
কৈশোরে হাতে পেলাম ব্যাডমিন্টনের ব্যাট আর ‘শাট্ল কক’। জেনেছি সেগুলো না কি হাঁসের বা রাজহাঁসের ১৬টি পালক দিয়ে তৈরি। খেলতে গিয়ে ঘুরতে-ঘুরতে ছুটতে দেখেছি শাট্লকে। শাট্ল ককের পালকের বিশেষ বিন্যাসই একে বাতাসে ঘুরতে বাধ্য করে এবং দিক বজায় রেখে নিখুঁতভাবে চলতে সাহায্য করে। সঠিক উড়ানের জন্য ডান অথবা বাম ডানা থেকে পালক সংগ্রহ করতে হয়। পালকের মাঝখানে যে ডাঁটি থাকে তার দুপাশের অংশের সাইজ এবং আকৃতি আলাদা হওয়ায় পালক মেশানো হয় না। অভিজ্ঞ এবং দক্ষ খেলোয়াড়রা পালকের শাটলকক পছন্দ করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট বা লিগে সেগুলো সর্বদাই উচ্চ মানের পালকেরই হয়।
২২.
দুধসাদা পাপড়ির বুকে হলুদের আভা। রাশি রাশি ফুলে ভরা গাছ থেকে খসে পড়ত কাঠগোলাপ। ঠিক যেন পাখার মতো ঘুরতে ঘুরতে নিচে নামত। ফুলগুলো ছিল আমাদের ছেলেবেলায় খেলার সরঞ্জাম। আমরা বলতাম, ঘূর্ণিফুল। আঙুল দিয়ে পাপড়িগুলো একটু গুটিয়ে নিলে, কিংবা একটু বেশি করে ফুটিয়ে নিলে ওর নিচে নামার গতি এবং ঘূর্ণনের দ্রুততা কমবেশি হতে থাকে। সে এক মজার খেলা। নামার সময় ফুলের পথ একেবারে সোজা নিচে আর বোঁটা সবসময় থাকত মাটির দিকে।

কৈশোরে হাতে পেলাম ব্যাডমিন্টনের ব্যাট আর ‘শাট্ল কক’। জেনেছি সেগুলো না কি হাঁসের বা রাজহাঁসের ১৬টি পালক দিয়ে তৈরি। খেলতে গিয়ে ঘুরতে-ঘুরতে ছুটতে দেখেছি শাট্লকে। শাট্ল ককের পালকের বিশেষ বিন্যাসই একে বাতাসে ঘুরতে বাধ্য করে এবং দিক বজায় রেখে নিখুঁতভাবে চলতে সাহায্য করে। সঠিক উড়ানের জন্য ডান অথবা বাম ডানা থেকে পালক সংগ্রহ করতে হয়। পালকের মাঝখানে যে ডাঁটি থাকে তার দুপাশের অংশের সাইজ এবং আকৃতি আলাদা হওয়ায় পালক মেশানো হয় না। অভিজ্ঞ এবং দক্ষ খেলোয়াড়রা পালকের শাটলকক পছন্দ করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট বা লিগে সেগুলো সর্বদাই উচ্চ মানের পালকেরই হয়।
শহরাঞ্চলে ছোট-বড় সবার কাছে একটা মজার খেলা ‘ফ্রিসবি’ বা ‘ফ্রিজবি’। সমুদ্রের ধারে কিংবা শহরের পার্কে ফ্রিসবি খেলতে দেখেছি অনেক জায়গায়। একটা ফ্লাইং ডিস্ক বা সোজা কথায় ডিস্কও বলা হয়। একটা গ্লাইডিং খেলনা বা খেলাধুলোর সরঞ্জাম, যা কবজির জোরে ছোড়া এবং ধরার জন্য বিনোদন এবং প্রতিযোগিতায় ব্যবহার হয়। ডিস্কটি ঘোরানোতে, বিজ্ঞানের পরিভাষায়, একটি স্থিতিশীল জাইরোস্কোপিক শক্তি তৈরি হয়, যার ফলে এটিকে নির্ভুলভাবে নির্দিষ্ট দূরত্বে এবং লক্ষ্যে নিক্ষেপ করা যায়।

স্কুলে এনসিসি করার সময় অনেকবার রাইফেল শুটিং করেছি। সেখানে শিখেছিলাম, রাইফেল থেকে বুলেটগুলো বেরিয়ে যখন ছুটে যায় সেটা ঘুরতে ঘুরতে যায়। আর এই ঘূর্ণির কারণে বুলেট স্থিতিশীল পথে টার্গেটে পৌঁছাতে পারে। ব্যাপারটা আরও ভালো করে হাতে-কলমে দেখেছিলাম যখন এনসিসি ক্যাম্পে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে শুটিংয়ের আগে বা পরে রাইফেলের অংশগুলো খুলে খুলে পরিষ্কার করার সময়। একচোখ বন্ধ করে নলের মধ্যেকার আকার-আকৃতিটাও আলোর দিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছি বারবার।
শিকারিদের নানা রকমের অস্ত্রশস্ত্রের গল্প সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত চলে আসছে। অদ্ভুত একটি শিকারের অস্ত্রের নাম শুনেছিলাম, বুমেরাং। বুমেরাং, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের তৈরি ঐতিহ্যবাহী একটি ছোড়ার অস্ত্র। এর বিশেষ আকৃতি আর ঘূর্ণনের ফলে বাতাসে ভেসে এটি না কি আবার নিক্ষেপকারীর কাছে ফিরে আসতে পারে। একটা সাংঘাতিক কৌতূহল ছিল। প্রথম যেবার অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলাম সেখানে যে ক’টা জিনিস দেখার বা জানার ছিল তার মধ্যে লিস্টে প্রথম ছিল ক্যাঙ্গারু, দ্বিতীয় বুমেরাং। আমার সংগ্রহে আজও আছে কয়েকটি বুমেরাং। রেখেছি দিয়েছি অন্য কারণে, তার গায়ে অস্ট্রেলিয়ার আদিম মানুষের আঁকা নকশা আছে। বুমেরাং-এর যে কাহিনি আমাকে বিস্মিত করেছিল তা হল, এই অস্ত্রটি বিশেষ দক্ষতায় হাত দিয়েই ছুড়তে হত, আর শিকারের গায়ে না লাগলে সে ঘুরতে ঘুরতে ফিরে আসত শিকারির হাতে।
বুমেরাং প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, বছর পঞ্চাশেক আগে, কলেজ স্ট্রিট পাড়ায়, ‘কিশোর জ্ঞানবিজ্ঞান’-এ আমরা বিজ্ঞান নিয়ে নানান কিছু খেলার আয়োজন করতাম। সেই সময় হাতের কাছে যা পাওয়া যায়, এমন অল্প সরঞ্জাম দিয়ে হাতেনাতে বিজ্ঞানচর্চার একটা ধুম পড়ে গিয়েছিল। প্লেনের মডেল বানানো, কাগজ-কাটা শিল্প ‘অরিগামি’, এমনকী সহজে রেডিও বানানো এবং হ্যাম রেডিও স্টেশনেরও একটা অদ্ভুত কৌতূহল ছিল কিশোরদের মধ্যে। আমি তখন টাটকা আর্ট কলেজ থেকে বেরিয়ে সায়েন্স মিউজিয়ামের চাকরি করছি, আর অদ্ভুত অদ্ভুত সব জিনিস দেখছি সেখানে। মাথায় নানা অগোছালো আইডিয়া গিজগিজ করছে। আমরাও বানিয়েছিলাম কাটবোর্ডের মিনি বুমেরাং। কিশোর জ্ঞানবিজ্ঞানের পাতায় আমার ‘বুদ্ধি শুদ্ধি’ নামে যে কলাম ছিল সেখানে শিখিয়েছিলাম কী করে বানাতে হয়। সেগুলো আঙুলে ঠিক কোন অ্যাঙ্গেলে রেখে আর অন্য হাতের আঙুলে কীভাবে টোকা দিয়ে ছুঁড়তে হয় তাও লিখেছিলাম। কী করে বুমেরাং চলে এবং ঘুরতে ঘুরতে বাতাসের সাহায্য নিয়ে কী করে আবার আমাদের হাতে ফিরে আসে, সেইটার একটা ধারণা পেয়ে তখনকার দিনের কিশোর জ্ঞানবিজ্ঞানের পাঠকরা ভীষণ মজা পেয়েছিল।

কিশোরদের মধ্যে উৎসাহ এখন কি একেবারেই নেই? হয়তো অনেক কমেছে হাতেকলমে কাজ করার ব্যাপার। সবকিছু যেন এখন কিনতে পাওয়া যায় দোকানে কিংবা ঘরে বসেই। মোবাইল ফোন একটা সাংঘাতিক শক্তিশালী সরঞ্জাম। সোশাল নেটওয়ার্কিং-এ দেখছি ভীষণ রকমের ‘রিল’ বানানোর হিড়িক পড়ে গেছে আজকাল। ঝোঁক বা নেশা চেপেছে কিশোর, তরুণদের মধ্যে। মন্দ নয়। এখানে অল্প সরঞ্জামে একটা মিনি সিনেমা বানানো ছাড়াও নানারকম বিষয়বস্তু নিয়ে নাড়াচাড়া করা, প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো এবং অদ্ভুতভাবে হেঁয়ালি, ম্যাজিক, কুইজ– এইসব বিষয়গুলোকে অন্যভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা চলছে। সবচেয়ে বড় কথা সাধ্যমত একটা রচনাধর্মী মনও কাজ করছে এর পেছনে। ভালো খারাপ পরের কথা। পুরনো দিনের সাধ মিটছে নতুন সরঞ্জামে, নতুন টেকনোলজির ব্যবহারে।
যা বলছিলাম, কার্যসিদ্ধি না হলে বুমেরাং ফিরে আসে, এ তো বড় ভালো কথা। বানানোর পরিকল্পনা, পরিশ্রম, পদার্থের অপচয় বাঁচে। কিন্তু কার্যসিদ্ধি করেও যদি ফিরে আসে অস্ত্রখানি– তাহলে কেমন হয়? গল্পের মেজাজে যখন আছি তখন সে গল্প বলার লোভ সামলাতে পারছি না, যেখানে ঠিক তেমনই ঘটেছিল। কার্যসিদ্ধির পরে ফিরে আসত অস্ত্র। গল্প বা কাহিনিটা পেলাম মহাভারতের ‘বর্বরীক’ চরিত্রটি জানার সময়।
সংক্ষেপে, মহাভারতের এক অন্যতম শক্তিশালী এবং উপেক্ষিত চরিত্র হলেন ‘বর্বরীক’। ভীমের পৌত্র এবং ঘটোৎকচের পুত্র বর্বরীককে মহাভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধাদের মধ্যে একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও ফলাও করে তাঁর কথা বলা হয়নি মহাভারতে। তিনি সরাসরি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি, তবে তাঁর কাহিনি সেই মহাযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

যুদ্ধে অংশ নিতে মহাপরাক্রমশালী বর্বরীক চলেছেন কুরুক্ষেত্রের উদ্দেশে। স্বল্প সরঞ্জাম, তাঁর তূণে মাত্র তিনটি তির। মায়ের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা এবং নানা দেবদেবীর আশীর্বাদধন্য বর্বরীকের আশ্চর্য শক্তির কথা জানতেন ‘শ্রীকৃষ্ণ’। পথিমধ্যে কৃষ্ণ, ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে তাঁকে থামান। বিশাল এই যুদ্ধ শেষ করতে কত দিন লাগবে জানতে চাইলে বর্বরীক উত্তর দেন যে, তিনি এক নিমেষেই শেষ করতে পারবেন। কৃষ্ণ তখন বর্বরীককে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে তিনি মাত্র তিনটি তির দিয়ে মহাযুদ্ধ শেষ করবেন! বর্বরীক উত্তর দিয়েছিলেন, যুদ্ধে তার সমস্ত প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার জন্য আসলে একটিই তির যথেষ্ট। তিনি বলেন, তিনটি তিরের প্রথমটি ধ্বংস করতে চায় এমন সমস্ত জিনিস চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় তিরটি সংরক্ষণ করতে চায় এমন সমস্ত জিনিস চিহ্নিত করতে পারে। তৃতীয় তিরটি ব্যবহার করলে, এটি চিহ্নিত সমস্ত জিনিসগুলোকে ধ্বংস করবে এবং তারপরেও সে তূণে ফিরে আসবে।
কৃষ্ণ নিজের পরিচয় দিলেন। তাঁকে তির ব্যবহার করে, যে পিপল গাছের নিচে দাঁড়িয়েছিলেন তার সমস্ত পাতাকে বেঁধে দেওয়ার জন্য চ্যালেঞ্জ করলেন। বর্বরীক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং চোখ বন্ধ করে তির মুক্ত করার জন্য যখন ধ্যান করছিলেন, তখন কৃষ্ণ নিঃশব্দে গাছ থেকে একটি পাতা ছিঁড়ে তার পায়ের নিচে লুকিয়ে রাখেন। বর্বরীক তার প্রথম তিরটি ছেড়ে দিলে, এটি গাছের সমস্ত পাতা চিহ্নিত করে এবং অবশেষে কৃষ্ণের পায়ের চারপাশে ঘুরতে শুরু করে। কৃষ্ণ জানতে চাইলেন, কেন তার পায়ের উপর তির ঘোরাফেরা করছে। বর্বরীক উত্তর দিলেন, তার পায়ের নিচে নিশ্চয়ই একটি পাতা আছে এবং কৃষ্ণকে তাঁর পা তুলতে পরামর্শ দিলেন, অন্যথায় তিরটি কৃষ্ণের পা বিদ্ধ করে পাতাটিকে চিহ্নিত করবে। কৃষ্ণ পা সরিয়ে নিয়েছিলেন আর প্রথম তিরটি লুকোনো পাতাটিকেও চিহ্নিত করেছিল। তৃতীয় তিরটি তারপর লুকোনো পাতা-সহ সমস্ত পাতা সংগ্রহ করে একসঙ্গে বেঁধে দেয়, অর্থাৎ বন্দি করে।

কৃষ্ণ বুঝলেন তিরগুলো এতটাই শক্তিশালী এবং অনন্য যে, বর্বরীক তাঁর লক্ষ্য সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকলেও তির লক্ষ্যবস্তুগুলোকে খুঁজে বের করে শনাক্ত করতে পারে। শুধু তাই নয়, মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বর্বরীক সর্বদা দুর্বলদের পক্ষ নেবেন। এই বীর থাকলে যুদ্ধের পরিণতি সম্পূর্ণ বদলে যাবে। সব বুঝে কৃষ্ণ বর্বরীকের কাছে তার ‘মস্তক’ দান হিসাবে চেয়ে বসেন। বর্বরীক তাঁর শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে, এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার খাতিরে সানন্দে নিজের মস্তক দান করতে রাজি হলেন। তবে তিনি শ্রীকৃষ্ণের কাছে একটি শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেন যে তিনি সম্পূর্ণ যুদ্ধটা দেখতে চান। কৃষ্ণ তার এই ইচ্ছা পূরণ করেন। তাঁর কাটা মস্তকটি একটি উঁচু পাহাড়ের উপরে স্থাপন করেন। এই মস্তক জীবিত অবস্থায় ১৮ দিনের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ পুরোপুরি দেখেছিলেন।
ভাবতে ভালো লাগছে বর্বরীকের তির তাঁর প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসকে চিহ্নিত করতে পারে, ঠিক যেন এখনকার স্যাটেলাইটের নিয়মে। তির, লক্ষ্যবস্তুগুলোকে খুঁজে বের করতে এবং শনাক্ত করতে পারে– অর্থাৎ আজকের জিপিএস সিস্টেম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সে তির। কার্যসিদ্ধির পর সে আবার ফিরে আসে তূণে। ঠিক যেন বুমেরাঙের মতো।

আমরা ফিরে আসি বুমেরাঙে। বুমেরাং কখনও খেলনা, কখনও প্রতিযোগিতা, কখনও শিকারের অস্ত্র এবং কখনও যুদ্ধাস্ত্র। সেই যুগে বুমেরাং তৈরির কলাকৌশল এবং আদিম মানুষের বুদ্ধির যে গল্প শুনেছিলাম, পরবর্তীকালে তাতে অবাক হয়েছি এর বিজ্ঞানসম্মত যুক্তিবুদ্ধির বিশ্লেষণে। বুমেরাংয়ের ভেতরের বিজ্ঞানটা আসলে একেবারে পদার্থবিজ্ঞানের খাঁটি বায়ুগতিবিদ্যা, মানে বাতাসের সঙ্গে বস্তুর মিথস্ক্রিয়া।
বুমেরাংয়ের প্রতিটি বাহু আসলে ছোট্ট একটা বিমানের ডানার মতো। এই ডানার ওপরের দিকটা একটু বাঁকানো, নিচের দিকটা তুলনামূলকভাবে সমতল। বুমেরাং শুধু সামনে ছোড়া হয় না, তাকে জোরে ঘোরানোও হয়। এই ঘূর্ণন তাকে দেয় জাইরোস্কোপিক স্থিতিশীলতা। বুমেরাং ধীরে ধীরে বাঁক নিতে থাকে একটা বৃত্তাকার পথ ধরে। এই ক্রমাগত বাঁক নেওয়ার ফলেই বুমেরাং একসময় প্রায় গোল চক্র কেটে আবার নিক্ষেপকারীর দিকে ফিরে আসে।

এখন সবার কাছে বেশ পরিচিত একটা বস্তু, ‘ড্রোন’। এটা কখনও খেলনা, কখনও ফটোগ্রাফির কাজে, কখনও বিজ্ঞানীদের উপর থেকে পর্যবেক্ষণ, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আবহাওয়ার কাজ এমনকী যুদ্ধের কাজেও এর ব্যবহার। ড্রোন থেকে সহজেই অনুমান করা যায় আরও একটা সিস্টেম, ‘অটো পাইলট’। ইউএভি বা আনম্যান্ড এরিয়াল ভেহিকল্। আধুনিক কালে অটো-পাইলট সিস্টেম বিমানের টেক-অফ এবং ল্যান্ডিংয়ের কাজে ব্যবহার হয়, এমনকী আজকাল স্বয়ংক্রিয় গাড়িও এই পদ্ধতিতে চলতে শুরু করেছে। অটো-পাইলট সিস্টেম জিপিএস থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গন্তব্যের দিকে চলতে পারে। অতএব, জিপিএস হল পথপ্রদর্শক আর অটো-পাইলটের মতো স্বয়ংক্রিয়তা যদি হাতে থাকে তাহলে আমাদের আর পায় কে!
আজকাল বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর যেন খেলা-খেলা। ছাড়া ছাড়া ভূগোল-বিজ্ঞান। কোনও কোনও দেশে যুদ্ধ তো যুদ্ধ, অন্য কোনও দেশের তাতে মাথা-ব্যথা নেই। সম্প্রতি ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ইউএভি-র উপর নির্ভর করার পর, রাশিয়া ইউক্রেনে তার আগ্রাসনের জন্য একটা নতুন সেট ড্রোন-এর নাম ঘোষণা করেছে। সংবাদ মাধ্যমের জানাচ্ছে সেটা এখন ‘বুমেরাং ড্রোন’। বুমেরাং ড্রোনগুলি চালচলনে অত্যন্ত দক্ষ এবং প্রতি ঘণ্টায় ১১০ মাইল পর্যন্ত গতিতে চলতে পারে আর চলমান লক্ষ্যবস্তুকেও আঘাত করতে পারে। ড্রোন হোক বা বুমেরাং, সবাই কেমন কাজ হাসিল করে ফিরে ফিরে আসছে। তবে মানবহীন এইসব বায়ুযান সঠিকভাবে কাজ করে ফিরে যে আসছে– তার নেপথ্যে মানুষ কিন্তু রয়েছে, যার হস্তক্ষেপ ছাড়া এসব করা অসম্ভব।

এতক্ষণ যা বললাম, তার চেয়ে আরও অনেক বেশি আছে ঘূর্ণির কাহিনি। নিছক মজার খেলা থেকে দক্ষ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা মায় যুদ্ধ পর্যন্ত। সত্যি-মিথ্যে-গল্প-লোককথা সব কেমন গুলিয়ে যায় না আজকাল? একই টেলিভিশনের পর্দায় একসঙ্গে কখনও দেখছি বানানো মিথ্যে– সিনেমার মারামারি; পরক্ষণেই আবার দেখছি সংবাদ মাধ্যমের ওই একই পর্দায় পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কোথাও রিয়াল টাইমে মানুষ মারা হচ্ছে। সত্যিমিথ্যে যাচাই করে আমাদের আবেগ আর অনুভূতিগুলোকে মুহুর্মুহু পরিবর্তন করছি কীভাবে আমরা? কী সুখের দিন আমাদের এখন। কোথাও যাওয়ার আগে হাতের মুঠোয় দেখে নিতে পারছি কোন পথে যেতে হবে, কোন রাস্তা সহজ আর কোন রাস্তা বিপদসংকুল। এমনকী জানতে পারছি ঠিক কখন পৌঁছব আমরা আমাদের গন্তব্যে!
আসলে ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে’, তবুও প্রশ্ন আমরা কি ঘুরে ঘুরে আবার পুরনো জায়গায় ফিরে আসি? সাদা চোখে, হ্যাঁ। গোটা পৃথিবীটাই তার আহ্নিক গতিতে নিজ অক্ষে এবং বার্ষিক গতিতে সূর্যের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে আগের জায়গায় ফিরে আসে বলেই তো শুনি। কিন্তু আরও একটা নতুন প্রশ্ন উঁকি দেয়, সূর্যও তো তার সংসার শুদ্ধ ঘুরতে ঘুরতে চলেছে আরও কারও চারপাশে। তাই ঘুরতে ঘুরতে সত্যি সত্যি আমরা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসি কি? যাই ঘটুক, এই ঘূর্ণি দুর্নিবার, এক অনন্ত ঘূর্ণিপাক, একেবারে জাইরোস্কোপিক প্রিসিশনে।
…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…
পর্ব ২১: শরীরের ক্যানভাসে আঁকা শিল্প
পর্ব ২০: বিজ্ঞান পরিবেশনা ও মিউজিয়ামের অজানা গল্প
পর্ব ১৯: মরণের পরেও, এই পৃথিবীর জন্য আপনি রইলেন
পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না
পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন
পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি
পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!
পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ
পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম
পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?
পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়
পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ
পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?
পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা
পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার
পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ
পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা
পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?
পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!
পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved