Local Forms of Goddess Kali in Bengal | Robbar
Robbar
  • ২০ কার্তিক ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৭ নভেম্বর ২০২৬

কালী নামের লাগল আগুন

শাস্ত্রে ‘বামাকালী’ বলে পৃথক কোনও শ্রেণীবিভাগ নেই। কিন্তু বামাচার দর্শনের সাক্ষাৎ জ্যামিতি বামাকালী। এর আইকোনিক বৈশিষ্ট্য এত বৈচিত্রময় তা এককথায় বলে শেষ করা যায় না। কুম্ভকাররা সাধারণত বামাকালীর মতো প্রথাবিরোধী মূর্তি তৈরি করতে চান না। সেই কারণে বংশানুক্রমিক শিল্পীরা করেন। মূর্তির মাপ হয় পোয়া অর্থাৎ এক মুষ্টির দৈর্ঘ বিচারে। সেই হিসাবে সাত পোয়া, নয় পোয়া, এইভাবে উচ্চতা বাড়তে থাকে। এই মাপ অবশ্য কুম্ভকারদের মূর্তিশিল্পের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। রক্ষাকালীর মতো পুজোর দিনেই অনেক বামাকালী তৈরি হয়।

শেষ আপডেট: নভেম্বর ৭, ২০২৬, ২১:৩৯   
Facebook WhatsApp Messenger

৫৬.

ইনকিলাব জিন্দাবাদ! ইতিহাসের পাতায় স্থান পাওয়া ৩৪ বছরের রক্তিম বঙ্গদর্শনে, মার্কসবাদী বামপন্থী মনন-মেজাজের জয়জয়কার। কিন্তু শত শত বছর আগে রাঢ়বাংলার লোকায়ত মাটিতে জন্ম নিয়েছিল আরেক প্রথাবিরোধী বামপন্থী দর্শন। তান্ত্রিক পরিভাষায় যার নাম ‘বামাচার’ বা ‘বীরাচার’। এটি কোনও পলিটিক্যাল মতবাদ ছিল না। বরং প্রথাগত বৈদিক আচারের বিরুদ্ধে প্রথাবিরোধী বিপ্রতীপ সাধন-পদ্ধতির বিদ্রোহ। যার গুহ্যতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে লোকমানসে ও মূর্তি কাঠামোয় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে বামাকালীর ভয়াল প্রতিমা। যে প্রতিমা আরাধনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বামাচারী বিস্মৃত শাক্তসাধক থেকে বাংলার দস্যুসংস্কৃতি বা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি-বিস্মৃতি।

zoom
নবদ্বীপের শবশিবা মূর্তির শিবের তৃতীয় হাত; ছবি: অয়ন ভট্টচার্য

কিংবা ‘বিপরীত-রতি’র শবশিবা মাতৃবিগ্রহের নিগূঢ় জ্যামিতি। যেখানে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে আর্য-পুরুষতন্ত্রের অনুশাসনের বিরুদ্ধে আদিম অনার্য মাতৃতান্ত্রিক সমাজের দার্শনিক দ্রোহের প্রতিভাস। যা কিছু শাস্ত্রসম্মত, পরিশ্রুত, পরিমার্জিত, তথাকথিত ভদ্রলোকীয়– তাই ‘দক্ষিণাচার’। বামাচার এর বিপরীতে অবস্থিত। দক্ষিণাচার সাধন-চর্যায় যা বর্জন করেছে, যেমন শ্মশান-চিতা, শবদেহ, কারণবারি, রতি-মৈথুন, নরমুণ্ড ইত্যাদি সেগুলি যখন পরম মমতায় সাধনার অঙ্গ হয়ে ওঠে, তাই হল বামাচার। দক্ষিণাচার পুরুষতান্ত্রিক আর্যসংস্কৃতির উত্তরসূরী। বামাচার সেখানে অমার্জিত, অনার্য, আদিম, মাতৃতান্ত্রিক সমাজের চিহ্ন বহন করে চলেছে! ‘বাম’ অনেক সময় নিন্দা বা অবজ্ঞা অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে। মনসামঙ্গলকাব্যে চাঁদ সদাগর মনসাকে কিছুতেই পুজো করতে রাজি ছিলেন না। তাঁর অহং স্ফীত দর্পের স্বগতোক্তি ছিল:

যে হাতে পূজি আমি দেব শূলপাণি,
সেই হাতে না পূজিব চ্যাংমুড়ি কানি।

ঘটনাক্রমে চাঁদসদাগর মনসাকে ‘বাম’ হাত দিয়ে পুজো করতে বাধ্য হয়েছিলেন। লোকায়ত নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ‘লেফট-হ্যান্ড-রিচুয়াল’ কোনও অবজ্ঞার স্মারক নয়। আর্য আভিজাত্যের দর্পচূর্ণ করে অবৈদিক ব্রাত্যদেবীর সামাজিক স্বীকৃতি। শাস্ত্রীয় ডান হাতের অহংকার এখানে পরাজিত। ‘বাঁ-হাতের খেল’ সেখানে স্বীকৃতির সিলমোহর। এ যেন বামাচার ও বামাকালীর সমান্তরালে অজয়-গঙ্গার ধারা।

বামাচারের অপর নাম ‘বীরাচার’। বীরের মতো কাম-ক্রোধ-ভয়কে জয় করার পুরুষকারের কঠোর সাধন-পদ্ধতি। এটি রাঢ়ের পরিমণ্ডল থেকে উদ্ভব হয়েছিল; বিশেষ করে বীরভূমের মাটি থেকে। বীরভূমের নামকরণ প্রসঙ্গে তথাকথিত ভদ্রলোকীয় ইতিহাস ‘সামন্ততান্ত্রিক বীর ভূমি’ বলে দাগিয়ে দিলেও আসলে এটি তন্ত্রসাধনার বীরাচারদের সাধনভূমি। তবে ‘বীর’ বলতে বামাকালী সম্পৃক্ত এক ধরনের লাল মাটিকেও বোঝায়।

বীরভূমের পাড়ুই থানার শেহালা গ্রামের বামাকালীর আটনের পিছনে এক ধরনের মাটিকে বীরমাটি বলে, যেখানে সাপের আধিক্য অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লোকবিশ্বাস হল, এই মাটি গায়ে মেখে দেবীর কাছে মনস্কামনা করলে তা পূরণ হয়। দুবরাজপুর থানার লোবা গ্রামের বামাকালীর মুখমণ্ডল নির্মাণের উদ্দেশ্যে এই রক্তিম মাটি যা পশ্চিম বর্ধমানের গৌরবাজার থেকে আনা হয়, তা চিরাচরিত প্রথা। ‘বীর ভূমি’ (মাটি) হল আদিম প্রথাবিরোধী অতিপ্রাকৃত উর্বরতা ভৌম-শক্তির প্রতীক। সুতরাং এই বীরভূমি যে বামাচারী বামাকালীর সাধনভূমি হবে, সন্দেহ নেই।

পরবর্তীকালে বহিরাগত ‘চীনাচার’ বামাচারকে পুরিপুষ্টি জোগায়। বিশেষ করে পঞ্চ ম-কারকে সাধন স্বীকৃতি দিয়েছে। বামাচার বর্তমানে কিছুটা শাস্ত্রীয় তকমা পেলেও, এর আদি ও অকৃত্রিম উৎস যে রাঢ়ের অন্ত্যজ লোকায়ত পরিমণ্ডল– ক্ষেত্রসমীক্ষার দু’ একটা জীবন্ত উদাহরণ দিলে তা স্পষ্ট হবে।

ঝাড়খণ্ড ও বীরভূমের সীমান্ত-ঘেঁষা প্রাচীন গ্রাম– আম্বা। গ্রামের অন্যতম আদি বাসিন্দা প্রান্তিক বাদ্যকর ডোম সম্প্রদায়। তাঁদের কুলদেবতার নাম ‘এঁটুঠাকুর’। শাস্ত্রীয় দেবমূর্তির চেনা ফ্রেম উল্টে দিয়ে, দেবমূর্তি সেখানে আয়তাকার মাটির বেদির মাঝে তিনটি গোলাকার কালো পাথর, লৌকিক ঘোড়া ও ত্রিশূলের ত্রিবৃত্ত। ডোমেরা নিজেরাই পূজা করেন। পূজার উপকরণ ও নৈবেদ্যের তালিকা দেখলে ভদ্রলোকীয় শুচিবায়ুগ্রস্ততা চমকে উঠতে বাধ্য! চপ-বেগুনি থেকে শুরু করে দেশি মদের পাউচ, কাঁচা পেঁয়াজ আর ফলের মালা– সবই সেখানে ‘দেবভোগ’।

zoom
এঁটুঠাকুর

পূজার সময় ডোম পুরোহিত লাল কাপড় পরে, হাতে লোহার চিমটা নিয়ে প্রথাবিরোধী আবেশে বসেন। তাঁর নিজের গলায় ঝোলে চপের মালা! নিজ হাতে একটা করে চপ ছিঁড়ে, তাতে লৌকিক মন্ত্র মাখিয়ে, প্রথমে নিজে এক কামড় বসিয়ে উচ্ছিষ্ট বা এঁটো করেন। বাকি অংশটি পরম ভক্তিতে চাপিয়ে দেন ‘এঁটুঠাকুরের’ মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে নাদ-ব্রহ্মের মতো বেজে ওঠে চিমটের ঘণ্টাধ্বনি। শাস্ত্রীয় চোখে যা চরম অশুচি ও ‘এঁটো’, বামাচারের এই আদিম লোকায়ত গর্ভে সেটি দেবতা ও ভক্তের একাত্ম হওয়ার পবিত্র মাধ্যম।

দুবরাজপুরের বিখ্যাত ‘মামাভাগ্নে’ পাহাড়ের পূর্বদিকে শ্মশানকালীর আস্তানা। দেবীমূর্তি অত্যন্ত ভয়ংকরী। কার্তিক অমাবস্যার রাতে বাৎসরিক পূজা অনুষ্ঠিত হলেও বিসর্জিত হন পরের বছরের বিজয়াদশমীর পুণ্যতিথিতে। কালানুক্রমের প্রচলিত সময়-সারণিকে উল্টে দেওয়ার এই যে লোকায়ত স্পর্ধা, সেখানেই বামাচারের আসল রূপ। প্রথানুসারে স্থানীয়রা দেবীকে পূজাবেদি থেকে নামানোর সময় যে উদ্দাম খিস্তি-খেউড় করেন, লোকবিশ্বাসে তাতেই নাকি দেবী পরম সন্তুষ্ট হন। এইসব আপাত ‘অশ্লীল’ আচারের গভীরে জড়িয়ে আছে প্রাগৈতিহাসিক অনার্য শবর সংস্কৃতির আদিম উর্বরতা-চর্যার নিবিড় যোগসূত্র। সুতরাং, অবৈদিক ব্রাত্য সমাজের এই যে স্বাধীন প্রথাবিরোধিতা, তা-ই হলো লোকায়ত বামাচারের আসল ভিত্তিভূমি!

দক্ষিণাচারে যেখানে সংস্কৃত মন্ত্রাবলি, বৈদিক-হোম কিংবা নাকে কাপড় বেঁধে পরম শুচিতায় ভোগ রন্ধনের কড়া অনুশাসনে ছন্দময়; বামাচার ও বামাকালীর দর্শনে ঠিক তার উলটো বিধান। মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা, মৈথুন ও বীরভাবের সযত্ন অনুশীলন। সমাজের কৃত্রিম সংস্কারকে ভেঙে মানুষের আদিম প্রবৃত্তিকেই ব্রহ্মময়ীর চরণে সমর্পণ করতে শেখায় বামাচার।

বামাচারে আসনবিধিতেও পার্থক্য লক্ষ করা যায়। পঞ্চমুণ্ডির আসনের পাশাপাশি অনেক স্থানে তান্ত্রিক সাধকের ‘ভূসমাধি’র উপর কালীর বেদি নির্মিত। যেমন পূর্ব বর্ধমান জেলার পাটুলি এবং এড়ুয়ারের সোনার কালীর মূলবেদি সাধকের সমাধির উপর দৃশ্যমান। ভদ্রলোকীয় নন্দনতত্ত্ব যেখান মৃতদেহকে অশূচি বা অপবিত্র মনে করে, বামাচার সেখানে মহাশক্তির আসন প্রস্তুত করে। শুরুর যেমন শুরু থাকে, বামাচারেরও তার ব্যতিক্রম নেই। প্রাচীন তিব্বতি ও বৌদ্ধ-তান্ত্রিক ধারা থেকে আগত ‘চীনাচার’ বামাচারের তাত্ত্বিক কাঠামোকে দূর অতীতে স্পষ্ট করলেও, আম্বা গ্রামের এঁটুঠাকুর অথবা বিপ্রতীপ খেউড়ের লৌকিক ভিতই তাকে মজবুত ও অপরাজেয় করে তুলেছে। সুতরাং চীনাচারের তিব্বতি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায়  না-গিয়ে, রাঢ়ের মাটিতে এর আসল রূপটি কীভাবে ধরা পড়েছে তারা-কালীর মূর্তিতাত্ত্বিক বিবর্তনে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

zoom
প্রাচীন তান্ত্রিক কালী

দশমহাবিদ্যার ‘তারা’ কালীর প্রায় অনুরূপ মূর্তি। উভয়ে শবের উপর দণ্ডায়মান, যা শিবের সঙ্গে একীভূত। কালী ঘন কৃষ্ণবর্ণের, তারা নীলবর্ণের। ‘কালী’ নগ্ন হলেও ‘তারা’ বাঘছাল পরিহিতা। উভয় দেবী নরমুণ্ডমালা বিভূষণা। তারার বামপদ অক্ষোভ্য শিবের বুকে স্থাপিত। উভয়ের লোল-জিহ্বা। তারার মস্তকে পঞ্চ কপালের মুকুট। হিন্দুধর্মে তারার নাম ‘তারিণী’ যা মহাভারতের ভীষ্মপর্বে অর্জুন কৃত দুর্গাস্তবে পাওয়া যায়– ‘চণ্ডীচণ্ডে নমস্তুভ্যম্ তারিণী বরবর্ণিনী’। বৌদ্ধ বজ্রযান অনুযায়ী দেবীর নাম ‘একজটা’, ‘উগ্রতারা’ বা ‘নীলসরস্বতী’। তারা ও কালীর সমন্বয়ী মূর্তির নাম ‘তারাকালী’।

তারাকালীর মূর্তি অদ্ভুত প্রকৃতির। তারা প্রধানত প্রত্যালীঢ় পদে অক্ষোভ্য শিবের বুকে দণ্ডায়মান হলেও তারাকালী সমপাদস্থানিক হয়ে শিবের বুকে দাঁড়িয়ে থাকেন আড়াআড়ি ভাবে। দুই কাঁধে ফণাধারী সাপ। দেবীর দু’পাশে নগ্না ডাকিনী যোগিনী। চতুর্ভুজা দেবীর উপরের দু’ হাতে থাকে খড়্গ ও পদ্ম। নীচের দু’ হাতে শূল ও কালীর মতো বরদমুদ্রা। এই রূপের দু’টি তারাকালী মৃণ্ময়ী মূর্তি প্রায় ৩০০ বছর ধরে পূজিত হচ্ছেন বীরভূমের জাজিগ্রামে।

zoom
তারাকালী; জাজিগ্রাম, বীরভূম

‘বিপরীত রতি’ শুধু কালীবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত নয়, তারাতত্ত্বেও প্রাসঙ্গিক। উগ্রতারা বা নীলসরস্বতীর ধ্যানমন্ত্রে বিপরীত রতির প্রসঙ্গ রয়েছে। তারারহস্যমে বলা হয়েছে– ‘বিপরীতরতা শক্তাং উগ্রতারাম পরাৎপরাম’ কিংবা ‘বিপরীতরতাসক্তাং বাগীশত্ব প্রদাহিণীম’। নবদ্বীপের ঐতিহাসিক শবশিবার রূপকল্পটি শাক্ত তথা তন্ত্রদর্শনের এক চরম বৈপ্লবিক দিক। এই মূর্তিতে সরাসরি বিপরীত রতির চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। দাঁইহাট ও নবদ্বীপের রাসে পূজিত শবশিবা মূর্তির নীচে থাকে ‘মড়া শিব’। উপরে ‘জ্যান্ত শিব’। তাঁর সঙ্গে বিপরীত রমন যুক্ত মহাকালী। শব এখানে ভয় বা মৃত্যুর প্রতীক নয়। সৃষ্টির পূর্বে নিষ্ক্রিয় ‘সদাশিব’ বা বিশুদ্ধ চেতনা। সেই জড়বৎ চেতনার বুকে কালীরূপী আদি প্রকৃতির সংযোগ ও বিপরীত বিহার প্রমাণ করে, জড় ও শক্তির মিলনে মহাবিশ্বের চিরন্তন শক্তির স্পন্দন ও সৃষ্টির উন্মেষ ঘটে। কামকে মোক্ষ ও শবকে শিবে রূপান্তরিত করার তান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মূর্তি ভাষ্য শবশিবা।

নবদ্বীপের শবশিবা মূর্তি কল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে। নিচে শায়িত শিবের শরীর থেকে আরেকটি প্রক্ষিপ্ত হাত দেবীর উদরদেশের নিচে উড্ডীন থাকে। অনেকেই মড়া শিবের হাত বলে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু বামাচারে আলোকে বোঝা যায়, সেটি জ্যান্ত শিবের আদিম চৈতন্য-বাহু। যা মহাশক্তির বিপরীত রতির স্পর্শে জেগে ওঠা জাগ্রত মহাজাগতিক হস্ত।

কালীতত্ত্বে বর্ণিত বাহ্যিক বিপরীত-রতি কোনও লৌকিক অনাচার বা ‘কাঁঠালের আমসত্ত্ব’ নয়। মানুষের স্নায়ুতন্ত্র, হরমোন-বিজ্ঞান এবং অবচেতনকে নিয়ন্ত্রণ করার গূঢ় মানসিক প্রক্রিয়া। সাধারণ মানুষ ডোপামিনের মোহে বিন্দুক্ষয় করে সাময়িক অবসাদে তলিয়ে যায়। বামাচার সাধক সেখানে ‘সিমেন রিটেনশন’ ও ‘প্যারাসিমপ্যাথেটিক’ স্নায়ুর উদ্দীপনার মধ্যস্থতায় কামশক্তিকে মস্তিষ্কের সহস্রা-চক্রের পরম ওজশক্তিতে রূপান্তরিত করেন। চরম আনন্দকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করেন। কামকে অবলম্বন করে কামাতীত হওয়ার প্রয়াস তান্ত্রিক-বিজ্ঞানের মূল সুর। এখানেই তান্ত্রিক সাধকের আসল বীরত্বের পরিচয়।

শাস্ত্রে ‘বামাকালী’ বলে পৃথক কোনও শ্রেণীবিভাগ নেই। কিন্তু বামাচার দর্শনের সাক্ষাৎ জ্যামিতি বামাকালী। এর আইকোনিক বৈশিষ্ট্য এত বৈচিত্রময় তা এককথায় বলে শেষ করা যায় না। কুম্ভকাররা সাধারণত বামাকালীর মতো প্রথাবিরোধী মূর্তি তৈরি করতে চান না। সেই কারণে বংশানুক্রমিক শিল্পীরা করেন। মূর্তির মাপ হয় পোয়া অর্থাৎ এক মুষ্টির দৈর্ঘ বিচারে। সেই হিসাবে সাত পোয়া, নয় পোয়া, এইভাবে উচ্চতা বাড়তে থাকে। এই মাপ অবশ্য কুম্ভকারদের মূর্তিশিল্পের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। রক্ষাকালীর মতো পুজোর দিনেই অনেক বামাকালী তৈরি হয়। পূজান্তে বিসর্জন। যেমন পূর্বোক্ত শেহালা গ্রামের বামাকালী তার প্রাসঙ্গিক উদাহরণ।

zoom
বামাকালীর দন্তপঙ্ক্তি

বামাকালী মাত্রই দেবীর বামপদ শিবের বুকে স্থাপিত হয়। এটি প্রধানতম মূর্তি বৈশিষ্ট্য। দক্ষিণাকালীর ডানপদ শিবের বুকে থাকে। অনেক বামাকালীর দন্তপঙ্ক্তিতে কালো রঙের বৃত্তাকার বা ত্রিভূজাকৃতি জ্যামিতিক অলঙ্করণ দেখা যায়, যেমন বীরভূমের ইন্দ্রগাছার বামাকালীর দাঁতে। এটি উপনিষদ বর্ণিত করালী কালীর আইকনিক বৈশিষ্ট্য। দু’ হাঁটুতে থাকে বিছের অলংকরণ, যেমন নবদ্বীপের রাসের বামাকালী। এটিও চামুণ্ডার উদরে বিছের ভাস্কর্যকে স্মরণ করায়। রঙের বিচারে ঘোর কালো অথবা আকাশী বর্ণের হয়। তবে তন্ত্রসারে বর্ণিত কাজল-কালো পর্বতের মতো দেবীর গায়ের রং দেখা যায় হাওড়ার আমতার খড়িয়প গ্রামের বামাকালীর মূর্তিতে।

zoom
নবদ্বীপের রাসের বামাকালী; ছবি: অয়ন ভট্টাচার্য

খড়িয়পের বামাকালী মূর্তিটি দ্বিভুজা ত্রিনয়নী। ডান হাতে খর্পর। বাম হাতে সদ্যচ্ছিন্ন মুণ্ড। দেবী করালদ্রংষ্টা হলেও লোল-জিহ্বার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই। কানে পক্ষাকৃতি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কুণ্ডল। বক্ষদেশে শোলার বুকপাটা, যা প্রাচীন ‘রক্ষাবলী’ অলংকারের কথা স্মরণ করায়। নগ্ন শিব সামান্য কাত হয়ে দেবীর দিকে তাকিয়ে আছেন। বাম হাত মস্তকে ঠেকানো। ডান হাত ঊর্ধোত্থিত। দেবীর বাম পদ শিবের বুকে। দু’ পাশে ভয়ংকরী ডাকিনী যোগিনী ও শিয়াল।

zoom
বামাকালীর মস্তক অলংকার

বীরভূমের লোবা, বাবুপর বড়ার গ্রামের বামাকালী, বামাচার তান্ত্রিক দর্শনের চাক্ষুষ রূপ। দেবীর গায়ের রং কালো হলেও সারা গায়ে ইংরেজি এস চিহ্নের মতো সাপের মোচড়ের তান্ত্রিক আলপনার অলংকরণ। এগুলি আসলে তন্ত্রের ষটচক্রভেদ ও কুণ্ডলিনী যোগদর্শনের সুপ্তশক্তিকে সর্পপ্রতীকে রূপায়িত করেছে। মস্তকে আকালীপুরের গুহ্যকালীর মতো দুই থাকি সর্পফণার মুকুট তাৎপর্যপূর্ণ। যা কুলকুণ্ডলিনী বা অনন্তনাগের সহস্রশীর্ষার প্রতীক। দেবীর কান ও কপাল বরাবর বেষ্টিত আছে তন্ত্রশাস্ত্র বর্ণিত, ‘শকুন্তপক্ষসংযুক্তবাণ কর্ণবিভূষিতাং’এর লৌকিক চক্রাকৃতি সজ্জা। কুণ্ডলিনীশক্তি যখন মেরুদণ্ডের সুষম্না কাণ্ড বেয়ে ঊর্ধে আরোহণ করে সহস্রার চক্রে পৌঁছয় তখন সেখানে মহাজাগতিক চেতনার বিস্ফোরণ ঘটে, যা পাখির পালকের পুচ্ছ বিশিষ্ট বাণের ভাস্কর্যে দৃশ্যায়িত হয়েছে।

নবদ্বীপের রাসে বামাকালী মূর্তির বৈচিত্র দেখার মতো। কালীর দুই কাঁধে রয়েছে দু’টি শব এবং শবরূপী শিব। বামপদের সামনে শুম্ভ। চতুর্ভুজা দেবীর উপরের দিকের বাম হাতে থাকে খড়্গ, ডান হাতে প্রতীকী জপমালা। নিচের বাম হাতে নরমুণ্ড এবং নিচের ডান হাতে থাকে খর্পর বা রক্তপাত্র। ভগবতীর ডান দিকে থাকেন মহাকাল এবং বাম দিকে থাকেন ডাকিনী। তাঁর হাতে থাকে একটি দেহাবশেষ। পুজো সম্পূর্ণ বীরাচারী মতে হয়। একটি তুলসীপাতা মায়ের পুজোয় ব্যবহার করা হয় নারায়ণের পুজোর জন্য। পুজোয় কুশনির্মিত শালগ্রাম ব্যবহৃত হয়। পুজো শুরু নিশিরাতে। সঙ্গে থাকে পাঁচটি অর্ঘ্যপাত্র। ভগবতী, ক্ষেত্রপাল, কামিনী এবং জয়া-বিজয়ার জন্য আলাদাভাবে পুজো করা হয়। মালদার আয়ো গ্রামের বামাকালীর পুজো অন্যান্য কালীর পুজো সাঙ্গ হওয়ার পর শুরু হয়।

zoom
বীরভূমের লোবার মা, সারা গায়ে সর্পাকৃতি কুণ্ডলিনী আলপনা।

নবদ্বীপের বামাকালী দক্ষিণাকালীর মতো পদসংস্থান অর্থাৎ ডান-পা’টি শিবের বুকে থাকলেও তাঁর নাম বামাকালী কিংবা লোবা বাবুপুর বড়ার গ্রামের মূর্তি দৃশ্যত বামপদ আগে থাকলেও তাঁরা বামাকালী বলেন না। নবদ্বীপে সম্ভবত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশদের দাপটে বামাকালীর রূপের পরিবর্তন হয়েছে আর লোবার ক্ষেত্রে আগমবাগীশের প্রভাব শূন্য। এখান থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, আগমবাগীশের পূর্বে বাংলায় বিশেষ করে বীরভূমে বামাকালীই ছিল কালীর প্রধান মূর্তিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। আগমবাগীশপন্থীদের সঙ্গে তাঁদের যে বিরোধ ছিল, তার একটি পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় শান্তিপুর থেকে। বিসর্জনের সময় শান্তিপুরের বামাকালীর সঙ্গে আগমেশ্বরীর সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

অধিকাংশ বামাকালীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিস্মৃতপ্রায় তান্ত্রিক সাধকের নাম। এই কারণে লৌকিকভাবে বামাকালীর নাম ‘সাধন-কালী’। পূর্ব বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলী থানার প্রাচীন গ্রাম গঙ্গা তীরবর্তী মেড়তলা।  গ্রামের উল্লেখযোগ্য দেবী হলেন ভট্টাচার্যদের ধাতব বামাকালী; ‘যাদোয়া-কালী’ নামে সুপরিচিত। বংশের প্রখ্যাত তান্ত্রিক সাধক ছিলেন রাজারাম ঠাকুর। আদি নিবাস পূর্ববঙ্গ। এই বংশে জন্মেছিলেন আরেক তান্ত্রিক সাধক কালীশঙ্কর ভট্টাচার্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভট্টাচার্য বংশের দৌহিত্র ছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রশিল্পী পাহাড়ী সান্যাল।

যাদোয়া কালীর মূর্তি অষ্টধাতুর তৈরি। তাঁর বাম পদ শিবের বুকে ন্যস্ত। পাশেই রয়েছে জোড়া শৃগাল। দু’টি মূর্তি রয়েছে ‘বড় মা’ ও ‘ছোট মা’ নামে পরিচিত। শরিকিয়ানার জেরে সম্ভবত মূর্তি বিভক্ত হলেও বর্তমানে একই মন্দিরে পূজিত হচ্ছেন। যাদোয়া কালীর নিত্যসেবায় আমিষ ভোগ লাগে। প্রতি অমাবস্যায় দেবীকে সুরা অর্পণ করতে হয়। কার্তিক মাসের অমাবস্যায় দেবীর বাৎসরিক পুজো। সেদিন সুরার ঘট স্থাপিত হয়। বারোমাস সুরার ঘটটি দেবীদ্বয়ের কাছে থাকে। পাল্টানো হয় কালীপূজার রাতে। পূর্বে মোষ বলি হত। এখন মোষ বলি বন্ধ হলেও ছাগ বলি বজায় আছে। লোবার কালীর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন রামেশ্বর দণ্ডী নামে তান্ত্রিক সাধক। ইন্দ্রগাছার বামাকালীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুনিরাম গোঁসাই বা চক্রবর্তী ইত্যাদি। শুধু সমাজের উচ্চবর্ণ নয়, বামাকালীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রান্তিক মানুষ। পুরুলিয়ার বলরামপুরথানার কর্মাগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বামাকালীর পূজারী কর্মকার সম্প্রদায়। মুর্শিদাবাদের জরুর গ্রামের বামাকালীর প্রতিষ্ঠাতা গ্রামের রাখাল বাগালেরা। এই কারণে ‘রাখালে কালী’ও বলে। বর্ধমানের পাণ্ডুক গ্রামের বামাকালী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ভয়ংকর দস্যু প্রল্লাদ মেটে। চুরির ফলের নৈবেদ্য দেবী পূজার প্রধান উপকরণ। এসব কালী অন্তত ৩০০ বছরের পুরাতন।

zoom
বামাকালী, শান্তিপুর

শান্তিপুরে দু’টি বামাকালী আসে। ১৯৪৬ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোধে একদল স্বাধীনতা সংগ্রামী বামাকালীর পূজা আনেন। ‘বোম্বাটকালী’ নামে বিখ্যাত। বামাচারের স্মৃতিস্বরূপ একাধিক নরকরোটি দেবীর বেদিতে বিদ্যমান। সাতের দশক থেকে আসছে শান্তিপুরের চরজিজিরা বামাকালী। মূর্তি হিসাবে উগ্র হলেও বামাচার মতে পুজো হয় না। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে শান্তিপুরের বামাকালীর নাচ দেখার জন্য এখন লক্ষাধিক মানুষের ভিড় হয়। 

বামাচার ও বামাকালী নিয়ে ফিল্ড সার্ভে করার সূত্রে বাস্তব পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বামাচারে এখন পঞ্চ ম-কারের গুহ্য ও প্রথাবিরোধী মৈথুন বিষয়টি লুপ্ত। তার পরিবর্তে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের লোকাচার ও লোকবিশ্বাস বা লোকায়ত ভয় ভক্তির মনস্তাত্ত্বিক বিচিত্র আবর্ত। যেমন মুর্শিদাবাদের জড়ুর গ্রামের বামাকালীর পুজোয় মৈথুন আচার স্থান হারিয়ে মেয়েদের ষোলো কলার ‘ঠারোগো প্রদান’ রীতিতে পরিণত হয়েছে। বিসর্জনের সময়ে মশাল জ্বালানোর বাঁধনহারা উল্লাস যেন কুণ্ডলিনী শক্তির আদিম প্রলয়-স্পন্দনকে সামাজিক উৎসবের নিগড়ে বেঁধেছে। কোথাও পশুবলি বন্ধ হয়েছে, কোথাও বা পশুবলির আধিক্য ক্রমবর্ধমান। প্রাচীন গুহ্য বামাচার গোপন শ্মশানচক্র থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে।  সাধারণ মানুষের আশ্রয়ের পরম নির্ভরস্থল হয়ে উঠেছে বামামায়ের রাঙা চরণতল।

…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….

Bamakali Behula Buddhism Chand Sadagar Crematorium Goddess Kali Local deity Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shantipur Tantra Tantrik Rituals

Share this article on