
আশা, মানুষের একধরনের ডিফেন্স মেকানিজম। মানুষের আত্মপ্রেরণা। মানুষের নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার এক ভিটামিন। কিন্তু নতুন যে, বা যা, তা আশার উপর দাঁড়িয়ে নেই। বরং এই নতুন আমাদের মনে নতুন কোনও আশার জন্ম দিতে পারে। ‘আশা’ এক ধরনের ন্যারেটিভ, এক ধরনের আখ্যান, যা আমরা নিজেদের মনে তৈরি করি। কখনও তা বাস্তবে হয়, কখনও তা হয় না। তাই নতুনের দিকে আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে এক শিশুর মতো বিস্ময়ে।
গ্রাফিক্স: দীপঙ্কর ভৌমিক
তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে। লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কে না জানে, একই নদীতে দু’বার স্নান করা যায় না। প্রতিটি মুহূর্ত সেই যে ছেড়ে যায় আমাদের, আর কখনও-ই ফেরত আসে না। সে যে শুধু আমার কাছে ফিরে আসবে না, তা-ই নয়, সে কারও কাছে ফেরত আসবে না। এমনকী, সে নিজেকেও ধ্বংস করে ফেলবে। এমন একটা অতীত অন্ধকারে চলে যাবে, যেখানে আমরা আর যেতে পারব না। থাকবে শুধু স্মৃতিতে। অর্থাৎ, আমরা চাই বা না-চাই, নতুন আসবেই। শেলি লিখেছিলেন, ‘ইফ উইন্টার কামস ক্যান স্প্রিং বি ফার বিহাইন্ড?’ এ কি আমাদের আশা, না কি এ এক সত্য, অমোঘ সত্য, যে স্থির কিছুই নয়, সবই পরিবর্তনশীল। যে ঘাটে বসে আমি নদীর প্রবাহের দিকে তাকিয়ে আছি, সে তো নিত্য পরিবর্তনশীল। একটি নদী যেমন আসলে একটি নদী নয়, অসংখ্য নদী, ঠিক তেমন, কোনও রাস্তাও আর ঠিক সে রাস্তা নয়। সে-ও পরিবর্তনশীল। ধরুন, একই রাস্তা দিয়ে রোজ যেমন আমি যাই, আপনিও যান। আরও ১০০ জন সেই রাস্তা দিয়ে যায়। রাস্তাটির সঙ্গে আমার বা আমাকে বাদ দিয়ে আপনার বা আপনাকে বাদ দিয়ে আরও শয়ে শয়ে মানুষের যাপন কিন্তু ভিন্ন রকমের। একই রাস্তা আমার কাছে দুঃখের হতে পারে, আবার সে-ই রাস্তাই হতে পারে কারও কাছে এক গোপন সুখের স্মৃতি। আমরা আপাতভাবে ভাবি, দেখতে তো পাচ্ছি না কিছুই। বদলে তো যাচ্ছে না কিছু। সেই তো একই রাস্তা, একই দোকান, একই মানুষ। সেই তো একই নদী। কিন্তু খতিয়ে ভাবলে হয়তো বুঝতে পারতাম, কিছুই এক নেই। যা দেখছি, তা আসলে আমি আগে দেখিনি, যদিও তার নতুনত্ব আমার চোখে ধরা দিচ্ছে না।

এত কথা বলার একটাই কারণ। জগৎ নিত্য পরিবর্তনশীল। সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড প্রতি মুহূর্তেই পরিবর্তনশীল। ওই যে শুকনো পাতাটা বাতাসে ঘুরতে ঘুরতে পড়ল গাছ থেকে মাটিতে, এই ঘটনাটি আর কখনও ঘটবে না। আবার নতুন কোনও শুকনো পাতা ঝরে পড়বে মাটিতে। কিন্তু তা আগের পাতাটির ঝরে পড়ার মতো না। তাহলে, আমরা চাই বা না-চাই, আশা করি, বা না-করি, এই মুহূর্তের পরের মুহূর্তটিই নতুন হয়ে আমার কাছে আসছে। সে কেমন হবে, তা জানি না। এখানেই জীবনের মজা। জীবন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত এবং প্রতি মুহূর্তে অপ্রত্যাশিত সব অভিজ্ঞতার সামনে আমাদের নিয়ে আসে। এবার আমাদের আশা কেমন হয়? আমরা ভাবি, ইতিবাচক কিছু ঘটবে নিশ্চয় আগামী বছরে। সামনের দিনগুলিতে নিশ্চয় যা চাইছি, তেমন একটা কিছু হবে। স্বপ্নপূরণ হবে। ভগবান মুখ তুলে তাকাবেন। যুদ্ধ থেমে যাবে। মানুষ মানুষকে অপমান করা বন্ধ করবে। আচমকা একজন ফ্যাসিস্ট লিডার হয়ে উঠবেন মাদার টেরিজার মতো মানবিক। কিন্তু যা কিছুই ভাবি না কেন, তা আমাদের প্রেক্ষিত থেকে ভাবি। আমাদের প্রেক্ষিত, আমাদের ভাঙাচোরা জীবনের ধ্বংসস্তূপ কিংবা আমাদের এতোলবেতোল স্বপ্নগুলো দিয়ে ভাবি, নতুন আসবে আমাদের জীবনে। বাঁচার একটা সপ্তাহ পাব। মাথা তুলে দাঁড়ানোর মতো পাব সজ্জন, ভদ্র, মানবিক একটা পরিবেশ। সবই আমাদের প্রেক্ষিত থেকে ভাবি। শাসক শাসকের প্রেক্ষিত থেকে ভাবেন। শাসিত তাঁর প্রেক্ষিত থেকে ভাবেন। চাবুকও, চাবুকের প্রেক্ষিত থেকে ভাবে নিশ্চয়ই। হাতিয়ার ভাবে, বিশ্রাম দরকার। সৈন্য ভাবে দুশমনকে টার্গেট করতে পারব। দুশমন ভাবে উল্টোদিকের দুশমনকে মেরে ফেলব এবার। আবার যুদ্ধক্ষেত্র ভাবে, এত লাশের বোঝা আমার বুক থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে নিশ্চয়ই। থমথমে উপত্যকা ভাবে কিছু শব্দ প্রয়োজন। সাইকেডেলিক নাইটক্লাব ভাবে নতুন কোনও সংগীত দরকার, কিংবা চরম নীরবতা। ক্লান্তি ভাবে, বিশ্রাম পাব। বিশ্রাম ভাবে নতুন কোনও কাজের কথা। কিন্তু আগামী কেমন ভাবে তাদের জীবনে আসবে, তা কেউই জানে না। সবাই আশা করে। আসলে তো সময় বলে কিছু নেই। আছে এক মুহূর্ত থেকে অন্য আরেক মুহূর্তের ব্যবধান। এই ব্যবধানকে আমরা ভুলে গেলেই আর নতুন কোনও বছর আসবে না ক্যালেন্ডারে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। তাই ক্যালেন্ডারে নতুন বছর আসুক বা না আসুক, জীবনের অপ্রত্যাশিত অনিশ্চয়তা নতুনকে হাজির করবেই। শুধু সেই নতুন আমার প্রেক্ষিত থেকে ইতিবাচক না নেতিবাচক হবে, নতুনের সে সব ভাবার কোনও দায় নেই।

তবে কি আশায় মরে চাষা? কিন্তু আশা না করলে আমরা বাঁচব কী নিয়ে? আশা না করতে পারলে, মানুষ তো বেঁচে থাকার প্রেরণাই পাবে না। কারণ মানুষ তো ভাবে তার জীবনে যা কিছু ঘটছে, সব ঘটনাগুলির মধ্যে একটা কার্যকারণসূত্র আছে। মানুষ তো এ কথা মেনে নিতে পারে না, যে মুখ তুলে তাকানোর মতো কোনও ভগবান নেই। কোনও বিশ্বজনীন শক্তি তার ভালো থাকার জন্য পিয়ানো বাজাবে না। কেউ সাইকেল চালিয়ে এসে বলবে না, আমিই সে গোডো, যার জন্য তুমি প্রতীক্ষা করছিলে। যদি জীবনে এই সুতোটা না থাকে, তাহলে প্রতিটি মুহূর্তের দিকে মানুষ অসহায় তাকিয়ে থাকবে। আসলেই যে সে অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছে প্রতিটি মুহূর্তের দিকে, জীবনে যা কিছু ঘটছে তার, তার আদৌ কোনও কার্যকারণসূত্র নেই, একথা ভাবলেই পাগল হয়ে যাবে। এই গণপাগলামি আসার চেয়ে বরং আশা নিয়ে থাকা ভালো, কারণ তার চাওয়া বা না চাওয়া– নিরপেক্ষভাবেই নতুন আসবে। হয়তো সেই নতুন তার ভালোই করবে। আবার সে নতুন তার জীবনকে ওলটপালট করে দেবে। আমাদের জীবনে তো এমনই সব নতুনের মুখোমুখি হতে হতে আমরা জীবন কাটাই। শেষ মুহূর্ত অবধি আমরা ভাবি, কাল থেকে ঠিক পালটে যাব দেখে নিবি তোরা।

আশা, মানুষের একধরনের ডিফেন্স মেকানিজম। মানুষের আত্মপ্রেরণা। মানুষের নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার এক ভিটামিন। কিন্তু নতুন যে, বা যা, তা আশার উপর দাঁড়িয়ে নেই। বরং এই নতুন আমাদের মনে নতুন কোনও আশার জন্ম দিতে পারে। ‘আশা’ এক ধরনের ন্যারেটিভ, এক ধরনের আখ্যান, যা আমরা নিজেদের মনে তৈরি করি। কখনও তা বাস্তবে হয়, কখনও তা হয় না। তাই নতুনের দিকে আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে এক শিশুর মতো বিস্ময়ে। শিশু কোনও আশা করে সামনের দিকে তাকায় না। যা আসছে তাকে চোখ ভরে দেখে, শেখে। কিন্তু মানুষ যত বড় হয়, যত প্রত্যাশা তার মনের মধ্যে তৈরি করে আকাশকুসুম, তত সে জটিল হতে থাকে। সময়কেও, সে তৈরি করে নিজের ইচ্ছের মাপকাঠিতে। যেন আশার বালি দিয়ে সে এক একটা বালির স্বর্গ বানিয়ে তুলছে সৈকতে। আর নতুন আসে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো।
তা বলে কি আশা করব না আমরা? আশা না করে থাকতেই পারব না। মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও তো মানুষ আশা করে পুনর্জন্মের। নতুন যে, সে তো এক উদাসীন বালক, সে তো পুরোনো হওয়ার সময়ই পায় না। তার আগেই আবার নতুন হয়ে যায়।
…………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন হিন্দোল ভট্টাচার্য-র অন্যান্য লেখা
…………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved