব্যের গল্প, গ্রিমভাইদের রূপকথা, লুইস ক্যারল বা এডওয়ার্ড লিয়ারের ছড়া, কবিতা, গল্প অনুবাদ করতে শুরু করেন। চিরায়ত সাহিত্যে খেয়ালরসের নানা ঘটনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। কল্পলোকের সেইসব ঘটনা নিয়েই তাঁর কলম– কল্পলোকের অ্যালবাম!

zoom

আঁতোয়ান দ্য স্যাঁতেকজুপোরি-র চিরকালীন সাহিত্য ‘ছোট্ট রাজপুত্র’ অনুবাদ করেছিলেন। শুধু বিদেশি কাহিনির অনুবাদ নয়, নিজেও লিখেছিলেন বেশ কয়েকটি আষাঢ়ে গল্প। বটতলা সাহিত্য বা হেটো সাহিত্য নিয়ে ওঁর যে আগ্রহ ছিল, সেটাও ওই পত্রিকায় লেখা থেকে জানতে পারি। ২০০৭ থেকে প্রায় বছর পাঁচেক নবপত্রিকা চালিয়েছিলেন কৃষ্ণেন্দু চাকী আর প্রবীর সেন। প্রত্যেকটি সংখ্যাই ছিল সংগ্রহযোগ্য।

বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য, লোককথা, বই ও পুস্তিকা নিয়ে তার প্যাশনের পরিচয় পেয়েছি বহুবার। ২০১৪ সালে তিনি ‘পাতাবাহার’ নামে একটি পত্রিকা নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করতে শুরু করেন। বাংলার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার দুষ্প্রাপ্য প্রাচীন বই বা নিবন্ধের সটীক ও ভূমিকা-সহ পুনঃপ্রকাশ। প্রতিটি সংখ্যার সম্পাদকীয় পড়লেই বোঝা যেত বিষয়টির প্রতি তাঁর সম্যক জ্ঞান। এই সময়েই প্রবীরের সঙ্গে কথা হত বেশি। তাঁর অনুসন্ধান, কৌতূহল, তথ্যের প্রতি নিষ্ঠা আমাকে বিস্মিত ও মুগ্ধ করত। বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য লেখা সেই সময়ে আমরা পেয়েছি পাতাবাহারের মাধ্যমে। প্রথম বছরেই শিক্ষিত বাঙালির মননে স্থান করে নিতে পেরেছিল পত্রিকাটি।

zoom

এসব ছাড়াও বাংলা হরফ, মুদ্রণ, লেটারপ্রেসের প্রতি প্রেম নতুন মাত্রায় দেখা গেল ‘প্রকৃতি’ নামে তাঁদের নতুন প্রকাশন সংস্থা খোলার পর। এখানেও তাঁর সঙ্গী, বন্ধু কৃষ্ণেন্দু চাকী। লেটার প্রেসে ছাপা এবং উডকাট ইলাস্ট্রেশনে প্রবীর তাঁর নিজের লেখা কয়েকটি বই ছাপিয়েছিলেন। ভিন্ন মাপের সেই দলছুট বইগুলি ছিল বাংলা মুদ্রণের গর্বিত উদাহরণ।

zoom

বেশ কয়েক বছর প্রবীরের আর কোনও খোঁজ পাইনি। তিনি নিজেই বেছে নিয়েছিলেন নিভৃতযাপন। আর আজই শুনলাম প্রবীর গতকালই আমাদের ছেড়ে, নিজের প্রিয় বই, ছবির জগৎ ছেড়ে চলে গিয়েছেন অন্য আর এক জগতে।

BengaliLiterature BengaliDesign BookCoverDesign CoverArt EkkhonMagazine PrabirSen Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar SatyajitRay SatyajitRayLegacy

Share this article on