Bibha Sengupta: Lifetime Devotion to Rabindra Sangeet। Robbar
Robbar
  • ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ৬ অক্টোবর ২০২৬

হারমোনিয়ামের উত্তরাধিকার

একজন নিবিড় পূজারি যখন পুজো করেন, তখন তাঁর জীবনের বাকি দরজাগুলো তিনি বন্ধ করে দেন। জীবনের ক্লেদ তাঁর গায়ে লাগে না। তাঁর দৃষ্টি থাকে একদিকে– ঈশ্বরসাধনায়। বিভা সেনগুপ্তও সেরকম। আজীবনের কর্মযোগ তাঁর। নাম, সম্মান বা টাকাপয়সা– এসব দিকে তাঁর কোনও ‘নজর’ ছিল না, কিন্তু রোজ সকালে উঠে রেওয়াজ করতে হবে, এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ৬, ২০২৬, ১৮:০১   
Facebook WhatsApp Messenger

বিভা সেনগুপ্ত, আমার ‘বিভামাসি’, চলে গেলেন। ওঁকে ‘মাসি’ বলতাম মা’র বয়সি ছিলেন বলে। এ কলকাতায় যদি কোনও ‘তীর্থস্থান’ থেকে থাকে, আমার নিজস্ব, তা ওই ম্যান্ডেভিল গার্ডেন্সের ছোট্ট ফ্ল্যাটটা। বিভামাসি থাকতেন যেখানে। সারাজীবন থেকেছেন একাই। বিয়েশাদি করেননি। তবু ‘একা’ বললে ভুল বলা হবে। রবীন্দ্রনাথ, তাঁর গান, আর গানের সাধকরা ছিলেন তাঁর সঙ্গে সঙ্গে– দেবব্রত বিশ্বাস, মায়া সেন, সুচিত্রা মিত্র, আরও অনেকে। গানের সঙ্গে একত্রবাস।

zoom
পূজার উপাদান

তাঁর জীবনের শেষদিকে তাঁকে নিয়ে ডকুমেন্টারিও করেছি। আমি ওঁর ছাত্রী। ২০০২ সাল থেকে ২০১২– এই সময়টায় হাতে ধরে গান শিখিয়েছেন বিভামাসি। এবং তারপরেও আমার যাতায়াত থামেনি। ওঁর কাছে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন আমার মা, ভারতী মুখোপাধ্যায়। মা পড়াতেন বিদ্যাভারতীতে। বিভা সেনগুপ্ত এই ইশকুলে গানের কম্পিটিশনের জাজ হয়ে এসেছিলেন। সেদিন তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পর্যায়ের গান ‘বাসন্তী হে ভুবনমোহিনী’ এমনই গেয়েছিলেন যে, আমার মা যিনি সুচিত্রা মিত্রর কাছেও গান শিখেছেন, তিনিও বলতে বাধ্য হয়েছিলেন: ‘ওইরকম উদাত্ত কণ্ঠ আমি শুনিনি।’

zoom
একজীবন, গানজীবন

পথের ধারে এমন ফুল ফুটে থাকে প্রায়শই, যা এমনিই ফুটছে। বিভামাসির সারা জীবন যাপনে, এই ‘এমনি ফুটে থাকা’ ছিল সবচেয়ে সত্যি। কোনও চাকচিক্য ছিল না, ছিল না কোনও গ্ল্যামার। দেবব্রত বিশ্বাস তো মজা করে ওঁকে বলেছিলেন, ‘দেখুন, আপনাকে আমি কী বলব, আপনি দেখতে সুন্দর না। বিয়ে করেননি। ভালো করে কথাও বলতে পারেন না। আপনি বেশি নাম-ডাকের আশা করবেন না। গান করে যান, আর আমার আশীর্বাদ রইল।’ সেই আশীর্বাদ শুধুই হাওয়ায় ভাসানো কথা নয়, নিজের হারমোনিয়ামটি বিভা সেনগুপ্তর জর্জদা, দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁকে।

পূর্ব বাংলার মানুষেরা যেরকম হতেন একসময়, অত্যন্ত সাদামাটা। ভেতরে ভেতরে অসম্ভব সংযত। প্রায় ব্রাহ্ম। বিভা সেনগুপ্ত প্রায় আর্কেটাইপ ‘পূর্ববঙ্গীয়’ বলা চলে। বিয়ে করেননি। থাকতেন দাদার বাড়ি– শিবপ্রসাদ সেনগুপ্তর কাছে। কখনও কোনও শিল্পীর নিন্দে করতে আমি শুনিনি। এ তো বলতে খুব দ্বিধা নেই, যে আমবাঙালিরা মূলত নিন্দামুখর। এবং জীবনে না-পাওয়া সেই নিন্দার আগুনে ঘি ঢালে। বিভা সেনগুপ্ত সামান্য খ্যাতি পেতে শুরু করলেন ৮০ ছুঁই ছুঁই বয়সে। ওই ২০০২ সালে, বিভা সেনগুপ্তকে কতজন চিনতেন? গত ২৪ বছর অনবরত তাঁর কাছে যাতায়াত করেছি, কখনও কারও সম্পর্কে, তাঁর কোনও নিন্দাবাক্য শুনিনি। নিঃসঙ্গতা নিশ্চয়ই ছিল ওঁর। গত ২৪ বছরের আলাপে, একবার মাত্র, অস্ফুটে বলে উঠেছিলেন, ফোনে: ‘আমি কি কাউকে বলি? আমার কতটা কষ্ট হয় তুমি কি বুঝতে পারো?’

zoom
বিভা সেনগুপ্ত, মায়া সেন, সংঘমিত্রা গুপ্ত, অমিয়াংশু মুখোপাধ্যায়

মায়া সেন ওঁকে যত্ন করে গান শিখিয়েছিলেন। আমি যদিও মনে করি, মায়াদির থেকেও ভালো গান করতেন বিভামাসি। মায়া সেনই পরবর্তীকালে ওঁকে দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে নিয়ে যান। এই দেখা হওয়াটা, ওঁর জীবনে একটা টার্নিং পয়েন্ট বলেই বোধ করি। ‘গায়কি’ বা ‘সংগীত মেথডলজি’ সম্বন্ধে খুব মূল্যবান এক তথ্য বেরিয়ে আসে সেসময়। কী সেই তথ্য?

বিভামাসিকে গান করতে বলেছেন দেবব্রত বিশ্বাস। ‘এসেছিলে তবু আসো নাই’– এই গানটা গাইলেন বিভামাসি। দেবব্রত বিশ্বাস বললেন, ‘এত হাত-পা নেড়ে তাল বজায় রেখে গান করলে, গানের আত্মাটা ঠিক বেরয় না।’ তখন মায়া সেন আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘একথা আপনি বলতে পারেন না। আমরা শিক্ষক। তাল দেওয়া তো শেখাতেই হবে।’ দেবব্রত বিশ্বাস তখন দ্বিমত প্রকাশ করে বলেন যে, ‘না, গানের যে অন্তর্নিহিত ভাব, সেটা প্রকাশ করা বেশি প্রয়োজন।’ অতঃপর সেই গান গেয়েছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস। ওই দিনের কথা বলতে গিয়ে, দেবব্রত বিশ্বাস কেমন করে সেদিন গান গেয়েছিলেন, তা বারে বারেই দেখাতেন বিভামাসি।

গানের ভাব আর শব্দের ডেলিভারি– আমার মনে হয় উনি দেবব্রত বিশ্বাসের কাছ থেকেই শিখেছিলেন। খেয়াল করে দেখেছি, গানের যে একটা ‘ড্রামাটিক এলিমেন্ট’ আছে, তাও উনি প্রকাশ করতে সক্ষম। সুচিত্রা মিত্রর ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’র পাশাপাশি বিভা সেনগুপ্তর ‘কৃষ্ণকলি’ শুনলেই বোঝা যাবে, আসলে কী বলতে চাইছি।

ওঁর কাছে আমি গান শিখতাম একা। গ্রুপে নয়। খুবই দক্ষ শিক্ষক। অত্যন্ত ধৈর্য ধরে গান শেখাতেন। নিজেকে জাহির করার লেশমাত্র ছিল না সেখানে। গানবাজনা এখন তো একপ্রকার আত্মবিজ্ঞাপনের পর্যায়ে চলে গিয়েছে। এইসব ওঁকে স্পর্শই করত না কোনও দিন। বুঝতেও পারতেন না। জীবনের ৮৫তম বছরে এসে, তিনি সংগীত সম্মান পেয়েছিলেন। অথচ তাঁর মনের মাটি ছিল আজীবন বাঙ্ময়।

zoom
চিত্র ঋণ: লেখক

একজন নিবিড় পূজারি যখন পুজো করেন, তখন তাঁর জীবনের বাকি দরজাগুলো তিনি বন্ধ করে দেন। জীবনের ক্লেদ তাঁর গায়ে লাগে না। তাঁর দৃষ্টি থাকে একদিকে– ঈশ্বরসাধনায়। বিভা সেনগুপ্তও সেরকম। আজীবনের কর্মযোগ তাঁর। নাম, সম্মান বা টাকাপয়সা– এসব দিকে তাঁর কোনও ‘নজর’ ছিল না, কিন্তু রোজ সকালে উঠে রেওয়াজ করতে হবে, এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর। এই পবিত্র প্রচেষ্টা নিরন্তর করে যাওয়াই তাঁকে অশীতিপর বয়সে হলেও, স্বীকৃতি দিয়েছে। শেষদিকে, উনি অনেক জায়গায় গান করতে যেতেন। বারণও করা হত ওঁকে। কারণ একটা চোখ তাঁর নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এছাড়া, শারীরিক প্রতিকূলতাও ছিল যথেষ্ট। কিন্তু উনি বলেছিলেন, ‘একলা ঘরে বসে কী করব? গান গাইতেই তো চাই।’

খুবই সাধারণ পরিবার থেকে এসেছিলেন বিভাদি। অনেক ভাইবোন। বাহুল্যের ছিল না এতটুকুও। খাটাল ছিল। গরুকে আদর করার গল্পও করেছেন কথায় কথায়। পরে, উনি কলকাতায় চলে আসেন। ওঁর দাদার কথায়, রবীন্দ্রভারতীতে চান্স পেয়ে যান। রবীন্দ্রসংগীতে এমএ করেন এবং পরে, স্পেশালাইজেশনও।

প্রথম প্রথম রবীন্দ্রসংগীত উনি একেবারে ধরতে পারতেন না। কারণ ছোটবেলায়, ওঁর তালিম হয়েছিল ধ্রুপদী সংগীতের। ত্রিপুরার মহারাজার কোর্টে একটা বড় কম্পিটিশনে গান করে ফার্স্ট হয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স ১৪। নজরুলগীতি, রাগপ্রধান গান খুবই ভালো গাইতেন। কলকাতায় এসে, যখন রবীন্দ্রসংগীত ধরতে পারছেন না, তখন মায়া সেনকে অনুরোধ করেন। ঠিক হয় মায়া সেনের কাছে একলা গান শিখবেন তিনি। সম্ভবত তখন বিভামাসি গড়িয়াহাটের আশপাশে থাকতেন। এইসব ঘটছে, ওই ছয়ের দশকের কলকাতায়।
…………………………………………….

পড়ুন বিভা সেনগুপ্তর অবিচুয়ারি: সারাজীবন সুরজীবী

…………………………………………….

মায়া সেন বলেছিলেন, ‘অত দূর থেকে আসবে কী করে? ‘আমি ঠিক আসতে পারব।’ উত্তর দিয়েছিলেন বিভা সেনগুপ্ত। মায়া সেনের কাছে বোধহয় সপ্তাহে দু’দিন ক্লাস করতেন। মায়া সেন বলেছিলেন, ‘অন্য গান গাওয়া চলবে না, শুধু রবীন্দ্রসংগীতই গাইতে হবে।’ ভেবে দেখুন, ওঁর এতদিনের সংগীতমন– যা দিয়ে গড়ে উঠেছিল ‘মনোজগৎ’– উনি ছেড়ে দিয়ে শুধুমাত্র রবীন্দ্রসংগীতেই মনোনিবেশ করেছিলেন। রবীন্দ্রসংগীতের বিভা ছড়িয়ে পড়েছিল ওঁর সারা জীবন।

সেই মনোনিবেশ, ফুরল আজ। যখন ফুরল শরীর।

তবু গান ফুরল না।

Bibha Sengupta death Bibha Sengupta obituary Bibha Sengupta Rabindra Sangeet Debabrata Biswas disciple Maya Sen Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on