
আমাদের দেশে ইতিহাসে মুদ্রা বলতে সবসময় রাজা-রাজড়াদের মুদ্রাই বুঝি। এখনকার যে সরকারি মুদ্রা, তার মধ্যে পুরনো শিল্পকর্মের মজা নেই। না আছে ছবিতে গল্প, না আছে ডিজাইনের ঢং। এটা লক্ষ করছি সেই নয়া পয়সার সময় থেকেই। হয়তো শিল্পীদের, মানে যারা মুদ্রা ডিজাইন করেন, বলা ভালো, ক্ষুদ্র ভাস্কর্য গড়েন, তাঁদের হাতে ক্ষমতা নেই। অথবা ওইসব শিল্পীরা পৃথিবীর ইতিহাসে এই যে শিল্প, মুদ্রা বেয়ে হাতে হাতে ঘোরে, তার মধ্যে দিয়েই যে শিল্পটাকে সবার মধ্যে চালান করা যায়– সেইটা মাথায় রাখেন না। অন্যদিকে আমাদের এখনকার রাজাদেরও এ ব্যাপারে কোনও মাথাব্যথা নেই, দেশের লোগো লাগিয়েই ক্ষান্ত।
১৭.
কলেজ-জীবনে বসিরহাটের বাড়িতে যেতাম শ্যামবাজার থেকে যশোর রোড ধরে। এয়ারপোর্ট পেরিয়ে বারাসাত, সেখান থেকে যশোর রোড দু’-ভাগ। বাঁ-দিকে চলে গেছে বনগাঁ আর ডানদিকে চলে গিয়েছে বসিরহাট, টাকি, হাসনাবাদ। মাঝখানে একটা জায়গা পড়ত। তার নাম বেড়াচাঁপা। এই বেড়াচাঁপা জায়গাটা বিখ্যাত ছিল শিঙাড়ার জন্য। যখন বাস থামত, তখন বাইরে জানলার ধারে ধারে একগাদা ঝুড়ি হাতে মানুষ। ‘শিঙাড়া, গরম শিঙাড়া’ বলে চেঁচাত।
তেল-খাওয়া ঝুড়িতে থাকত গরম শিঙাড়া। উপরে ঢাকনা দেওয়ার শালপাতা একগুচ্ছ। তার মধ্যে মাঝারি সাইজের পেট-ফোলা শিঙাড়া। সেই শিঙাড়ার পেটে ছোট ছোট চৌকো করে কাটা আলু আর ভাজা পাঁচফোড়ন থেঁতো করে বানানো মশলা, সঙ্গে চিনেবাদাম। শীতের মরশুমে ফুলকপির কুচি। হালকা গা-ভেজা তরকারি। আলুটা চটকে কাদা করা নয়। ভাজা হত সরষের তেলে। বলতে কী, আমাদের ছোটবেলায় যে কোনও তেলেভাজাই সরষের তেলে ভাজা হত। সাদা তেলের চল হয়নি।
বহুদিন পরে এখন বেড়াচাঁপা শিঙাড়ার জন্য নয়, বিখ্যাত হয়েছে ‘খনা মিহিরের ঢিবি’ কিংবা ‘চন্দ্রকেতুগড়’ এই নামে। রসনা থেকে ইতিহাস। কয়েকবার দেখতে গিয়েছি সেই ঢিবি আর ইটের তৈরি জনবসতির ধ্বংসাবশেষ। ইট দেখে কারও গা শিরশির করে না, আমারও করেনি। খুব সম্প্রতি বাড়ি যাওয়ার সময় দেখলাম ওখানে একটা ছোট হলেও সুন্দর মিউজিয়াম হয়েছে। চন্দ্রকেতুগড় মিউজিয়ামের জন্য এবার নেমেছিলাম। অভিভূত হয়ে গেলাম। এবারে গা শিরশির করল। ইতিহাস।

বিশিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও নাকি ১৯০৯ সাল নাগাদ এই জায়গাটি পরিদর্শন করেছিলেন। তবে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তেমন কোনও ঘটনা ঘটেনি, যতক্ষণ না আশুতোষ মিউজিয়াম ছোট করে খনন কাজ চালিয়েছে। খননের ফলে বিভিন্ন যুগের মৃৎশিল্প, প্রাক-মৌর্য যুগের পোড়ামাটির লাল পাত্র, মৌর্য-শুঙ্গ যুগের কালো পাত্র, ঢালাই করা তামার মুদ্রা, পোড়ামাটির মূর্তি-সহ পোড়া ইট এবং অন্যান্য গুপ্তযুগের ধ্বংসাবশেষ। আমার ব্যক্তিগত ভালো লাগার জিনিস পেলাম– মুদ্রা। মুদ্রায় ইতিহাস। মৌর্য যুগ কিংবা বেড়াচাঁপা, এককালের জলপথে বাণিজ্যের গন্ধ পেলাম।
মুদ্রা এবং ইতিহাস বললে তো দুটো ভাগ হয়ে যায়। মুদ্রা একদিকে, অন্যদিকে ইতিহাস। আমার জীবনের সবচেয়ে পুরনো অভিজ্ঞতায় মুদ্রা বলতে, ল্যাংটাবেলায় কোমরে লাল ঘুনসিতে গোল তামার ফুটো পয়সা। রাজার মুকুট দিয়ে ডিজাইন করা সেই ফুটো পয়সাটাও কিন্তু দেখতে দারুণ ছিল। আমাদের কাছে রাজার ধন। আর ইতিহাস? সে ওই ‘বাবার হইল আবার জ্বর সারিল ঔষধে’ পর্যন্ত। পরবর্তীতে ‘সংগ্রাহক’ না হলেও মুদ্রার আকার-আকৃতি, ধাতু এবং অলংকরণ বিষয়ে আগ্রহ বেড়েছে।

আর্ট কলেজে পড়াকালীন আমাদের পরিচিত ছিলেন সিনিয়র দাদা দেবুদা, ভাস্কর দেবব্রত চক্রবর্তী। তিনি কলকাতা মিন্টে কাজ করতেন। ওঁর কাছে গল্প শুনে মুদ্রা তৈরির নানান কারিগরি দিক, ডিজাইনের কথা অনেক জেনেছি। এমনও জেনেছি যে মিন্টের মিউজিয়ামে রাখা থাকে যতগুলো মুদ্রা, তার পাশাপাশি বাজারে পাওয়া নকল মুদ্রার সংখ্যাও প্রায় ততগুলোই। সেগুলোও রাখা আছে, মানুষের কীর্তি হিসেবে। ইতিহাসের বেলাতেও সশরীরে পৃথিবীর বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখে আর বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য জেনে অভিভূত হয়েছি। তেমনই কিছু টুকরো গল্প এখানে।
আমাদের দেশে ইতিহাসে মুদ্রা বলতে সবসময় রাজা-রাজড়াদের মুদ্রাই বুঝি। এখনকার যে সরকারি মুদ্রা, তার মধ্যে পুরনো শিল্পকর্মের মজা নেই। না আছে ছবিতে গল্প, না আছে ডিজাইনের ঢং। এটা লক্ষ করছি সেই নয়া পয়সার সময় থেকেই। হয়তো শিল্পীদের, মানে যারা মুদ্রা ডিজাইন করেন, বলা ভালো, ক্ষুদ্র ভাস্কর্য গড়েন, তাঁদের হাতে ক্ষমতা নেই। অথবা ওইসব শিল্পী পৃথিবীর ইতিহাসে এই যে শিল্প, মুদ্রা বেয়ে হাতে হাতে ঘোরে, তার মধ্যে দিয়েই যে শিল্পটাকে সবার মধ্যে চালান করা যায়– সেইটা মাথায় রাখেন না। অন্যদিকে আমাদের এখনকার রাজাদেরও এ ব্যাপারে কোনও মাথাব্যথা নেই, দেশের লোগো লাগিয়েই ক্ষান্ত।
প্রাচীন বাংলায় হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজত্বকালে যেরকম মুদ্রা প্রচলিত ছিল, তা ছিল চৌকো। কোনও কোনও রাজার সময়ে ষটকোণ মুদ্রাও তৈরি হত। মুদ্রার ধাতু– বিশুদ্ধ রুপো। মুদ্রা যখন যে রাজার আমলে তৈরি হত, সেই রাজার নাম, তাঁর রাজ্যের নাম এবং শকাব্দ কিংবা সম্বৎ লেখা থাকত। টাকায় কোনও প্রতিমূর্তি থাকত না। আধুলি, সিকি, দোয়ানি, আনা, পয়সাও ছিল না। মুদ্রা ভাঙালে মিলত এক গাদা কড়ি। অনেকদিন আগে থেকেই কড়ি দিয়ে কেনাবেচা চলত। মুঘল আমল থেকে গোলাকার মুদ্রা প্রচলিত হয়।

কড়ি প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, আমাদের ছোটবেলায় প্রত্যেকের বাড়িতেই কিছু না কিছু এবং বনেদি বাড়িতে প্রচুর পরিমাণে কড়ি দেখেছি। আমার সংগ্রহেও প্রচুর কড়ি আছে। এখন যোগ হয়েছে নানান বড় মাপের কড়ি এবং তাদের বিচিত্র রং। প্রাকৃতিক এই বস্তুটিকে মুদ্রা হিসেবে ভাবতে বেশ ভালো লাগে। এর আকার-অবয়বের মধ্যে একটা প্রাকৃতিক, নান্দনিক ব্যাপার আছে। তাছাড়া অযত্নে বহু হাত ঘুরলেও কড়ি সহজে ভাঙে না। যখন কার্টুনিস্ট চণ্ডী লাহিড়ীর সঙ্গে কাজ করতাম, তখন একটা অদ্ভুত জিনিস জানলাম। ওঁর লেখা, মানুষ কী করে মানুষ হল– এই বিষয়ের ওপরে একটা বইয়ে বলেছেন: কড়ি যেমন ছোট ছোট পয়সা তেমনই তার চেয়ে বড় পয়সার জন্য তো কোনও কিছু দরকার। সেখানে কাঠঠোকরার মাথায় আয়োজন।
কাঠঠোকরার মাথার খুলি না কি ছিল কড়ির চেয়ে দামি মুদ্রা। আমাদের গ্রাম্য জীবনে যখন দেখতাম, কাঠঠোকরা ওই মাথা ঠুকে ঠুকে গাছের শক্ত কাঠের গায়ে গর্ত করে বাসা বানাত, কিংবা খাবারের খোঁজ করত, তখন তো অবাক হয়েছিলাম। কী সাংঘাতিক শক্তি ওদের মাথায়, যেটা ওরা হাতুড়ির মতো ব্যবহার করে গাছের গায়ে গর্ত খুঁড়ছে। দুটো জিনিস তখন মাথায় ঢুকেছিল। এই যে মাথা দিয়ে ঠুকছে, মাথার একটা ওজন আছে– সেটা যেমন সত্যি, অন্যদিকে এই মাথাটা ঠুকতে ঠুকতে ওর মাথা ঘুরে যায় না তো? পরবর্তীকালে জেনে বিস্মিত হয়েছি, গলা থেকে শুরু হয়ে মাথার পিছন ঘুরে এসে কপালের দিক পর্যন্ত ওদের অভাবনীয় বিশাল লম্বা জিভ। নরম রাবারের মতো জিভটাই না কি সামলায় মাথার আঘাত।

তবে মুদ্রা বলতে রাজা-বাদশার মুদ্রা। কিংবা বলুন, মুদ্রার রাজা– স্বর্ণমুদ্রা। রাজা মানে তো মুকুট পরে সিংহাসনে বসে থাকা নয়। রাজা মানে মেজাজ। ঠিক ঠিক সিদ্ধান্ত। শাসন, যুদ্ধ, দেশদখল। ক্ষমতার লড়াই, বাণিজ্য, সম্পদের অহংকার। দস্যু, ডাকাতদের থেকে সম্পত্তি রক্ষা। আর আছে বিলাসিতা, বিনোদন, শিল্পকলা।
আমাদের দেশের ওপর দিয়ে বিভিন্ন সময়ে যে ঔপনিবেশিক শাসন বা শোষণের ঝড় বয়ে গিয়েছে। মুঘল, পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি, ব্রিটিশ ইত্যাদি। বিদেশি শক্তির বসতি স্থাপনে তারা নিজেদের সংস্কৃতি, আইন ও অর্থনৈতিক স্বার্থ চাপিয়ে দিয়েছে আমাদের ওপর। ফলত আমাদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়েছে বারবার। আর আমরা পেয়েছি একটা মিশ্র সংস্কৃতি। ভালো-মন্দ জানি না, আমরা কিন্তু আর একটা জিনিস পেয়ে গেলাম তার মধ্যে। বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতির এবং সৃজনশীলতার ছাপ। যুদ্ধ-বিগ্রহ কিংবা লুটতরাজের পরেও তারা রেখে গিয়েছে নানা রকমের সংস্কৃতির চিহ্ন। বিশেষ করে স্থাপত্য, দুর্গ তৈরি আর শিল্পকলা। বেশিরভাগটাই বিভিন্ন অঞ্চলে বাঁধা থাকলেও মুদ্রার ওপর আমি জোর দিচ্ছি। এই কারণে যে, মুদ্রা একটি ক্ষুদ্র আকারের শিল্পকর্ম, যা কেমন হাতে হাতে, পকেটে পকেটে ঘুরে বেড়ায়। যখন তখন, যত্রতত্র। ঠিক যেন ভ্রাম্যমাণ শিল্প প্রদর্শনী।

পুরনো দিনের এই লুট-তরাজের গল্প কল্পনা করতে দারুণ লাগে। সেইসব গল্পের সরঞ্জাম হিসেবে ‘জলদস্যু’ আমার প্রিয় চরিত্র। আর আছে মহাসমুদ্র, নানা দেশ-উপদেশ, সুদীর্ঘ যাতায়াত, ছোট-বড় দ্বীপ। আছে জাহাজ, কামান, আগুন। আছে জাহাজডুবি, আছে স্বর্ণমুদ্রা বা সোনার প্রতি লোভ। নিজেদের মধ্যে কখনও আবার ঝগড়াঝাঁটি কিংবা স্বার্থপরতা। কেউ কেউ স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা কিংবা মূল্যবান জিনিসপত্র লুকিয়ে রেখেছে বিভিন্ন জায়গায়।
এই লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা থেকেই তৈরি হয়েছে ‘গুপ্তধন’। তাই নিয়ে কত না সূত্র, কত না সংকেত, রহস্যের জাল। দুঃখের বিষয়, যারা লুকিয়ে রেখেছিল ধনসম্পত্তি, তাদের অনেকেই তা ভোগ করতে পারেনি। কিংবা সূত্র ধরে খুঁজেও পায়নি কেউ। চিরকালের মতো হারিয়ে রইল। মাঝেমাঝেই খবর পাই, আজও যেখানে-সেখানে, বিভিন্ন দেশে খুঁজে পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণে স্বর্ণমুদ্রা ইত্যাদি।

সত্যিকারের ঘটনা, ইতিহাস-আশ্রিত ঘটনা থেকে আমরা পেয়েছি নানা রকম কল্পকাহিনি বা কল্পবিজ্ঞানের গল্প। এমনই এক সত্যি ঘটনার গল্প বলব। এ গল্প সত্যিকে উপেক্ষা করে যেন কল্পকাহিনির রূপ নিয়েছে।
স্বর্ণমুদ্রা নয়, এ মুদ্রা রৌপ্যমুদ্রা। মুম্বইয়ের কাছাকাছি সুরাটের ঐতিহাসিক রুপোর ‘রুপি’। এবার শিল্পকলা নয়, মুদ্রার পিঠে কাব্য। প্রতিটি মুদ্রায় তারিখের ঠিক নিচে খোদাই করা ছিল এক কাব্যিক পঙ্ক্তি। বাংলা করলে যার মানে দাঁড়ায়:
‘শাহ ঔরঙ্গজেব আলমগীর– শাসক, সিংহাসনের অলংকার, বিশ্বের অধিকারী– তিনি পৃথিবীতে প্রবর্তন করেছেন জ্যোৎস্নাভরা পূর্ণিমার চাঁদের মতো দীপ্তিময় মুদ্রা।’

৩০০ বছরেরও আগের কথা। ভারতের বন্দর শহর সুরাট থেকে ‘স্পাইস রুট’ ধরে সুদূর পূর্বের উদ্দেশে সমুদ্রযাত্রা শুরু করেছিলেন এক ভারতীয় বণিক। তাঁর জাহাজে ছিল বিপুল ধন। প্রচুর পরিমাণে রৌপ্য মুদ্রা। একটার পর একটা থলি, প্রতিটিতে এক হাজার করে নিখুঁতভাবে গড়া রূপোর রুপি। এই রুপিগুলো তৈরি হয়েছিল ভারতের ষষ্ঠ ও শেষ মুঘল সম্রাট, শাহ ঔরঙ্গজেব আলমগীরের (১৬১৮-১৭০৭) নির্দেশে। ঔরঙ্গজেব, শিল্পরসিক সম্রাট শাহজাহানের পুত্র। শাহজাহান তাঁর প্রিয় স্ত্রী মুমতাজের স্মৃতিতে নির্মাণ করেছিলেন আমাদের সবার চেনা, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্মৃতিসৌধ, শুভ্র মার্বেলে নির্মিত দীপ্তিময় ‘তাজমহল’।
পুবের পথে যাত্রাকালে সেই বণিক সম্ভবত তৎকালীন পর্তুগিজ বাণিজ্যকেন্দ্র সিলোন অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার ক্ষুদ্র এক দ্বীপে নোঙর ফেলেছিলেন। দ্বীপটির দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে এগনোর সময় নেমে আসে বিপর্যয়। সুরাটের মানুষরা এই ক্ষতির কোনও লিখিত নথি রেখে যাননি। আর ঔরঙ্গজেব? নিজেও বোধহয় কখনওই তাঁর রুপিগুলোর অভাব অনুভব করেননি।

মনে করা হয়, মুদ্রাগুলো ১০০০টি করে প্রতিটি পাটের কিংবা নারকেলের ছোবড়ার বস্তায় প্যাক করা ছিল; এবং সম্ভবত বেশ কয়েকটা করে বস্তা বড় কাঠের সিন্দুকে ভরা ছিল। বস্তাগুলো জলের নিচে এত দীর্ঘ সময় ধরে অক্ষত ছিল যে রৌপ্য মুদ্রাগুলো শক্তভাবে জমাট বেঁধে গিয়েছিল। ফলে যখন বস্তাগুলো পচে যায়, তখন মুদ্রাগুলো বস্তার আকৃতির, আনুমানিক ৪০ পাউন্ডের মতো রুপোর দলা আকারে থেকে যায়। দলাগুলোর মাঝের মুদ্রাগুলো নিখুঁত টাটকা অবস্থায় ছিল।
১৯৬১ সালে প্রথম সেই ডুবে যাওয়া জাহাজের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। শুনে অবাক হই, কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের কিংবদন্তি, স্যর আর্থার সি. ক্লার্ক ও তাঁর ডুবসাঁতারু সহযোগীরা শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে, বিপজ্জনক ‘গ্রেট ব্যাসেস রিফ’-এ নেমে উদ্ধার করেন সেই ধনভাণ্ডার। এক বিশাল প্রবালচূড়ার উপর দিয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে হঠাৎই চোখে পড়ে জাহাজডুবির ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ। ১৯৫৬ সাল থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন, ৯০ বছর বয়সি, স্যর আর্থার সি. ক্লার্ক। তিনি ছিলেন উৎসাহী স্কুবা ডাইভার। পর্বত আরোহণের মতো, তাঁর নেশা ছিল সমুদ্রের তলায় সাঁতার কাটা।

এই অনাবিষ্কৃত জাহাজডুবি আবিষ্কারের পরপরই স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটকে ১০০০ রুপির একটি দলা দান করা হয়েছিল। আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত এই ধরনের কোনও মুদ্রার অস্তিত্ব কারও জানা ছিল না। অভিযানটি ‘Taj Mahal Sunken Treasure 1702’ নামে পরিচিত। অর্থাৎ তলিয়ে যাওয়া তাজমহল ধনভাণ্ডার।
শেষ করার আগে হালকা মেজাজে পৃথিবীর নবতম মুদ্রাটির কথা বলব। মলডোভা আর ইউক্রেনের মাঝখানে ‘ট্রান্সনিস্ট্রিয়া’ বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে প্রচলিত মুদ্রা হিসেবে এখন প্লাস্টিকের কয়েনের ব্যবহার। মুদ্রার নাম ‘ট্রান্সনিস্ট্রিয়ান রুবল’। প্লাস্টিকের মুদ্রাগুলোর রং কাগজের নোটের মতোই, এমনকী পুরনো সোভিয়েত ইউনিয়নের রুবলের রঙের মতোই– হলুদ, সবুজ, নীল, লাল– এবং এগুলোতে দেশটির ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন রুশ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি রয়েছে। বিনিময় হার, ১ মার্কিন ডলারের সমান ১৭ রুবল।

সেই মুদ্রা নিয়ে ইতোমধ্যে বয়স্করা হাসাহাসি শুরু করেছে। মাত্র কয়েক বছরেই রঙিন প্লাস্টিকের খেলনা গোছের মনে হচ্ছে ওদের কাছে। দৃষ্টিহীনদের হাতের ছোঁয়ায় চিনতে সুবিধার জন্য প্লাস্টিকের মুদ্রাগুলো সবই ভিন্ন ভিন্ন আকারের। গোলাকার, বর্গাকার, পঞ্চভুজাকার, ষড়ভুজাকার। বেশ পাতলা হলেও, কম্পোজিট প্লাস্টিকের গড়া হওয়ায় মুদ্রাগুলো খুব শক্তপোক্ত। আদ্যিকালের সেই কাঠঠোকরার করোটির মতো, বাঁকানো বা ভাঙা যাবে না সহজে।
…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…
পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি
পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!
পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ
পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম
পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?
পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়
পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ
পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?
পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা
পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার
পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ
পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা
পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?
পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!
পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved