Robbar

আমি যখন সৃষ্টি করছি না তখনও কিন্তু সৃষ্টির কাজ চলছে, বলেছিলেন শর্বরী রায়চৌধুরী

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 21, 2026 6:55 pm
  • Updated:January 21, 2026 6:55 pm  

শর্বরী রায়চোধুরীর বলেছিলেন, ‘কেউ কেউ আমার কিছু কাজ দেখে বলেছেন যে, ওই কাজ চোখের সামনে রেখে ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক বাজতে থাকলে একটা সিংক্রোনাইজেশন হয়।’ অর্থাৎ ‘কোনো ছবি বা ভাস্কর্য সংগীতের সঙ্গে ওইভাবে রিলেইট করবে সেটা নির্ভর করে ছবি বা ভাস্কর্যের স্টাইলের সঙ্গে। তার মানে সৃষ্টির আঙ্গিকের সঙ্গে ওই ধর্মের একটা মিলন হল, বলা যায়। আর এরই মধ্য থেকে শিল্পী পেয়ে যান ভিন্ন এক লিরিক্যাল ইশারা, সেই প্রশ্ন নিয়ে, ভিন্ন কোনও কৌতূহল নিয়ে, জীবনের মধ্যেই ভিন্ন কোনও অভিব্যক্তি, ভিন্ন কোনও সৃষ্টির উৎস।

শুভ চক্রবর্তী

শিল্পীর ভেতর যন্ত্রণা আছে বলেই তো সৃষ্টি হচ্ছে। ‘নো ক্রিয়েশন ইজ পসিবল উইদাউট পেইন’– এইরকম একটি কথা বলেছিলেন শিল্পী শর্বরী রায়চোধুরী শিল্পভাবনার বিষয়ে বলতে গিয়ে । অনেক দিন আগে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টির এমন অনেক মুহূর্তকে আমাদের সামনে এনেছেন, যা এখনও ভাবতে গিয়ে বিস্ময় জাগে মনের দোরগোড়ায়। ১৯২০ সাল, আহমেদাবাদে একটি প্ৰবন্ধ পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, শিরোনাম ছিল তার: ‘construction versus creation’। রবীন্দ্রনাথ বোঝাতে চেয়েছিলেন আমাদের ব্যক্তিগত জীবনচর্যায়, কীভাবে এবং কোথায় সৃষ্টির চেয়ে নির্মাণকে বড় করে দেখি। বলেছেন, সৃষ্টির আনন্দ ও দুঃখের মধ্যে এমন একটা সামঞ্জস্য আছে– যা আমাদের চেতনার সত্যকে আবিষ্কার করে। এই সত্যই আমাদের সামগ্রিক সৃষ্টির প্রবাহ। কিন্তু কেউ কেউ তো এ-ও প্রশ্ন করতে পারেন ওই কথার সূত্র ধরে, একজন শিল্পীর সৃষ্টি কি নির্মাণের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সত্যের যন্ত্রণার প্রবাহ নয়? এ-কথা যে সত্য নয়, তা নয়, বরং আমাদের শিল্পসৃষ্টির অভিজ্ঞতায় জড়িয়ে আছে নির্মাণ ও সৃষ্টির যন্ত্রণা। কেউ যদি তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিদিনের আনন্দ ও যন্ত্রণাকে নির্মাণ এবং সৃষ্টির সঙ্গে মিলিয়ে ভাবেন, তাহলে? এটা ঠিকই যে কখনও কখনও উপাদান ও তার প্রকাশের ধরনের উগ্রতায়, বিচ্ছিন্নতায়, ভিন্নতাকে প্ৰকাশ করতে গিয়ে উপাদানই বড় হয়ে ওঠে, এ হল নির্মাণের অহংকার। একথার সূত্র ধরে যদি শর্বরী রায়চৌধুরীর শিল্পচর্যার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, তাহলে স্পষ্ট হবে ‘সৃষ্টির যন্ত্রণা’ এক অর্থে সামগ্রিক ‘আমির বোধ’। কেননা এই বোধই হয়ে ওঠে শিল্পীর বিশ্বগত আমির সৃষ্টি, আর এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে শর্বরী রায়চোধুরী বললেন, ‘আমি যখন সৃষ্টি করেছি না তখনও কিন্তু সৃষ্টির কাজ চলছে।’

ভাস্কর শর্বরী রায়চোধুরী

এইভাবে কি আমরা ভাবতে পারি এখন? ভাবতে পারি না যে তা নয়, বরং ওইরকম করে ভাবতে গিয়ে আমরা তাঁর জীবনচর্যার এমন এক মুহূর্তের সামনে এসে দাঁড়াই যেখানে তাঁর সাধনার আমি ও শিল্পের আমি মিশে গিয়ে হয়ে উঠছে ভিন্ন এক শিল্পবোধ, শিল্পী নীরবতার মধ্যে আত্মস্থ করতে চাইছেন বিশ্বআমির বোধ, ভিন্ন ভিন্ন উপাদানে জড়িয়ে নিতে চাইছেন সেই আমিকে। আর সেইজন্যই আমরা কত ভাঙাগড়া, কত অভিঘাতে ভিন্নতাকে প্ৰকাশ করতে গিয়ে কত কিছু করি, যাকে অনেক ক্ষেত্রে ‘অ্যাকসিডেন্ট’-ও বলা যায়, বলা যায় ওই হচ্ছে স্রষ্টার অবচেতনে সৃষ্টির আমির প্ৰকাশ। তারই মধ্য দিয়েই সারা পৃথিবীতে এত রকম আর্ট সৃষ্টি হচ্ছে।

এই হল শিল্পের সামগ্রিক ‘আমি’র বোধ, এই বোধ কীভাবে আমাদের জীবনচর্যায় উত্তরণের আধার হয়ে ওঠে? এই প্রবাহই বিশ্বগত ‘আমি’র ইনস্পিরেশন? জীবনের মধ্যবয়সে এসে যাকে শর্বরী রায়চৌধুরী বলবেন: ‘এই-যে একটা ফর্ম-এর অনুভূতি, এটা কতভাবে সৃষ্টির মধ্যে প্রবেশ করে, বা এক্সপ্রেশন পায়’। আর এই এক্সপ্রেশন আসে মনের নিচুমহলের ছাড়পত্র পেয়ে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ে, যে রূপ অল্পে অল্পে হয়ে উঠেছে সামগ্রিক আমির অংশ, সে সৃষ্টির আমি। তারই একটা আকার পাই আমরা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে। যাকে তিনি স্পর্শ করতে পারেন তাঁর সামগ্রিক জীবনচর্যায়, একদিন সে কথাই তো তিনি বলেছিলেন আমাদের: ‘আমি পরিষ্কার দেখতে পাই যে আমাদের মূর্তি বা ছবির যেমন আকার আছে তেমনই সংগীতেরও আকার আছে।’ এইখানে এসে হয়তো-বা আমরা আমাদের শিল্প ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর ওইরকম বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার একটা অবকাশ পেতে পারি, মনে হবে, তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে প্রচ্ছন্ন কোনও যোগ আছে হয়তো-বা। কেননা তাঁর সৃষ্টির সামনে দাঁড়ালে মনে হয় যেন প্রচ্ছন্ন কোনও বেদনার মতো স্রোত বয়ে চলেছে নির্জন মনের উপর দিয়ে, সমগ্রজীবন বোধের ওপর দিয়ে যেন নেমে আসছে হিমশীতল ভিন্ন এক অন্তর্দ্বন্দ্ব।

গুরু প্রদোষ দাশগুপ্তের সঙ্গে শর্বরী রায়চৌধুরী

কিন্তু কখনও কখনও এ-ও মনে হয় তাঁর সৃষ্টির প্রচ্ছন্ন আঙ্গিক ওইরকম এক সুরে বাঁধা, তার একপাশে ছিল বিশ্বগত আমির আমি আর অন্যপাশে তাঁর ব্যক্তিগত আমি। ‘ভাস্কর্যের নীরবতা’ আর ‘সংগীত’– কথাদু’টি পাশপাশি থেকে যেন কোনও বৈপরীত্যের সামঞ্জস্য তৈরি করেছিল তাঁর শিল্পজীবনের আধারে। নিজের সঙ্গে নিজের একটা বোঝাপড়াই ছিল না কি তাঁর সামগ্রিক শিল্পীজীবনের বোধ? আর এই বিপরীত অভিঘাতে গড়ে-ওঠা তাঁর সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে ওই একই সামঞ্জস্য, যেখানে সুরের নীরবতাও ভাষা পেয়ে যায় ভিন্ন ভিন্ন নাটকীয় মুহূর্তের আভায়। আমরা দেখতে পাব ওই একইরকম অভিব্যক্তি ও নাটকীয় মুহূর্তের সুর তাঁর মধ্য বয়সের সূচনা পর্বে প্রতিকৃতি ‘অজন্তা’য়, আর এই অভিব্যক্তির ধ্যানমগ্ন নীরবতায় ধরা আছে সহজ এক সুর, জীবনচর্যার ভিন্ন এক আবেগের মুহূর্ত; দৃষ্টিই এখানে হয়ে ওঠে ভিন্ন এক পরম্পরা; মুখের অবয়বে কোথাও-বা জমে আছে বিশ্বগত আমির বিশ্বাস; আবার ‘কোথাও বেদনার মতো বেজে চলে সবসময়,’ কিন্তু এই প্রতিকৃতিই যে তার একমাত্র প্ৰকাশ ধর্মের আঙ্গিক তা কিন্তু নয়। এর আগেও তিনি এইরকম নারী প্রতিকৃতির ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তির সত্যকে প্ৰকাশ করেছেন নানা আঙ্গিকে। তাঁর শিল্পী জীবনের সূচনাপর্বের দিকে ফিরে গেলে এইরকমই একটি প্রতিকৃতির কথা আমাদের মনে পড়বে– সিদ্ধেশ্বরী দেবীর মুখের সেই অভিব্যক্তির গভীর আভায় যেন লেগে রয়েছে ভিন্ন এক মগ্নতা, অথবা সেই মুহূর্তের সত্যকে প্ৰকাশ করবার তীব্র কোনও অনির্বচনীয় অনুভূতি। আর, এইরকমই এক প্রতিকৃতির হয়ে ওঠার প্রসঙ্গে শর্বরী রায়চৌধুরী বললেন: ‘আলি আকবর খাঁ সাহেবকে এমনিতে বসে থাকতে দেখলে তো মনে হয়, যে-কোনও একজন সাধারণ লোক। কিন্তু যতবারই ওঁকে ওই সরোদ নিয়ে বলতে দেখেছি, মনে হয়েছে, বুদ্ধ ভগবানকে দেখছি।’

আলী আকবর খাঁ এবং শর্বরী রায়চৌধুরী

অর্থাৎ আলি আকবরের মূর্তিতে ওরকম একটা ধ্যানস্থ ভাব তিনি ধরে রাখতে চাইলেন তাঁর শিল্পী সত্তার উত্তরণে, কিন্তু এইটেই যে তাঁর অভিজ্ঞতার আলোয় ভরাট এক প্রত্যয়ের অনুভব তা নয়, অথবা একমাত্র পথ হয়ে উঠবে তাঁর প্রতিদিনের আবরণে, বরং বলা যায়, একজন শিল্পীর ওইরকম এক ধ্যানমগ্নতা অভিব্যক্তি যে, তাঁর জীবনচর্যারও একটা উপায় হয়ে উঠছে, তা আমরা টের পেয়েছিলাম অনেক আগেই, এইরকম ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ধরা আছে তাঁর প্রথম দিকের কাজে। বোঝা যায়, কেন তিনি ওই মূর্তি গড়ার সময় বারবার হারিয়ে ফেলছিলেন তাঁর সেই ধ্যানমগ্নতা ভাব,আর এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলবেন– ‘কিন্তু আমি তখন গোলমালে পড়ে গেছি। যে-চেহারা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি, সেই চেহারা তো পাচ্ছি না। চার-পাঁচ দিন চলে যাওয়ার পর আমার খুব করুণ অবস্থা। আমি কেবলই ভাবছি, আমি কী করে বলি, আপনি একটুখানি বাজান।’ কেউ কেউ ভাবনার অবয়ব টেনে প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে কি শর্বরী রায়চৌধুরী সৃষ্টির ওই মুহূর্তকেই ধরতে চেয়েছেন? যেখানে সংগীত শুধু আর সংগীত নয়, সেই সংগীতের বিমূর্ত রূপ আমাদের প্রতিদিনের জীবনের আত্মপ্রতিকৃতি হয়ে উঠছে, এ-প্রশ্নের মধ্যে যে ভিন্নতা নেই তা নয় বরং এটাই সহজ একটা উপায় আমাদের কাছে শিল্পী শর্বরী রায়চোধুরী-র ভিন্নতাকে জানার, তাঁর শিল্পের নিবিড়তাকে স্পর্শ করার। তিনি নিজেই তো বললেন তারপর ‘আলি আকবরের মিউজিক আমাকে সারা জীবন এত সুখ দিয়েছে, তাঁর মিউজিকে এত ইনস্পায়ার্ড হয়েছি, ওই রকম রস আমি খুব কম লোকের মিউজিক-এ পেয়েছি।’ আর যখন সেই শিল্প উপলব্ধির যখন তখন শিল্প ও শিল্পী এক অর্থে দুই ভিন্ন ভিন্ন আধার। কিন্তু এই অর্থে কি তাহলে সংগীত তাঁর শিল্পে উপাদান হয়ে ফিরে আসছে? কেউ কেউ একটু এগিয়ে গিয়েও ভাবতে পারেন শর্বরী রায়চৌধুরীর ভাবনার আঙ্গিক, অর্থাৎ তাঁর শিল্পবোধের ভিন্নতাকে স্পর্শ করতে আমাদের চাই তাঁর সৃষ্টির উপলব্ধির অভ্যাস। কেননা একদিন সেই কথাই তো তিনি বলবেন– ‘‘এখন ‘আধার’ অর্থে যদি কেউ মনে করেন তা শুধুমাত্র উপাদানের, তাহলে হয়তো ভুল হবে, উপলব্ধির আশ্রয়ের আধার হচ্ছে ওই শিল্প– যাকে আমরা দেখতে পাই কিন্তু যা দেখতে পাই না তার কি কোনও আধার নেই? আছে, কীভাবে আছে, কেমন করে আছে সেইটা একটা অভ্যাস। আর এই অভ্যাসই তো আমাদের নিয়ে যায় শিল্পের সমগ্রতার সত্য, এই সত্য উপলব্ধিই একজন শিল্পীর সমগ্র জীবনের সঞ্চয়, আর শিল্পীর জীবনে এই সঞ্চয় গুরুত্বপূর্ণ এক বোধের জন্ম দেয়।’’

আলি আকবর খানের প্রতিকৃতি, ব্রোঞ্জ, ১৯৬৭

এইরকমই এক ভিন্ন প্রসঙ্গে ভ্যান গগকে লিখতে হয়েছিল ‘যদিও আমি প্রায়শই দুঃখের গভীরে থাকি, তবুও আমার ভিতরে প্রশান্তি, বিশুদ্ধ সমন্বয় এবং সংগীত রয়েছে।’ এই সংগীত সমন্বয়ই হচ্ছে উপলব্ধির বিমূর্ত রূপ, আর এই কারণেই হয়তো ভ্যান গগ তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমি আমার শিল্প দিয়ে মানুষকে স্পর্শ করতে চাই। আমি তাদের বলতে চাই তিনি গভীরভাবে অনুভব করেন, তিনি কোমলভাবে অনুভব করেন।’ আর এই সমন্বয়ের সাধনাই শর্বরী রায়চৌধুরীর জীবনচর্যার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ভিন্ন এক শিল্প-সমন্বয় হয়ে উঠেছে তাঁর সামগ্রিক সৃষ্টির বিশ্বগত আমির সমন্বয়। এই শিল্প সমন্বয়ই তাঁর সৃষ্টি সত্তার ভিন্ন এক স্বরূপ। যেখানে আমি আর একা নই, সমগ্রতাই সেই আমির একান্ত, সমস্তের মধ্যে আমির অংশ এই ধারণার জন্ম হয়, কারণ এই সত্যকে উপলব্ধি করাই হচ্ছে শিল্পের অস্তিত্বকে উপলব্ধি করা। হয়তো এই কারণেই নিৎসেকে লিখতে হয়েছিল ‘এই অবস্থায় একজন তাঁর নিজের পূর্ণতা থেকে সবকিছুকে সমৃদ্ধ করে’, কিংবা ‘যখন কেউ তা অনুভব করেন, অথবা উচ্ছ্বসিত হন, টানটান, শক্তিশালী, শক্তিতে ভারাক্রান্ত হন। এই অবস্থায় একজন মানুষ তার ক্ষমতার প্রতিফলন না হওয়া পর্যন্ত জিনিসগুলিকে পরিবর্তন করেন– যতক্ষণ না সেগুলো তার পরিপূর্ণতার প্রতিফলন হয়। এই ধারণাকেই পরিপূর্ণতায় রূপান্তরিত করতে হয়– সেটাই শিল্প।’ কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তিনি এমন এক ক্ষমতাকে প্ৰকাশ করবেন যা আমির অহংকার।

মধ্যমণি রামকিঙ্কর বেইজ, সস্ত্রীক শর্বরী রায়চৌধুরী

তাহলে? ‘একজনকে ভালবাসতে শিখতে হবে।– সংগীতে আমাদের সঙ্গে এই বিষয়টিই ঘটে,’ এই ভালোবাসাই তো আমাদের মনে গভীর এক প্রত্যয়ের জন্ম দেয়, আর একজন শিল্পী এই জীবনকেই বিশ্বাস করেন, বুঝে নিতে চান তাঁর সমগ্র জীবনের নীরবতার ভাষা দিয়ে: ‘প্রথমে একজনকে একটি ছবি এবং সুর শুনতে শিখতে হবে, ভিন্নতাকে বোঝার জন্য, শনাক্ত করতে এবং আলাদা করতে, অন্য কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করতে এবং একটা সম্পূর্ণ আলাদা জীবন হিসাবে সীমাবদ্ধ করতে হবে; তারপরে তার বিস্ময় সত্ত্বেও সহ্য করার জন্য কিছু পরিশ্রম এবং সদিচ্ছা প্রয়োজন, তার গঠন এবং অভিব্যক্তিতে ধৈর্যশীল হওয়া এবং অদ্ভুত সম্পর্কে সম্পর্কে সদয় হওয়া– অবশেষে এমন একটি মুহূর্ত আসে যখন আমরা এর মধ্যে অভ্যস্ত হয়ে যাই, যখন আমরা তার জন্য অপেক্ষা করি, যখন আমরা অনুভব করি যে, তার অনুপস্থিত থাকলে আমাদের মন অস্থির হয়ে ওঠে। এখন সে আমাদেরকে নিরলসভাবে বাধ্য করে, মন্ত্রমুগ্ধ করে যতক্ষণ না আমরা তার নম্র এবং আনন্দিত প্রেমিক হয়ে উঠি– যাঁরা এর চেয়ে ভালো আর কিছুই চায় না। শুধু সংগীতে নয় আমাদের সঙ্গে যা ঘটে, এভাবেই আমরা এখন ভালোবাসি এমন সব জিনিসকে ভালোবাসতে শিখেছি। শেষ পর্যন্ত সবসময় আমাদের ইচ্ছা, আমাদের ধৈর্য, ​​ন্যায়পরায়ণতা, ধীরে ধীরে, তার আবরণ খুলে ফেলে এবং একটি নতুন এবং অবর্ণনীয় সৌন্দর্যে পরিণত হয়।’ সবসময়ই যে একজন শিল্পীর জীবন এমন গাঢ় ও বিশুদ্ধ আমির প্ৰকাশ পাবে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে, তা হয়তো নয়। সবসময়ই যে, তাঁর আবরণ ভেঙে প্রকাশ্যে কিছু বলবেন এমনটাও নয়, বরং তিনি তাঁর বিশ্বগত আমির মধ্যেই আবিষ্ট হয়ে ভিন্নতাকে প্ৰকাশ করেন।

মায়ের সঙ্গে খেলার স্মৃতি ফুটে উঠেছে ভাস্কর্যে

২.

হেনরি মুর যেমন বলবেন, ‘একজন ভাস্কর বা চিত্রকরের পক্ষে তার কাজ সম্পর্কে প্রায়শই কথা বলা বা লেখা ভ্রম সৃষ্টি করে।’ আর শর্বরী রায়চৌধুরী তাঁর শিল্পবোধ প্ৰকাশ করতে গিয়ে বলবেন, ‘আমি ভয় পায়। কীই-বা আছে আমার যে সবার সামনে গিয়ে দাঁড়াব?’ এর অর্থ আমরা উপলব্ধি করতে পারব যদি আমরা তাঁর জীবনচর্যার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, আর তার পরেই সেই কথার সুতো ধরে এসে পড়বে ভিন্ন এক কথা, ‘আসলে নিজের সঙ্গে থাকা নিজেকে জানা এটাও তো খুবই প্রয়োজন আমি নিজেকে জানি না অথচ অন্যকে জানি বলে প্ৰকাশ করছি সে তো মিথ্যা।’ এই কথার সূত্র ধরে আরও একটু এগিয়ে গিয়ে বলবেন, ‘আমি এখনও রাস্তায় পুকুরের ধারে যদি শ্যাওলা দেখি দাঁড়িয়ে পড়ি। দেখি কেমন করে তার রপের মধ্যে কত কী আয়োজন চলছে। কত সৃষ্টি এই জগতের।’ আর আলবার্তো জ্যাকোমেট্টি অনেক আগে ওই একই কথা কিছুটা ভিন্ন স্বরে আমাদের বলেছিলেন, ‘আমি যত বেশি কাজ করি, ততই আমি জিনিসগুলিকে ভিন্নভাবে দেখি, অর্থাৎ, প্রতিদিন সব কিছুই মহিমা অর্জন করে, আরও বেশি অজানা, আরও বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে’ তখন। অর্থাৎ ‘একটা বোধ যা আমাকে সবসময়ই উৎসাহে পূর্ণ করে, তা হল চেষ্টা করা, সবকিছু সত্ত্বেও, সেই দৃষ্টিভঙ্গির কাছাকাছি যাওয়ার যা প্রকাশ করা এত কঠিন বলে মনে হয়।’ কিন্তু ‘বাইরে থেকে যারা দেখে তারা কে জানবে ভিতরে একটা সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলছে’– এ-কথা আমাদের বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ– ‘সৃষ্টির কি আমারই মনের মধ্যে আরম্ভ আমারই মনের মধ্যে অবসান।’ অর্থাৎ এই যে কিছু আগে বলা হল শর্বরী রায়চৌধুরীর ভিন্ন এক দেখার দেখা নিয়ে, তাঁর সংগীতের বিমূর্ত রপের প্ৰকাশ এটাই কি তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে একাত্ম হয়ে নীরবতার ভিন্ন এক রূপের প্ৰকাশ নয়? এর পরেও কি আমাদের মনে হবে, ‘বিশ্বসৃষ্টির সঙ্গে এর কি কোনও চিরন্তন যোগসূত্র নেই?’ কীভাবে বুঝব সংগীতের সে বিমূর্ত রূপের সঙ্গে নীরবতার চিরন্তন রূপটি সৃষ্টির সঙ্গে আবিষ্ট হয়ে ভিন্ন এক বিমূর্ত রূপের প্ৰকাশ করে? ‘আসলে মিউজিকের পজ (pause)-টাও মিউজিক-এর একটা অঙ্গ।’ আর এই বক্তব্যের মধ্যেই আমরা পেয়ে যাই শর্বরী রায়চৌধুরীর দেখার একটা ভিন্ন রূপের বিস্তার, যখন আমরা তাঁর সৃষ্টির ভিতরে গিয়ে সেই বিস্তারিত রূপের স্পর্শ পাই, একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয় তখন আমাদের মনের অতলে, অনেক সময় এই শূন্যতার মধ্যেই কি আমরা খুঁজে পাই না একজন শিল্পীর আমির যন্ত্রণা? নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার একটা আশ্রয় কি তখন পেয়ে যাই না আমরা? শিল্পী নিজেও কি ওইরকমই এক আশ্রয়ের সন্ধান করেন না তাঁর সমগ্র জীবনচর্যায়? আর এটাই তো স্বাভাবিক যে, একজন শিল্পীর জীবনচর্যাই হয়ে উঠবে তাঁর সৃষ্টি চেতনার ইতিহাসও, যদিও এখানে আশ্রয় এক অর্থে আমিকে জানার একটা পথও। আর, অনেক আগে, আমরা জেনেছি মিকেলাঞ্জেলো মনে করতেন, ‘একজন শিল্পী তার সবচেয়ে কঠিন কাজটি করেন যখন তিনি ফাঁকা ক্যানভাসের সামনে ফিরে আসেন এবং তিনি কী তৈরি করতে চলেছেন তা নিয়ে ভাবেন।’ আর, একই কথার ধরনে শর্বরী রায়চৌধুরী মনে করতেন যখন সেই শূন্যতা– ‘স্কাল্‌পচার বা কোনও ক্রিয়েশন-এ দেখি, অনেক সময় আমরা বসে থাকি চুপ করে, একটা শূন্যতা তৈরি হয়, আকাশে কী যেন আছে? সেটাও অনেক সময় দেখতে ভুলে যাই। আসলে কিছুই দেখি না তখন।’ অর্থাৎ, মনের ওপর মহলে তখন আমাদের চেতনার স্তরে কেউ যেন হাত বুলিয়ে যায়, ভিন্ন কোনও অভিপ্রায়ে, মনে হয়, কোনও অচেনা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছে আমাদের মন, কোথাও কিছুই নেই, স্পষ্ট করে বোঝাও যায় না তার চলাচল ‘অথচ ওইরকম তাকিয়ে থাকতেই ভালো লাগে। আমার অবচেতন মনে তখন যে-চিন্তাটা চলতে থাকে তাতে অনেকটা কাজ হয়, ব্যথার সান্ত্বনাও এনে দেয় অনেক সময়।’ এই তাকিয়ে থাকার মধ্যেই একজন শিল্পীর অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধির ভরাট প্রত্যয়ের রূপ বিমূর্ত ভাবের বৃত্তে এসে যায়। আর সেই বৃত্তকে কেন্দ্রে রেখে কেউ কেউ ধরতে পারেন সংগীতের মতো ভিন্ন এক অনির্বচনীয় রূপ, কিন্তু কেউ কেউ মনে করেন সেই সৃষ্টির রূপের স্রোতের মধ্যে এসে পড়ে আমাদেরই কোনও পুরনো অভ্যাসের জর্জরিত অভিজ্ঞতা। কিন্তু অনেকে এই অভ্যাসই আঁকড়ে ধরে থাকেন, তার কারণ কি কেবল এই যে মিথ্যার একটা চাপ লেগে থাকে তাঁদের মনের ওপর? সে কি এই কারণে যে সংগীতের রূপের সঙ্গে কোনও সামঞ্জস্যের বোধে পৌঁছাতে পারেন না তাঁরা? জীবনচর্যার অনভ্যাসের একটা স্তরে প্রতিদিনের আমির মধ্য দিয়ে মন কি কোনও বদ্ধ ধারণায় পৌঁছে যায় শেষে, ভগ্নহৃদয়ের অসাড়তায়? আর শর্বরী রায়চৌধুরী এই প্রতিদিনের অসাড়তা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখলেন তাঁর বিশ্বগত আমিকে, বরং তাঁর আত্মগত সাধনার আমিকেই এগিয়ে রাখলেন তাঁর সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে। সংগীতেই সেই সৃষ্টির ভিন্ন এক বিমূর্ত অভিজ্ঞতার আভা, তার মানে এই নয় যে, তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই সেই বিমূর্ত রূপ আমাদের প্রতিদিনের কল্পনার রূপ, বরং ভাবতে ইচ্ছে হয় যেন বিমূর্ত রূপের সামগ্রিক বোধই তাঁর সৃষ্টির একটা সহজাত ধর্ম। কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে কি সংগীতের বিমূর্ত রূপই তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ভিন্ন এক উপলব্ধি?

আত্মপ্রতিকৃতি, ব্রোঞ্জ, ১৯৫৭

‘কিন্তু আমাদের কল্পনার মধ্যে এমন অনেক কিছুই এসে যেতে পারে যা বিমূর্ত কল্পনাকে নষ্ট করে দিতে পারে।’ কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সে সত্য নয়, ‘আমার এটা বলবার অর্থ হচ্ছে সংগীত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আর এটা হয় সংগীতের মধ্যে আলাদা করে কোনও উপাদান নেই বলে কিন্তু চিত্রকলা বা ভাস্কর্যের মধ্যে এটা তখনই সম্ভব যখন ‘আমাদের মধ্যে সেই বোধ জন্ম নেয়। বলা ভালো দেখার মধ্যে একটা দেখা যখন আমাদের মধ্যে আকুল করে আঘাত করবে তখন সেই বোধের জন্ম হয়। তখন মুহূর্তে সৃষ্টির দরজা খুলে যায়, তখন আলাদা করে উপলব্ধির প্রয়োজন হয় না। তখন আমি বা ওই প্রতিকৃতি একটিই বোধ বা সামগ্রিক সৃষ্টির অংশ হয়ে যায়। কেননা সংগীতের দুঃখ যেমন আমাদের আত্মাকে স্পর্শ করে তেমনই আমাদের বোধের প্রতিকৃতিকেও বিস্তারিত করে’– সেই অভিব্যক্তি। এইরকমই এক অভিব্যক্তি মেশানো রামকিঙ্করের প্রতিকৃতির কথা মনে পড়বে আমাদের।

রামকিঙ্কর বেইজের প্রতিকৃতি, ১৯৬৪

৩.

কিন্তু আত্মগত আমির সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতেই কি বিক্ষত হতে থাকেন নিঃসঙ্গ প্রবীণ স্রষ্টা? মনে হতে পারে আমাদের, এইরকম এক প্রশ্নের সম্মুখীন হই আমরা তখন। বাইরে থেকে দেখলে ওরকমই দেখার মধ্যে আঘাত এসে যায় আমাদের মনের দোরগোড়ায়। কিন্তু ওই প্রতিকৃতির ভেতরে গিয়ে দেখলে মনের অতলে যাওয়ার দরজা খুলে যায়।

৪.

শৃঙ্খলা আর সামঞ্জস্যের প্রতিধ্বনির কেন্দ্রে পৌঁছে যায় শবর্বী রায়চৌধুরীর শিল্পবোধ, গড়ে ওঠে তাঁর সৃষ্টি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তাঁর সৃষ্টির মধ্যে লেগে আছে কোনও প্রবাহের বিরুদ্ধতা, আঘাত থেকে প্রতিঘাতের কোনও আয়োজন, বরং তাঁর সৃষ্টি হয়ে ওঠে সংগীতের সঙ্গে বিশ্বগত আমির মিলন। না হলে কেন বলবেন তিনি? ‘আমি যা খুঁজে চলেছি, তা হল মিউজিক-এর একটা রূপ-ভিস্যুয়াল মিউজিক। ওইরকম একটা কিছু পাবার জন্য এত বছরের চেষ্টায় আজ পর্যন্ত আমি কিছুই পাইনি। সেরকম কিছু পাইনি বলে বড় দুঃখ রয়ে গেছে।’ আর এই দুঃখই হয়ে উঠবে তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে ব্যক্তিগত আমির সামঞ্জস্য, কিন্তু এও সঙ্গে সঙ্গে মনে রাখতে হবে, আমাদের সেই সামঞ্জস্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে বাইরের কোনও প্রত্যাশা, আবার এ-ও ঠিক কেবলই তা ব্যক্তিগত আমির সামঞ্জস্য নয়।

বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেবের প্রতিকৃতি, ১৯৭১

‘কিন্তু কোনও একটা জিনিস দেখে বা কোনও একটা মিউজিক শুনে সেটাকে রিপ্রেজেন্ট করতে গিয়েছি, সেরকম কখনও হয়নি।’ তাহলে? কারণ তাঁর সৃষ্টির মধ্যে কোনও সংগীতের অবয়ব নেই, এটা যেমন ঠিক তেমনই বিপরীতে তাঁর সৃষ্টির ভিন্নতাকে উপলব্ধির করার একটা বোধ এই সংগীত, কিন্তু কখনওই তা সংগীত নয়, সেটা করতে গেলে আমার ভয় হয়, সে কখনও হতে পারে না। যদিও তিনি নিজে মনে করেন তাঁর কিছু কিছু কাজের মধ্যে সংগীতের স্বাদ আছে কিন্তু এই ভিন্নতাকে তিনি কখনওই তাঁর সৃষ্টির একমাত্র ভিন্নতা মনে করেন না। কারণ তিনি মনে করেন ‘আমার যতটা ফিলিং, আমার তো মনে হয়, মিউজিক-এর আসলে যে অ্যাবস্ট্র্যাক্ট স্বপ্ন সেটা আরেকটা  অ্যাবস্ট্র্যাক্ট রূপের মধ্যেই প্রকাশ করা হতে পারে।’ কিন্তু এই বিমূর্ত স্বপ্ন কোনও ব্যক্তিগত স্বপ্ন নয় বরং আমরা তাঁর সমগ্র সৃষ্টির স্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারলে বুঝতে পারব সে স্বপ্ন তাঁর আমির সঙ্গে আমির একটা দ্বন্দ্ব, সামাজিক মানুষ হিসেবে সে-দ্বন্দ্ব তাঁর ব্যক্তিগত মোচনের। এই দ্বন্দ্ব যখন একজন শিল্পীর মন থেকে মুছে যায়, যখন কোনও শিল্পী তাঁর ভূমিকা থেকে সরে আসেন তখনই তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে সরে আসেন একজন ব্যক্তিগত মানুষের কাছে।

কেসরবাই কেরকরের প্রতিকৃতি, ১৯৭২

শর্বরী রায়চোধুরীর বলেছিলেন, ‘কেউ কেউ আমার কিছু কাজ দেখে বলেছেন যে, ওই কাজ চোখের সামনে রেখে ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক বাজতে থাকলে একটা সিংক্রোনাইজেশন হয়।’ অর্থাৎ ‘কোনো ছবি বা ভাস্কর্য সংগীতের সঙ্গে ওইভাবে রিলেইট করবে সেটা নির্ভর করে ছবি বা ভাস্কর্যের স্টাইলের সঙ্গে। তার মানে সৃষ্টির আঙ্গিকের সঙ্গে ওই ধর্মের একটা মিলন হল, বলা যায়। আর এরই মধ্য থেকে শিল্পী পেয়ে যান ভিন্ন এক লিরিক্যাল ইশারা, সেই প্রশ্ন নিয়ে, ভিন্ন কোনও কৌতূহল নিয়ে, জীবনের মধ্যেই ভিন্ন কোনও অভিব্যক্তি, ভিন্ন কোনও সৃষ্টির উৎস। আর একই প্রসঙ্গে আমাদের মনে পড়বে বড়ে গোলাম আলির প্রতিকৃতির কথা, আর এই কারণেই শর্বরী রায়চোধুরী কিছুটা ভিন্ন স্বরে বলবেন, ‘আমার সেই সীমিত দৃষ্টি, সীমিত চিন্তা থেকে আমি কিছু কর্ম সৃষ্টি করার চেষ্টা করি। তবে সেগুলি মিউজিশিয়নদের প্রতিকৃতি নয়। সংগীতকারদের প্রতিকৃতির বাইরে আমি যা করি, তার মধ্যেই আসলে মিউজিকাল কর্ম দেখানোর চেষ্টা রয়েছে।’ শুধু কোনও মানুষের প্রতিকৃতি নয় বরং একজন ভাস্কর হিসাবে এরপর তাঁর একমাত্র বিষয় হয়ে উঠবে মানবদেহ। আমরা দেখতে পাব তাঁর সৃষ্টির প্রচ্ছন্ন আত্মশক্তি আদিম এক কল্পনার মতো গড়ে উঠেছিল তাঁর প্রাত্যহিক সহজতায়, আর এই সহজ মুহূর্তই তো অল্পে অল্পে তাঁর সৃষ্টিরও একটা ধরন হয়ে উঠবে একদিন। এক হিসেবে বলা যায়, এই প্রবহমান সামাজিক সামঞ্জস্য একদিকে তাঁর সৃষ্টির স্বাভাবিক প্রত্যয়, অন্যদিকে নিজেকে মানুষের ঘূর্ণির মাঝখানে রেখেও প্রচ্ছন্ন এক সময়কে তুলে ধরতে পারেন, একই সঙ্গে ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী হয়ে ওঠে তাঁর শিল্পের বোধ। ব্যক্তির সঙ্গে বিশ্বের আরও একবার সমন্বয় হতে থাকে এইভাবে।