ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখি, ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পে আগাগোড়া একটা ‘নেপোটিজম’ কাজ করেছে। গুরুর সবটুকু বেশিরভাগ তাঁর সন্তানেরা, পরিবারের মানুষরা পেয়ে থাকে। সেদিক থেকেও গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র ছিলেন ব্যতিক্রমী। তাঁর শিল্পের হকদার তাঁর পুত্র-পুত্রবধূ যেমন, ঠিক ততটাই তাঁর অন্যান্য ছাত্রছাত্রী। তাঁর সৃষ্ট সমস্ত গান-তাল-বোল যেগুলি নাচের জন্য প্রয়োজন হয় সেগুলির তেমন কোনও পেটেন্ট নেওয়া নেই। কোনও কিছুই তিনি কুক্ষিগত করে যাননি। সব জিনিস ইউটিউবে মেলে। ঠিক এ-কারণে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের ওডিসি নৃত্য এতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তাঁর এক জীবনেই।
ভাস্কর মজুমদার
৭ এপ্রিল, ২০০৪। হাওড়া স্টেশনে বহু তরুণ-তরুণীর ভিড়। সকলেই ভুবনেশ্বরের টিকিট চাইছে। কেউ লোকাল ট্রেন ধরছে। কেউ টিকিট ছাড়াই ভুবনেশ্বরগামী যে-কোনও ট্রেনে উঠে যাচ্ছে। কারও পায়ে একটা চটি পর্যন্ত নেই। বোঝা যাচ্ছে, যেখানে যে-অবস্থায় ছিল, সেভাবেই বেরিয়ে পড়েছে সকলে। কিন্তু ঘটনা কী? ঘটনা হল ওডিসি নৃত্যের গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন! কলকাতা শহরের সঙ্গে তাঁর ছিল স্নেহের বাঁধন। কলকাতা তাঁকে ছাত্রছাত্রী, খ্যাতি, প্রাচুর্য– সব দিয়েছিল। হঠাৎ তাঁর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে কাতারে সব ছাত্রছাত্রী তাদের প্রিয় ‘গুরুজি’কে একবার শেষ দেখা দেখতে ছুটছে। এমন সৌভাগ্য সকলের হয় না। তিনি ছিলেন বাংলার এমনই আপনজন!
শিক্ষক কেলুচরণ মহাপাত্র। ছবিঋণ: শারন লোয়েন
নাট্যবিদ শ্যামানন্দ জালান শুধুমাত্র যে থিয়েটারের প্রচার ও প্রসার নিয়ে কাজ করছিলেন কলকাতায়, তা নয়। তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্যের নানা দিক উন্মোচন করেছিলেন কলকাতায় স্থাপিত তাঁর ‘পদাতিক’ থেকে। বিভিন্ন নৃত্য গুরুদের তিনি এ-শহরে আমন্ত্রণ করতেন লেকচার-ডেমোনস্ট্রেশনের জন্য। কুচিপুড়ির গুরু ভেমপত্তি চিন্নাসত্যম, মণিপুরীর গুরু বিপিন সিং, কথকের বিরজু মহারাজ ছিলেন নিয়মিত মুখ। আরেকজন দিকপাল শিল্পী ওই সময় কলকাতায় আসতে শুরু করলেন। তিনি ওডিসি নৃত্যের গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র। সেটা সাতের দশক। কলকাতা শহর-সহ সমগ্র বাংলা তখন খানিক দিশাহীন সামাজিক ও রাজনৈতিক দোলাচলের মধ্য দিয়ে চলেছে। তার মাঝেও সংস্কৃতির অন্দরে অনেক বিপ্লব সে-সময় ঘটে যাচ্ছিল।
কটকের বাড়িতে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র
গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র এর কিছু বছর আগে ‘সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার’-এ (১৯৬৬) ভূষিত হয়েছিলেন। তখন ওডিসি নৃত্যকে মানুষ প্রায় একটি ‘লোকনৃত্য’ হিসেবে দেখে। এই নৃত্যের শাস্ত্রীয় দিকটি নিয়ে কেউ ভাবিত ছিল না। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র ‘সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার’ পাওয়ার পর ওডিসি নাচটা আসলে কী, তা দেখতে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সেই নাচের একটি প্রদর্শনী হয়েছিল দিল্লিতে। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র মৃদঙ্গ বাজিয়েছিলেন, গান গেয়েছিলেন রঘুনাথ পাণিগ্রাহী এবং ওডিসি নৃত্য করে দেখিয়েছিলেন শ্রীমতী সংযুক্তা পাণিগ্রাহী। দর্শক নড়েচড়ে বসেছিল। এমন অপূর্ব একটি নৃত্য ওড়িশাতে আছে যুগ যুগ ধরে? এ তো যে-কোনও শাস্ত্রীয়নৃত্যের সমতুল্য! এবং তখনই সকলে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র ও তাঁর শিল্পের মর্মোপলব্ধি করতে শুরু করে। দিকে দিকে নাম ছড়িয়ে পড়ে তাঁর। কিন্তু তিনি তো তখনও মূলত বাদ্যকার। তাঁর শিল্প ফুটে ওঠে প্রিয় ছাত্রী সংযুক্তার নৃত্যে কেবল। তবে প্রকৃত গুরু যিনি তাঁর শিল্প একজনেই শেষ হয়ে যায় না। ঠিক এই জায়গাটি পূর্ণতা পেয়েছিল যখন তিনি কলকাতার ‘পদাতিক’-এ আসা শুরু করলেন। কলকাতায় তখন উদয়শঙ্কর স্টাইল অফ ডান্সের রমরমা। ভরতনাট্যম, মোহিনীআট্টম ও কথাকলি নিয়ে গুরু গোবিন্দন কুট্টি ও গুরু শ্রীমতী থাঙ্কমণি কুট্টিও আছেন। এবং যতটুকু ওডিসি ছাত্রছাত্রীরা শেখে তারা শেখে গুরু মুরলীধর মাঝির কাছে। মুরলীধর মাঝি কলাবিকাশ কেন্দ্রের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর ওডিসি নৃত্যের প্রকরণে কাঁধের ব্যবহার ছিল। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র যেদিন থেকে ‘পদাতিক’-এ এলেন কলকাতার বহু ছেলেমেয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে শুরু করল।
কলা বিকাশ কেন্দ্রে কেলুচরণ মহাপাত্র
কী ছিল গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের ওডিসি নৃত্যে? ছিল এক নতুন ভাষা এবং এক অপূর্ব শৈল্পিক প্রকরণ। তাঁর নৃত্য গুরু পঙ্কজ চরণ দাসের মতো প্রায় গোটিপুয়ো ধরনের শারীরিক নৃত্য নয় আবার গুরু দেবপ্রসাদ দাসের নৃত্যের মতো ভাবনির্ভরও নয়। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের নৃত্যশিল্প ছিল শরীরী ভাষা ও ভাবের এক অনির্বচনীয় মিশেল। ঐতিহ্যবাহী ওডিসি নৃত্য হত চৌকা পায়ে অর্থাৎ দু’টি গোড়ালি মুখোমুখি রেখে অর্ধেক বসে। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র প্রথমে এই অধিষ্ঠানকে পরিবর্তন করেছিলেন। তাঁর নৃত্য ছিল অর্ধচৌকাতে অর্থাৎ দু’-গোড়ালির মাঝখানে কয়েক আঙুলের ব্যবধান থাকবে মাত্র, অনেকটা নয়। ওড়িশার যেসব মন্দিরগাত্রের স্থাপত্য থেকে ওডিসি নৃত্যের উদ্ভব অর্ধচৌকাতেই নাকি সেইসব স্থাপত্যের কাছাকাছি পৌঁছনো যায় শারীরিকভাবে।
মন্দিরশৈল্য ও নৃত্য সমান্তরালভাবে ছিল তাঁর নৃত্যমুদ্রায়
কলকাতায় যখন তাঁর শিক্ষার্থী বাড়তে থাকল তখন বহু ছাত্রছাত্রীকে আরও বেশি তৈরি হওয়ার জন্য তিনি ওড়িশার কটকে তাঁর গুরুকুলে আহ্বান করতেন। সংযুক্তা পাণিগ্রাহী তখন স্বাধীনভাবে কাজ করছেন। সোনাল মানসিংহ, মাধবী মুদ্গল কিংবা প্রতিমা বেদীরা ‘সিনিয়র’ শিষ্যা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছেন শুধু নয়, এঁদের হাত ধরে ওডিসি নৃত্যের দেশ-বিদেশ জুড়ে খ্যাতি বেড়েই চলেছে। কিন্তু দলে দলে ছাত্রছাত্রী আসলে কলকাতা থেকে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র পেয়েছিলেন। কৃষ্ণা নন্দী, সুধা দত্ত, দীপান্বিতা রায়, সুতপা তালুকদার, শর্মিলা বিশ্বাস, অরুন্ধতী রায়, পৌষালী মুখোপাধ্যায়, আলোকপ্রভা কানুনগো, রিনা জানা, নন্দিনী ঘোষাল, মায়া ভট্টাচার্য, কাকলি বসু, ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়, দেবমিত্রা সেনগুপ্ত, রাজীব ভট্টাচার্য, রঘুনাথ দাস, অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবিকাশ মুখোপাধ্যায়, শিবনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়োমিতা দাশগুপ্ত, নীলাঞ্জনা মুখোপাধ্যায়– কে নেই সেই তালিকায়!
শিক্ষক হিসেবে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র ছিলেন এক কথায় অনবদ্য। কেন? ছাত্রছাত্রীদের প্রতিটি অঙ্গ তিনি ওডিসি নৃত্যোপযোগী করে তুলতেন। এবং বয়স তাঁর যত এগতে থাকল নতুন ছাত্রছাত্রীদের শেখার স্পৃহাও বাড়তে থাকল সেই ছন্দে। ‘গীতগোবিন্দ’ থেকে নতুন নতুন অভিনয় তিনি কম্পোজ করতে শুরু করলেন। ভারতে শাস্ত্রীয়নৃত্য প্রায় আটটি। কিন্তু গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের মতো গীতগোবিন্দকে এমন নিংড়ে নিতে পেরেছিলেন মাত্র কয়েকজন হাতে-গোনা শিল্পী। অভিনয় শিল্পে তাঁর সৃষ্ট যে এক অপূর্ব সৌকুমার্য ছিল সেটা পরবর্তী কালে তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যদের মধ্যে চালিত হয়েছিল। এর মাঝে প্রকৃত শিল্পীর মতো তিনি নিজের শিল্পের অনেক পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। এমনিতে একই তালের মধ্যে তিনি এত জাতি তৈরি করতে পারতেন যে, তা কথক নৃত্যশিল্পীদেরও অবাক করত।
প্রথম দিকে তাঁর ওডিসি নৃত্য ছিল বেশিরভাগ দ্রুত লয়ের। সংযুক্তা পাণিগ্রাহীর নাচে তা ধরা আছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই নাচে আরও স্থৈর্য এল। আরও গভীর হল সেই শিল্প। সেই প্রকরণ আবার প্রাণ পেল পুত্রবধূ সুজাতা মহাপাত্রের নৃত্যে। সেই নাচও তাঁরই শেখানো। জীবদ্দশায় নিজের শিল্পের এমন পরিবর্তন খুব কম শিল্পী ঘটাতে পেরেছিলেন। তাছাড়া, তিনি শিষ্যদের ভীষণ রকম স্বাধীনতা দিতেন। তাঁরই শিষ্য অথচ একদিকে শর্মিলা বিশ্বাস, অন্যদিকে প্রতিমা বেদীর সূত্রে সুরূপা সেন কিংবা তাঁর পুত্র রতিকান্ত মহাপাত্র নিজেদের মতো করে আলাদা প্রকরণ তৈরি করতে পেরেছেন। আরও অনেকেই তা করেছেন।
প্রকরণ গড়েছেন, ভেঙেছেনও বহুবার
ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখি, ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পে আগাগোড়া একটা ‘নেপোটিজম’ কাজ করেছে। গুরুর সবটুকু বেশিরভাগ তাঁর সন্তানেরা, পরিবারের মানুষরা পেয়ে থাকে। সেদিক থেকেও গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র ছিলেন ব্যতিক্রমী। তাঁর শিল্পের হকদার তাঁর পুত্র-পুত্রবধূ যেমন, ঠিক ততটাই তাঁর অন্যান্য ছাত্রছাত্রী। তাঁর সৃষ্ট সমস্ত গান-তাল-বোল যেগুলি নাচের জন্য প্রয়োজন হয় সেগুলির তেমন কোনও পেটেন্ট নেওয়া নেই। কোনও কিছুই তিনি কুক্ষিগত করে যাননি। সব জিনিস ইউটিউবে মেলে। ঠিক এ-কারণে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের ওডিসি নৃত্য এতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তাঁর এক জীবনেই। আজ দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যরা এক জায়গায় হলে বোঝা যায় কী মানের সব শিল্পী তিনি তাঁর নৃত্যশিল্পের মাধ্যমে তৈরি করে গিয়েছেন!
দারিদ্র ছিল এক সময়। প্রথম জীবনে মিস্ত্রির কাজ করেছেন, নাটকের দলে ছিলেন, সিনেমায় যুক্ত থেকেছেন। স্বামী হিসেবে, বাবা হিসেবে, গুরু হিসেবে সমস্ত কর্তব্য পালন করেছেন। কিন্তু নিজেরটা-গোছাতে-হবে এমন মানসিকতা নিয়ে চলেননি। পরবর্তী কালে ছাত্রছাত্রীদের কখনও কেবল অর্থের বিনিময়ে কিছু শেখাননি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি নতুন সৃষ্টিতে মজে ছিলেন। ইউটিউবে যে তাঁর গীতগোবিন্দের অভিনয়গুলি পাওয়া যায় সেগুলি বেশিরভাগ তাঁর বাইপাস সার্জারি হওয়ার পর!
আজ ৮ জানুয়ারি। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র (১৯২৬-২০২৬) জন্মশতবর্ষ পূর্তি। তাঁর মতো বিরাট শিল্পী এবং দিকপাল গুরু অবশ্যই গত ১০০ বছরে ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্যের আঙিনায় খুব কম দেখা গিয়েছে। কিন্তু যেসব ছাত্রছাত্রীকে তিনি তৈরি করে গিয়েছেন তাঁদের মাধ্যমে তাঁর ওডিসি নৃত্যশিল্প টিকে থাকবে আরও বহু শত বছর।