
প্রকাশনার উপস্থাপনায় ফ্যাক্সিমিলি-র স্পর্শানুভূতি দেখে গায়ে কাঁটা দেয়। নিখুঁত ছাপাইয়ের দরুন পাশাপাশি পাতায় বসে যাওয়া কাট-আউটের পুরনো কালচে ছোপ সর্বত্র স্পষ্ট চোখে পড়ে, বা উল্টোদিকের পাতার শুকনো ফুলের গায়ের টেক্সচার। ফ্যাক্সিমিলিতে সেই অনুপুঙ্খ ধরা পড়ে নিখুঁতভাবে। ১৫০ বছর আগের একটা মানুষ যেন ঘাড়ের কাছে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এক নিঝুম দুপুরে আপন মনে হঠাৎ আবিষ্কারের সেই সুপরিচিত পদ্ধতিটিকে উসকে দেয় ছাপাইয়ের উৎকর্ষ।
প্রান্ত সামাজিক নির্মাণ। দূরত্ব আর পৃথকীকরণের প্রয়োজনের দরুন সৃষ্ট। তাকে সংজ্ঞায়িত করে কারা?– পণ্ডিত, গবেষক, বুদ্ধিজীবী, শ্রেণি, ক্ষমতা, রাজনীতি। তবে যাকে ‘প্রান্তিক’ হিসেবে দেগে দেওয়া হয়, দূরত্বে রাখা হয়, প্রান্ত তার কাছে তো প্রান্ত নয়। তার যাত্রার শুরু। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধ। সশস্ত্র বিপ্লব দিয়ে না হলেও, হয়তো নিজের জগতের পুনর্নিমাণের মধ্যে দিয়ে। অর্থাৎ, সৃজন দিয়েও প্রতিরোধ সম্ভব।

প্রান্ত বলে এই যে ক্ষেত্র, তার চেহারাটা আদতে কেমন? সে কি কেবলই দমনের? না কি উত্তরণেরও? সে কি কেবল শেষ আর শুরুর বাইনারির এক অংশ না কি নানা মিশেলের আধারও? এসব কথা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে, হাতে এসে পড়া বইটা নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে।

এই বই আসলে ‘স্ক্র্যাপবুক’ হিসেবে ব্যবহৃত খেরোর খাতা বা এক ডায়েরি। এর মালিকানা যাঁর, তাঁর নাম ইন্দুবালা। রামবাগানের ইন্দু। ‘নাইটিংগেইল অব বেঙ্গল’। জন্ম ১৮৯৮। মৃত্যু ১৯৮৪। এই খাতাকে ‘মাই প্রেয়ার্স: মিস ইন্দুবালা’ শীর্ষনামে বই আকারে প্রকাশ করেছে ‘বুক অলিন্দ’। সম্পাদনা: জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য্য। প্রকাশক ও সম্পাদক সুবিবেচক, তাই স্ক্র্যাপবুকের ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ ছাপার দরুন এক আশ্চর্য বহুস্তরীয় সম্পদের সৃষ্টি হয়েছে।

ইন্দুবালা গান শিখেছেন রথী-মহারথীদের সান্নিধ্যে। গওহর জান, ইলাহি বকশ, কালীপ্রসাদ মিশ্র, গৌরীশঙ্কর মিশ্রের কাছে। কিন্তু ইউরোপ, উপনিবেশ, প্রযুক্তির উন্নয়ন ব্যতিরেকে রামবাগানের ইন্দুর ইন্দুবালা হয়ে ওঠা সম্ভবপর ছিল না। সিনেমা আর গ্রামোফোন রেকর্ড, প্রযুক্তির এই মিশেল নির্মাণ করেছিল তাঁর জাজ্জ্বল্যমান সত্তা; এক নতুন আইডেনটিটি। তা সত্ত্বেও পাদপ্রদীপের আলো থেকে যোজন দূরত্বে যেন নিজের এক বাহুল্যবর্জিত, অতি সাদামাটা জীবনযাপনের প্রতি আশ্চর্য অনুরাগ ছিল তাঁর। আধ্যাত্মিকতাকে সোপান করে পার্থিব প্রাপ্তি ছাপিয়ে উঠে, বিদ্যালাভ, শিক্ষা আর জ্ঞানতৃষ্ণার প্রতি তীব্র আসক্তির দিকেই ইঙ্গিত করে এই সম্ভার।

এই খেরোর খাতা সুনির্দিষ্টভাবে কবে থেকে শুরু এবং কবে শেষ, বলা যায় না। তবে অনুমান করা যায়। কারণ ইন্দুবালার প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড ১৯২৬-এ। শেষ রেকর্ড ১৯৪২। হতে পারে এই খাতা তার কিছুকাল আগে-পরের।

শেষ ক’পাতা বাদ দিয়ে, ১০২ পৃষ্ঠা অবধি প্রতি পাতায় পৃষ্ঠাসংখ্যা লিখেছেন ইন্দুবালা। স্ক্র্যাপবুক শুরু পাতাজোড়া পায়ের কাট-আউট দিয়ে। তার ওপর সাঁটা গ্রেকো-রোমান উৎসের এক ফুলদানির স্ট্যাম্প-সাইজ় কাঠখোদাই– পদযুগলে ইন্দুবালার পুষ্পার্ঘ্য। বাঁ পাশের পাতায়– ‘ওঁ অপবিত্র পবিত্রোবাং সর্ব্বাবস্তাংগত পিবা [সর্বাবস্থান গতহ্বপিবা]।/যৎস্মরে [যৎ সরেত] পুন্ডরিকাক্ষং স্ব ভার্য্য ভান্তরে [স বাহ্য অভ্যান্তরে] শুচি।।’– দেহ শুচির মন্ত্র। ছোট ছোট কিছু ভুল বানান। যা দিয়ে ইন্দুবালার, প্রান্তের ও সেসময়ের উচ্চারণগত ভুলত্রুটি ধরা পড়ে। এরপর একে একে দেখা যায় রাধাকৃষ্ণের ছবি; প্রাতঃকৃত্য স্তব; চাঁদার বিল থেকে কেটে বসানো দেবী শীতলার ছবি, তার নিচে শীতলার মন্ত্র; পরের পাতায় আসনশুদ্ধি; স্বরস্বতীর ছবি কেটে, সেঁটে, তার নীচে বীণাপাণি মন্ত্র– ‘লাগ লাগ স্বরস্বতী মোর কন্ঠে লাগ…’। আরও একটু এগিয়ে ৯ নম্বর পাতায় দুটো গণেশের ছবির কাট-আউট– একটা রঙিন লিথোগ্রাফ। কোনও বই থেকে নেওয়া। অন্যটা লাল রঙের কাঠখোদাই। কোনও কোম্পানির ট্রেড-মার্ক। অন্যত্র শিব-পার্বতী, বিষ্ণু, বুদ্ধ, কালী, দুর্গার ছবি; খবরের কাগজ থেকে কাটা কৃষ্ণ-সম্বন্ধীয় তথ্য; অন্য কোনও বই থেকে টেক্সট কেটে ছবির নিচে জুড়ে ন্যারেশন নির্মাণ। এসবের পাশাপাশি এক এক করে আবিষ্কৃত হতে থাকে কালির কলমে হাতে লেখা মন্ত্র– আদ্যা স্তোত্রম, শিব প্রণাম, শ্রী শ্রী সরস্বতী লীলামৃত থেকে ‘কালীদাসের কাহিনী’র আস্ত দু’-পাতা কেটে নিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়েছে খাতায়। ‘কালীদাসের কাহিনী’ কেন ইন্দুবালাকে আকৃষ্ট করেছিল, তা খানিক অনুমান করা যায়। ‘কালীদাস বলে বাণী/ খুঁজি আমি বীণাপাণি/ বিদ্যালাভ বাসনা আমার’– এই পঙক্তি বোধহয় হাতে লেখা বীণাপাণি মন্ত্র– ‘লাগ লাগ স্বরস্বতী মোর কন্ঠে লাগ…’-র সূত্র ধরে ইন্দুবালার বিদ্যালাভের বাসনার দিকটা আরও স্পষ্ট হয়।

১১ নম্বর পাতায় পৌঁছে বিস্ময় জাগে। বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা একাধিক লিথোগ্রাফিক অণুচিত্র দিয়ে আরাধ্যা দেবীর জগৎ সাজিয়েছেন ইন্দুবালা। ২১ পৃষ্ঠায় ‘নব দূর্গা’, ৩১ ও ৩৩ পৃষ্ঠায় নবগ্রহ; ৩৫ পৃষ্ঠায় ক্যালেন্ডারের তারিখ থেকে সংগৃহীত পক্ষকাল, ৪১ পৃষ্ঠায় দশ অবতার বা ৭৭ পৃষ্ঠায় দেবীমূর্তির অ্যারেঞ্জমেন্ট এক আশ্চর্য দৃশ্যজগতে নিয়ে যায় আমাদের। ইন্দুবালা যেভাবে তাঁর ইউটোপিয়াকে সাজাতে চেয়েছেন, যে ক্ষেত্রটিতে বিচরণের মধ্যে দিয়ে বাঁচতে চেয়েছে তাঁর অন্তর, তার বিমূর্ত এক ছবি ধরা পড়ে। ২৫ নম্বর পাতা: সাজানোর আয়োজনে শৈল্পিক সত্তা স্বাধীনতা চাইছে; প্রথা ভাঙতে চাইছে– টেক্সট ঢেকে দিয়ে তার ওপরেই তাই সাঁটা হয়েছে পাতাজোড়া বিষ্ণুর লিথোগ্রাফ। পাশের পাতায় বিষ্ণু স্তোত্রানি। দু’-মলাটের মধ্যে ইন্দুবালার ইউটোপিয়া-র আর্কিটেকচারের এক স্পষ্ট ছবি ধরা পড়ে। সেই ক্ষেত্র প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে বহুচর্চিত, উজ্জাপিত গণপরিসরে দেখা এক তারকার বহুস্তরীয়, জটিল, অদম্য দিকটির। যেন স্যাংকটাম স্যাংকটোরাম এক। যার মধ্যে অপার জ্ঞানতৃষ্ণা নিয়ে উপবিষ্ট এক ধ্যানমগ্ন ইন্দুবালা।

মূলত নানা সময়ে আবিষ্কৃত, প্রাপ্ত, আকৃষ্ট হওয়া মন্ত্রের সম্ভার এই ডায়েরি। তবু তাকে ‘মাই প্রেয়ার্স’ নাম দিলে পূর্ণতা পায় না এই আকর। এই স্ক্র্যাপবুক ইন্দুবালার একান্ত নিজস্ব জগৎ। তিনি কোন বস্তুকে গ্রহণ করছেন আর কোনটাকেই বা বর্জন করছেন; তাঁর গভীর বিশ্বাস; রুচি; চাহিদার তার এক চূড়ান্ত তালিকা এই খাতা। কখনও তা ইন্দুবালার অতি পছন্দের মন্ত্রের সম্ভার, কখনও তাঁর প্রিয় বাণিজ্যিক পণ্য সামগ্রীর এন্ডর্সমেন্ট– ৭৬ নং কলেজ স্ট্রিট ও ৩৬ নং ব্রজনাথ মিত্র লেনের শীতলা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার; শিব-শক্তি চন্দন ধূপ; আরাধনা ধূপ; কালী স্বদেশী দেশলাই। কখনও আস্ত এক গ্রাফিক নভেল– খাতার শেষাংশে অন্যত্র ছাপা সম্পূর্ণ ‘শ্রী গৌরাঙ্গের আবির্ভাব’ পাতা কেটে জুড়ে জুড়ে নির্মিত। কখনও বা ইষ্টদেবতার সঙ্গে ইন্দুবালার ডায়ালগের রেকর্ড। ১১ নম্বর পৃষ্ঠায় দেখা যায় লক্ষ্মী, শীতলা, শিব-পার্বতী, দুর্গা, কালী, সম্ভবত ক্যালেন্ডার থেকে কেটে নিয়ে সাঁটা অমাবস্যা তিথিতে চড়ক-এর ছবির স্ট্যাম্প সাইজ কাট-আউটের একাধিক দেবী প্রতিমার লিথোগ্রাফ। ‘পথ দেখাও। মা দয়া কর।’ শ্রী গুরুদেব, শ্রী কালিকানন্দ ব্রহ্মচারীর ছবি সাঁটা পাতায় নীচে লেখা– ‘ইষ্টদেবতা আমার, শ্রীচরণে স্থান দিন।’ কালিকানন্দর বড় ছবির দু’-ধারে ও নিচে মোট ন’টি ছোট ছবির পুনরাবৃত্তি হয়েছে। একই মাপের একই প্রতিকৃতি ইন্দুবালা কোথা থেকে পেলেন, তা কৌতূহল জাগায়। সেই সময় তো স্টিকার কিনতে পাওয়া যেত না। তাহলে একই ছবি বারবার তিনি ধৈর্য ধরে, সময় নিয়ে জোগাড় করেছেন নিশ্চয়ই। তবে যা বিস্মিত করে তা হল কাট-আউট ব্যবহার করে ডেকরেশন নিয়ে তাঁর এই অবসেসিভ রিপিটেশনস।

ছবির দেহঘেরের অনুসরণে কাটা বেশ ধৈর্য্যের কাজ। ছোট ছবি হলে সেই প্রক্রিয়া আরও দুরূহ হয়। ইন্দুবালা তাতে দমেননি। বহু স্ট্যাম্প-সাইজ ছবির জন্য তিনি প্রতিক্ষা করেছেন, সংগ্রহ করেছেন, ধৈর্য ধরে কেটেছেন, সময় নিয়ে সাজিয়েছেন, আঠা দিয়ে খাতায় জুড়েছেন। এই পারিপাট্য, সজ্জা, নিভৃতচর্চা যেন অকৃত্রিম নিষ্ঠার পুষ্পার্ঘ্য।

অন্যত্র, দেবদেবীর ছবি ঘিরে প্রদীপের কাট-আউট দিয়ে সাজানো; কোথাও এয়ার মেইলের খামের লাল-নীল ধারের নকশা কেটে নিয়ে ডায়েরির পাতা ফ্রেমের ধাঁচে সজ্জিত হয়েছে। সজ্জার এই কাজ কখনও এতই তীব্র হয়েছে যে, ইন্দুবালার অবসেশন আর নিষ্ঠার ভেদরেখা গিয়েছে মুছে। পৃষ্ঠা ৯১, ৯২ এবং ৯৩ ভরাট করা হয়েছে শতাধিক পদ্মের অণুচিত্র দিয়ে, আর ৪৫ পৃষ্ঠায় এই পদ্ধতি ছাপিয়ে গিয়েছে অন্য সবকিছুকে। মা লক্ষ্মীর কাঠখোদাই ছবি ঘিরে প্রায় শ’-খানেক শঙ্খের অনুচিত্র কেটে যেন ধ্বনির পথ-নির্দেশ করে খাতায় বসানো হয়েছে। সম্ভবত অন্য ছাপাই ছবির ধারের সাজানো অংশ থেকে সংগ্রহ করা। সে সময় উত্তর কলকাতার ছাপাইশৈলীর এসব ছিল অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সবকিছুর পর বোধহয় তাঁর মনে হয়েছিল একটু ধূপ দিলে সাজানো সম্পূর্ণ হবে। তাই শঙ্খ-পদ্ম-আলোয় উদ্ভাসিত ‘দশকর্ম্ম ধূপ’-এর বিজ্ঞাপন কেটে ওপরে বসিয়েছেন। নিচে সেই লক্ষ্মীর ছবিরই পুনরাবৃত্তি। দু’-দিকে মালা, ঘটের ওপর ডাব, আলপনা, বড় শঙ্খের কাট-আউট শেষে জুড়ে যেন পুজো সম্পন্ন হল।

তাঁর একনিষ্ঠতা, একাগ্রতার কাছে হার মেনেছে তাঁকে তৈরি করা বহির্জগৎ। অধরা সেই সত্তা রক্ষিত, সঞ্চিত হয়ে রয়ে গিয়েছিল দুই মলাটের অন্তঃপুরে। এই বই তার দুয়ারে এক নিবিড় আমন্ত্রণ।
বিশ শতকের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ফ্রেমওয়ার্কের নিরিখে তাঁকে দেখব কীভাবে? ইন্দুবালার খাতা থেকে একথা সুস্পষ্ট– তিনি উপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত ছিলেন না। বরং উপনিবেশ কীভাবে তাঁর অন্তর্জগৎ আর বহির্জগৎকে প্রভাবিত করেছিল তার প্রকারভেদ লক্ষণীয়। হিন্দু বাঙালির আধ্যাত্মিকতাকে উপজীব্য করে সত্যনিষ্ঠ এক শিল্পী কেবল জ্ঞানের সন্ধানে ছুটে চলেছেন বহির্জগতের জাঁকজমক উপেক্ষা করে। এই উত্তরণের সন্ধিক্ষণে ছায়া ফেলে ঔপনিবেশিক ছাপাইচিত্র ও স্বদেশির হাওয়া। কিন্তু ইন্দুবালা নিজেকে দেখেছেন কীভাবে? তাঁরও কি নিজেকে মনে হয়েছে প্রান্তের উৎপাদন? কেনই বা সুগায়িকা এবং চলচ্চিত্রাভিনেত্রীর চূড়ান্ত খ্যাতি, সম্মান, জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরেও কেন তিনি ‘রামবাগানের ইন্দু’-ই হয়ে রয়ে যেতে চেয়েছেন? আধ্যাত্মিকতার প্রতি তাঁর প্রবল আসক্তিই কি তাঁকে সর্বক্ষণ উত্তরণের আশ্বাস যুগিয়েছিল? এই খাতাকে বরং দেখা দরকার কাকে প্রতিরোধ করছেন তিনি, তার সাপেক্ষে– আধ্যাত্মিকতার পথ ধরে উত্তরণ প্রতিহত করেছে ‘প্রান্তিকতা’র নির্মাণকেই। এই খাতা তাই আদতে সেই সাইট অব রেজিস্টান্স।

সুতরাং, এবার জানতে ইচ্ছে করে, যে মানুষটার বহির্জগৎ পশ্চিমি প্রযুক্তির উৎপাদন (গ্রামফোন, সিনেমা); যে মানুষটা সমসাময়িক মহিলাদের ব্রত-আচার পালনের পরিবর্তে উন্মাদিনী হয়ে সংগ্রহ করেন হিন্দু দেবদেবী পূজার্চনার সংস্কৃত মন্ত্র, অথচ যিনি ব্রাহ্মনয়-মধ্যস্থতায় পূজোআচ্চা করেননি ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতি আসক্ত নন (নিজের সংগীতচর্চাকে তিনি ব্রাহ্মণ্যবাদের হাতে ছেড়ে দেননি। ভক্তিরস আর আদিরসাত্মকই রয়ে গিয়েছিল তা), তাঁর ক্ষেত্রে কি ডিকলোনাইজেশন ঘটেছিল?

আসলে ডিকলোনাইজেশন একমাত্র গণপরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দু’-মলাটের স্ক্র্যাপবুকের ভেতরেও তা প্রবলভাবে বিদ্যমান। ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং পশ্চিম– দুইয়ের মধ্যে থেকেও নিজের সত্তাকে পৃথক করে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন ইন্দুবালা। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে নয়, জ্ঞানচর্চা, দৃশ্যচর্চা ও বিশ্বাসের চর্চা দিয়ে এপিস্টেমিক সেন্টারটাই বদলে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সৃজনের জগৎ anti-brahmanical বা anti-colonial revolt নয়। তিনি এক আশ্চর্য সংস্কৃতির পুনঃকার্যকরীকরণ (re-functionalization) ঘটিয়েছিলেন এই দুইয়ের।
তিনি এই দুই জগৎকে ‘মানি না’ বলেননি। তিনি বলেছিলেন, এই দু’টিকে তিনি ‘নিজের মত করে মানেন’। কোন মন্ত্র, কোন জ্ঞান, কোন ছবি কীভাবে তাঁর জীবনে কাজ করবে, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর একান্ত আপনার। নিজস্ব সিদ্ধান্তের এই অভ্যাসই ঔপনিবেশিকতা মোচন।

এই পুনঃকার্যকরীকরণের মাহেন্দ্রক্ষণটি ধরা পড়ে তাঁর স্ক্র্যাপবুকে। ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং পশ্চিমকে ইন্দুবালা কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে তাকে তুলে রাখেননি। ক্ষমতাকে তিনি ‘র মেটিরিয়াল’-এ পরিণত করেন তাঁর ডায়েরিতে। এ-ও উপনিবেশিকতা মোচনের আরেক উদাহরণ।
এই বইয়ের প্রাককথন লিখেছেন রন্তিদেব মৈত্র। ইন্দুবালাকে তাঁর সময়ের নিরিখে দেখার ক্ষেত্রে রচনাটি অতি প্রয়োজনীয়। তাছাড়া দুষ্প্রাপ্য চিঠি, ছবি যোগ করাতে সেই কাজ আরও ঋদ্ধ হয়েছে। জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণশীল সম্পাদকীয়টিতে ইন্দুবালার দৃষ্টিজগৎ সার্বিকভাবে উঠে আসে। তবুও কিছু প্রত্যাশা রয়ে যায় তাঁর কাছে। কারণ জ্যোতির্ময় নিজে একজন কিউরেটর। ফলে, ইন্দুবালার ভিস্যুয়াল প্র্যাকটিসের মনস্তত্ত্বের দিকটা তাঁর লেখায় আরও বিস্তৃতি পেলে ভালো হত। দিলীপ ঘোষের করা প্রচ্ছদটির ক্ষেত্রেও আরও একটু ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন ছিল। বিশেষত, সিগনেট প্রেসের জন্য সত্যজিৎ রায়ের করা অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ’র প্রচ্ছদ যখন বাঙালির মনে-প্রাণে মিশে আছে বহু দশক ধরে।

এই প্রকাশনার উপস্থাপনায় ফ্যাক্সিমিলি-র স্পর্শানুভূতি দেখে গায়ে কাঁটা দেয়। নিখুঁত ছাপাইয়ের দরুন পাশাপাশি পাতায় বসে যাওয়া কাট-আউটের পুরনো কালচে ছোপ সর্বত্র স্পষ্ট চোখে পড়ে, বা উল্টোদিকের পাতার শুকনো ফুলের গায়ের টেক্সচার। এছাড়া, ৬ নম্বর পৃষ্ঠায় কার্ডে ছাপা সরস্বতীর ছবিটি, যা পৃথকভাবে বসানো হয়েছে বলে ভ্রম হয়। অথবা, দ্য পরিস্তান-এর হ্যান্ড-আউটের ডানদিকে নীচের কোণে বইপোকায় কাটা এক অংশ। এফোঁড়-ওফোঁড় হয়নি। দুধের সরের মতো কাগজের একটা হালকা স্তরমাত্র কাটা। ফ্যাক্সিমিলিতে সেই অনুপুঙ্খ ধরা পড়ে নিখুঁতভাবে। ১৫০ বছর আগের একটা মানুষ যেন ঘাড়ের কাছে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এক নিঝুম দুপুরে আপন মনে হঠাৎ আবিষ্কারের সেই সুপরিচিত পদ্ধতিটিকে উসকে দেয় ছাপাইয়ের উৎকর্ষ।
দ্বিতীয়ত, উনিশ শতক, এমনকী বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় ছাপাই চিত্র ও বাণিজ্যিক পণ্য, তাদের চাহিদা, ইচ্ছে, শখ-আহ্লাদ, চিন্তাধারার এমন জলজ্যান্ত ছবি উপস্থাপন করা দুরূহ। ‘বুক অলিন্দ’ সেই কাজটা নিখুঁতভাবে সম্পাদন করেছেন। আরও এক কারণে এই বই অতুলনীয়। চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রটা ইদানিংকালে যেন ক্রমশ শুকিয়ে আসছে। ‘মাই প্রেয়ার্স’ ডাইড্যাক্টিক নয়। গোয়েন্দা গল্পের মতো প্রতি পাতায় প্রশ্ন জাগে– এখানে ইন্দুবালা করছেন কী? কেনই বা? কেমনভাবে?– সুতরাং শুরু থেকে একজন ব্যক্তি এবং তাঁর সঙ্গে সময়ের সম্পর্কের কথা পাঠকের অনুমান, যোগফল, সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারার স্বাধীনতা দেয়। চিন্তাশীল পাঠকের হাতে এক অনন্য উপহার এই বই।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved