‘যাত্রা’ (২০০৬)। রেখা, নানা পাটেকর, দীপ্তি নাভাল। দুর্ধর্ষ অভিনয় করেছিল নানা। শুটিং হয়েছিল রামোজি স্টুডিওতে। হায়দরাবাদে কিছুটা, কিছুটা কলকাতায়। নানার চরিত্র– দশরথ– দ্বৈত চরিত্র। এই ছবিতে নানা নিজে একজন লেখক। আর ওর লেখার যে চরিত্র, তাকেও আমরা ছবিতে দেখিয়েছিলাম। পুরো ছবিটাই বাস্তব আর কল্পনার মিশেল। হায়দরাবাদের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং রাস্তাতেও নানাকে নিয়ে শুট করা হয়েছিল। ভিড়ের মধ্যে নানা বা রেখাকে নিয়ে শুট করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য! কিন্তু নানার স্পিরিট দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ‘গৌতম, আমরা নেমে পড়ছি, হ্যাঁ? চিন্তা নেই!’
নানা এসেছিল নানারকম শরীর নিয়ে। নানারকম মানে, মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে পারে যে শরীর, আলাদা করে চেনা যাবে না, এইরকম। কমন ম্যানের সেই চোখ-মুখ-শরীর বিভঙ্গ– এই ভারতের সিনেপ্রেমী মানুষেরা গ্রহণ করেছিল। এবং অবশ্যই চরিত্রে, ওর অভিনয়ে একটা অনমনীয় দৃঢ়তা ছিল। নানা নাটক করেছে। ফলে একটা পুরনো ট্রেনিং তো ছিলই। আর ছিল অসম্ভব ডেডিকেশন।
কীরকম? সে কথায় আসছি।
নানার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা সম্ভবত নয়ের দশকের মাঝামাঝি। তার আগে নানার বেশ কিছু ছবি দেখে ফেলেছি। আমারও বেশ ক’টা ছবি করা হয়ে গিয়েছে। মুম্বইয়ে সেই প্রথম দেখা মনমোহন শেট্টির ‘অ্যাড ল্যাব’-এ। চা-টা খাওয়া চলছে। নানা গল্পকথা। নানা বলল, ‘আমরা একটা ছবি করব না একসঙ্গে?’ বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, হবে।’

সে ছবিই ‘যাত্রা’ (২০০৬)। রেখা, নানা পাটেকর, দীপ্তি নাভাল। দুর্ধর্ষ অভিনয় করেছিল নানা। শুটিং হয়েছিল রামোজি স্টুডিওতে। হায়দরাবাদে কিছুটা, কিছুটা কলকাতায়। নানার চরিত্র– দশরথ– দ্বৈত চরিত্র। এই ছবিতে নানা নিজে একজন লেখক। আর ওর লেখার যে চরিত্র, তাকেও আমরা ছবিতে দেখিয়েছিলাম। পুরো ছবিটাই বাস্তব আর কল্পনার মিশেল। হায়দরাবাদের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং রাস্তাতেও নানাকে নিয়ে শুট করা হয়েছিল। ভিড়ের মধ্যে নানা বা রেখাকে নিয়ে শুট করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য! কিন্তু নানার স্পিরিট দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ‘গৌতম, আমরা নেমে পড়ছি, হ্যাঁ? চিন্তা নেই!’
এই ছবিতেই একটা ভোরবেলার দৃশ্য। নানা ও রেখার। রাত দুটোর সময় ইউনিটকে বলে রেখেছিলাম লোকেশনে পৌঁছে যেতে। কারণ প্রথম আলোয় শটটা হবে। সিনটা এইরকম যে, নানা সাইকেল চালিয়ে এসে দেখবে রেখা পড়ে আছেন। তা, সেই সাইকেল চালানোর জন্য ও আমার অ্যাসিস্ট্যান্টদের কাছ থেকে একটা রিং চেয়েছিল। সাইকেল চালানোর সময় গ্রামের দিকে অনেকে ধুতির তলায় একটা রিং ব্যবহার করত। নানা বলেছিল, এটা ওর দরকার।

শুটিংয়ের সময় তা জোগাড় করে ওঠা সম্ভব হয়নি। নানা এতই ক্ষিপ্ত হয়েছিল যে, চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট অরুণ গুহঠাকুরতাকে অকল্পনীয় ভাষায় গালাগাল করে! এত সবের মধ্যেও ভোরের আলো চলে যাচ্ছে। আলো বদলে যাচ্ছে। কাজে ফিরতে হবে। সিকোয়েন্সটা করলাম আমরা। চমৎকার হল।
সেদিন, খানিক পরে, নানাকে বললাম যে, ‘তুমি অরুণদার সঙ্গে অত রাগারাগি করলে কেন? সিন তো চমৎকার বেরল।’ ‘না-না-না, ওটা অনেক ভালো হত, লাস্ট মোমেন্টে কোনও রকমে ওটা করলাম!’ বলল নানা। নিজের চরিত্রের জন্য ও ছিল এতটাই নিমগ্ন। তা নিয়েই এত ভাবত বলেই রেগে যেত। তবে যাত্রার গল্প এখানেই শেষ নয়।

সেদিন রাত্রিবেলা হোটেলে ফিরে নানাকে বললাম, ‘অরুণ গুহঠাকুরতা এত সিনিয়র একজন লোক, তাঁকে তুমি এই ভাষায় গালাগাল করলে?’ নানা চুপ করে রইল। রামোজিতে টেকনিশিয়ানদের একটা চমৎকার হোটেল ছিল। আর একটা হোটেলে নানা, রেখা, দীপ্তি, আমি আর নীলাঞ্জনা থাকতাম। আমি রাত্রিবেলা ফিরে হোটেলের ঘরে এসেছি। পরের দিনের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা বাকি। তাই নানার ঘরে নক করলাম। নানা বলল, ‘গৌতম, আমি আসছি তোমার ঘরে।’
নানা এল। ওকে সেদিন খুব বকাবকি করলাম। ‘তুমি কী করছ এটা? আমি এক্সপেক্ট করিনি। এরকম একটা চরিত্রে অভিনয় করছ, তোমার যদি এরকমভাবে টেম্পার লুজ করো, কী করে হয়? আর এমন একটা সিনিয়র লোককে বলেছ…’

নানা কিচ্ছু বলল না। খানিকক্ষণ পর নিজের ঘরে চলে গেল। পরের দিন ভোরবেলা। ও চলে গিয়েছে টেকনিশিয়ানদের হোটেলে। সটান রান্নাঘরে। সেই ভোর থেকে নানা তৈরি করেছিল সক্কলের জন্য ব্রেকফাস্ট। ব্রেকফাস্ট অরুণদার হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘আই অ্যাম ভেরি সরি, দেখো, আমি রান্না করেছি, খেয়ে নাও তোমরা।’
নানা এইরকমই। নানাকে অনেকেই বলে যে খুব বদমেজাজি। আসলে তা নয়। চরিত্রের মধ্যে ডুবে থাকার চেষ্টা করত সারাক্ষণ। মেথড অ্যাক্টর আর কী।
নানা চলে গেল। এখনও অনেক কিছু করার ইচ্ছে ছিল ওর। মাত্র ক’দিন আগেই দেখা হয়েছিল আমাদের। শুধুমাত্র একজন অসাধারণ অভিনেতা, তা নয়, ওর মতো মানুষও খুব কম পাওয়া যায়। নিঃশব্দে কত মানুষকে সাহায্য করত, ওর ক্ষমতা অনুযায়ী, তা বলে শেষ করা যায় না। বাইরে কোনও দিন সেকথা বলেনি নানা। চোখের সামনে আমি দেখেছি বেশ কয়েকবার।
বিদায় নানা। যাত্রা শুভ হোক।
………………………………
ছবিঋণ: লেখক
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved