
সদ্যই ‘রাবণ’ প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে মনসিজ মুজমদারের ‘পটে লিখা: রূপ, অরূপ আর স্মৃতির কথন’ বইটি। কীরকম হল সেই বই? শিল্পের লেখার সঙ্গে সাধারণ পাঠকের এক দূরত্বময় আলো-আঁধারির খেলা কি উতরোতে পারল এই বই? জানুন, কারণ সামনে বইমেল। বইয়ের লিস্ট তৈরি করতে শুরু করেছেন তো?
‘সোনার কেল্লা’ সিনেমায় দেখানো মুকুলের আঁকা ছবিগুলির একটিও সত্যজিৎ রায় নিজে আঁকেননি, ওগুলি শিশু অভিনেতা কুশল চক্রবর্তীর হাতযশ। কারণ অভিজ্ঞ শিল্পীর দক্ষ হাতের স্ট্রোকে বাচ্চাদের স্বতঃস্ফূর্ত টান, রঙের প্রয়োগ ও সামগ্রিক বিচিত্র বিন্যাস পাওয়া অসম্ভব। বহু বছর আগে ঠিক সেই একই কারণে নাকি, স্বয়ং পাবলো পিকাসো-ও ছোটদের আঁকার অনুকৃতি দেখাতে ভরসা পাননি! নিজের শিশুপুত্র ক্লদ ও শিশুকন্যা পালোমা-কে মডেল করে পিকাসো যে ছবিটি এঁকেছিলেন তার নাম ‘ক্লদ আঁকছে’। ছবিতে দেখা যায় ছোট্ট ছেলে ক্লদ নিবিষ্টমনে কাগজের ওপর তুলি বা প্যাস্টেল ঠেকিয়ে রেখেছে, অথচ তাতে কিছু আঁকা হয়নি। আসলে শিশুর মতো ছবি আঁকা সহজ নয়। পিকাসোর মতো শিল্পীর পক্ষেও নয়! শিশুরা আঁকে আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায়, কোনও দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ নেই সেখানে। অথচ বয়স্ক আধুনিক শিল্পী তাঁর অর্জিত পটুত্ব নাকচ করলেই শিশুশিল্পীর অপটুত্বে পৌঁছতে পারেন না। যাকে পিকাসো বুঝতে চেয়েছেন এভাবে, রজার ফ্রাই তাকে-ই বলেছেন ‘মনের ছবি’। বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যায়, শিশুশিল্পীর রসদ যতদিন কেবলমাত্র তার নিজেরই ইম্প্রেশন, ততদিনই সে একজন ‘শিশুশিল্পী’। একটি বইয়ের শুরুতেই যদি এমন একটি বিষয় নিয়ে তোলপাড় আলোচনা ও ভাবনার খোরাক মেলে, তবে পাঠকমনে বাকি লেখাগুলি সম্বন্ধে আগ্রহ একলাফে বহুগুণ বেড়ে যায়। মনসিজ মজুমদারের সাম্প্রতিক বই ‘পটে লিখা: রূপ, অরূপ আর স্মৃতির কহন’ সম্বন্ধে এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা চলে।

মোট ১৫টি লেখা বিশিষ্ট বইটির সবই যে ‘চিত্রশিল্প’ নিয়ে প্রবন্ধ, এমনটা আদৌ নয়। বরং একে লেখকের আইডিয়া ও বিশ্লেষণী ব্যুৎপত্তির নানা ঝলকে ঠাসা একটি নোটবুক বলা চলে। ‘অরূপের রূপ ও ভাষা’র প্রবন্ধে ঐতিহাসিক মতান্তর অজস্র। প্লেটো, সেন্ট অগাস্টিন, মধ্যযুগীয় দলবল থেকে পিকাসো বা কান্দিনস্কি– ভাবনার চরম দোলাচল। সস্যুর ও লেভি স্ট্রাউসের মতে, মানুষের ভাষা কেন ‘সুসংগঠিত চিহ্নব্যবস্থা’, তা বোঝাতে গিয়ে লেখক বলছেন– মর্জিনা যখন আলিবাবার বাড়ির দরজায় ডাকাতদের দেওয়া খড়ির দাগ দেখেছিল, তখন অবশ্যই তা অর্থবহ চিহ্ন ছিল। কিন্তু রাত্রে দস্যুরা যখন একই খড়ির দাগ সব বাড়ির দরজায় দেখতে পেল, তখন সেটা রইল নিছক দাগ হয়ে। চিহ্ন হয়ে উঠল না!– এমন ভাবনা পড়ে চমৎকৃত না হয়ে উপায় নেই।
ভ্যান গখকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটি হদিশ দেয় প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর মরণোত্তর খ্যাতির নেপথ্যে থাকা, ভাই থিও-র সঙ্গে ভ্যান গখের পত্রাবলির প্রকাশ হওয়ার ঘটনা। তেমনই ভ্যান গখের মৃত্যুশতবর্ষ উদযাপনে সারা পৃথিবীতে যে কী বিপুল সাড়া পড়ে গিয়েছিল তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণ ঋদ্ধ করে পাঠকদের। শিল্পী সৈয়দ হায়দার রাজার ছবিতে ভারতীয়ত্ব ঠিক কোন স্তরের? অবনীন্দ্রনাথ আর বেঙ্গল স্কুলের বাইরে চিত্রকলার ভারতীয়করণের ভগীরথ কেন শুধুমাত্র যামিনী রায়কেই বলা চলে, কেনই বা অনীশ কাপুরের ছবি ভারতীয় শিল্পকলার প্রতিনিধি নয়?– এ জাতীয় তত্ত্ব এবং তথ্য যুগপৎ উঠে আসে ‘নেই তাই’ শীর্ষক প্রবন্ধে।
‘শিল্পকলায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি’ বলতে আদতে কী বোঝায়? এই মুখাপেক্ষিতাকে কেন বলে ‘কালচারাল ক্রিঞ্জ’– সে ব্যাপারে বলতে গিয়ে কলাসমালোচক টিমোথি হাইমেনের প্রশংসার উপর ভূপেন খাক্কারের ছবির বাজারদর কেমনভাবে নির্ভর করে, এমন গুরুগম্ভীর প্রসঙ্গও সাবলীলভাবে এসেছে বৈঠকি আড্ডার মেজাজে। অনুপুঙ্খ ডিটেইলিংয়ে ভরা এই বই। জ্যাকসন পোলক, অ্যান্ডি ওয়রহল, ফ্রাঙ্ক স্টেলার মতো শিল্পীদের সঙ্গে ক্যানভাসের রং যেন ছড়িয়ে পড়ে পাঠকের মনে। রুচির পাঠের সঙ্গে সঙ্গে এ যেন বোধেরও স্নান।
১৯৯৮ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সুন্দরতা কি দেবী’ প্রবন্ধটি এ বইয়ের সম্পদ। লেখার বিষয়বস্তু: মকবুল ফিদা হুসেনের আঁকা বহু-বিতর্কিত নগ্ন সরস্বতী ছবিটির নান্দনিক যৌক্তিকতা। ‘পটে লিখা নারী’ যেন গানের অন্তরায় ঢুকে পড়ার আগে ক্ষণিকের ফিরে দেখা। বিতর্কিত বিষয় আবারও– অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতমাতা’ কেন সমকালের জাতীয়তাবাদী তাগিদে মাথা খাটিয়ে আঁকা ‘আইডিওলজিক্যাল কনস্ট্রাক্ট’, আর নন্দলাল বসুর ‘সতী’ কেন তাৎপর্যে ভিন্ন, তার তথ্যনিষ্ট আলোচনা রয়েছে ‘বঙ্গভঙ্গ, হিন্দুত্ব এবং দু’টি ছবি’ প্রবন্ধে। বইয়ের শেষ লেখাটিতে আবারও ফিরে এসেছে এই অনুষঙ্গ। বলা বাহুল্য, ছবি সম্বন্ধে পাঠকের মনে ‘ভাবা প্র্যাকটিস করো’ জাতীয় প্ররোচনায় কেতাবখানি ভরপুর।
শিল্প ছাড়াও তসলিমা নাসরিন প্রসঙ্গে ‘যে যা পারে’ শীর্ষক লেখাটিতে ‘মৌলবাদ কীভাবে সাহিত্যের কণ্ঠরোধ করতে উদ্যত হয়’, তার প্রাঞ্জল বিশ্লেষণ মেলে। বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্টিতে স্কটের প্রভাব, রবীন্দ্রনাথের লেখায় গলসওয়ার্দির ছায়া, এমনকী, ‘সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বনাম দীপা মেহতা’ মামলার বিবরণ এক আশ্চর্য সহাবস্থানে পৌঁছেছে ‘নকল’ আর ‘অনুপ্রেরণা’-র মধ্যের এক চিলতে ফারাক বোঝাতে গিয়ে।
লেখক মনসিজ মজুমদারের পিতা কবি মোহিতলাল মজুমদার। পুত্রের চোখে দেখা পিতার আন্তরিক স্মৃতিচারণ এ গ্রন্থের শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। ‘বাবার স্মৃতি’ লেখাটি পাঠকদের আবিষ্ট করবে, নতুন চোখে চেনাতে সাহায্য করবে বিস্মৃত এক কবির ব্যক্তিসত্তার দিকটিকে। বহু ঘটনার থেকে বেছে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়– শিশুকালে লেখক মেলায় যাবেন বলে বাবার কাছে পয়সা চাইলে কবি মোহিতলাল উল্টে শিশুপুত্রকে বলেন, ‘তুই আমাকে চারটে পয়সা দিবি?’ দারিদ্রের সঙ্গে সংগ্রামের এমন নিঃসংকোচ অথচ দুঃসহ উদাহরণ সত্যিই বিরল।
‘রাবণ’ থেকে প্রকাশিত এই বইয়ের বিস্তর ‘ভালো’র মধ্যে সমস্যা কি কিছুই নেই? আছে। সংকলিত সবক’টি প্রবন্ধের শেষে লেখাটির প্রথম প্রকাশের সূত্র উল্লেখ রয়েছে, একমাত্র ‘আর্তি ও বিপন্নতার শিল্পী ভ্যান গখ’ প্রবন্ধটি বাদে। এ নির্ঘাত ছাপাখানার ভূতেদের কীর্তি। তেনাদেরই দৌলতে হুসেনের বহু-বিতর্কিত ‘সরস্বতী’ ছবিটি আঁকার বছরও ১৯৭৬-র পরিবর্তে ১৮৭৬ হয়ে গিয়েছে। উৎসাহী পাঠকমাত্রই এটি খেয়াল করবেন বলে মনে হয়। যে বইয়ের বারো আনা লেখাই ছবি বা ছবিকেন্দ্রিক বিশ্লেষণ ঘিরে, সেই গোটা বইয়ে এক ‘পাপু’-র (প্রাবন্ধিক শ্রীপান্থের অকালপ্রয়াত শিশুপুত্র) আঁকা দু’টি স্কেচ বাদে আর কোত্থাও কোনও ছবি নেই!? বিষয়টি খানিক হতাশাজনক। কোনও ছবির লিখিত বিবরণ বা বিশ্লেষণের পাশে মূল ছবিটির সাদা-কালো অবয়বটুকুও দেখতে পেলে, সাধারণ পাঠক লেখকের আলোচনা সম্যকভাবে বুঝতে পারেন, আরও আগ্রহ নিয়ে পড়েন। বহু শিল্পীর কাজই তো কপিরাইটের আওতা পেরিয়ে গিয়েছে বহুকাল, কাজেই ছাপার খরচ মাথায় রেখেও, দু’-একটি আর্টপ্লেট সংযুক্ত হলে মন্দ হত না। ছবির অভাবে পাঠকের সান্ত্বনা যেন লেখকেরই একটি প্রবন্ধের শীর্ষক– ‘নেই তাই’। তবুও এত ‘নেই’-এর মাঝে এমন একটি জরুরি সংকলন যে নতুন বছরে ভীষণভাবে ‘আছে’, সেকারণেই প্রকাশক এবং লেখক পাঠকদের ধন্যবাদার্হ।
পটে লিখা: রূপ, অরূপ আর স্মৃতির কহন
মনসিজ মজুমদার
রাবণ
৪০০্
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved