
পেলে-গ্যারিঞ্চা। ১৯৪০-এর ২৩ অক্টোবর জন্মানো পেলের চেয়ে বছর সাতেকের বড় গ্যারিঞ্চার জন্ম সেই অক্টোবরেই, ১৯৩৩-এর ২৮ তারিখ। ৫ ফুট ৮ ইঞ্চির পেলের চেয়ে আরও এক ইঞ্চি খর্বাকার ‘ক্রিপল’ গ্যারিঞ্চা। ক্লাব কেরিয়ারে পেলের ’৫৬ থেকে ’৭৪ পর্যন্ত স্যান্টোসের হয়ে রেকর্ড ৬৪৩ গোল, পরের তিন বছর নিউ ইয়র্ক কসমসের হয়ে ৩৭। গ্যারিঞ্চার ’৫৩ থেকে ’৬৫ পর্যন্ত বোটাফোগো। ১২টি মরশুমে ৫৭৯ ম্যাচে ২৪৯ গোল। এবং ওই ’৬৫ অবধিই প্রাইম গ্যারিঞ্চা। বোটাফোগো মানে ‘সেট টু ফায়ার’। আগুন।
’৬২। সবেমাত্র মেক্সিকো ম্যাচের ৭৩ মিনিটে ওই আশ্চর্য গোলের স্মৃতি। দ্বিতীয় ম্যাচে সামনে চেকোশ্লোভাকিয়া। একটা লং রেঞ্জার শট নিতে গিয়ে ঊরুর পেশিতে টান। ’৫৮-র রাজপুত্র, ফুটবলের বিশ্বকাপকে টানা ১২ বছর জুড়ে শাসন করে আসা পেলে, ছিটকে গেলেন ’৬২-র বিশ্বকাপের মাত্র দ্বিতীয় ম্যাচেই!
তার কয়েকদিনের ভিতর ব্রেকিং নিউজের ভাষা ঠিক এরকম ছিল– ‘দ্য কিং হ্যাজ লেফট, দ্য ক্রিপল টুক দ্য ক্রাউন’।

কে ক্রিপল? ম্যানুয়েল ফ্রান্সিসকো ডস স্যান্টোস। ডাকনাম সাউথ আমেরিকান রেন পাখির নামে– ‘গ্যারিঞ্চা’ বা ‘লিটল বার্ড’। রাইট উইঙ্গারের মেডিকেল রিপোর্ট বলছে– ‘The young man has a slight strabismus, a deformed spine, an unbalanced pelvis, a six-centimeter difference in leg length; his right knee suffers from varus deformity, while the left knee has valgus deformity, despite a corrective surgery.’ অর্থাৎ, ডান হাঁটুর জয়েন্ট ভ্যারাস ডিফর্মিটিতে ভেতরের দিকে ঢোকানো, বাঁ-হাঁটু ভালগাস ডিফর্মিটিতে বাইরের দিকে। দু’ পায়ের ভেতর ৬ সেন্টিমিটারের তফাত। সম্ভবত পিতার সূত্রে পূর্বসূরি ফুলনিও আদিবাসীদের থেকে পাওয়া জেনেটিক ট্রেইট। এই শরীর নিয়ে তো বল ধরার কথাই নয়! অথচ সেখান থেকেই ঐশ্বরিক রূপান্তর– ক্রিপল, পঙ্গু থেকে পর্তুগিজে ‘Anjo de Pernas Tortas’, বা ‘বেন্ট লেগড অ্যাঞ্জেল’।

পেলে-গ্যারিঞ্চা। ১৯৪০-এর ২৩ অক্টোবর জন্মানো পেলের চেয়ে বছর সাতেকের বড় গ্যারিঞ্চার জন্ম সেই অক্টোবরেই, ১৯৩৩-এর ২৮ তারিখ। ৫ ফুট ৮ ইঞ্চির পেলের চেয়ে আরও এক ইঞ্চি খর্বাকার ‘ক্রিপল’ গ্যারিঞ্চা। ক্লাব কেরিয়ারে পেলের ’৫৬ থেকে ’৭৪ পর্যন্ত স্যান্টোসের হয়ে রেকর্ড ৬৪৩ গোল, পরের তিন বছর নিউ ইয়র্ক কসমসের হয়ে ৩৭। গ্যারিঞ্চার ’৫৩ থেকে ’৬৫ পর্যন্ত বোটাফোগো। ১২টি মরশুমে ৫৭৯ ম্যাচে ২৪৯ গোল। এবং ওই ’৬৫ অবধিই প্রাইম গ্যারিঞ্চা। বোটাফোগো মানে ‘সেট টু ফায়ার’। আগুন। নামেও সমাপতন। ক্লাব-কোচ জোয়াও সালদানহা এই আগুনে তরুণ, বোহেমিয়ান গ্যারিঞ্চাকে পেয়ে শৃঙ্খলায় মাপা যাবে না বুঝে পাখিকে উড়তে বললেন, গোটা মাঠে।
ক্লাব কেরিয়ারে কোথাও পেলে-গ্যারিঞ্চা সমাপতন নেই। মঞ্চ একমাত্র বিশ্বকাপ, দেশের জার্সিতে শ্রেষ্ঠ ডায়াস। যদিও একসঙ্গে প্রথম পেনাল্টি বক্স শেয়ার করলেন ’৫৮-র বিশ্বকাপের ঠিক আগে ১৮ মে, বুলগেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচে। ৩-১। সেই ট্র্যাডিশন থামেনি। অনেক পরে রোমারিও-বেবেতোর সাফল্যের প্রসঙ্গে বলা হল, যদি এই দুটো লোক একসঙ্গে আরেকটু বেশি খেলত, গ্রহের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ জুটি হতে পারত। ’৫৮-র সুইডেন বিশ্বকাপ। প্রথম দুটি ম্যাচে ওয়ার্ম আপটুকুই হল। মাঠে নামা হল না। মাসখানেক আগে বোটাফোগো-ফিওরেন্তিনা ম্যাচে সিগনেচার গোল, তবু একরোখা গ্যারিঞ্চা কোচের কাছে তখনও ভরসাযোগ্য হননি।

শুরুতে অস্ট্রিয়াকে উড়িয়ে ৩-০, দ্বিতীয় ম্যাচেই ইংল্যান্ডের কাছে গোলশূন্য হোঁচট। তৃতীয় ম্যাচে কোচ ভিনসেন্তে ফিওলা একসঙ্গে নামালেন পেলে-গ্যারিঞ্চাকে। ১৮ ছোঁয়া পেলের পাশে তখন অনেকটাই পরিণত গ্যারিঞ্চা, তবে জাতীয় দলে তেমন কিছু করেননি। গ্যারিঞ্চার খাতায় ১৯৫৭ এবং ১৯৫৯-এর দু’-দু’টি কোপা আগে ও পরে। অন্যদিকে, পেলের কেরিয়ারে একমাত্র কোপা ১৯৫৯। কোপাকে চিরকাল বৈমাত্রেয়সুলভ দেখা ব্রাজিল ওই দু’বছরই কোপায় রানার্স। ’৫৮-এ সেই সোভিয়েত ম্যাচ, দলের তিন নম্বর খেলা। সোভিয়েত মানে চির তারুণ্য, গতি, গতি এবং গতি। এবং অবশ্যই লেভ ইয়াসিন! দু’-দু’বার জালে ঢোকালেন ভাভা। গ্রুপ লিগে কোথাও স্কোরশিটে পেলে-গ্যারিঞ্চা নেই। আসল গল্প শুরু তার পরেই।
…………………….
অলৌকিক ’৫৮-র ফাইনাল জেতার পর দেশের প্রেসিডেন্ট জুসেলিনো কুবিসচেক গোটা দলকে ডাকলেন ডিনারে। প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করছেন, ‘কী চাও, বলো।’ স্বাভাবিক প্রতিটি চাওয়ার বাইরে আশ্চর্য চমক গ্যারিঞ্চার উত্তরে, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, ওই যে আপনার ঘরের ভেতর খাঁচার পাখিটি রাখা আছে, আমি চাই ওকে খাঁচা খুলে উড়িয়ে দিতে।’ শোনা যায়, ওই পাখিটিই ছিল সাউথ আমেরিকান রেন অর্থাৎ, ‘গ্যারিঞ্চা’।
…………………….
কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েলস ম্যাচে কষ্টার্জিত ১-০। দুর্ধর্ষ, বুদ্ধিদীপ্ত গোল পেলের। সেমিতে জাস্ত ফঁতের ফ্রান্স। আগে-পরে মিলিয়ে গোটা টুর্নামেন্টে ফঁতের ১৩ গোলের অবিশ্বাস্য রেকর্ড। ১-০ গোলে এগনো ব্রাজিলকে থমকে দিয়ে ১-১ সেই ফঁতের পা থেকে, যদিও ওটুকুই। কারণ, তারপরেই ঝকঝকে হ্যাটট্রিক পেলের। পরিণতি ৫-২। ২৯ জুন ফাইনালে স্টকহোমের কাছে রোসুন্ডা স্টেডিয়ামেও সেমির কার্বন কপি। আবারও ৫-২। প্রতিপক্ষ হোস্ট সুইডেন। ভাভাকে দিয়ে প্রথম দু’টি গোল করিয়ে অনবদ্য অ্যাসিস্ট গ্যারিঞ্চার, সঙ্গে স্কোরশিটে দু’-দু’বার নাম ঢোকালেন পেলে। তার মধ্যে প্রথমটি সেই আশ্চর্য গোল– প্রথমে বুকে রিসিভ করে পায়ের ছোট্ট চিপে বোকা বানানো ডিফেন্ডার বেংট গুস্টাভসনের মাথা টপকে বাঁ-পায়ে জোরালো ভলিতে গোলরক্ষক ক্যালে ভেনসনের ডানদিক দিয়ে জালে। একটুর জন্য ’৬৬-র জিওফ হার্স্টের আগে প্রথম ফাইনাল হ্যাটট্রিকের কৃতিত্ব– হল না। তবে ট্রফি এল। ’৫০-এর মারাকানা অভিশাপ কাটিয়ে প্রথম জুলে রিমে ট্রফি এল। গোটা দল উচ্ছ্বাসে মাতল। সবার থেকে আলাদা থাকা দ্বিধাগ্রস্ত গ্যরিঞ্চা ডিফেন্ডার ক্যাপ্টেন হিল্ডেরাল্ডো বেলিনিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা সবাই এখনই আনন্দ করছ কেন, ক্যাপ্টেন? দ্বিতীয় লিগ কবে শুরু হবে?’

ঠিক এমনই গ্রেটেস্ট ডুও-র একজন– গ্যারিঞ্চা, ঠিক এমনই। দু’জনেরই। ড্রিবল, চকিত গতি, বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল, সারা মাঠ জুড়ে খেলার দাপট। সঙ্গে গ্যারিঞ্চার অসমান পায়ের সৌজন্যে প্রতিপক্ষকে দিকভ্রান্ত করে দেওয়ার মোহ। ওয়েলস ম্যাচে পেলের সেই গোল, পেলেকে টুপি খুলে সেলাম জানানো ওয়েলসের মার্কার ডিফেন্ডার মেল হপকিন্সের কথায় আলাদা করে বারবার গ্যারিঞ্চার প্রসঙ্গ– ‘He is a phenomenon, a sheer magic.’
অলৌকিক ’৫৮-র ফাইনাল জেতার পর দেশের প্রেসিডেন্ট জুসেলিনো কুবিসচেক গোটা দলকে ডাকলেন ডিনারে। প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করছেন, ‘কী চাও, বলো।’ স্বাভাবিক প্রতিটি চাওয়ার বাইরে আশ্চর্য চমক গ্যারিঞ্চার উত্তরে, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, ওই যে আপনার ঘরের ভেতর খাঁচার পাখিটি রাখা আছে, আমি চাই ওকে খাঁচা খুলে উড়িয়ে দিতে।’ শোনা যায়, ওই পাখিটিই ছিল সাউথ আমেরিকান রেন অর্থাৎ, ‘গ্যারিঞ্চা’।

পেলে-গ্যারিঞ্চা। পর্তুগিজ ‘O Rei’ বা ‘The King’ পেলের পাশে ‘Alegria do povo’ বা ‘joy of the people’– গ্যারিঞ্চা। এদোয়ার্দো গ্যালিয়ানো পেলে সম্পর্কে বলতে গিয়ে অমরত্বের কথা বলেছিলেন। লিখেছিলেন, ‘moments so worthy of immortality they make us believe immortality exists.’ গ্যারিঞ্চাকে নিয়েও তাঁর পাগলের মতো মুগ্ধতা। লিখছেন, ‘When he was playing, the field became a circus ring, the ball a tame beast, the game an invitation to party.’
এই পেলে-গ্যারিঞ্চা জুটি ব্রাজিলের হয়ে একসঙ্গে খেলেছেন ৪০টি ম্যাচ। ড্র পাঁচটিতে, বাকি সবকটিতেই অর্থাৎ, ৩৫টি ম্যাচে জয়ীর হাসি। দু’জনে একসঙ্গে একটি ম্যাচও হারেননি! তাহলে ’৬৬-র হতাশা? কিন্তু সেখানে আসার আগে মাঝে ’৬২-র চিলি বিশ্বকাপ পড়ছে যে! যে ’৬২-র কথা শুরুতেই এসেছিল। মেক্সিকো ম্যাচের ৭৩ মিনিটে ’৫৮-র পেলের প্রতিলিপি। চারজনকে কাটিয়ে গোল। পরের চেকোশ্লোভাকিয়া ম্যাচে গোলশূন্য, তার চেয়েও বড় ক্ষতি পেলেবিহীন বাকি টুর্নামেন্ট। এবং এখানেই গ্যারিঞ্চার উত্থান।

’৫৮-র ফিওলার পদত্যাগ, কোচের সিটে এসেছেন এনিমোর মোরেইরো। গ্যারিঞ্চাকে খেলালেন আরেকটু সামনে থেকে। আজীবন ১০ নম্বর পেলের পাশে বদলে বদলে গিয়েছে গ্যারিঞ্চার পিঠের ফিগার। ’৫৮-য় ১১, ’৬২-র ৭-এর পর ’৬৬-র ১৬। ’৬২-র সেই সাত নম্বর জার্সির তরুণ স্পেন ম্যাচ থেকেই ঝলসে উঠলেন। পেলের বদলি হিসেবে নামা, ভাভা-ডিডিদের পাশে চিরকাল আন্ডাররেটেড অ্যামারিল্ডো করলেন জোড়া গোল, যার ভেতর একটির অ্যাসিস্ট গ্যারিঞ্চার। নক আউটে পরপর ইংল্যান্ড এবং চিলিকে উড়িয়ে দেওয়া ম্যাচে মোট চার গোল গ্যারিঞ্চার। ১৭ জুন সান্টিয়াগোর এস্তাদিও ন্যাশনাল। হলুদ ঝড়ে ৩-১-এ শেষ চেকরা। চিলির দৈনিক এল মার্কিউরিও লিখল– ‘Which planet is he from?’ পেলে সাইডলাইন থেকে উচ্ছ্বাসে মাতলেন। বারবার যেখানে পেরেছেন বলেছেন বন্ধুর কথা। বলেছেন, ‘মাঠের ভেতর আমরা টিমমেট, মাঠের বাইরে দারুণ বন্ধু’। বলেছেন, ‘আমি তিনবারের চ্যাম্পিয়ন হতাম না, পাশে গ্যারিঞ্চা না থাকলে’।

পরেরটুকুতে ক্রমশ আলো কমে আসার গল্প। ’৬৬। শারীরিক ফুটবলে পারদর্শী পর্তুগাল-ইংল্যান্ডের দাপটে ছন্নছাড়া সেলেকাও। ’৫৮, ’৬২-র গ্যারিঞ্চা তখন ছায়ামাত্র। হাঁটু ভোগাচ্ছে। ’৬৬-তে দলের কোচের মুখ সেই পুরনো ‘৫৮-র ফিওলা। ১২ জুলাই বুলগেরিয়া ম্যাচে গ্রুপ লিগের শুরুটা হয়েছিল জুটির ম্যাজিক দিয়েই। ১৫ মিনিটে পেলের গোল, ৬৩ মিনিটে ২-০ করলেন গ্যারিঞ্চা। একসঙ্গে শেষ হাসি। ’৫৮-য় প্রি-ওয়ার্ল্ড কাপ ম্যাচে বুলগেরিয়া দিয়ে জেতা শুরু, শেষ জয়েরও প্রতিপক্ষ এক। সমাপতন। পরেরটুকু সুখের নয়।
লিগেই পরপর দু’ম্যাচ হেরে ছিটকে গেল টানা দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। দ্বিতীয় ম্যাচে হাঙ্গেরি, লিভারপুলের গুডিসন পার্কের অবিশ্বাস্য গ্যালারি দেখল, নিজের ৫০তম ম্যাচে হেরে মাঠ ছাড়ছেন গ্যারিঞ্চা, এই প্রথম ফুটবলের শ্রেষ্ঠ মঞ্চে গ্যারিঞ্চার হার! লিটল বার্ডের শেষ ম্যাচ সেটিই। অবশ্য সে ম্যাচে খেলেননি পেলে। ফলে, জুটির অপরাজেয় তকমা ভাঙতে পারল না ইতিহাস। পেলের তারপরেও ’৭০-এর ড্রিম সিজন ছিল। কিন্তু গ্যারিঞ্চা? কী পেলেন? পরবর্তী অন্ধকার ছাড়া?

শৃঙ্খলাবদ্ধ, নিদিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে এগনো পেলের বিপরীতে, জুটির ওদিকে, চিরকাল জেদি, স্রেফ আনন্দের জন্য ফুটবল খেলা, বোহেমিয়ান আনপ্রেডিক্টেবল গ্যারিঞ্চা। ক্রিপল হাঁটু ভোগাচ্ছে, সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খলতা। দেশের জাতীয় পানীয় ‘ক্যাচাকা’ মদের তীব্র নেশা। ’৫৯-এ বাড়ি ফেরার পথে পিতাকে প্রায় গাড়ি চাপা দিতে দিতেও বেঁচে যাওয়া, সেই পিতা লিভার সিরোসিসে চলে গেলেন পরে। ছিলেন মদ্যপ, মহিলাসঙ্গ-প্রিয়। সেই লেগ্যাসি ছেলের রক্তেও। ’৬২-র উচ্ছাসমত্ত নগ্ন ব্রাজিল দলের স্নানঘরে ঢুকে পপগায়িকা এলজা সোরেস জড়িয়ে ধরলেন গ্যারিঞ্চাকে। আগুনে ঘি। টানা ১৫ বছরের সেই আগুন। স্ত্রী নাইরের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ’৬৫-তে। সোরেসকে নিয়ে দেশ ছাড়িয়ে একটা সময়ে রোমে চলে গেলেন। ক্লাবের পর ক্লাব পাল্টালেন। গাড়ি দুর্ঘটনার ভূত পিছু ছাড়ল না। শাশুড়ি ডোনা রোজারিওকে পাশে নিয়ে নিজের ভুলে গ্যারিঞ্চার স্টিয়ারিং চলে এল লরির সামনে। প্রেমিকার মা-কে খুনের অপরাধবোধ, অবসাদ, আত্মঘাতের চেষ্টা। তর্কের মাঝে গায়ে হাত দেওয়ায় ’৭৭-এ বিচ্ছেদ সোরেসের সঙ্গেও। গোটা জীবনে ৮ জন আলাদা নারীর গর্ভ, ১৪টি সন্তান। শেষ ২০ বছর যোগাযোগ নেই সন্তানের কারও সঙ্গেই।

একটা সময় ইতালিতে ব্রাজিলিয়ান কফি ইন্সটিটিউটের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। ব্ল্যাঙ্ক চেকে সই করিয়ে খেপ খেলিয়ে নিচ্ছেন ক্লাবকর্তারা, ঘরের ফুলের টবে, আসবাবে থোকা থোকা টাকা পড়ে আছে, পাশে সোফায় মদ্যপ, নির্বিকার গ্যারিঞ্চা। ফুটবলের থেকে আলোকবর্ষ দূরে মদ্যপ, একা, এক অচেনা নায়ক। ’৮৩-র ২০ জানুয়ারির আগে টানা তিনদিন লাগাতার মদ। ১৯ তারিখ রাতেই পালমোনারি ইডিমা, অ্যালকোহলিক কোমার ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন। সেই নিয়ে টানা আটবার হাসপাতাল। এবং সেবারই শেষ! বছর ৪৯-এর লিটল বার্ড আর উঠতে পারেননি সেই ঘুম থেকে। ডেথ সার্টিফিকেটে কারণ হিসেবে লেখা ছিল– ‘লিভার সিরোসিস’। শরীর এতটাই ফুলে গিয়েছিল, প্যারামেডিক টিম শরীরটাকে গ্যারিঞ্চা বলে চিনতে পারেনি শুরুতে। তবু, এত কিছুর পরেও, ফুটবল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন লোকটার শেষ যাত্রায় যেন ’৬২-র ছোঁয়া, মারাকানা থেকে পও গ্র্যান্দে পর্যন্ত বিরাট শোকমিছিল। পও গ্র্যান্দের সেই সাদা প্রস্তরফলক– ‘Here rests in peace the one who was the Joy of the People – Mané Garrincha.’

এছাড়াও আছে বলতে ‘লিটল বার্ড’-এর জন্য একটা ফেয়ারওয়েল ‘গেম অফ দ্য গ্র্যাটিচিউড’ ম্যাচ। ’৭০-এর ১৯ ডিসেম্বর, ১.৩১ লক্ষ মুখ মারাকানা ভরালো। আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ে মিলে তৈরি ফিফা একাদশকে ২-১ গোলে হারালো ব্রাজিল। ’৭০-এর ত্রিপল-ক্রাউন জয়ী টিম। পেলে খেললেন। সেলাম জানালেন, জড়িয়ে ধরলেন।

আরও আছে। এদোয়ার্দো গ্যালিয়ানোর সেই সেমিনাল বই। ‘সকার ইন দ্য সান অ্যান্ড শ্যাডো’। গ্যালিয়ানো লিখছেন– ‘He was the one who climbed out of the training-camp window because he heard from far-off back alleys the call of a ball asking to be played with, music demanding to be danced to, a woman wanting to be kissed…’।

মনে পড়ছে, ব্রাজিলের ফুটবল-সমাজে, রাস্তায়, তস্য গলিতে বারবার উঠে আসা, রিবাউন্ড করা পুরনো সেই কথাগুলো–
‘Even today, if you ask an old Brazilian about Pelé, he will take off his hat as a sign of admiration and gratitude. But if you mention Garrincha, he will lower his eyes, apologize, and weep.’
………….. পড়ুন জুটি কলামের অন্যান্য পর্ব ……………
পর্ব ৫: চিরশত্রু থেকে শ্রেষ্ঠ জুটি
পর্ব ৪: বিতর্কিত, বর্ণময় আটাত্তরের আর্জেন্টিনার জোড়া ফলা
পর্ব ৩: পায়ে লেখা যৌথ-কবিতা
পর্ব ২: অমরত্বের জাল কাঁপানো এক চিরকালের বন্ধুত্ব
পর্ব ১: পাশে থাকা, পাসে থাকা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved