Durga Puja Memories: Finding Joy in Simplicity। Robbar
Robbar
  • ১৫ কার্তিক ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২ নভেম্বর ২০২৬

পুঁজি কম, পুজো বেশি

ভালোবাসা আর ভিউয়ের মধ্যে তফাতটা ক্রমশ কমে আসছে। আসলে বাজার সব কিছুর মধ্যেই ব্যবসা খুঁজে পায়। নস্টালজিয়ার মধ্যেও। পুরনো দিনের পুজো, সাদা-কালো কলকাতা, শৈশবের স্মৃতি, হারানো আনন্দ– সবই এখন বিক্রির উপকরণ। আমরা হারানো পুজোর জন্য হাহাকার করি। বাজার সেই হাহাকারও বিক্রি করে। অতীতেও অভাব ছিল। সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু সামান্য আয়োজনে ছিল বিপুল আনন্দ। একটা রিকশা, একটা নতুন জামা, একটা পাড়ার মণ্ডপ, একটা শিশুর বিস্ময়। এতেই উৎসব সম্পূর্ণ হত। সেই আনন্দকে আচমকাই মনে করাল রিকশায় করে পাড়ার পুজোর পরিক্রমায় বের হওয়া বাবা, মা ও ছোট্ট ছেলেটি।

শেষ আপডেট: নভেম্বর ২, ২০২৬, ১৮:১৫   
Facebook WhatsApp Messenger

৩৯.

একটা রিকশা। তিনজন মানুষ। আর এক পৃথিবী আনন্দ।

পুজো কি তবে এতই সস্তা ছিল? কম পয়সায় পুষিয়ে যেত সব? সত্যিই সস্তা ছিল। এবারের পুজোয়, একটি ছোট্ট ভিডিও ‘ভাইরাল’ হয়েছে। সামান্য কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও। কোনও ক্লিকবেট নেই। কথাবার্তার ঝড়ঝঞ্ঝা নেই। ‘হইহইহই করব বলে’ও নেই। আছে আনন্দ উজ্জ্বল তিনজনের হাসিমুখ। যে হাসিমুখ আমাদের ছিল। এখন কি নেই? আর কি সম্ভব নয় ফিরে পাওয়া? সব পথ কি মুছে গিয়েছে? হারিয়ে গিয়েছে সে দেশ?

zoom
পুজোয় ভাইরাল হওয়া রিকশাযাত্রী সেই ত্রয়ী

বাবা, মা আর ছোট্ট ছেলেটি রিকশায় চেপে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে। রাস্তা আলোকিত। হয়তো প্যান্ডেলের সামনে ঢাক বাজছে। রিকশার ঝাঁকুনিতে ছেলেটা কখনও বাবার গায়ে ঢলে পড়ছে, কখনও মায়ের হাত ধরে সামনের দিকে ঝুঁকছে। হয়তো বাইরে থেকেও দেখা যাচ্ছে মর্ত্যে আসা দেবদেবীকে। ‘ওই তো ঠাকুর!’ ‘ওই তো সিংহ!’ বাবা-মাও তাকিয়ে দেখছেন। বিস্ময় তাঁদের চোখেও। রিকশাওয়ালাও হাত ঠেকিয়ে পেন্নাম করে প্যাডেল মারছেন। আনন্দের প্যাডেল। আনন্দ এগিয়ে চলছে নতুন ঠাকুরের প্যান্ডেলে।

কোনও পাস নেই, কোনও ভিআইপি ব্যবস্থা নেই, কোনও বিশেষ প্রবেশমূল্য নেই। হয়তো পাড়ার ঠাকুর। পাড়ার রাস্তা। পাড়ার মানুষ। অথচ আনন্দের কোনও অভাব নেই। এখন অবশ্য আনন্দের সংজ্ঞা বদলেছে। ঠাকুর দেখার আগে জানতে হয়, কোন ঠাকুর দেখতে হবে। কোথায় থিম ভালো, কোথায় আলো ভালো, কোথায় ভিড় বেশি, কোথায় পুরস্কারের সম্ভাবনা বেশি। পুজো যেন এক বিরাট প্রদর্শনী। দেবী আসেন, অসুর আসেন, সঙ্গে আসে স্পনসর। অসুর বধের আগে বিজ্ঞাপন বিরতি। ঢাকের সঙ্গে পাল্লা দেয় প্রচারের ঢাক।

zoom
পুজোর মণ্ডপে চেনা ভিড়

দেবী দশভুজা। বাজারের হাত অবশ্য তার চেয়েও বেশি। পুজো এখন শুধু উৎসব নয়। উৎসবের প্যাকেজ। জামাকাপড়ের প্যাকেজ, খাওয়াদাওয়ার প্যাকেজ, ঘোরাঘুরির প্যাকেজ, এমনকী, আনন্দেরও প্যাকেজ। কোথায় গেলে ভালো ছবি উঠবে, কোথায় গেলে সামাজিক মাধ্যমে বেশি বাহবা মিলবে– সব ঠিক করা। আগে ঠাকুর দেখে মন ভরত। এখন মোবাইল ভরে। আগে স্মৃতি জমত মনে। এখন জমে ক্লাউডে। মেঘ জমছে, কিন্তু বৃষ্টি নেই।

পাড়ার পুজোর কথাই ধরা যাক। একসময় পাড়াই ছিল পুজোর ঠিকানা। পরিচিত মুখ। চেনা গলি। মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প। কে নতুন জামা কিনল, কার ছেলে বড় হল, কার বাড়িতে নতুন বউ এল– পুজো ছিল পাড়ার বার্ষিক সামাজিক সম্মেলন। এখন পাড়ার পুজো আছে। পাড়ার মানুষ নেই! তাঁরা শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটছেন। নিজের পাড়ার ঠাকুর দেখার চেয়ে দূরের বিখ্যাত ঠাকুর দেখা জরুরি। পাড়ার মণ্ডপ এখন বড় পুজোর পথে একটি সাময়িক বিরতি। আগে পুজো মানুষকে পাড়ায় ফেরাত। এখন পুজো মানুষকে পাড়া থেকে বের করে দেয়।

zoom
পুজো মণ্ডপে আড্ডার মেজাজ

একথা ঠিক, পুজোর শিল্পমান বেড়েছে। বাংলার শিল্পী, মৃৎশিল্পী, আলোকশিল্পী, কাঠামো নির্মাতা, মণ্ডপ-শ্রমিকদের অসামান্য পরিশ্রমে পুজো আজ এক বিরাট শিল্প-আয়োজন। তার আন্তর্জাতিক পরিচিতিও তৈরি হয়েছে। এই কৃতিত্ব অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। পুজো কি শিল্পের প্রদর্শনী, না মানুষের উৎসব? শিল্পের উচ্চতা বাড়ুক। কিন্তু দর্শকের আনন্দের জায়গাটা ছোট হয়ে গেলে মুশকিল। যাঁরা পুজো তৈরি করেন, যাঁরা পুজো দেখেন, আর যাঁরা পুজোর বিজ্ঞাপন দেন– তিন পক্ষের স্বার্থ কি এক?

শ্রেণির প্রশ্ন এখানেই। বড় পুজো, বড় বাজেট, বড় আলোকসজ্জা। কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্তের আনন্দের মাপ কী? যে পরিবারটি রিকশায় চেপে পাড়ার ঠাকুর দেখে বাড়ি ফিরত, তাদের জন্য এই বিপুল আয়োজন কতটা? যে শিশুটির কাছে বাবার কাঁধই ছিল সবচেয়ে উঁচু প্যান্ডেল, তার জন্য এখন কতখানি জায়গা আছে? যার পকেটে দামি পোশাকের টাকা নেই, যে পরিবার রেস্তোরাঁয় খেতে যেতে পারে না, তাদের পুজো কি একটু কম পুজো? আনন্দেরও কি শ্রেণিবিভাগ হবে? ধনীর আনন্দ প্রিমিয়াম, গরিবের আনন্দ সাধারণ? এ কেমন উৎসবের অর্থনীতি!

এখন আনন্দেরও বিজ্ঞাপন দিতে হয়। কোথায় গেলাম, কী খেলাম, কী পরলাম, কী দেখলাম– তার প্রমাণ চাই। ঠাকুর দেখার সময় ক্যামেরা ব্যস্ত। চোখ অবসর পায় না। দেবীর দিকে তাকানোর আগে ফ্রেম ঠিক করতে হয়। আলো ঠিক করতে হয়। মুখের অভিব্যক্তি ঠিক করতে হয়। তারপর ছবিটি কোথায় প্রকাশ করা হবে– ইন্সটাগ্রাম, ফেসবুক না কি হোয়াটসঅ্যাপ স্টেটাসে, সেই চিন্তা।

zoom
সেলফি-পুজো

ভালোবাসা আর ভিউয়ের মধ্যে তফাতটা ক্রমশ কমে আসছে। বাজারের অবশ্য দোষ দিয়ে লাভ নেই। সে-সব কিছুর মধ্যেই ব্যবসা খুঁজে পায়। এমনকী, নস্টালজিয়ার মধ্যেও। পুরনো দিনের পুজো, সাদা-কালো কলকাতা, শৈশবের স্মৃতি, হারানো আনন্দ– সবই এখন বিক্রির উপকরণ। অতীতেরও নতুন প্যাকেজিং হচ্ছে। আমরা হারানো পুজোর জন্য হাহাকার করি। বাজার সেই হাহাকারও বিক্রি করে। স্মৃতিরও বাজারদর আছে। শুধু স্মৃতির মালিকানা কার, সেটাই গোলমেলে। তবে এমন নয় যে, অতীতের সব কিছুই দুরন্ত ভালো ছিল। অভাব ছিল। সীমাবদ্ধতা ছিল। অনেকের নতুন জামা জুটত না। অনেক পাড়ায় আয়োজন ছিল সামান্য। কিন্তু সামান্য আয়োজনেও আনন্দ ছিল বিপুল। একটা রিকশা, একটা নতুন জামা, একটা পাড়ার মণ্ডপ, একটা শিশুর বিস্ময়। এতেই উৎসব সম্পূর্ণ হত। এখন উপকরণ বেড়েছে। ব্যয় বেড়েছে। আয়োজন বেড়েছে। আনন্দের হিসেবটা কেন যেন মেলানো যাচ্ছে না।

আলো আরও জ্বলুক। শিল্প আরও বিস্ময়কর হোক। প্যান্ডেল আরও অভিনব হোক। কিন্তু সেই আলোর তলায় একটা সাধারণ রিকশারও জায়গা থাকুক। যে রিকশায় চেপে বাবা-মা তাঁদের সন্তানকে ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যাবেন। তাঁদের জন্যও যেন উৎসবের দরজা খোলা থাকে। পুজো কোনও বিশেষ শ্রেণির সাংস্কৃতিক অধিকার নয়। কোনও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া সম্পত্তিও নয়। পুজো তাঁদেরও, যাঁরা সবচেয়ে কম খরচ করেন, অথচ আনন্দে কোনও কার্পণ্য করেন না।

zoom

রিকশাটি তাই কেবল একটি বাহন নয়। একটি জরুরি সময়। একটি সাধারণ অতীত। যে সাধারণকে পাওয়া এখন বড় সোজা কথা নয়। কারণ সেখানে গন্তব্য খুব দূরে নয়। আয়োজন খুব বড় নয়। আর আনন্দেও ঘাটতি নেই কোনও…

……………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন ওপেন সিক্রেট-এর অন্যান্য লেখা

……………………..

Durga Puja Durga Puja 2026 Durga Puja Memories nostalgia puja expences Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Simplicity Viral Video

Share this article on