Inside Bengal’s Theatre Heritage Through Rare Photographs। Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

কেবলই ‘ছবি’ নয়

‘রঙ্গালয়ের ছবি’ উল্টে-পাল্টে দেখলে মনে হবে এ শুধু ছবির বই। মোট ২২টি ছবি আছে এই গ্রন্থে। কোথাও যোগেশ চরিত্রে গিরিশচন্দ্র, কোথাও ঘোড়ায় চড়ে মঞ্চে হাজির অমর দত্ত, কোথাও বা শ্রীকৃষ্ণ চরিত্রে কুসুমকুমারী। মনে রাখতে হবে, বাংলা থিয়েটারে নারী চরিত্রে দীর্ঘদিন নিষিদ্ধপল্লির নারীরা অভিনয় করতেন। এঁদের মঞ্চে দেখার জন্য মারামারি চলত, কিন্তু সামাজিক প্রাপ্তি শূন্য। ‘রঙ্গালয়’ পত্রিকা এঁদের ছবি ছাপছে, তা হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে। 

Published by: Robbar Digital

Posted:February 17, 2026 4:03 pm | Updated:February 17, 2026 7:05 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

দেহপট সনে নট সকলি হারায়– থিয়েটারের তো এই এক সমস্যা। এই আছি, এই নেই। তার উপর বঙ্কিমচন্দ্র কবেই বলে গিয়েছেন, ‘বাঙ্গালার ইতিহাস নাই।’ যা ছিল আক্ষেপ, তা পরিণত হয়েছে ভবিষ্যদ্বাণীতে। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে যাঁরা কম-বেশি জড়িত, তাঁরা জানেন খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার কাজ কত কষ্টসাধ্য। সেখানে একটা গোটা বই শুধু থিয়েটারের দুষ্প্রাপ্য ছবি নিয়ে!

থিয়েটারের ছবি বলাটা ভুল হল। বলা উচিত ‘রঙ্গালয়ের ছবি’। অধ্যাপক দেবদত্ত গুপ্ত শুধু বাংলা থিয়েটারের এক কালখণ্ডের বিভিন্ন মুহূর্তের ফোটোগ্রাফ একত্রিত করেননি। তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ছাই ঘেঁটে দেখেছেন সচ্চা থিয়েটার ছিল কি না।

এরকম ছবি যে টিকে রয়েছে, সেটা ভাবাই ছিল বাতুলতা। সেখানে দুই মলাটের মধ্যে গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অমরেন্দ্রনাথ দত্তদের জীবন্ত হয়ে ওঠা থিয়েটারের ইতিহাসের সম্পদ। ১৯০১ সালে অমরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে প্রকাশিত হয় বাংলা নাট্যপত্রিকা ‘রঙ্গালয়’। সম্পাদক পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়। চোরবাগানের দত্তবাড়ির সন্তান অমরেন্দ্রনাথের থিয়েটারি জগতে আসা, সাফল্য-ব্যর্থতা ও অন্তিম পরিণতি- ট্র‍্যাজেডির মতো একটা বিরাট চরিত্রের উত্থান-পতনের থেকে কম কিছু নয়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি ক্লাসিক থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে অমরেন্দ্রনাথ ও ক্লাসিকের ভূমিকা স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।

তবে আপাতত আলোচ্য ‘রঙ্গালয়’-এর কথা। আরও যথাযথভাবে বললে ‘রঙ্গালয়’-এর ছবি। ১৮৯৮ সাল নাগাদ অমরেন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ হয় হীরালাল সেনের। ভারতীয় সিনেমার প্রাণপুরুষের আগ্রহ তৈরি হয় থিয়েটার নিয়ে। ক্লাসিকের নাটকগুলোর জনপ্রিয় মুহূর্ত ধরা রইল হীরালাল সেনের ক্যামেরায়। যেগুলো ছেপে বিনামূল্যে বিতরণ করা হত ‘রঙ্গালয়’ পত্রিকার সঙ্গে। এই ব্যবস্থার পোশাকি নাম– ‘রঙ্গালয়ের উপহার’। তার পাশাপাশি ভ্রমর, আলিবাবা ও চল্লিশ চোর, সরলা, প্রফুল্লর মতো নাটকের স্থির মুহূর্ত তোলা রইল উত্তরকালের পাঠকের জন্য।

বোঝাই যায়, পত্রিকার ওই পদ্ধতি বেশিদিন টিকিয়ে রাখা মুশকিল। অমরেন্দ্রনাথ কোনও দিনই হিসেবি মানুষ ছিলেন না। যা করেছেন, রাজকীয় মেজাজে করেছেন। অর্থ কখনও বাধা হয়নি। ‘রঙ্গালয়’ পত্রিকার ছবি উপহারের প্রথা ওই সময়ে হিসেবের খাতায় আর্থিক ক্ষতি বলে লেখা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের খাতায় তা ল্যামিনেটেড হয়ে রইল।

কেন? কী এর গুরুত্ব? সেটারই ব্যাখ্যা করছেন দেবদত্ত বাবু। ‘রঙ্গালয়ের ছবি’ উল্টে-পাল্টে দেখলে মনে হবে এ শুধু ছবির বই। মোট ২২টি ছবি আছে এই গ্রন্থে। কোথাও যোগেশ চরিত্রে গিরিশচন্দ্র, কোথাও ঘোড়ায় চড়ে মঞ্চে হাজির অমর দত্ত, কোথাও বা শ্রীকৃষ্ণ চরিত্রে কুসুমকুমারী। সংক্ষিপ্ত গ্রন্থে গ্রন্থকার এই ছবিগুলোর ঐতিহাসিক ভূমিকা আলোচনা করেন। মনে রাখতে হবে, বাংলা থিয়েটারে নারী চরিত্রে দীর্ঘদিন নিষিদ্ধপল্লির নারীরা অভিনয় করতেন। এঁদের মঞ্চে দেখার জন্য মারামারি চলত, কিন্তু সামাজিক প্রাপ্তি শূন্য। ‘রঙ্গালয়’ পত্রিকা এঁদের ছবি ছাপছে, তা হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে। এ নিছক জনপ্রিয়তা নয়, বরং সমাজের অপাংক্তেয় মানুষদের একই পরিবারভুক্ত করে নেওয়া। তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে সামাজিক দূরত্ব ঘোচানোর প্রক্রিয়া। গ্রন্থকারের ব্যাখ্যা, ‘এইভাবেই ছবিগুলির মধ্যে দিয়ে নাটক এক ধরনের গৃহস্থ সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠল। ঠিক যেমন ক্যালেন্ডারের দেবদেবীর ছবি বা জনপ্রিয় দেশনায়কের নেতার প্রতিকৃতি গৃহস্থের অন্দরমহলে স্থান পেয়েছিল।’

এখানেই শেষ নয়। পুরুষ-নারীর দাঁড়ানোর ভঙ্গি কিংবা শরীরী ভাষাও একটা ন্যারেটিভ তৈরি করে। ধরা পড়ে, উনিশ শতকের শুরুর দিকে ভারতীয় ফোটোগ্রাফিশিল্পের অত্যাধুনিকতা। এ তো গেল সমাজ-সভ্যতার নিজস্ব হিসেবনিকেশ। তার বাইরেও একটা থিয়েটারি ‘সত্যি’ আছে। বাংলা থিয়েটারের গবেষকদের মধ্যে অনেক বিষয়ে ঝুটঝামেলা থাকলেও একটা বিষয়ে সকলে সহমত- ইতিহাসের উপাদানের অপ্রতুলতা। কিংবা যেখানে যেটুকু আছে, সেটুকু সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণে যত্নের অভাব প্রকট। সেখানে ‘রঙ্গালয়’ পত্রিকার ভিজ্যুয়াল ইতিহাস নির্মাণের সক্রিয় হাতিয়ার। পোশাক, ব্যাকড্রপ, সেট, নাটকীয় ‘কোরিওগ্রাফি’ সম্বন্ধে একটা ধারণা করা যায়। অতীতের ভাষ্যকে কাজে লাগিয়ে ইতিহাস নির্মাণে এই ডকুমেন্টশনের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। যেমন, গিরিশচন্দ্রের ছবি মানেই সব সময় ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, বিনোদিনীর রূপ সাজানো-গোছানো, অমরেন্দ্রনাথ ঘোড়ায় বসা। পরবর্তীতে এই রূপই এঁদের জীবন ও চরিত্র তৈরির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।

 

তবে গ্রন্থকারের সঙ্গে অনেক বিষয়েই একমত হওয়া যায় না। এই গ্রন্থে ‘রঙ্গালয়’ পত্রিকার সপ্তম এডওয়ার্ডস বা লেডি কার্জনের ছবি আছে। অমর দত্ত সত্যিই এঁদের সম্মান করতেন, ইংরেজদের সমীহের প্রত্যাশী ছিলেন। শাসকদের ছবি ছাপিয়ে তিনি কোনও ভারসাম্যের খেলা খেলেননি। নিজের বিশ্বস্ততা প্রমাণ করেছিলেন। গ্রন্থে চেনা ইতিহাসের বিবৃতি কমিয়ে আরও আলোচনার জায়গা দেওয়া যেত। যতিচিহ্নের ভুল ব্যবহার গদ্যকে জটিল করেছে। সেসব সত্ত্বেও থিয়েটারের ইতিহাসের উপাদান ডকুমেন্টশন ও তার ব্যাখ্যার জন্য এক নিমেষে ‘রঙ্গালয়ের ছবি’ পড়ে ফেলা যায়।

‘রঙ্গালয়ের’ ছবি
দেবদত্ত গুপ্ত
ইতিকথা পাবলিকেশন
৩০০্‌

Archival Images bengal theatre Bengali Stage History Cultural History Bengal Girish Chandra Ghosh Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Stage Artists Bengal

Share this article on