
এক সময়ে তপন সিন্হার এবং তাঁর স্ত্রী অরুন্ধতী দেবীর সঙ্গে গড়ে উঠেছিল আমার ইউক্লিডিয়ান নির্ণয়ের রৈখিক সম্পর্ক, তাঁদের কয়েকটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুবাদে। সেই সম্পর্কে ছিল না তরুণ মজুমদারের গম্ভীর আন্তরিকতা। মৃণাল সেনের পিঠে-চাপড় বন্ধুতা। ঋত্বিক ঘটকের কোহলিক কল্লোল। ছিল না সত্যজিৎ রায়ের ঘরোয়া স্নেহ ও প্রবল প্রতিভার প্রতাপ। তপন সিংহ এবং অরুন্ধতী দেবীর নিউ আলিপুরের বাড়িতে যতবার গিয়েছি, পেয়েছি পাঁচতারা হোটেলের পরিপাটি শৈত্য। পেয়েছি মিতভাষ, মাপা, সচেতন, গোছানো ব্যবহার। কোথাও সেলাইয়ের দাগ নেই।
২০০৯-এর ১৫ জানুয়ারি। ৮৫ বছর বয়সে চলে গেলেন তপন সিন্হা। ১৭ বছর তিনি নেই। তাঁর সিনেমার টান কিছুটা ঝিমিয়েছে। তবু আছে। হারিয়ে যায়নি তাঁর অবদানের মূল্য।

এক সময়ে তাঁর এবং তাঁর স্ত্রী অরুন্ধতী দেবীর সঙ্গে গড়ে উঠেছিল আমার ইউক্লিডিয়ান নির্ণয়ের রৈখিক সম্পর্ক, তাঁদের কয়েকটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুবাদে। সেই সম্পর্কে ছিল না তরুণ মজুমদারের গম্ভীর আন্তরিকতা। মৃণাল সেনের পিঠে-চাপড় বন্ধুতা। ঋত্বিক ঘটকের কোহলিক কল্লোল। ছিল না সত্যজিৎ রায়ের ঘরোয়া স্নেহ ও প্রবল প্রতিভার প্রতাপ। তপন সিংহ এবং অরুন্ধতী দেবীর নিউ আলিপুরের বাড়িতে যতবার গিয়েছি, পেয়েছি পাঁচতারা হোটেলের পরিপাটি শৈত্য। পেয়েছি মিতভাষ, মাপা, সচেতন, গোছানো ব্যবহার। কোথাও সেলাইয়ের দাগ নেই।

অথচ তপন সিংহ-ই সবথেকে অবাক করেন আমাকে। কেননা, তাঁর অজান্তে তিনিই আমার লেখক কেরিয়ারের ‘পিতা’! তাঁর অমিত ক্রোধ, তাঁর তীব্র তিরস্কার, তাঁর অশিষ্ট জুগুপ্সা, তাঁর বেদম বিতুষ্টি, তাঁর অন্ধ অহং, তাঁর অবাধ অসন্তোষ ও অপভাষার আমিই ‘অবৈধ’ সন্তান।
১৯৭৬ সাল। আমি স্কটিশ চার্চ কলেজে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ইংরেজি সাহিত্য, বিশেষ করে ইংরেজি রোম্যান্টিক কবিতা উপভোগ করার চাকরি করি। শিল্প প্রদর্শনী প্রসঙ্গে আটপৌরে আলোচনা করি কবি ও বামপন্থী ইন্টেলেকচুয়াল সমর সেনের ইংরেজি ‘সাপ্তাহিক ফ্রন্টিয়ার’-এ। ‘স্টার অ্যান্ড স্টাইল’ এবং ‘ফিল্ম ফেয়ার’-এ বক্র প্রশ্নের শাণিত ছুরি ছুড়ি চিত্রতারকাদের পানে। ‘দ্য স্টেটসম্যান’ সংবাদপত্রে মাঝেমধ্যে লিখি বুক রিভিউ। স্টেটসম্যান হাউস থেকে প্রকাশিত উত্তর-আধুনিক পত্রিকা ‘জুনিয়র স্টেটসম্যান’। অ্যাংলো-আইরিশ এডিটর ডেসমন্ড-এর নেতৃত্বে জে. এস. নামে সেই পত্রিকা ইংরেজিভাষী বাঙালি তরুণদের ছিপে গাঁথল। ডেসমন্ডের ডাকে লিখতে শুরু করলাম সেই পত্রিকায়। ডেসমন্ড যেমন ভালো লেখেন। তেমন ভালো আঁকেন। তেমন উচ্চবর্ণের খিস্তি করেন। আমি মুগ্ধ হলাম। এবং ডেসমন্ডের একটা কথা এমনভাবে মনে গেঁথে গেল, এখনও খসে পড়েনি: ‘ইফ ইউ রিয়েলি রাইট ওয়েল দেয়ার ইজ অলওয়েজ অ্যান এডিটর ওয়েটিং ফর ইউ!’
সেই সময়ে বিশেষ করে সিনেমা বিষয়ে লেখায় খোলনলচে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। সব লেখার মধ্যে বাজারি-ধারার একটা বিপজ্জনক বিরোধী অন্তরস্রোত বজায়ও রেখেছিলাম। তবে সুতো ছেড়ে ওড়ার জুতসই বাতাস ও আকাশ পাচ্ছিলাম না।
একদিন বিকেলবেলায় এক বিখ্যাত সংবাদপত্রের দফতরে আড্ডা মারছি। হঠাৎ ‘দেশ’ পত্রিকার বেয়ারা এসে বলল, এডিটর তাঁর ঘরে আপনাকে ডাকছেন। এডিটর মানে ‘দেশ’-এর প্রবাদপ্রতিম সম্পাদক সাগরময় ঘোষ। আমি মুহূর্তে অপার অনিশ্চয়তায় তাঁর সামনে দণ্ডায়মান। তিনি ইশারায় আমাকে বসতে বললেন। তারপর এই সুসম্পাদিত সংক্ষিপ্ত উক্তি: ‘সিনেমা নিয়ে তোমার লেখা আমার ভালো লাগে। আমি চাইছি, তুমি এখানে ওখানে না-লিখে দেশ-এ লেখো। আমি সিনেমার লেখায় বদল চাইছি। সেটা আনতে হবে। একেবারে রাতারাতি। সিনেমার লোকজনদের ইন্টারভিউ করো। আর রিভিউ লেখো। তবে একটা শর্ত।’
সাগরময় তাকালেন আমার দিকে। স্থিরদৃষ্টি। মনে হল, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মুখে পড়েছি। সম্মোহিত হলাম। সাগরময় বললেন: ‘একটা শর্ত আছে। সিনেমার কোনও পার্টিতে যাবে না। আর স্টারদের মোহে হবনব করবে না। তাহলেই সত্যিটা লিখতে পারবে।’ আচ্ছা সাগরদা, ঠিক আছে, চেষ্টা করছি, বলেই ‘কেটে পড়লাম।’

তখন কে জানত এই দোর্দণ্ডপ্রতাপ সাগরময় একদিন ভালোবেসে আমাকে তাঁর সল্টলেকের বাড়ির একতলায় ভাড়াটে হয়ে থাকার ডাক দেবেন। সেখানে বউবাচ্চা নিয়ে আমি সংসারও পাতলাম। সাগরদা-রা ওপরে। আমরা নিচে। কোনও কোনও সন্ধ্যায় সাগরদার সঙ্গে পান। এবং তাঁর গুরুদেবের রূপকথা শোনা। শান্তিদেব ঘোষের ছোটভাই সাগরময়ের ছেলেবেলা কেটেছিল রবীন্দ্রনাথের ডানার তলায় শান্তিনিকেতন আশ্রমে। সেই সব সাগরসন্ধে স্মৃতিতে বয়ে যাওয়া সুবর্ণরেখা। কে জানত, ‘বাসা’, ‘সেটেল করা’, ‘থিতু হওয়া’, কোনও দিন হবে না আমার। কোন ভাঙনের লগ্নে জন্মেছি! চুরমারের পথে তাড়িত যাপন খুঁজে চলেছে প্রাণন ও দহন। উইদাউট রিগ্রেটস। তবে মেদুরতার বেদনা, সে তো আছেই। ক্রমিক তারল্যে যা গড়িয়ে যায় লেখার শরীরে।
সাগরদাকে লেখা দিতে মোটেই দেরি করিনি। ১৯৭৬-এর ৩১ জুলাই। ‘দেশ’ পত্রিকার সিনেমা বিভাগে আমার প্রথম লেখা বেরল সেদিন। এভাবে সেই লেখার শুরু:
‘ফোটোগ্রাফিটা তুমিই করো’, কথাটা বললেন সত্যজিৎ রায়, সুব্রত মিত্র নামের একটি বছর ২০ বয়সের নাবালক, কিন্তু- কিন্তু করা ছেলেকে।
‘আমি! সেটা কী করে হবে! আমি তো কিছুই জানি না!’ ছেলেটি প্রায় আতঙ্কিত ভাবে উত্তর দিল। সত্যজিৎ নির্দ্বিধায় বললেন, ‘এতে আবার জানার কী আছে? তুমি তো স্টিল ফোটোগ্রাফি করই। ব্যাপারটা তো একই শুধু এখানে সুইচ টিপলে ক্যামেরা চলে।’

সত্যজিতের এই ধাক্কাটার পরে আরও একটা ধাক্কা দিতে পারলে ‘দেশ’-এ আমার প্রথম লেখাটা বেশ পুষ্টিকর হবে, সে-কথা ভেবে লিখলাম: সুব্রত মিত্র আমাকে বললেন, ‘কলেজে বিএসসি পড়তে পড়তে আমি তখন চূড়ান্তভাবে ঠিক করেছি যে ক্যামেরাম্যান হব। তার আগে ঠিক করেছিলাম আর্কিটেক্ট হব। তার আগে ঠিক করেছিলাম মিউজিশিয়ান হব। পথের পাঁচালীর ওই দুর্ধর্ষ দৃশ্যটা নিশ্চয় মনে আছে। মিষ্টিওলার পিছন পিছন অপু দুর্গা আর কুকুর চলেছে সারিবদ্ধ ভাবে। সেখানকার আবহ সংগীতের সেতার কিন্তু রবিশঙ্কর বাজাননি। বাজিয়েছি আমি। এছাড়া রেনোয়ার পৃথিবী বিখ্যাত ছবি দি রিভারের টাইটেল মিউজিকেও আমার সেতার আছে।’ এই পুষ্টি বেশ কাজে লেগেছিল। সাগরদা, সুনীলদা আর পূর্ণেন্দুদা (পত্রী) তিনজনেই বললেন, লেখাটা মন্দ হয়নি, চালিয়ে যাও।
এই লেখা বেরনোর দু’সপ্তাহ পরে ‘দেশ’ পত্রিকায় বেরল আমার প্রথম সিনেমা সমালোচনা। ১৯৭৬-এর ১৭ সেপ্টেম্বর। ছবির নাম ‘দত্তা’। পরিচালক বাণিজ্যসফল বিখ্যাত অজয় কর। আমি প্রথম লেখাতেই বেড়াল মারতে চাইলাম। বেজে উঠল রণভেরী। জ্বলে উঠল টলিউড। পরের সপ্তাহে ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপা হল তপন সিন্হার এই শ্লেষময় ঘৃণাপ্লুত অরুন্তুদ নিনাদ:
“ ‘দেশ’ পত্রিকায় অজয় কর পরিচালিত ‘দত্তা’-র সমালোচনা পড়ে মর্মাহত হলাম। কথিত আছে, খালি কলসির আওয়াজ বেশি। কিন্তু এ যে ঢাকের আওয়াজ। থামলে বাঁচি। বার্নার্ড শ-র ঐতিহাসিক শাণিত ভাষা সম্বৃদ্ধ মঞ্চ সমালোচনা থেকে শুরু করে সাদুল, ট্রুফো, লিন্ডসে অ্যান্ডারসন, আর্থার নাইট প্রভৃতি সমালোচকের সিনেমা সমালোচনা সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ জ্ঞান আমাদের আছে– সেই আমাদের দেশেও বিগত দিনের অনেক ভালো ভালো সমালোচনা আমরা পড়েছি। দত্তার সমালোচনাকে মূর্খতার অপহাস ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। আজ বিংশ শতাব্দীর মধ্যাহ্নে একটি স্কুলের ছেলেও ক্লোজ শট, লং শট, লাইট সোর্স প্রভৃতি কথাগুলো জানে। সুতরাং সমালোচনায় ওই শব্দগুলি ব্যবহার করে বিশেষ বাহাদুরি তিনি পাবেন না। বরং থ্রি স্কিম লাইটিং, টু স্কিম লাইটিং, মনো কী লাইটিং সম্বন্ধে কিছু জ্ঞান দিলে বাধিত হতাম। এই সিনেমার ভাষাতত্ত্ববিদটির প্রতি আমার উপদেশ: বাংলার মাটি গায়ে মাখুন, বাংলার জলে স্নান করুন। উপদেশটি যদি না মানতে পারেন,তবে একটু সৎ সাহস দেখিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ান, খালি কলসির কত আওয়াজ একবার দেখি।”

এই চিঠি যেদিন প্রকাশিত হল, সাগরদা সেদিনই আমাকে ডেকে পাঠিয়ে জানিয়ে দিলেন, তোমাকে আর লিখতে হবে না। তপন সিন্হার এই চিঠির পরে সিনেমা বিষয়ে তোমার লেখা আর প্রকাশ করা যাবে না। সাগরদার ঘর থেকে বেরিয়ে চুপচাপ সুনীলদার সামনে গিয়ে বসলাম। সুনীলদা গম্ভীরভাবে বললেন, ‘মনখারাপ কোরো না। কাল সকালে আমার বাড়িতে এসো। একটা কিছু ঘটতে চলেছে।’
সেই সুনীলদা প্রেডিক্টেড একটা কিছু ঘটল। ঠিক পরের ‘দেশ’ পত্রিকায় সম্পাদক সাগরময় ঘোষ প্রকাশ করলেন কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, চিন্তক পূর্ণেন্দু পত্রীর একটি অসামান্য প্রাবন্ধিক পত্র আমার দত্তা সমালোচনার দাপুটে সমর্থনে, তপন সিন্হাকে তাঁর নিজের জায়গায় বসিয়ে দিয়ে, ‘হ্যাভিং পুট হিম ইন হিস প্লেস’! সেই দীর্ঘ চিঠির সারাৎসার উদ্ধৃতি চিহ্নর মধ্যে পূর্ণেন্দুদার অনুকরণীয় বাক্য বিন্যাসে:
“কয়েক সপ্তাহ আগে দেশ-এ ‘দত্তা’-র সমালোচনা পড়ে চমকে উঠলাম। কারণটা ভিন্ন। এতকাল সংবাদপত্রিকাটিতে চলচ্চিত্র সমালোচনার যে মামুলি রোমন্থনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম, এ-রচনা তার থেকে স্বাদে এবং চরিত্রে স্বতন্ত্র। স্বাদ অর্থে এখানে ভাষা। চরিত্র অর্থে সারফেস ছেড়ে ভিতর দিকে পেনিট্রেট করার চেষ্টা অথবা পদ্ধতি। ইনি ছবিকে বিচার করার চেষ্টা করেছেন তার চিত্রময়তার দিক থেকে। তাঁর তীর ধনুকের লক্ষ্যস্থল বাকসর্বস্ব চলচ্চিত্রের বাস্তববর্জিত নাটকীয়তা। সেই কারণেই এসেছে ক্যামেরার অবস্থান, আলোক সম্পাত, সাউন্ড ট্র্যাক, শট ইত্যাদির প্রসঙ্গ, অনিবার্যরূপে।
বাংলা ছবির মান আজ ক্রমশ গড়িয়ে চলেছে অধঃপতনের গভীর খাদের দিকে। এইরকম একটা সংকটময় মুহূর্তে চলচ্চিত্রকে তার যথার্থ পটভূমিকায় বসিয়ে কেউ যদি সাম্প্রতিক গড্ডলিকাপ্রবাহের বিরুদ্ধে তাঁর কলমের নীল কালিকে খানিকটা লাল করে ফেলে, আমি তাকে স্বাগত জানাতে এক মুহূর্ত দেরি করতে রাজি নই।
আমাকে আবার একবার চমকাতে হল গত সংখ্যা ‘দেশ’ পত্রিকায় তপনবাবুর চিঠিটি পড়ে। যে সমালোচনা পড়ে তপনবাবুর মতো পরিচালকের সকলের আগে খুশি হওয়া উচিত, তিনি যে হঠাৎ কেন অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন, বোঝা গেল না। এই চিঠির ভাষা তাঁর মর্যাদার পক্ষে ক্ষতিকর। চলচ্চিত্র সমালোচনায় এর আগে কেউ লং শট, মিড শট ইত্যাদি বাক্য ব্যবহার করেননি, কারণ তা স্কুলের ছেলেরাও জানে, এই অপরাধেই কি? এবং স্কুলের ছেলেরা জানে না বলেই কি সাদুল, ত্রুফো, লিন্ডসে অ্যান্ডারসন, আর্থার নাইট প্রমুখদের নামোল্লেখ?
এবার কয়েকটি প্রশ্ন: রঞ্জন বলছে, ‘শরৎচন্দ্র তাঁর গল্প বিন্যাসে এবং চরিত্রায়নে এমন কিছু মাল মশলা মেশান যা অধিকাংশ বাঙালির পক্ষে আজও স্বাদু এবং লোভনীয়।’ তপন বাবু আপনি কি এই মন্তব্যের বিরুদ্ধ নন?”
ওই পত্রে পূর্ণেন্দু লিখছেন, ‘আমি অন্তত এই পর্যন্ত ১০০ জনকে বলতে শুনেছি দত্তা চলছে দুটো শ-স-এ!’
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আর সুচিত্রা সেন। পূর্ণেন্দুদার দীর্ঘ চিঠির বাকিটা বাদ দিয়ে এবার শেষ প্যারাতে যাচ্ছি: ‘তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম দেশ পত্রিকায় রঞ্জনবাবু আর কোনো দিন লং শট ইত্যাদি লিখবেন না। এই তো? কিন্তু আমার প্রশ্ন, খালি কলসির বা ফোঁপরা ঢেঁকির প্রতি যদি তপনবাবুর এতই বিরাগ এবং বিদ্বেষ তিনি কি রঞ্জনবাবু ছাড়া আর কোথাও ওই জাতীয় ক্ষতিকারক বস্তু খুঁজে পান নি এতদিন? ফাঁপা স্টুডিও, ফাঁপা ফিল্ম, ফাঁপা যন্ত্রপাতি, ফাঁপা অব্যবস্থা, এর জন্যে তিনি কি কাউকে ডেকে কিছু উপদেশ দেবেন? বা দিয়েছেন? কদর্য রুচির সঙ্গে পতিতাবৃত্তি করতে করতে যে বাংলা চলচ্চিত্র আজ সমস্ত গৌরব হারিয়ে পা বাড়িয়েছে গঙ্গা যাত্রার পথে, তাকে বাঁচাবেন কোন মাটি মাখিয়ে, কোন পুকুরের জলে নাইয়ে? তপন বাবু, আজকের এই অধঃপতিত চলচ্চিত্রের সত্যিকারের শত্রু কে বলুন তো? রঞ্জন? না, অবাস্তব মনোরঞ্জন?’

পূর্ণেন্দুদার এই চিঠি প্রকাশিত হল ১৯৭৬-এর ৪ সেপ্টেম্বর। সাগরদা সেই দিনই আমাকে ফোন করে ডাকলেন দেশের দফতরে। বললেন সিনেমা নিয়ে যেমন লিখছিলে, আবার লিখতে শুরু করো। প্রচুর চিঠি আসছে। সব তোমার সমর্থনে। কিছু চিঠি আমরা দেশের পরের সংখ্যায় ছাপব। সাগরদার ঘর থেকে বেরিয়ে আমি সুনীলদার ঘরে ঢুকতে যাব, উনি হেসে বললেন, ‘আগে পূর্ণেন্দু, তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।’ আমি পা বাড়ালাম পূর্ণেন্দুদার দিকে। তখন জানি না, ১৯৭৬ থেকে ১৯৯০, আগামী ১৪ বছর ‘দেশ’ পত্রিকায় সিনেমা নিয়ে লিখব। আর বারবার কলম ধরতে বাধ্য হব উত্তমকুমারের বিরুদ্ধে। পীযূষ বসু পরিচালিত ‘বহ্নিশিখা’ ছবির শ্রাদ্ধ করে শেষে উত্তমকুমারকে লিখলাম, সব বাজে ছবির লাইফ জ্যাকেট হওয়ার চেষ্টা করে বাংলা ছবির সর্বনাশ করবেন না। আপনি নিজের কফিনে শেষ পেরেক নিজেই মারছেন।
একদিন ডেকে পাঠালেন আমাকে ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে সকালবেলা। লিভিং রুমের একেবারে শেষে, রান্না ঘরের সামনে, ছোট্ট একটা হিম ঠান্ডা ঘর, যে ঘরে উনি স্ক্রিপ্ট শোনেন। আমাকে বসতে বলে উনি চুপ করে বসে থাকলেন। তারপর তাকালেন। সেই আঁখিপাত কোনও দিন মুছে যাবে না স্মৃতি থেকে। উত্তম বললেন, ‘শোনো, আমার পক্ষে এই অবস্থা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। আমি একা সমস্ত বাংলা ছবির ইন্ডাস্ট্রিটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছি। আমি সই না করলে প্রোডিউসার পাওয়া যায় না। আমি যদি বেছে বেছে ছবি করি কত মানুষের সংসার চলবে না, জানো? গল্প নেই, স্ক্রিপ্ট নেই, ডিরেক্টর নেই, শুধু উত্তমকুমার আছে।’

উত্তম থামলেন। তারপর বললেন, ‘একটা ইন্টেলেকচুয়াল ছবি আসছে। আমি আছি বলে যাত্রিক টাকা পেয়েছে ছবিটা করার। ছবির নাম, চাঁদের কাছাকাছি।’
সায়েন্স ফিকশন? আমার বিহ্বল প্রশ্ন।
‘না, না, ছবিতে আমার নাম চাঁদ। আমার নায়িকা মিঠু মুখার্জী। আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু আমি পাগলের ভান করি। তারপর আমি সত্যি ধীরে ধীরে পাগল হতে থাকি। এবং পাগলা গারদে শান্তি পাই অস্থির জীবনের শেষে। এক্সপেরিমেন্টাল আর্ট ফিল্ম, বুঝতেই পারছ। প্রোডিউসার পাচ্ছিল না। আমি সই করলাম। প্রডিউসার এল। ছবিটা হল। মিঠুও কাজটা পেল। কত মানুষের সুরাহা হল, সেটা ভাবতে হবে তো।’
উত্তমকুমার আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। দ্যাট কিলার স্মাইল!

সব শেষে বলি, তপন সিংহ, আপনার ঘৃণা, তাচ্ছিল্য, অপভাষার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। না-হলে সাগরদা, সুনীলদা, পূর্ণেন্দুদাকে আমি অমন দাত্রী নৈকট্যে কাছে পেতাম না। আপনার তাচ্ছিল্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল আমার জীবনে।
এমনও হয়!
…………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা
…………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved