
সম্ভবত ’৯৩-তেই, বাবার শেষ হিন্দি ছবি ‘স্বামী বিবেকানন্দ’, জি ভি আইয়ারের ছবি– সেখানেও আশাজির একখানা গান ছিল। সাহারা স্টুডিওতে আমিই ওঁকে সেই গানটা তুলিয়েছিলাম। মনে আছে, সেই রেকর্ডিং-এ হঠাৎ করেই রাহুল দেব বর্মন এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি বারবার গানটা শুনছেন, আর বলছেন, ‘সলিলদা, এই সুরটা আমি কোথায় শুনেছি!’ আর বাবা মিটিমিটি হাসছেন। কারণ এ গানটাও মায়ের গাওয়া একটা বাংলা গান থেকেই তৈরি। মূল গানটা ছিল ‘গুরু গুরু মন্দ্র বাহারে’। সুরের স্মৃতি যে কী তীক্ষ্ণ হতে পারে, আর ডি বর্মন কিন্তু ঠিক মনে রেখে দিয়েছিলেন। গুলজারজিও ছিলেন সেদিন। হিন্দি গানের কথাটা উনিই লিখেছিলেন। সেদিন এই নিয়ে অনেক হাসিঠাট্টাও হয়েছিল।
ক্ষতি হল। অপূরণীয় এক ক্ষতি। সংগীত এবং চলচ্চিত্র জগতের তো বটেই, পাশাপাশি আপামর সংগীতপ্রেমী মানুষের জন্যও। আশাজি, লতাজি– এঁরা একটা যুগ। এঁদের গান শুনেই তো আমাদের বড় হওয়া।
খুব ছোট থেকেই এঁদের দেখছি। তখন অবশ্য ‘আশাজি’, ‘লতাজি’– এই নামে ডাকতাম না। বলতাম ‘আশা আন্টি’। প্রথম যখন ওঁর সঙ্গে কাজ করি, তখন আমার মাত্র সাত বছর বয়স। ‘মিনু’ সিনেমায় ‘ধীরে ধীরে হলে সে’ গানটা গেয়েছিলাম ওঁর সঙ্গে। ডুয়েট। এই গানটা আসলে মায়ের গাওয়া ‘বিশ্বপিতা তুমি’-র হিন্দি ভার্সন। বাবাই করেছিলেন। তখন, সেই বয়সে, কার সঙ্গে গাইছি বুঝতে পারিনি খুব একটা। এখন মনে হয় কত মূল্যবান অভিজ্ঞতা! আমার সৌভাগ্য আমি এরকম একটা পরিবারে জন্মেছি। সেজন্যই হয়তো এত বড় মাপের শিল্পীদের এত সামনে থেকে দেখা, তাঁদের থেকে শিখতে পারার সুযোগ হয়েছে।

পরে আরেকটু বড় হওয়ার পর ‘কালিয়া’ ছবিতে আশাজির সঙ্গে আরেকটি ডুয়েট গাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে আশাজি এবং কিশোর কুমার– দু’জনেই ছিলেন। আমার খুব ছোট্ট একটা অংশ ছিল। আমায় কেবল গাইতে হত ‘এল-ও-ভি-ই’ অর্থাৎ ‘L-O-V-E’। মূল গানটা ছিল, ‘যব সে তুমকো দেখা’ এবং সারাদিন ধরে ওঁদের সঙ্গে আমায় এই একটা শব্দই গেয়ে যেতে হয়েছিল। আমি আর আশাজি একই মাইকে রেকর্ড করছিলাম। অর্থাৎ আমার অংশটুকুর সময় বারবার আশাজি সরে যাচ্ছিলেন, আর আমি মাইকের সামনে গিয়ে ওইটুকু গেয়ে চলে আসছিলাম। আর পাশের মাইকে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কিশোর কুমার। সে এক মজার অভিজ্ঞতা! এরকম কত টুকরো টুকরো স্মৃতি ঘিরে রয়েছে আশাজিকে নিয়ে।

‘ট্রু আর্টিস্ট’ বলতে যা বোঝায়, আশাজি ছিলেন ঠিক তাই। খুবই সরল, সাদামাটা মানুষ। হাসিখুশি এবং মিশুকে। মায়ের সঙ্গে আশাজির খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল। আর বাবাকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। মা-বাবা– দু’জনেই আশাজিকে খুব ভালোবাসতেন। আশাজির সঙ্গে বাবার প্রথম রেকর্ডিং ‘বাগ মে কলি খিলি’। ‘চান্দ অউর সুরজ’ নামে একটা ছবির গান। এর মূল গানটাও কিন্তু মায়ের গাওয়া একটা বাংলা গান। ‘যা রে যা আমার আশার ফুল ভেসে যা’। মায়ের বেশ কিছু বাংলা গানের হিন্দি ভার্সন, বাবা, আশাজিকে দিয়ে গাইয়েছিলেন। এই গানটা বেশ একটা রক-অ্যান্ড-রোল স্টাইলের গান ছিল। গানটা ছিল তনুজাজির লিপে। কী চমৎকার যে একটা পরিবেশনা! বাংলা গানটা ঠিক যতটা ধীরস্থির, হিন্দিটা ততটাই দ্রুত লয়ের। বাবা তো খুব পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন, এই একই সুর, একেবারে অন্যরকম মিউজিকাল অ্যারেঞ্জমেন্টে জেসুদাসজিকে দিয়ে গাইয়েছিলেন, মলায়ালমে। ‘চাগরা’ নামে একখানা গান, ছবির নাম ছিল ‘চেম্মিন’। অর্থাৎ একই সুর, ছবির সিচুয়েশনের ওপর ভিত্তি করে তিনটে আলাদা পরিবেশনা– তিনজন আলাদা শিল্পী।

আশাজির সঙ্গে বাবার আরও বেশ কিছু কাজ হয়েছিল। আরেকটা ছবির রেকর্ডিংয়ের স্মৃতি মনে পড়ছে, ‘তৃষাগ্নি’, নবেন্দু ঘোষের ছবি। একটু পরের দিকের ছবি, নয়ের দশকে। আমার মনে আছে, আশাজি স্টুডিওতে এলেন, বাবা গানটা তুলিয়ে দিলেন। এবং মহড়া হয়ে গেলে মাইকের সামনে গিয়ে একবার গাইলেন। ব্যস! একবারেই ‘ওকে’ হয়ে গেল গানটা। আমি খুবই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। একজন শিল্পী, কত বড় মাপের হলে, তাঁকে কিছুই বলে দিতে হয় না– একবারে একটা গান গেয়ে দিতে পারেন! মনে আছে, বাবা খুবই খুশি হয়েছিলেন রেকর্ডিংটায়।

নবেন্দু ঘোষ, সলিল চৌধুরী এবং আশা ভোঁসলের আরেকটা স্মৃতির কথা মনে পড়ে। আমরা তখন বোম্বের ডি এন নগরে একটা বাড়িতে থাকতাম। আমার তখন ১৭-১৮ বছর বয়স। ক্লাসিকাল গান শিখছি। আশাজি হঠাৎ একদিন আমাদের বাড়ি এসেছিলেন। তেমন কোনও কাজ ছিল না। বাবার সঙ্গে দেখা করতেই। বাড়িতে যা রান্না হয়েছিল, সাধারণ, তা-ই খাওয়াদাওয়া হল। খাওয়াদাওয়ার পর আমায় একখানা গান শোনাতে বলেছিলেন। আশাজির গাওয়া আমার খুব প্রিয় একটা গান ‘জীবনগান গাহে কে যে’– আমি সেই গানটা শুনিয়েছিলাম। এ গানটা বাবারই লেখা। আমার মনে আছে, গান শুনে উনি বলেছিলেন– ‘খুবই ভালো গেয়েছ। কিন্তু গানে প্রচুর কাজ দিতে যেও না। ঠিক যতটুকু দরকার ততটুকুই দিও। খাবারে বেশি মশলা দিলে যেমন খাবারটার স্বাদ নষ্ট হয়, অতি অলংকারে তেমন গানও নষ্ট হয়।’ একথাটা উনি আমায় বলেছিলেন, এবং গানের ক্ষেত্রে যে অলংকারের চেয়েও অনুভূতিটাই আসল– সেটা সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে একথাটা আমি সবসময় মনে রেখেছি।

আশাজির গানের বৈচিত্র চিরকাল আমাকে মুগ্ধ করেছে। আধুনিক থেকে সেমি-ক্লাসিকাল, আবার গজল কিংবা পিওর ক্লাসিকাল যেভাবে সমান দক্ষতায় উনি গাইতে পারতেন– সেটা খুবই দুর্লভ একটা গুণ। একবার তো বাবার সুরে আশাজি একখানা গুজরাতি গানও গেয়েছিলেন। মূল গানটা আমার গাওয়া– ‘বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে’, গুজরাতি ভার্সন ছিল ‘দেভনা দিধেল দিকরা মারা’। এবং গানটা খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।

আশাজি, লতাজি এবং মা– তিনজনেই বাবার খুব প্রিয় শিল্পী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলার, অনেকেই অভিযোগ করেন– সলিল চৌধুরী, আশা ভোঁসলেকে দিয়ে খুব বেশি গান গাওয়াননি। দূরদর্শনে বাবা একবার আশাজির একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেখানে উনি নিজেও অনুযোগের সুরে একথা বলেছিলেন। আমরাও একথা জিজ্ঞাসা করেছি বাবাকে। উনি যেটা বলেছিলেন– আসলে তখনকার দিনে মিউজিক কোম্পানিরা আসত, গান গাওয়ানোর জন্য। তখন সারেগামা ছিল না, এইচএমভি, তো ওঁরা হয়তো বললেন, অমুক শিল্পীর দুটো গান করে দিন, রেকর্ডের জন্য– এরকম ভাবে কাজ হত। সেরকম কোনও অনুরোধ, পুজোর গানের জন্য, হয়তো আসেনি। ফলে ওঁদের যৌথ কাজ করার পরিসরটাই তৈরি হয়নি। পরে যখন বাবা ভাবলেন আশাজিকে নিয়ে আলাদা করে একটা কাজ করবেন, তখন খানিকটা দেরি হয়ে গিয়েছে, তখন বাবা অসুস্থ, এবং তারপর চলেও গেলেন। খুবই দুর্ভাগ্যের। আসলে এ ধরনের মানুষেরা তো চলে যান না, থেকে যান। কাজের মধ্যে দিয়ে। বাবা আর আশাজির আরও কিছু যৌথ কাজ থেকে গেলে হয়তো আরও ভালো হত।

১৯৯২-’৯৩ নাগাদ বাবা একটা বাংলা ছবি করছিলেন। ‘এই সময়’। ছবিটা দুর্ভাগ্যবশত রিলিজ হয়নি। আমাদের স্টুডিও তখন ছিল ‘সাউন্ড অন সাউন্ড’। কলকাতায়। সেখানেই এসেছিলেন আশাজি। ওঁর দুটো গান গাওয়ার কথা ছিল– ‘দিন গেল দিন গেল’ এবং ‘জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা’। ‘ও নীল আকাশ’ নামে আমারও একটা একক গান ছিল সেই ছবিটায়। খুবই খারাপ লাগে ছবিটা বেরল না বলে। আশাজির দুটো গানেরই চমৎকার রেকর্ডিং হয়েছিল।

সেই সময়েই, সম্ভবত ’৯৩-তেই, বাবার শেষ হিন্দি ছবি ‘স্বামী বিবেকানন্দ’, জি ভি আইয়ারের ছবি– সেখানেও আশাজির একখানা গান ছিল। সাহারা স্টুডিওতে আমিই ওঁকে সেই গানটা তুলিয়েছিলাম। মনে আছে, সেই রেকর্ডিং-এ হঠাৎ করেই রাহুল দেব বর্মন এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি বারবার গানটা শুনছেন, আর বলছেন, ‘সলিলদা, এই সুরটা আমি কোথায় শুনেছি!’ আর বাবা মিটিমিটি হাসছেন। কারণ এ গানটাও মায়ের গাওয়া একটা বাংলা গান থেকেই তৈরি। মূল গানটা ছিল ‘গুরু গুরু মন্দ্র বাহারে’। সুরের স্মৃতি যে কী তীক্ষ্ণ হতে পারে, আর ডি বর্মন কিন্তু ঠিক মনে রেখে দিয়েছিলেন। গুলজারজিও ছিলেন সেদিন। হিন্দি গানের কথাটা উনিই লিখেছিলেন। সেদিন এই নিয়ে অনেক হাসিঠাট্টাও হয়েছিল।

সেটাই সম্ভবত আশাজির সঙ্গে আমার শেষ জমজমাট স্মৃতি। তারপরে ওঁর সঙ্গে সেভাবে দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। এরপর ২০০০ সালে যখন টাইমস মিউজিক থেকে আমার একটা অ্যালবাম বেরয়, ‘মধুর স্মৃতি’ নামে, সেখানে আমি আশাজির একখানা গান গেয়েছিলাম। ‘দিওয়ানে হো’– ‘ময়না গো’ গানটার হিন্দি ভার্সন। সে গানটার খুব প্রশংসা করেছিলেন উনি। সলিল চৌধুরী রচনাসংগ্রহ বেরনোর সময়, লতাজি ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন, সেসময় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কিন্তু আশাজির সঙ্গে আর সেভাবে দেখা হয়নি। বাবার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে অনুষ্ঠানে আমি চেয়েছিলাম, আশাজি উপস্থিত থাকুন। কিন্তু সেই সুযোগটাও হল না। ব্যক্তিগতভাবে এটাও আমার দুর্ভাগ্যই বলা চলে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved