Robbar

আয় ঘুম যায় ঘুম

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 23, 2026 8:03 pm
  • Updated:March 23, 2026 8:03 pm  

ঘুমকে আমরা প্রায়ই শুধু শরীরের বিশ্রাম বলে মনে করি। কিন্তু আসলে এটি তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত শরীর যখন বিছানায় শুয়ে পড়ে, তখন যেন প্রকৃতি নিজেই তাকে এক আন্তরিক আশ্রয়ে ঢেকে দেয়। নিদ্রার অন্ধকারে মানুষ আবার ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে পায়। মস্তিষ্ক দিনের স্মৃতি গুছিয়ে রাখে, শরীরের ক্লান্ত কোষগুলো যেন নীরবে নিজেদের মেরামত করে। তাই ঘুম এক অর্থে জীবনের পুনর্গঠন। একটি অদৃশ্য কর্মযজ্ঞ, যা রাতের আড়ালে সম্পন্ন হয়। 

সমীর মণ্ডল

২৬.

শুদ্ধ বিজ্ঞান মতে আমার একটা উপাধি প্রাপ্তি হয়েছিল অফিসে। ‘গিনিপিগ’। মানেটা আপনি আন্দাজ করতে পারছেন ঠিকই। অর্থাৎ মানুষের ওপরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর আগে যা কিছু ভালো-মন্দ তা ইঁদুর-বাঁদরের উপরে পরীক্ষা চালানো আর কী! আর এই গিনিপিগের উপরে গবেষণা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত আমাকে সারা জীবনের, যাকে বলে ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট’, একটা গড় চারিত্রিক উপাধিতেও ভূষিত করেছে– ‘রাতের পাখি’।

‘রাতের পাখি’ যদি থাকে তাহলে ‘ভোরের পাখি’ নেই? আছে। আর তারা একেবারে সত্যিই মাসতুতো ভাই। ফারাক যেটুকু, তা ওই ঘুমনো আর জেগে থাকার মধ্যে। হেঁয়ালি ছেড়ে বরং বাস্তবে আসি। এই যে গিনিপিগ উপাধিটা, সেটা পেয়েছিলাম দক্ষিণ ভারতের বেঙ্গালুরু শহরে। সদ্য কলকাতার বাংলা এবং বাঙালি নামক শিকড়বাকড় ছিঁড়ে, ঘরছাড়া হয়ে আমি পরিযায়ী হলাম দক্ষিণ ভারতে। বিজ্ঞান মিউজিয়ামের চাকরিতে বদলি। 

পরিযায়ী হলে মানুষের প্রথম যে পরিবর্তনটা ঘটে, সেটা হচ্ছে, ঘুম অগোছালো হয়ে যায়। ঘুমের ব্যাকরণ বদলে যায়। পরিযায়ীদের আরেকটা চারিত্রিক পরিবর্তন যা ঘটতে থাকে সেটা হল, নতুন জায়গায় নতুন পরিবেশে তারা হয় ওখানকার নিয়ম-কানুন মেনে চলার চেষ্টা করে, নয় ঘেঁটে গুলিয়ে নিজেরটা ওদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। বাঙালি হিসেবে আপনি বোধহয় আন্দাজ করতে পেরেছেন যে আমি দ্বিতীয় জাতের। ‘আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’ নয় আমি একেবারে পাতি ‘তর্কবাগীশ বাঙালি’। নিজের প্রাণ বাঁচাতে, সম্মান বজায় রাখতে, কারণে-অকারণে বিজ্ঞানকর্মীদের সঙ্গে, ‘কেন?’ এই প্রশ্নটি যথাসম্ভব বেশি প্রয়োগ করতে থাকলাম যে কোনও আলোচনায়।

ঝামেলায় ঘুম ছুটে যায় এই ব্যাপারটা, বিশ্বাস করুন, আমার মাথায় ঢুকেছে অনেক পরে। কারণ ঘুম ব্যাপারটাই অনেক বয়স পর্যন্ত বুঝতেই পারিনি, মাথায় ঢোকেনি। যখন-তখন যত্রতত্র বিনা কারণে আমার ঘুম পেয়ে যেত আর সেই ঘুম এমন যে সামলানো মুশকিল! সে গল্প অসংখ্য। সত্যি কথা বলতে কী, আজও আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু ঘুম। যখন তখন ঘুমিয়ে পড়ি। তবে এও দেখলাম যে, অতিনিদ্রা এবং অনিদ্রা– দুটো কাণ্ডই এই অধম গিনিপিগের ওপর দিয়ে গিয়েছে দীর্ঘজীবনে, আর এখনও বেশ বেঁচে-বর্তে আছি।

স্লিপিং। শিল্পী: সমীর মণ্ডল

যখন অফিসে ডিপার্টমেন্টাল হেড হিসেবে কাজ করতাম তখন আমার একটা বেশ বড়সড় কেবিন ছিল। বইপত্র আলমারি ইত্যাদিতে ঠাসা। অসুবিধা হল, আমি ভীষণ একা বোধ করতাম। তখন আমার নিজের হাতের কাজ কমিয়ে লোককে দিয়ে করানোর জন্য মগজের কাজগুলো বেড়েছে। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পড়াশোনা, লেখালেখি এই সমস্ত করতে গিয়ে মাঝেমাঝে ঘুম পেয়ে যেত। আমি একটা বসার পজিশন তৈরি করেছিলাম। বাঁ-হাতে টেবিলের উপরে ভর দিয়ে ডানহাতে একটি পেনসিল। সামনে কাগজে কিছু ড্রয়িং আর পেনসিলের পিছনের গোলাপি ইরেজারটা কপালে ঠেকিয়ে চিন্তা করার একটা পোজ। মানে ওই পোজে মিনিট কয়েক ঘুমিয়ে নিতাম। একদিন আমাদের ডিরেক্টর বিকেল চারটের সময় আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। উনি না-আসাতে পাঁচটার সময় ওঁর ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, স্যর, আপনি কিছু বলবেন বলেছিলেন! উনি বললেন, চারটে নাগাদ গিয়েছিলাম। আসলে তুমি এতই চিন্তামগ্ন ছিলে যে, তোমাকে আর ডিস্টার্ব করিনি। 

অফিসের কাজে প্রথমবার বিদেশে গিয়েছিলাম। জার্মানিতে। জার্নি শেষে দুপুর নাগাদ ‘বন’ শহরের হোটেলে পৌঁছেছিলাম। তারপরে পোশাক না পালটে নরম বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। যখন ঘুম ভাঙে তখন রাতদুপুর। জার্মান অফিস থেকে অনেকবার ফোন এসেছে। বারবার ইন্ডিয়ান এম্বাসির অফিস থেকেও ফোন। আমি ফোনের শব্দই শুনতে পাইনি। সে তো গেল। ঘুম থেকে উঠে বেজায় খিদে এবং মাঝরাতে কোনও দোকানপাট আর খোলা নেই। শুনশান জনমনুষ্যহীন রাস্তায় একা একা বেরিয়ে খাবার খোঁজার সে গল্প, অনেক লম্বা হয়ে যাবে। 

‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র মুম্বইয়ের অফিসে দেখেছিলাম ক্যামেরার জিনিসপত্র রাখার ঘর এবং রেকর্ড রুমের মধ্যে কাজের প্রয়োজনের জন্য দু’-তিনটে বড় বড় চওড়া বেঞ্চি রেখেছে। আসলে সেগুলো ছিল দুপুরবেলায় ভাতঘুম দেওয়ার বেশ চমৎকার জায়গা।

বেঙ্গালুরুতে রঞ্জনের বিজ্ঞাপনের অফিসের অন্য চেহারা। বিজ্ঞাপনের লোকেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাত জেগে কাজ করে। ওর অফিসে একটা ছোট্ট রুম ছিল, যেখানে একেবারে বালিশ-কম্বল দিয়ে গুছিয়ে বিছানা সাজানো। রুমটার বাইরে, দরজায় লেখা ছিল, ‘ক্রিয়েটিভ রুম’।

স্কুলবয়সে বাড়িতে রাত জেগে, মানে বেশি রাত করে পড়াশোনা করার ব্যাপারে বাবা-মায়ের তরফ থেকে কোনও উৎসাহ ছিল না, তার কারণ কেরোসিনের অভাব। হারিকেনের আলোতে পড়াশোনা খুব বেশি রাত অবধি করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া বইয়ের পাতা খুললেই কেমন চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসত। বইয়ের সঙ্গে ঘুমের দারুণ আত্মীয়তা। 

ছোটবেলায় ঘুমপাড়ানি গান ছিল, ঠাকুমা-দিদিমাদের কাছে গল্প শোনা ছিল। অদ্ভুতভাবে ঘুমপাড়ানির মতো ঘুমতাড়ানির একটা ওষুধের দরকার হয়ে পড়ল স্কুলের শেষের দিকে, হায়ার-সেকেন্ডারি পরীক্ষার আগে। হঠাৎ পাড়ায় পাড়ায় ধুম পড়ে গেল রাত জেগে পড়ার। সেই সময়ে আমাদের বাড়ি থেকেও হারিকেনের কেরোসিনের বরাদ্দ বেড়ে গেল। আমাদের পাড়া এবং পাশের পাড়া মিলিয়ে জনা চার-পাঁচজন সেবারে হায়ার-সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেব। তার মধ্যে গোটা দুয়েক ছিল পুরনো পাপী। আগের বছরে ফেল মেরে বসে আছে। এবারও আমাদের সঙ্গে পরীক্ষায় বসবে। আলাদা স্কুল, কিন্তু বোর্ড এগজামের কোশ্চেন এক।

এদের মধ্যে ধনী একজনের বাড়িতে যথেষ্ট জায়গা আছে। সেখানে মাঝেমাঝে আমরা চার-পাঁচজন একসঙ্গে রাত জেগে পড়তাম। মানে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগামী বিপদ জয়ের জন্য আমরা দলবদ্ধ। মাঝরাতে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়তাম। এর মধ্যে ফেলু পার্টির একজন ছিল ঘুম তাড়ানোর ওষুধ সম্পর্কে অভিজ্ঞ, আর একজন ছোট ছোট কাগজে কিংবা পেনসিলের গায়ে টোকার জন্য নানা কায়দা বের করার ওস্তাদ। টোকার ব্যাপারটা প্রথমে পছন্দ হয়নি ভয়ে। তবে অদ্ভুত একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম। ওর ছিল সূক্ষ্ম ছোট অক্ষরে লেখার ক্ষমতা। সে একটা দারুণ শিল্পকর্ম বলে মনে হল। পেনসিলের গায়ে লিখতে পারত দীর্ঘ ইতিহাসের উত্তর। ও কী করত, বিরাট বড় লেখাটার মূল ব্যাপারগুলো ধরা যাক পাঁচ-সাতটা প্যারাগ্রাফে ভাগ করে নিত। সেই প্যারাগ্রাফের একটা করে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ আলাদা করে লিখে, তারপর আবার প্রত্যেকটা শব্দের একটি মুখ্য অক্ষর নিয়ে তৈরি হত একটা প্রশ্নের উত্তর। ব্যাপারটা মাথায় ঢোকার পরে অনেক সময় কাজে লাগিয়েছিলাম। সেটা আলাদা করে কোথাও লুকিয়ে-টুকিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ত না। এত ছোট সেই অনু-উত্তর যা আমাদের মুখস্থ হয়ে যেত। 

রাতের ঘুম তাড়ানোর যে ব্যবস্থা, সেও ছিল বেশ মজার। তার মধ্যে একটি ছিল নস্যি টানা। আমরা পাঁচজন চাঁদা দিয়ে পাঁচ পয়সার নস্যি কিনে রাখতাম। শুরুর দিকে কিছুক্ষণ পড়ার পরে ঘুম পেলে ওই নস্যি নেওয়া হত। তারপরে হাঁচি দিয়ে নাক-মুখ পরিষ্কার হয়ে গিয়ে কোথায় হাওয়া হয়ে যেত ঘুম। মোক্ষম দাওয়াই! দু’-তিনদিন পরে লক্ষ করলাম নস্যি টেনে বেশ তাজা হয়ে যাচ্ছি কিন্তু প্রায় দু’-তিন মিনিট পরে আস্তে আস্তে ঘুম পাচ্ছে আবার। আরও দু’-একদিন পরে দেখলাম নস্যি টানার পরে খুব সুন্দর ঘুম পায়।

স্যর ফ্রেডেরিক লেইটনের আঁকা ছবি ‘ফ্লেমিং জুন’

আমাদের সেই নিজস্ব পাঠশালায় প্রথম স্বাধীনতার সুখ পেলাম। বাড়িতে থেকে বেরিয়ে অন্য জায়গায় রাত কাটানোর মজা। আর সেই সুবাদে আমরা পাড়ার সেবামূলক কাজও রাত্রিবেলা করতে শুরু করলাম। কোথাও কোনও আওয়াজ পেলে, চোরের গন্ধ পেলে তার গোয়েন্দাগিরি এবং হাতেনাতে চোর ধরার কাজকর্মগুলোও প্র্যাকটিস করতে থাকলাম। ফলত পরের দিন স্কুলে গিয়ে তিন-চারটি বেঞ্চের পিছনে বসে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়তাম।

স্কুলজীবনে ঘুম বিষয়ে জ্ঞানের জন্য সিরিয়াসলি কোনও বইপত্র পড়িনি। তবে ছোটবেলায় রূপকথায় রাজকন্যার ঘুমের আর রামায়ণ-মহাভারতের ঘুমের গল্প শুনেছি, দেখেছি নাটকে-সিনেমায়। রামায়ণের দুটো ঘুমের কাহিনি আমার খুব মনে ধরে আছে। দুটোই কাউকে অকালে ঘুম থেকে টেনে তোলার গল্প। একজন হলেন কুম্ভকর্ণ। কুম্ভকর্ণের ঘুম এতটাই গভীর ছিল যে, তা ভাঙাতে হাজার হাতি, ঘোড়া ঢাক-ঢোল, শঙ্খ-ঘণ্টার আওয়াজ ব্যবহারের প্রয়োজন হত। দ্বিতীয়টি অকালবোধন। অর্থাৎ দেবী দুর্গার অসময়ে পুজো। হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে, শরৎকাল দেবলোকের রাত্রি। তাই এই সময় দেবীপূজা করতে হলে, আগে বোধন বা জাগরণ করতে হয়। শরৎকাল পুজোর শুদ্ধ সময় নয় বলে রামের দেবী পার্বতীর বোধন, ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত বলে জানলাম।

স্কুলের পাঠ চুকিয়ে, গ্রাম্য জীবনের পাঠ চুকিয়ে, কলকাতায় এলাম আর্ট কলেজে পড়তে। মামাবাড়িতে ছেলেকে পড়িয়ে উত্তর কলকাতায় পাতিপুকুরে খাওয়ার জোগাড় তো হল, কিন্তু ঘর ছোট, শোওয়ার জায়গা নেই। তাই ওদেরই ব্যবস্থাপনার পাতিপুকুর মাছের বাজারের আড়তঘরে আমার শোওয়ার ব্যবস্থা। কলেজ করা, অনেকটা রাস্তা হেঁটে হেঁটে কলকাতায় ঘুরে বেড়ানো আর আউটডোর ইত্যাদি প্র্যাকটিস করা বাইরে বাইরে। সন্ধেবেলা এসে ছেলেকে পড়িয়ে খাওয়া-দাওয়ার পরে বেদম ঘুম পেত। ওখান থেকে মাছের বাজার পর্যন্ত হাঁটতে প্রায় পাঁচ-সাত মিনিট লাগে। একবার তো তিন-চার মিনিটের পরে এতই ঘুম এল যে, আমি রাস্তার ধারের একটা ল্যাম্পপোস্টের গায়ে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেওয়ার মতলব করেছিলাম। নেহাত রাতে রাস্তার কুকুরগুলো পিছনে পিছনে আসছিল তাই প্ল্যানটা বাতিল করতে হল।

মাছের আড়তের গদিঘরে ছিল ছারপোকার অত্যাচার। আর ওখানে বাজারের সমস্ত দেহাতি লোকজন খাওয়া-দাওয়া করে, ভজন-কীর্তন করতে করতে মাঝরাত পেরিয়ে যেত। একটুও ঘুমনো যেত না। উচ্চস্বরে চেঁচামেচি আর রাত শেষ না হতেই দূর-দূরান্ত থেকে মাছের লরিগুলো আসতে শুরু হয়ে যেত। আরও একটা হইহই। যার ফলে ঘণ্টা তিনেকের বেশি ঘুমনোর টাইম পাওয়া যেত না। আর তার জন্য সারাটা দিনে নানা অঘটন ঘটতে থাকত। 

পাতিকুকুর থেকে প্রায়দিনই পায়ে হেঁটে, কখনও কখনও বাসে, কখনও ট্রামে সাহেবপাড়ায় যেতে হত কলেজে। এই সময় বাসে প্রায়ই জানলার ধারে যে লোহার পাতগুলো থাকে সেইখানে মাথা ঠুকে, গুঁতো খেয়ে খেয়ে কপাল ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছে অনেকবার। একদিন ট্রামে করে যাচ্ছিলাম। চৌরঙ্গী পাড়ায় সাময়িকভাবে ঘুম ভাঙল। জানলার ধারে বসে দেখলাম মনুমেন্টটা দাঁড়িয়ে আছে। তারপর আবার দেখলাম যে, আমার ডানদিকে মনুমেন্ট হওয়ার কথা সেটা দেখছি রাস্তার বাঁদিকে। আসলে হয়েছে কী, ওই ট্রামটা বালিগঞ্জ বা ওইরকম কোনও দূরত্বে গিয়ে টার্মিনাস ঘুরে আবার যখন ফিরে এসেছে তখন মনুমেন্টের পাশে আমার ঘুম ভেঙেছিল। তাই মনুমেন্টটা ডানদিকের বদলে বাঁদিকে হয়ে গিয়েছে। 

চণ্ডী লাহিড়ী

এই কলেজ জীবনেই পাইকপাড়াতে কার্টুনিস্ট চণ্ডী লাহিড়ীর সঙ্গে কাজে জড়িয়ে পড়ি। আর চণ্ডীদার বাড়িতেই আলাপ হয়েছিল শিবরাম চক্রবর্তীর সঙ্গে। উনি মাঝে মাঝে আসতেন। শিবুদার লেখা তখন আমরা অনেক পড়ে ফেলেছি। ঘুম সম্পর্কে ওঁর বিখ্যাত উক্তিটাও জানা হয়ে গিয়েছে। ঘুম মানে শিবুদার কাছে ‘পরিশ্রম’, কারণ ঘুমিয়ে স্বপ্ন-টপ্ন দেখতে হয়। সেখানে অনেক কাজকর্ম, তার ফলে ঘুম থেকে উঠে উনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাই প্রায়ই ঘুম থেকে উঠে খিদে পেয়ে যায়।

ওঁর লেখার ঘুম ছাড়াও সরাসরি আমাদের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে নানা সময়ে ঘুমের কথা বলতেন। আমার হস্টেলজীবনে ঘুম এবং শরীর কী করে ঠিক রাখতে হবে, সে ব্যাপারে নিজস্ব স্টাইলে জ্ঞান দিয়েছেন। একবার চণ্ডীদার মেয়ে তুলির জন্মদিনে আমন্ত্রিত লোকজনদের সঙ্গে শিবুদাও আছেন। একটা ঘরে মহিলাদের মধ্যমণি হয়ে গল্প করছেন। এমন পরিবেশে শিবুদা থাকতেন অনেকটা শিশুর মতো, সহজ সরল। 

কে একজন মাঝখান থেকে বলে উঠল, আজ কিন্তু ইলিশ মাছ আছে। সঙ্গে সঙ্গে শিবুদা সোজা হয়ে বসে বললেন, কোথায়? কোথায়? চলো তাড়াতাড়ি খেয়ে নেওয়া যাক। মহিলারা বাধা দিয়ে বলল, না, না আরও কিছুক্ষণ গল্প করি। আপনি তো আবার খেলেই ঘুমিয়ে পড়বেন। তখন শিবুদা বলেছিলেন, ‘আর যদি না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি!’ সরল কথাটার মর্ম মায়েরা ভালোই বোঝে। নিমন্ত্রণ বাড়িতে শিশুদের খেয়েই ঘুমিয়ে পড়া আর না-খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার ঝামেলা সাংঘাতিক!

শিব্রামের স্বপ্নটপ্ন দেখা যতই পরিশ্রমের ব্যাপার হোক, ঘুমের একটি বিস্ময়কর দিকই হল স্বপ্ন। মানুষ ঘুমের গভীরে প্রবেশ করলে এক অদ্ভুত জগৎ খুলে যায়, যেখানে বাস্তব ও কল্পনা মিলেমিশে একাকার। কখনও আমরা দেখি অতীতের স্মৃতি, কখনও এমন দৃশ্য যা বাস্তবে কখনও ঘটেনি। স্বপ্ন যেন মনের একটি গোপন মঞ্চ, যেখানে স্মৃতি, আশা, ভয় ও আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে অভিনয় করে। জেগে থাকা অবস্থায় যে কল্পনাগুলো চাপা পড়ে থাকে, ঘুমের ভেতর তারা কখনও কখনও মুক্তি পায়। সুরিয়ালিস্ট শিল্পী সালভাদোর দালি এই স্বপ্নটাকে কাজে লাগিয়েছেন জীবনভর। এমনকী, নানাভাবে নিজের ইচ্ছেমতো স্বপ্ন তৈরির চেষ্টা করতেন। মনমতো স্বপ্ন দেখে জেগে গেলে তখনই স্টুডিওতে গিয়ে কাজে লেগে পড়তেন, রাতের যে কোনও সময়ে।

সালভাদর দালির আঁকা বিখ্যাত ছবি ‘স্লিপ’

পাবলো পিকাসো প্রায় সারারাত ধরেই ছবি আঁকতেন এবং একটানা অনেকক্ষণ না-ঘুমিয়েও ছবি আঁকতে পারতেন। সৃজনশীলতায় মগ্ন থাকায় শিল্পীরা অনেক সময় নিজেদের ক্লান্তি অনুভব করেন না। বিখ্যাত সৃজনশীল ব্যক্তিদের ঘুমের সময় এবং ঘুমের পরিমাণ নিয়ে নানা গল্প নানা তথ্য নেট ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে। সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে আপনাদের অনেকেরই জানা তাঁদের লেখার জন্য পছন্দের সময়, আর তাঁরা কতটুকু ঘুমতেন। বিজ্ঞানীরা সেক্ষেত্রে অন্যরকম। 

নিকোলা টেসলা দিনে মাত্র দু’-ঘণ্টা ঘুমতেন বলে দাবি করা হয়। বেনজামিন ফ্র্যাঙ্কলিন দিনে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা ঘুমতেন। টমাস এডিসন ঘুমকে ‘গুহাযুগের ঐতিহ্য’ মনে করতেন এবং সময়ের অপচয় বলতেন। রাতে মাত্র ৩-৪ ঘণ্টা ঘুমতেন। প্রাচীনকালে মানুষ আমাদের মতোই কম ঘুমত। গবেষণায় দেখা গিয়েছে আমাদের আধুনিক জীবন, কৃত্রিম আলো, ঝলমলে পর্দা এবং রাত জেগে থাকার গ্যাজেট ইত্যাদিতে প্রভাবিত, প্রযুক্তিতে আচ্ছন্ন। কিন্তু মজার বিষয় হল আমরা আমাদের প্রযুক্তি-মুক্ত প্রাচীন পূর্বপুরুষদের চেয়ে কম ঘুম পাচ্ছি তা নয়, গুহামানবরা তখনও শান্তিতে ঘুমতে পারত না। আধবোজা চোখে, বলতে গেলে বসে বসেই কাটাতে হত রাত। 

আমাদের এখানে হাতের কাছে অভিনেতা সলমন খান ও শাহরুখ খান বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন যে, কাজ বা অনিদ্রার কারণে ওঁরা দিনে মাত্র ২-৪ ঘণ্টা ঘুমন। প্রীতীশ নন্দীকে দেখেছি চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমতে। আমি নিজে ২৫ বছরেরও বেশি হৃদরোগী হয়েও দিনে ৬ ঘণ্টা ঘুমই এখন। আগে দীর্ঘ কর্মজীবনে অফিস, ছবি আঁকা এবং আরও নানা কাজ মিলিয়ে গড়ে চার ঘণ্টার বেশি ঘুমতে পারিনি।

ঘুম বিষয়ে বিজ্ঞানের কথা ও বিজ্ঞানীদের কথা তো হল কিন্তু আসলে ঘুম সম্পর্কে বিজ্ঞান কী বলছে? বিজ্ঞান মিউজিয়ামে কাজ করার অভিজ্ঞতার ফলে যতটুকু দেখেছি আজ অবধি, ঘুমের কোনও সময় নির্দিষ্ট করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। ঘুমের প্রয়োজনীয়তা কতখানি, সেটা ঠিক করতে পারেননি। তবে ঘুমে কী হয়, অর্থাৎ ঘুমলে শরীরের কী কী পরিবর্তন ও প্রতিক্রিয়া হয়, সে ব্যাপারে অনেক জ্ঞান আমাদের দিয়েছে বিজ্ঞান।

পাবলো পিকাসোর আঁকা ছবি ‘স্লিপ’

সুনিদ্রা, অনিদ্রা, অতি নিদ্রা, নিদ্রাঘটিত রোগ এবং প্রয়োজনে অ্যানেস্থেসিয়ার সাহায্যে জোর করে ঘুমপাড়ানো, এসবগুলোর গবেষণালব্ধ ফসল পেয়ে গিয়েছি আমরা। শুনে অবাক লাগলেও সত্যি, বিশ্বে এবং ভারতে বেশ কিছু জনপ্রিয় ‘ঘুমের প্রতিযোগিতা’ অনুষ্ঠিত হয়। তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন। ‘ওয়েকফিট স্লিপ ইন্টার্নশিপ’, এটি ভারতে বেশ জনপ্রিয় একটি প্রতিযোগিতা। এখানে নির্বাচিত ইন্টার্নদের ১০০ দিন ধরে দিনে ৯ ঘণ্টা করে ঘুমনোর জন্য মোটা অঙ্কের টাকা (কখনও ১ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত) দেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুরের ত্রিপর্ণা চক্রবর্তী এই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে ৬ লক্ষ টাকা পুরস্কার জিতেছিলেন। এছাড়া জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ঘুমের প্রতিযোগিতা তো রীতিমতো প্রদর্শনী।

ঘুমকে আমরা প্রায়ই শুধু শরীরের বিশ্রাম বলে মনে করি। কিন্তু আসলে এটি তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত শরীর যখন বিছানায় শুয়ে পড়ে, তখন যেন প্রকৃতি নিজেই তাকে এক আন্তরিক আশ্রয়ে ঢেকে দেয়। নিদ্রার অন্ধকারে মানুষ আবার ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে পায়। মস্তিষ্ক দিনের স্মৃতি গুছিয়ে রাখে, শরীরের ক্লান্ত কোষগুলো যেন নীরবে নিজেদের মেরামত করে। তাই ঘুম এক অর্থে জীবনের পুনর্গঠন। একটি অদৃশ্য কর্মযজ্ঞ, যা রাতের আড়ালে সম্পন্ন হয়। 

প্রসঙ্গত, একটি পৌরাণিক কাহিনির সাপোর্ট নিতে চাই। আমাদের অতি পরিচিত দৃশ্য, সবার জানা এক ভাবমূর্তি– ‘অনন্তশয়ন’। অনন্তশয়ন হল হিন্দু পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, ক্ষীরোদসাগরে অনন্তনাগ বা শেষনাগের ওপর ভগবান বিষ্ণুর যোগনিদ্রা বা শয়নরত অবস্থা। এটি মহাবিষ্ণুর একটি রূপ, যেখানে পরমাত্মার বিশ্রাম এবং সৃষ্টি ও ধ্বংসের মধ্যবর্তী অবস্থানকে নির্দেশ করে। তাই নিদ্রা এক অর্থে জীবনের পুনর্গঠন, একটি অদৃশ্য কর্মযজ্ঞ।

মৃত্যুর সম্ভাবনা আছে এমন কোনও মুহূর্তে, মহাত্মা থেকে সাধারণ মানুষেরও কিছু কিছু নিজস্ব জ্ঞান তৈরি হয়। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আমারও কিছু নিজস্ব বোধ তৈরি হয়েছে। আরোগ্য, নিদ্রা, মানসিক শান্তি ইত্যাদির জন্য যেগুলোকে আশ্রয় করেছিলাম তার একটি, যোগব্যায়াম। সেখানে সার বুঝেছি, পরিশ্রম মানে যেমন ব্যায়াম নয় তেমনই ঘুম মানে বিশ্রাম নয়। শান্তির বিশ্রামই বরং নিদ্রার পরিপূরক। জীবন ছোট হয়ে আসছে, এই ভেবে জগতের বৈচিত্র দেখার সাধ হল। দেশ-কাল-প্রকৃতি-সংস্কৃতি-মানুষ। ঘুরতে ঘুরতে একবার গিয়েছিলাম থাইল্যান্ডের ব্যাংকক শহরে। সেখানেই দেখা মিলল আপাদমস্তক সোনায় মোড়া, সেই অতিবৃহৎ বুদ্ধের শায়িত মূর্তি।

থাইল্যান্ডের ব্যাংকক শহরে অতিবৃহৎ বুদ্ধের শায়িত মূর্তি।

যোগাসনে বিশ্রাম বা ঘুমের যে ক’টি আসন আছে তার সবচেয়ে আমার প্রিয় আসনটি হল ডানহাতকে বালিশ করে তার উপর মাথা রেখে, শরীরকে সোজা রেখে ডান কাতে শুয়ে, বাঁ হাতটি আলতো করে যথাসম্ভব শরীরের উপর দিয়ে পা পর্যন্ত বিছিয়ে রাখা। ২৫ বছর ধরে এখন আমি যখন তখন শুয়ে থাকার সময় ওইভাবে শুয়ে ভীষণ আনন্দ পাই। সঙ্গ দিতে আমার সামনে আর একজন মাঝেমধ্যে শুয়ে থাকেন। শায়িত বুদ্ধের মূর্তিটি ।

শায়িত বুদ্ধের মূর্তিটি নিয়ে চিন্তা করতে করতে আমি এর প্রতীকী অর্থের গভীরতর স্তরগুলো বুঝতে শুরু করলাম। এই মূর্তিটি বুদ্ধের শান্তিপূর্ণ মহানির্বাণে প্রবেশকেও বোঝায়, যেখানে সমস্ত জাগতিক দুঃখের অবসান ঘটে। একটি শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণ মুহূর্ত, শোকের নয়, বরং জীবন ও মৃত্যুর অন্তহীন চক্র থেকে পরম মুক্তির এক মুহূর্ত। তাঁর আধ্যাত্মিক যাত্রার চূড়ান্ত পরিণতি। এমন এক যাত্রা, যে পথে আমরা প্রত্যেকেই আমন্ত্রিত।

…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…

পর্ব ২৫: ধুলোবালির পর বালিধুলো

পর্ব ২৪: তালাচাবির বন্ধুত্ব

পর্ব ২৩: বেঁধে থাকা বেঁধে রাখা

পর্ব ২২: এই দুনিয়া ঘোরে বনবন বনবন

পর্ব ২১: শরীরের ক্যানভাসে আঁকা শিল্প

পর্ব ২০: বিজ্ঞান পরিবেশনা ও মিউজিয়ামের অজানা গল্প

পর্ব ১৯: মরণের পরেও, এই পৃথিবীর জন্য আপনি রইলেন

পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না

পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন

পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি

পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!

পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ

পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম

পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?

পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়

পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব‍্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ

পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?

পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা

পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার

পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ

পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা

পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?

পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!

পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন

পর্ব ১: বস্তু নাকি ভাবনা, শিল্পকলায় কী খোঁজেন?