Robbar

‘হারমোনিয়াম’-এর ডালা খুললে এখন হাসিঠাট্টার পাশে অনেকটা মনখারাপ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 14, 2026 8:36 pm
  • Updated:January 14, 2026 8:36 pm  

২০০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি, প্রয়াত হয়েছিলেন তপন সিন্হা‌। ২০২৬ সালের এই জানুয়ারি মাসেই, হারমোনিয়াম ছবিটি ৫০ বছর পূর্ণ করল। হারমোনিয়ামের বাসন্তী চরিত্রে ছিলেন অভিনেত্রী সোনালী গুপ্ত। তাঁর হারমোনিয়ামের সাদা-কালো দিনগুলির কথা তিনি লিখলেন রোববার.ইন-এ। 

সোনালী গুপ্ত

ছোট থেকেই আমি বড় হয়ে উঠেছি সিনেমার পরিবেশে। বাবা– দীনেন গুপ্ত। ফোটোগ্রাফার, ক্যামেরাম্যান, বহু জনপ্রিয় ছবির পরিচালক। মা– অভিনেত্রী কাজল গুপ্ত। ফলে সিনেমাপাড়ার বহু মানুষের সঙ্গেই ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল অভিনয় করতে আসার আগেই। ওঁরা ছিলেন প্রায় পরিবারের মতোই– নায়ক-নায়িকা, পার্শ্বচরিত্র, তাবড় কমেডিয়ানরা। বাংলা সিনেমার পরিবেশ, সে সময় তেমনটাই ছিল হয়তো। নিজে ছবিতে অভিনয় করব, তা অবশ্য কখনও ভাবিনি। যদিও বাবার ছবিতে একে একে সুচিত্রা সেন, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন– কে না অভিনয় করেছেন! তাঁদের দেখেছি। তবুও আমার ছবি করতে আসা একেবারেই ‌‘অ্যাক্সিডেন্টাল’!

দীনেন গুপ্ত, সোনালী গুপ্ত ও কাজল গুপ্ত

বাবার বহু ছবিই বাংলা সাহিত্যের দুরন্ত সব লেখালিখিকে আশ্রয় করে। ছোটবেলায় বহু শিল্পী-সাহিত্যিকদের দেখেছি বাড়িতে আসতে, বাবাকে তাঁদের বাড়ি যেতে। বুদ্ধদেব বসু থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়– কে নেই সেই তালিকায়! প্রতিভা বসু-বুদ্ধদেব বসুর প্রায় পালিত সন্তানের মতোই ছিলেন আমার বাবা। প্রতিভা বসুর অনেক লেখাতেই ‘দীনেন’। সন্ধেবেলা শুটিং থেকে ফেরা মানেই প্রতিভা বসুর বাড়িতে আড্ডা! তাছাড়া ভৌগোলিক নিকটত্ব ছিলই– প্রতিভা বসুরা থাকতেন ২০২ রাসবিহারী অ্যাভিনিউ আর বাবা থাকতেন ২০০ রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে! বাবা যখন ‘বনজোৎস্না’ নিয়ে ছবি করবেন ভাবছেন, তখনই মীনাক্ষী দত্তকে বাবার পছন্দ হয়ে যায়। তখন বাবার এই সমস্ত ছবির স্ক্রিপ্ট করতেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। মনে পড়ে, আমরা রেড ব্যাঙ্ক টি এস্টেটে শুটিং দেখতে গিয়েছিলাম। ‘নতুন পাতা’ জাতীয় পুরস্কার পেল, হইচই হল, কিন্তু বাবার ‘বনজোৎস্না’ তেমন চলল না। মাত্র ৪ সপ্তাহ চলেছিল সেই ছবি!

পরের ছবি, আশাপূর্ণা দেবীর ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ নিয়ে। বাবা জুতসই কোনও মেয়ে পাচ্ছিলেন না যে সত্যবতী করতে পারে, পেলেও হয়তো বা পছন্দ হয়ে উঠছিল না তেমন। প্রিয়া সিনেমার মালিক, এ ছবির প্রোডিউসার অরিজিৎ দত্ত তখন হঠাৎ করেই আমার কথা বলেন। ৪টা ফিল্ম টেস্টের ছবি যখন বাবার হাতে পড়েছিল, বাবা প্রথমে আমাকে চিনতেই পারেননি! নোলক পরা সেই চেহারা সত্যবতী হিসেবে খুব মানাবে, বলেছিলেন বাবা। তখন আমার বয়স মাত্র ১৩। আমার প্রথম ছবি– ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’।

মা চাইতেন আমি অভিনয় করি, বাবা তেমন একটা চাইতেন না। কেন চাইতেন না– এটা যখন প্রশ্ন করার কথা মাথায় এল, ততদিনে বাবা চলে গিয়েছেন আমাদের ছেড়ে। প্রথম ছবি করার পরই বছর দুই অভিনয়ের সঙ্গে মুখ দেখাদেখি ছিল না। কারণ বোর্ডের পরীক্ষা। তারপরই ‘হারমোনিয়াম’! সে কাণ্ড বটে একটা!

তপন সিন্‌হার সহকারী পরিচালক ছিলেন বলাই সেন। বলাইকাকু আর বাবা খুবই বন্ধু! একদিন সন্ধেবেলা আড্ডা মারতে এসে বলাইকাকু বলেছিলেন, ‘‘খোকা শোন, তপনদা একবার তোর মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে চায়, দেখতে চায়– ‘হারমোনিয়াম’-এ অভিনয়ের জন্য।’’ হারমোনিয়ামের তিনটে সমান্তরাল গল্প– বলা চলে তিনজন হিরোইন– আরতি ভট্টাচার্য, অরুন্ধতী দেবী ও আমি। আমার ডাক পড়ল, বলাইকাকু বললেন, ‘বাবুই, কাল একবার চলে আসিস তপনদার বাড়ি।’

‘হারমোনিয়াম’-এর মহরতের আমন্ত্রণপত্র

তপন সিন্‌হার ‘হাটেবাজারে’তে ক্যামেরাম্যান ছিলেন বাবা। বাবার ‘ছুটি’ ছবিতেও অরুন্ধতী দেবী ছিলেন। ফলে ওঁদের সঙ্গে আমাদের সখ্য ছিলই। তপনকাকুর ‘ঠেক’ হল টালিগঞ্জের দু’ নম্বর স্টুডিও। আগে একটামাত্র ছবি করেছি, তাও সেখানে পরিচালক স্বয়ং বাবা! কিন্তু এবার তো তপন সিন্‌হা। বুক খানিক ঢিপঢিপই করছিল। তপনকাকু এত স্নিগ্ধ ও সুন্দর করে কথা বলেছিলেন সেই প্রথম দিন, আমার সমস্ত ভয় জুড়িয়ে গিয়েছিল। ‘হারমোনিয়াম’-এর গল্পটা ছোট্ট করে শুনিয়েছিলেন সেদিন। বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছিল। তপনকাকু বলেছিলেন, ‘আমার খুব ইচ্ছে বাসন্তীর চরিত্রটা তুমি করো। তোমার কী ইচ্ছে?’ আমি বলেছিলাম, ‘আমার ইচ্ছের কিছু নেই, আপনি যদি ভেবে থাকেন আমি এই চরিত্রটা করতে পারব, তবে করতে পারব।’ ‘আই লাইক ইওর কনফিডেন্স!’– বলেছিলেন তপনকাকু! বাবা-মা– দু’জনেই কোনও আপত্তি করেননি। তাঁদের অত্যন্ত প্রিয় ‘তপনদা’র ছবিতে মেয়ে অভিনয় করবে, তাতে তাঁরা বেশ খুশিই হয়েছিলেন।

‘হারমোনিয়াম’ ছবির আউটডোরে ভীষ্ম গুহঠাকুরতা ও তপন সিন্‌হার সঙ্গে সোনালী গুপ্ত

হারমোনিয়ামের প্রথম শুটিং হয়েছিল শান্তিনিকেতনে। জানুয়ারির প্রবল ঠান্ডায়। গাড়ি করে ইউনিট বেরিয়ে গেল। বাকিরা ট্রেনে করে শান্তিনিকেতন। ট্যুরিস্ট লজে থাকা। প্রথম দিন কোনও কাজ নয়। তপন সিন্‌হার ভাষায় ‘রেস্ট ডে’। আমি তো আমার হিরো ভীষ্ম গুহঠাকুরতার সঙ্গে ঘুরতে লাগলাম। সেই প্রথম শান্তিনিকেতন ঘুরে ঘুরে দেখা। তারপর বলাইকাকু কোথা থেকে এসে বললেন, ‘বেশি দেখা নয়, অনেক দেখা হয়ে গেছে। এবার রিহার্সাল’। রাতের বেলা তপনকাকু বললেন, ‘দেখো, চারদিন শুট করব এই গানটা। সকালে দু’-তিন ঘণ্টা, আর সন্ধেয় খানিকটা। মাঝের সময়টায় কোনও শুট নেই।’ ফুরফুরে হাওয়া। রোম্যান্টিক গান। না সোয়েটার, না শাল! খোয়াইতে শুটিংয়ের সময় প্রচুর দৌড় করিয়েছিলেন তপনকাকু। ছোট ছিলাম, তাই পেরেছিলাম। রাতে ফিরে এসে বলতাম, ‘বাপরে, এত্ত ছুটতে হবে জানলে করতাম না!’

‘হারমোনিয়াম’ ছবির আউটডোরে অরুন্ধতী দেবী ও সোনালী গুপ্ত

সেই প্রথম শান্তিনিকেতন। তার আগে কখনও শান্তিনিকেতন যাইনি। শুধু শুনেছি, লেখায় পড়েছি। এখন শান্তিনিকেতনে আমার বাড়ি আছে। খোয়াইয়ের ওখানে ‘এমন করেই চলতে পারি’ গানটা দিয়ে আমাদের শুটিং শুরু হয়। ওখান থেকে পরে কেন্দুলির মেলা– শিউলি মুখোপাধ্যায়, অরুণ মুখোপাধ্যায়ের দৃশ্যটা। মনে আছে, গানটার শুটিংয়ের আগে হৈমন্তী শুক্লার গলায় গানটা শোনালেন। রিহার্সাল হল। তপন সিন্‌হা কিন্তু প্রচুর রিহার্সাল করতেন! আমার খুবই উপকার হয়েছিল তাতে, জীবনের দ্বিতীয় ছবি কি না!

‘হারমোনিয়াম’ ছবির আউটডোর। বাঁদিক থেকে সোনালী গুপ্ত, অরুন্ধতী দেবী, তপন সিন্‌হা, কাজল গুপ্ত ও ভীষ্ম গুহঠাকুরতা

তপনকাকু খুব পোস্ত খেতে ভালোবাসতেন। ফলে, আমাদের খানাপিনায় রোজই আলুপোস্ত, ঝিঙেপোস্ত, ডালপোস্ত– কিছু একটা থাকতই। সাধারণ খাওয়াদাওয়া, কিন্তু আয়োজন, আন্তরিকতা এলাহি! আর ভীষণ ডিসিপ্লিনড! তায় মা আমার সঙ্গে! অভিনয়ের পাশাপাশি সবসময় খেয়াল রাখছেন মেয়ের পা যেন ‘পিছলে না যায়’। তপনকাকুর স্পষ্ট বলে দেওয়া ছিল, হয়তো আমি ছোট বলেই, লাঞ্চটা ওঁর সঙ্গেই সারতে হবে। আমাকে বলে দিয়েছিলেন, ‘খাওয়ার পর কোত্থাও আড্ডা মারতে যাবে না। একটু রেস্ট নাও।’ আসলে উনি চাইতেন নায়িকাকে একদম ফ্রেশ দেখাক। আমি ১৫-২০ মিনিট বিশ্রাম করতাম বটে, কিন্তু ওদিকে বাকিরা কতই না আড্ডা জুড়েছে মনে পড়তেই দৌড় দিতাম সেদিকে!

নায়ক-নায়িকা ভীষ্ম গুহঠাকুরতা ও সোনালী গুপ্তকে শট বোঝাচ্ছেন তপন সিন্‌হা

বিকেলবেলা যখন শুটিং সেরে ফেরত আসতাম তখনই সক্কলকে বলে দেওয়া হত– সাড়ে সাতটার মধ্যে তপন সিন্‌হার ঘরে পৌঁছে যেতে হবে। সেই ঘরে গানবাজনা, কখনও সখনও তাস খেলা– নানা কাণ্ডকারখানা! তপন সিন্‌হা শান্তিনিকেতনে, সঙ্গে আবার অরুন্ধতী দেবীও– ফলে অনেকে দেখা করতে আসতেন। মনে পড়ছে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এসেছিলেন। শুধু এই সিনেমার নয়, তপন সিন্‌হার আরও বহু ছবির গানই গাওয়া হত সেই সান্ধ্য-মজলিশে। শমিত ভঞ্জ হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান ধরতেন, হারমোনিয়ামটা তো থাকত গাড়িতেই, ফলে বাদ্যের অভাব হত না। ভীষ্মও খুব ভালো গান গাইত, বিশেষত রবীন্দ্রসংগীত।

‘হারমোনিয়াম’ ছবিতে ভীষ্ম গুহঠাকুরতা ও সোনালী গুপ্ত

সিনেমায় আমার বাবা হলেন কালী ব্যানার্জী, মা গীতা রায়। শ্বশুরমশাই সন্তোষ দত্ত আর শাশুড়ি আমার মা কাজল গুপ্ত! ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এদিকে পুলিশ অফিসার। এই ছবিতে যদিও তিনি আমার সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেছেন খুবই কম। একটা দৃশ্যে ভীষ্মকে থাপ্পড় মারলেন, আর আমাকে ‘তুমি মা’ বলে আদর করে সংলাপ বলেছিলেন ভানুকাকু! দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত অভিব্যক্তি, একটা লোক কী অবিশ্বাস্য সাবলীল দক্ষতায় করে ফেললেন! একবার, তপনকাকুকে দেখেছি, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে বললেন, ‘ভানু শোন, হাতের লাঠিটা একটু পেঁচিয়ে দিস এই দৃশ্যটায়।’ হারমোনিয়ামের দর্শক মাত্রই মনে করতে পারবেন, কালী ব্যানার্জীর বাড়িতে বিপ্লবী ছেলের খোঁজ করতে এসে এই কাণ্ডটা করেছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও তপনকাকু প্রায় কোনওদিনই খুব একটা কিছু বলতেন না। বলতেন, ‘তুমি তোমার মতো করো, আমি যদি দেখি, আমার কিছু দরকার, আমি বলব।’

‘হারমোনিয়াম’ ছবির একটি দৃশ্যে অরুন্ধতী দেবী ও দুর্গাদাস ব্যানার্জি

প্রায় সক্কলকেই আগে থেকে চেনা। কালী ব্যানার্জী তো লেক গার্ডেনসেই থাকতেন। পায়ে হাঁটা পথ। ফলে যাতায়াত লেগেই থাকত। শুটিং না থাকলে দুপুর কিংবা রাতের খাওয়া অনেক দিনই একসঙ্গে সারতাম আমরা। মায়ের প্রথম ছবি ‘অযান্ত্রিক’-এ তো কালীকাকুই মূল অভিনেতা! কালীকাকুর মেয়ে পিয়ানো বাজাতেন। সেই পিয়ানো দেখে, আমারও খুব শখ হয়েছিল শেখার। তখন আমাদের বাড়িতেও পিয়ানো এসেছিল। তখন আমার বোধহয় ৭-৮ বছর বয়স!

‘অযান্ত্রিক’ ছবিতে কালী ব্যানার্জি

কী আনন্দ করে যে শুটিং হত। শুটিং ব্রেকে অনেক গল্প করতেন সন্তোষ দত্ত। তিনি তো ক্রিমিনাল লইয়ারও, বাংলায় যাকে বলে ফৌজদারি উকিল– সেই আশ্চর্য সব অপরাধের গপ্প বলতেন। আমরা সব চোখ বড় বড় করে সেসব শুনতাম।

তপনকাকু অনেকটা সময় নিয়ে শুটিং করতেন। আমার সঙ্গে চুক্তি ছিল এই সমস্ত দিন কোনওভাবেই অন্য কোনও অভিনয়ের কাজ করা চলবে না। বলেছিলেন, ‘তুমি যখন ফ্লোরে ঢুকবে, ভাববে তুমি মন্দিরে ঢুকেছ। তখন আশপাশের সব কিছু তুমি ভুলে যাবে। বিয়েবাড়ি-জন্মদিনের নেমন্তন্নে দেরি হচ্ছে কি না, সেসব ভাববে না। শুটিং করতে এসেছ, অভিনয়ে মন দাও।’ ঠিক বলে বোঝাতে পারব না, একথা আমাকে কী পরিমাণ অভিনয়ের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। ‘হারমোনিয়াম’-এর শুটিং চলতে চলতেই আমাকে বলেছিলেন, ‘কাজটা তুমি বেশ ভালোই করছ, সেইজন্য পরের ছবিটাও ভেবেছি তুমি করবে!’ পরের ছবি– ‘এক যে ছিল রাজা’তেও আমি সত্যিই ছিলাম।

পত্রিকায় ‘হারমোনিয়াম’ ছবির বিজ্ঞাপন

তপনকাকু যতটা নরম ছিলেন, অরুন্ধতী দেবী ততটাই কঠিন। পারমিশনের জন্য তাই সবসময় অরুন্ধতী দেবীর কাছেই যেতাম। শুটিংয়ের সময়, অনেকবারই তপনকাকুকে দেখেছি, অরুন্ধতী দেবীকে জিজ্ঞেস করতে, ‘দেখো তো, এটা ঠিক হচ্ছে তো?’

ছবির শুটিং শেষ হয়েছে। ডাবিং পরে হত। কিন্তু তপনকাকু যোগাযোগ রাখতেন। একবার তপনকাকু ডেকে পাঠালেন। কী ব্যাপার! রেকর্ডিং হবে। গান গাইবেন ছায়া দেবী! এখন এইসব ভাবলে নিজেকে যে কী সৌভাগ্যবতী মনে হয়!

‘হারমোনিয়াম’ ছবির প্রচারপত্র

‘হারমোনিয়াম’ অবশেষে রিলিজ করল। প্রচারের দায়িত্ব নিলেন অরুন্ধতী দেবীর সংস্থা। পোস্টারে আমার একটা ছোট্ট ছবি। ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’– আমার প্রথম সিনেমার পোস্টারেই তো বড় করে ছিল আমার ছবি। দ্বিতীয় ছবির পোস্টার দেখে তাই খানিক দুঃখ দুঃখ ভাব। দিন ১৫ বাদে, হঠাৎ করে খবরের কাগজে প্রকাশ পেল এশিয়ান দেশগুলোর থেকে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছি আমি! ‘গোল্ডেন ক্রাউন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছি আমি। তপন সিন্‌হা ‘সিলভার ক্রাউন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন ‘হারমোনিয়াম’-এর সংগীতের জন্য। ১৫ দিনের মধ্যে হারমোনিয়ামের পুরো ব্যাপারটাই গেল বদলে। দর্শকের তুমুল ভিড় সিনেমা হলে! জীবনটাও দুম করে বদলে গেল।

সোনালী গুপ্ত

শুধু একটা মনখারাপ থেকে গেল। শান্তিনিকেতন থেকে ফেরার পথে, তপনকাকু বলেছিলেন, ‘‘জয়দেবের মেলায় যাচ্ছি। ‘মন বলে আমি মনের কথা’ গানের শুটিং হবে। চলো তুমি আমার সঙ্গে। কাজল, তুমি যাবে?’’ মা বললেন, ‘না।’ তপনকাকু আবার বললেন, ‘বাবুই যাবে?’ মা আবারও বললেন, ‘না।’ ওই যে– শুরুতেই বলেছিলাম– অভিনয়ে এসে পা পিছলে না যায় মেয়ের, তাই সারাক্ষণ তক্কে তক্কে থাকতেন মা।

‘হারমোনিয়াম’ ছবির রেকর্ড কভার

‘হারমোনিয়াম’-এর ৫০ বছর হল। কত স্মৃতি মনে পড়ল, কত পড়ল না। ফাঁকা শান্তিনিকেতনে আমাদের দৌড়ে বেড়ানো, বলাইকাকুর বকাঝকা, গান গাওয়া, কাগজে কাগজে ছবি-সাক্ষাৎকার– এসবেরও তো ৫০ বছর হল তবে? এত দিন কোথা দিয়ে চলে গেল?

পুরনো সেই হারমোনিয়ামের ডালা খুলে হাসি-ঠাট্টার পাশে, অনেকটা মনখারাপ, বিষণ্ণতাও। অনেকেই যে নেই আজ। নেই তপনকাকুও। তাঁর মৃত্যুদিনে, আমার প্রণাম রইল এই লেখায়।

……….
লেখার সঙ্গে ব্যবহৃত ছবিগুলি অভিনেত্রীর সূত্রে প্রাপ্ত