Purnendu Pattrea his cover design and calligraphy | Robbar
Robbar
  • ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রচ্ছদশিল্পের কবি পূর্ণেন্দু পত্রী

পিজি হসপিটালের উডবার্ন ওয়ার্ডে জীবনের শেষ সময়ে ক্যানসার-পীড়িত পূর্ণেন্দু তাঁর শেষ সাক্ষাৎকারে দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে বলেছিলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরেই সভাসমিতিতে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছি। অভিমানে, ক্ষোভে। আসলে আমরা যে কিছু করেছি, সেকথা যেন মনেই হয় না। প্রচ্ছদের কথাই ধরো, এতদিন বইয়ের জন্য ভেবেছি, কাজ করেছি, একথা যেন কেউ মনেই করে না। এখন মনে হয়, ৩০০০ মলাট না এঁকে ৩০০ রান করলে অনেক বেশি সম্মান পেতাম। আসলে ইতিহাস বোধটাই আমরা নষ্ট করে ফেলেছি।” বাংলা প্রচ্ছদের জগৎ যেন না ভোলে তার পূর্ণেন্দু পত্রীর মতো আকাশ আছে। যে আকাশ রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, আলো কোনওকিছু দিতেই কার্পণ্য করে না।

শেষ আপডেট: মার্চ ১৯, ২০২৬, ১১:৩৪   
Facebook WhatsApp Messenger

যে বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয় লাভের মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষার শুরু, যে অক্ষরদের পরপর সাজিয়ে আমাদের পড়তে-লিখতে-বলতে শেখা, যে অক্ষরমালা দিয়ে আমাদের এই বিরাট সাহিত্যসম্ভার, সেই অক্ষরেরই শিল্পিত রূপ বাংলা সাহিত্যের প্রচ্ছদ ও অলংকরণে এক বিশিষ্ট অবলম্বন। মানুষের ভাবনা-চিন্তার সঙ্গে তার ভাষাকে আলাদা করা যায় না, তেমনই এই ভাষার থেকে আলাদা করা যায় না তার অক্ষরকে। আর এই অক্ষরই যখন বিচিত্রভাবে পরপর সজ্জিত হয়ে একে অপরের সঙ্গে শিল্পিত সহাবস্থানে আবদ্ধ হয়, তাকেই আমরা বলি ‘অক্ষরশিল্প’। ইংরেজিতে ‘ক্যালিগ্রাফি’। নন্দলাল বসু যার নাম দিয়েছিলেন ‘লেখাঙ্কন’। অবশ্য ইংরেজিতে যা ‘ক্যালিগ্রাফি’ তা মূলত অক্ষর লেখার শিল্প। সেই অক্ষরকেই যখন আমরা আঁকব নিজের মতো, তার নাম হয়ে যাবে ‘লেটারিং’। আর ‘টাইপোগ্রাফি’ হল সেই অক্ষরকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করার মুনশিয়ানা। আবার ‘পিক্টোগ্রাফি’ হল অন্য বিষয়। ‘পিক্টোগ্রাফি’ বা বাংলায় ‘চিত্রাঙ্কন’ হল শব্দ, ধারণা বা সংখ্যাসূচক তথ্য উপস্থাপনের জন্য ছবি, প্রতীক বা আইকনের ব্যবহার, যা মূলত ‘Picture Writing’ বা চাক্ষুষ যোগাযোগের একটি রূপ হিসেবে কাজ করে।

zoom

বাংলায় অক্ষরশিল্প চর্চার একটি ধারাবাহিক ইতিহাস আছে, যেখানে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় থেকে সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত অক্ষরশিল্প চর্চার একটি সমৃদ্ধ ও সামগ্রিক ধারা আমরা দেখতে পাই। সত্যজিৎ রায়ের পর বাংলা অক্ষরকে যিনি শিল্পের সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গিয়েছেন, তিনি পূর্ণেন্দু পত্রী। বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট কোনও লেখার হেডপিস কিংবা চলচ্চিত্রের নামের লেটারিং– সর্বত্রই তিনি তৈরি করেছেন নিজস্ব এক মৌলিক ঘরানা। অক্ষরকে কখনও মাত্রা থেকে মুক্তি দিয়ে স্বাধীনভাবে ডানা মেলতে দিয়েছেন, কখনও মাত্রাকে সঙ্গে নিয়েই অক্ষরের মুক্ত চলন নিশ্চিত করেছেন। তার অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে আছে তাঁর সারাজীবনের সামগ্রিক কাজে। 

zoom
পূর্ণেন্দু পত্রী

‘নিজের সম্পর্কে’ লিখতে গিয়ে পঞ্চাশোর্ধ্ব পূর্ণেন্দু পত্রী বলেছিলেন, ‘…মলাট আমার বাল্যকালের বিয়ে করা বউ। তা হলে কবিতা? না কবিতাই বরং বাল্য-বিবাহের বউ। মলাট দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। দুই সতীনের ভালোই ভাবসাব এখনো পর্যন্ত।’ মলাটকে ‘বাল্যকালের বিয়ে করা বউ’ বলেও শুধরে নিয়ে নিজেকে প্রাথমিক পরিচয়ে কবি হিসেবেই দেখতে চাইছেন পূর্ণেন্দু পত্রী। কিন্তু আরেকটি বিষয় লক্ষ করার মতো। তা হল প্রচ্ছদ আর কবিতার ‘ভাবসাব’-এর কথা। পূর্ণেন্দু পত্রীর প্রচ্ছদ দেখলেই তা সহজে অনুধাবন করা যায় যে, কেবল টেকনিক-প্রধান একজন শিল্পী হলে সেসব প্রচ্ছদ করা যায় না। বরং পূর্ণেন্দুর মধ্যে এক অখণ্ড কবিসত্তা আছে বলেই তাঁর শিল্পীমানস জন্ম দিতে পেরেছে একের পর এক স্মরণীয় প্রচ্ছদ। আর এখানেই তাঁর কবিসত্তা ও শিল্পীসত্তা হাত ধরাধরি করে হেঁটেছে দীর্ঘতম পথ। শুধু বইয়ের ধারাভাষ্যকার নয়, তাঁর প্রচ্ছদ একাধারে ইঙ্গিত আর ব্যাঞ্জনাময় হয়ে অর্জন করেছে অবিমিশ্র কাব্যগুণ। আর তাই পূর্ণেন্দু পত্রী কেবল প্রচ্ছদশিল্পীই নন বরং প্রচ্ছদশিল্পের কবিও বটে। আর এই প্রচ্ছদশিল্পে তাঁর বিশিষ্ট অবলম্বন হল অক্ষরশিল্প, যার মধ্যে তিনি সম্পৃক্ত করেছেন ব্যঞ্জনাকে। আক্ষরিক অর্থের ঊর্ধ্বে উঠে অক্ষরের সুনির্দিষ্ট বিন্যাসে বইয়ের মলাটে পূর্ণেন্দু অক্ষরশিল্পের মাধ্যমে পরিস্ফুট করেছেন সেই বইয়ের বিষয়বস্তু। বইয়ের নামটিকেই কখনও এঁকে কখনও লিখে বা কখনও অক্ষরকে সম্পূর্ণ আড়ালে রেখে, বইয়ের বিষয়টিকে দ্যোতনা দিয়েছেন সফলভাবে। কবিরাও কি তাই করেন না? কবিরা বলেন কম, আড়াল করেন বেশি আর সেই না-বলা বাণী খুঁজতে হয় পাঠককে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে। এভাবেই শিল্পীরা পাঠক, দর্শককে দিয়ে পরিশ্রম করিয়ে নেন– মন ও মননের পরিশ্রম। পূর্ণেন্দুও তাঁর অক্ষরশিল্প দিয়ে সেই কাজই করেছেন। নান্দনিক ইন্দ্রজাল বিস্তার করে পাঠকের মন ভোলাননি, বরং তাকে দিয়ে ভাবিয়ে নিয়েছেন অনেকখানি। এখানেই আমরা বলতে পারি, পূর্ণেন্দু তাঁর অখণ্ড কবিসত্তা নিয়ে অক্ষরশিল্প চর্চায় প্রবৃত্ত হয়েছেন– অক্ষরশিল্প ও সর্বোপরি প্রচ্ছদে সংশ্লিষ্ট করেছেন অবিমিশ্র কাব্যগুণ।

zoom

পূর্ণেন্দু পত্রীর করা প্রচ্ছদে প্রকাশিত হয় চাণক্য সেনের বই ‘রেপ’। এখানে অক্ষরের আশ্চর্য মর্ফিং আপনারা লক্ষ করুন। এই মর্ফিং পূর্ণেন্দুর আরও নানা প্রচ্ছদে দেখা গিয়েছে। কয়েকটি অক্ষর বিশিষ্ট একটি শব্দের যে অর্থ, সেই অর্থকে সেই শব্দের অঙ্কনের মধ্যে দিয়েই ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা পূর্ণেন্দুর উৎকৃষ্ট শিল্পীসত্তার পরিচয়। একটি অক্ষর বা শব্দের ভেতরকার সত্তাকে আবিষ্কার করে, তুলির একনিষ্ঠতায় তাকে ক্রমাগত রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে সেই শব্দের অর্থে রূপান্তরিত করার আশ্চর্য উদাহরণ এই ‘রেপ’ বইটি– যেখানে ‘রেপ’ শব্দটি ক্রমাগত মর্ফড হতে হতে পরিণত হয় পিছমোড়া পা আর এলোচুলে অবিন্যস্ত এক নগ্ন নারীমূর্তিতে। অনুভবী বা subjective প্রচ্ছদ এবং তাঁর অক্ষরশিল্প এখানেই নিজের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সেরকমই তাঁর নিজের একটি বই ‘সিনেমা সিনেমা’। বইয়ের জমিকে তিনি মোট ১৫টি ভাগে ভাগ করেছেন। আনুভূমিকভাবে তিন ও উল্লম্বভাবে পাঁচটি ভাগে। ওপরের তিনটি ভাগে এক, দুই, তিন করে লেখা সিনেমা, সিনেমা, পূর্ণেন্দু পত্রী। ক্রমশ এই তিনটি লেখা রূপান্তরিত হয়ে নীচের দিকে নামছে এবং শেষের তিনটি খোপে মর্ফড হয়ে যাচ্ছে– এক, একজন পুরুষের মুখ; দুই, একজন নারীর মুখ; তিন, একটি ফিল্মের টুকরো।

zoom

এছাড়াও আছে পূর্ণেন্দু পত্রীর নিজের লেখা বই ‘প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ’, যার প্রচ্ছদ করেছিলেন শিল্পী নিজেই। প্রচ্ছদে দেখা গেল, বইটির নামের প্রতিটি অক্ষর হয়ে উঠেছে প্রিয় পাঠক-পাঠিকাদের মুখ। এবং আশ্চর্যভাবে সেখানে পুরুষমুখগুলি আঁকা হল শ্যামল সবুজ রঙে এবং নারীমুখগুলি আঁকা হল হালকা লাল রঙে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সাহিত্য পাঠের পর পুরুষ ও নারীমনে যে একইরকম প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় না, বরং একই সাহিত্য নারী এবং পুরুষের মনে ভিন্ন অভিঘাত নিয়ে আসতে পারে– এই দুই রঙের পার্থক্য সেই ভাবনাকেই ইঙ্গিত করে। শ্যামল রঙের মধ্যে একটা শান্ত মাধুর্য আছে, অন্যদিকে লাল রং চঞ্চলতার দিক। এভাবে দুই রং আবেগের দু’রকম দিককে ফুটিয়ে তুলল সহজভাবে।

zoom

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বেশ কয়েকটি কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন পূর্ণেন্দু পত্রী। তার মধ্যে কয়েকটি হল ‘পরশুরামের কুঠার’, ‘প্রভু নষ্ট হয়ে যাই’, ‘অঙ্গুরী তোর হিরণ্য জল’ প্রভৃতি। শক্তির কবিতার বইয়ের নামে যে শিহরণ লেগে থাকে তাকে প্রচ্ছদে ফুটিয়ে তোলা খুব সোজা কথা নয়। কিন্তু মানুষটি যখন পূর্ণেন্দু পত্রী তখন ইন্দ্রজাল সৃষ্টি হবেই। প্রথমেই ধরা যাক ‘পরশুরামের কুঠার’ বইটির কথা। এখানে ‘প’-কে তিনি দিয়ে দিলেন একটি আস্ত কুঠারের অবয়ব। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে ন্যারেটিভ-আশ্রয়ী কাজ বলে মনে হলেও, একটি অক্ষরকে প্রত্যক্ষভাবে একেবারেই না-লিখে কেবল কুঠার এঁকে সেই অক্ষরের ইঙ্গিত দেওয়ার জন্য যথেষ্ট সাহস লাগে। আসলে মানুষ তো বহু বিচিত্র আকৃতির পাথরের মধ্যে নিরাবয়ব ঈশ্বরকে খুঁজে পায়। সেই মনস্তত্ত্ব পরোক্ষে এখানেও ছায়া ফেলেছে বলে মনে হয়। ঠিক যে কারণে ‘প’ অক্ষরটি প্রচ্ছদে প্রত্যক্ষভাবে না-থাকা সত্ত্বেও কুঠারটিকে ‘প’ হিসেবে পড়ে নিতে আমাদের অসুবিধে হয় না। এবং এই কুঠার-সহ বইয়ের নামটিকে শিল্পী প্রচ্ছদের মধ্যে উল্লম্বভাবে এমন এক লাল রঙে আঁকলেন, যে লাল রং একাধারে গোধূলিলগ্নের সূর্যের ধ্যানমগ্নতা ও রাগান্বিত ব্যক্তিত্বকে নির্দেশ করে; যা পরশুরামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আর পিছনে থাকে গাঢ় হলুদ রং, যাতে করে ‘পরশুরামের কুঠার’ আরও বেশি ব্যক্তিত্বময় হয়ে ওঠে। এখান থেকেই বোঝা যায় একাধারে প্রচ্ছদশিল্পী এবং অক্ষরশিল্পী হিসাবে পূর্ণেন্দু ঠিক কতখানি গভীরতাকে স্পর্শ করার দক্ষতা রাখতেন। আর ‘সোনার মাছি খুন করেছি’-র প্রচ্ছদে ‘মাছি’ শব্দটির ওপর নির্মম ছুরি চালিয়ে তাকে আক্ষরিক অর্থেই খুন করলেন পূর্ণেন্দু।

zoom
zoom

অক্ষরের মর্ফিং বা ট্রান্সফর্মেশন নিয়ে অসামান্য কাজ করেছেন পূর্ণেন্দু। তার পরিচয় আমরা আগেই পেয়েছি তাঁর নিজের বই ‘সিনেমা সিনেমা’-র প্রচ্ছদে। তেমনই একটি বই ‘মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী’। শিবরাম চক্রবর্তীর ‘মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী’ বইটির প্রচ্ছদে কয়েকটা মাত্র আঁচড়েই তিনি বলে দিয়েছেন এক দীর্ঘ ইতিহাস তথা দর্শনের কথা, একাধারে বইটির সারবস্তুকেও প্রচ্ছদের একটিমাত্র পাতায় তুলে ধরেছেন অতুলনীয়ভাবে। তিনি দেখিয়েছেন ভারতীয় ‘ওঁ’ কীভাবে মাত্র পাঁচটি স্তরে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির সিম্বল ‘তারা-হাতুড়ি-কাস্তে’-তে।

zoom

অন্যদিকে আছে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার বই ‘উলঙ্গ রাজা’। এই প্রচ্ছদে শিল্পী রাজাকে গড়ে তুললেন অক্ষর দিয়ে। এক একটা অক্ষর একে অন্যের সঙ্গে ওপরে নীচে, পাশাপাশি বসে, গড়ে তুলেছে রাজাকে। অক্ষরগুলোকে আঁকা হল ক্রসহ্যাচ-এ, যাতে বুনোটের আদল আরও পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে প্রচ্ছদে ফুটে উঠল অদৃশ্য পোশাক পরিহিত এমন এক কাল্পনিক রাজা, যিনি উলঙ্গ। সেরকমই আরও উল্লেখ করা যেতে পারে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘পদাতিক’। যেখানে শুধুমাত্র অক্ষর দিয়েই তিনি গড়ে তুললেন এক কমরেডের অবয়ব– যে দৃঢ় চিত্তে হাতে পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ‘প’ ও ‘দা’ হয়ে উঠেছে কমরেডের পা। ‘ত’ হয়ে উঠেছে পতাকাধারী হাত আর ত-এর হ্রস্ব-ই হয়ে উঠেছে সেই উদ্যত পতাকাটি। যাকে দেখামাত্রই পাঠকের মনে আসতে বাধ্য ‘পদাতিক’ কবিতার সেই অবিস্মরণীয় পঙ্‌ক্তিগুলি– ‘উদাসীন ঈশ্বর কেঁপে উঠবে না কি/ আমাদের পদাতিক পদক্ষেপে?’।

zoom

এছাড়াও আছে শান্তি লাহিড়ীর ‘বন্দি ময়না কথা কয় না’। এখানে বইয়ের নামের প্রতিটি শব্দই হয়ে উঠেছে একেকটি পাখি। এখানে ‘ময়না’ কথাটিকেই যদি প্রতিনিধি স্থানীয় ধরে নেওয়া যায়, তার রং ও আকৃতির জন্য– তাহলে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, অক্ষর দিয়ে এই পাখি নির্মাণ করার সময় পূর্ণেন্দু প্রচ্ছদের ডানদিক থেকে বাঁদিক সমস্ত জমিটাই ব্যবহার করলেন প্রায় কোনও ফাঁক না রেখে। যাতে ময়না যে বন্দি তার একটা দ্যোতনা ফুটে ওঠে। আর আছে নবনীতা দেবসেনের ‘স্বাগত দেবদূত’। এখানে শিল্পী ‘স্বাগত দেবদূত’ শব্দবন্ধ দিয়েই গড়ে তুললেন ডানাওয়ালা এক দেবদূতের স্পষ্ট অবয়ব। যেখানে ‘স্ব’ হল দেবদূতের মাথা, ‘গ’ ও ‘ত’ হল দেবদূতের বক্ষ-সমেত দুই ডানা এবং ‘দেবদূত’ দিয়ে নির্মিত হল শরীরের নিম্নাংশ। এইসব মিলিয়ে দেবদূতকে উড়ন্ত রূপ দিয়ে তাকে স্বাগত জানানো হল প্রচ্ছদ জুড়ে।

zoom

অন্যদিকে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘না নিষাদ’-কে দিলেন নিম্নমুখী তীরের আকৃতি, যা ‘নিষাদ’ শব্দের অর্থ ‘ব্যাধ’-কে পরিস্ফুট করে তুলল। এছাড়া আছে নিজের লেখা বই ‘বলো’। যেখানে সারা প্রচ্ছদে হালকা খয়েরি রঙের ওপর মোটা ড্রাই ব্রাশে সাদা রঙে লিখলেন ‘বলো’। এবং বলা বাহুল্য, এই ‘বলো’ শব্দটিকেই প্রচ্ছদে একছত্র জায়গা করে দিয়ে ‘বলো’-র আবেদনকে আরও স্পষ্ট করে তুললেন শিল্পী।

zoom

অসীম রায়ের ‘আমি হাঁটছি’-ও ক্যালিগ্রাফির একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এখানে ‘হ’ আর ‘ছ’-এর নিম্নগামী শুঁড়কে তিনি এমনভাবে ছড়িয়ে আঁকলেন যাতে সত্যিই লেখাটি হাঁটার ভঙ্গি পেয়ে গেল। কিন্তু অক্ষরের এই আন-ইভেন টান কোমল হয়ে আসে নন্দলাল বসুর ‘দৃষ্টি ও সৃষ্টি’ বইটির ক্যালিগ্রাফিতে। সেখানে কলমের টান হয়ে ওঠে আলপনার মতো কোমল ও নান্দনিক।

zoom

এছাড়াও আছে পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের ‘শবযাত্রা’ এবং নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘অন্ধকার বারান্দা’-র প্রচ্ছদ। এখানে শব্দ মধ্যস্থিত অক্ষরগুলিকে অনন্য উপায়ে এঁকে তাদেরকে নির্দিষ্ট শব্দটির অর্থের শরিক করে তুলেছেন পূর্ণেন্দু। যেমন ‘শবযাত্রা’-র ক্যালিগ্রাফিতে মাত্রাটিকে মোটা করে এঁকে অক্ষরের নীচের দিকগুলিকে আঁকলেন খাটের পায়ার মতো ডিজাইনে। যাতে করে শব্দটির চিত্রিত রূপ পেয়ে গেল শববাহী খাটের চেহারা। একাধারে কেউ এই ক্যালিগ্রাফিকে শববাহী যাত্রা হিসেবেও ব্যাখ্যা করতে পারেন। অন্যদিকে ‘অন্ধকার বারান্দা’-য় প্রচ্ছদের নীচের দিকের জমিকে সম্পূর্ণ ধূসর অন্ধকার রেখে উপরের দিকে এমনভাবে ক্যালিগ্রাফি করলেন যাতে ‘অন্ধকার বারান্দা’ কথাটি পেয়ে গেল বারান্দার রেলিং-এর চেহারা। এভাবেই বইয়ের নামকে পূর্ণেন্দু তার অর্থের নিকটবর্তী করে তুলেছেন বারবার যা শুধু চোখকেই ভোলায়নি, মনকেও ভাবিয়েছে। 

zoom

অক্ষরশিল্পকে হাতিয়ার করে পূর্ণেন্দু বহু পত্রপত্রিকার প্রচ্ছদ করেছেন। সেখান থেকে তাঁর কল্পনার বিচিত্রগতির পরিচয় পাওয়া যায়। একই নামকে তিনি কত রকমভাবে ভাবতে পারতেন– কখনও সেই নামকে দিতেন উন্মুক্ত গতি, আবার কখনও জ্যামিতিক বিভাজন। ‘পরিচয়’ পত্রিকার দু’টি প্রচ্ছদ লক্ষণীয়। একটিতে আছে আলপনার ধরন, অন্যটিতে গাছপালার স্নেহ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, কোনও সুচারু বিন্যাস সেখানে নেই, কিন্তু মন দিয়ে দেখলে বোঝা যাবে এ অত্যন্ত সুচিন্তিত বিন্যাস। মা-ঠাকুরমাদের আলপনার ধরনের মধ্যে যে একরকমের অকৃত্রিম সারল্য থাকে, যার কোনও রেখার টান মোটা আবার কোনও রেখার টান সরু হয়ে যায়, অথচ তাতে থাকে আলপনার ভরাট আবেদন। ঠিক সেভাবেই এখানে ‘পরিচয়’-এর লেটারিং করলেন পূর্ণেন্দু। তুলসী মঞ্চ বা কোনও বেদিতে আলপনা দেওয়ার সময় যেমন ইচ্ছে করে গড়িয়ে দেওয়া হয় খড়িমাটি-গোলা-জলের রেখা, এখানেও ঠিক তাই। কোনও বানিয়ে তোলা জটিল রেখা নয়, বরং গ্রাম্য সরলতায় এই লেটারিং প্রাণবন্ত। আরেকটি প্রচ্ছদে লক্ষ করুন, ‘পরিচয়’ শব্দটির প্রতিটি অক্ষর হয়ে উঠেছে গাছপালা। কিন্তু প্রায় পত্রবিহীন, যেন গাছ নয়, গাছের কর্তিত ডাল। পাতা সেখানে কেবল দু’টি, সেটা যেমন ‘র’ ও ‘য়’-কে চিহ্নিত করার জন্য, তেমনই কর্তিত ডালেও যে প্রাণ আছে তা বোঝানোর জন্যও।

zoom

অন্যদিকে ‘অনুক্ত’ পত্রিকার প্রচ্ছদে আমরা দেখতে পাই, সুচারু জ্যামিতিক বিন্যাস। পাশাপাশি মাত্রা থেকে অক্ষরকে বিচ্যুত করে প্রায় বৈপ্লবিক দু’টি লেটারিং। তবে এগুলি মূলত আলংকারিক কাজ, অনুভবী ততটা নয়। এবার লক্ষ করুন ‘জাগর’ পত্রিকার প্রচ্ছদটি। এখানে ‘জ’ তার ‘আ-কার’-সহ যতখানি জায়গা নিয়েছে, ‘গ’ ও ‘র’ স্বতন্ত্রভাবে ঠিক ততখানি জায়গা নিয়েই প্রচ্ছদে ও লেটারিং-এ সাযুজ্য এনেছে। অক্ষরের চিরাচরিত গড়নকে এখানে কার্যত ভেঙে দিয়েছেন পূর্ণেন্দু। আর এই প্রত্যেকটি প্রচ্ছদেই রঙের বিন্যাস অক্ষরশিল্পকে দিয়েছে শৈল্পিক মর্যাদা। 

zoom

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পত্রিকার বিখ্যাত লেটারিংটিও পূর্ণেন্দুর করা। তারই পাশাপাশি রাখলাম পূর্ণেন্দুর করা বুদ্ধদেব বসুর ‘প্রবন্ধ সংকলন’-এর লেটারিং। দুই ক্ষেত্রেই লেটারিং-এর প্রবল ও ব্যক্তিত্বময় উপস্থিতি আমাদের চোখে পড়ে। যদিও প্রচ্ছদের বাকি জমির শূন্যস্থান সেই উপস্থিতিকে আরও জোরদার করে তোলে। ‘আকাদেমি পত্রিকা’-র লেটারিং মাত্রাবিহীন, সপ্রতিভ (Bold) অথচ পেলব। সিরিয়াস প্রবন্ধের পত্রিকা। প্রবন্ধ যেমন প্রকৃষ্ট রূপে বন্ধন, ‘আকাদেমি পত্রিকা’-র লেটারিং-ও তাই, শব্দদু’টি একে অপরের সঙ্গে প্রকৃষ্ট রূপেই আবদ্ধ। কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর ‘প্রবন্ধ সংকলন’-এর লেটারিং অত্যন্ত ‘Bold’ মাত্রাযুক্ত এবং একেবারেই পেলব নয়, বরং ভাঙাচোরা। যেন একটি প্রবন্ধের হয়ে ওঠার চিত্র লুকিয়ে এই লেটারিং-এ, ভাবনার ক্রমবিবর্তন বুঝি তখনও চলছে। পাথর কুঁদে বানানো এই ভাস্কর্যসুলভ লেটারিং-এর যেন এখানেই শেষ নয়, তার বিবর্তন এখনও বাকি– ঠিক যেন একটি প্রবন্ধে ভাবনার বিবর্তন ও পরিণতির রূপরেখা। 

zoom

এবার দেখা যাক দু’টি লেখার হেডপিসের দিকে। দুরন্ত ও অস্থির ‘সময়’-কে বোঝাতে একদিকে যেমন ‘সময়’-এর মাত্রা বরাবর আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন পূর্ণেন্দু, তেমনই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কবির মৃত্যু’ বোঝাতে মরণাপন্ন কবিকে শুইয়ে দিয়েছেন সাদা পাতায়, হাত যার বাঁচার আকাঙ্ক্ষায় উদ্যত আকাশের দিকে; আর লেটারিং-এ ‘মৃত্যু’ শব্দের ওপর জোর দিয়ে তা থেকে ঝরিয়ে দিয়েছেন গাঢ় রক্তের মর্মান্তিক রেখা। 

zoom

বইয়ের প্রচ্ছদ অলংকরণে অক্ষরশিল্প ব্যবহারের পাশাপাশি নিজের তৈরি বিজ্ঞাপনে, চলচ্চিত্রের নামাঙ্কনে কিংবা চলচ্চিত্রের নামপত্রে, এমনকী, বিবাহের আমন্ত্রণপত্রেও অক্ষরশিল্পের দুর্দান্ত নমুনা রেখে গিয়েছেন তিনি। ‘পরশুরামের কুঠার’-এ ‘প’-কে যেমন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত রেখে পিক্টোগ্রাফির সাহায্যে পরশু বা কুঠারের প্রতীকেই ‘প’-কে চিহ্নিত করেছেন, একটি বিবাহের আমন্ত্রণপত্রে তেমনই ‘শ’-কে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত করে দেননি। বরং ‘শ’-কে দিয়েছেন মঙ্গলচিহ্ন প্রজাপতির রূপ। আলাদা কোনও ইলাস্ট্রেশন নয়, অক্ষরকেই যেখানে ছবি করে তোলা যায় সেখানে অন্য বাহুল্যের দরকার কী? পূর্ণেন্দু একদিকে যেমন নিরলস অক্ষরশিল্প চর্চা করে গিয়েছেন তেমনই আমাদের শেখাতে চেয়েছেন এই পরিমিতির বোধ। 

zoom

এই হলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। তিনি শিল্পজগতে কেবল নিজের ঘরানা তৈরি করেননি, বাংলা প্রচ্ছদশিল্পকে দিয়েছেন একটি নিজস্ব ঘরানা। তাঁর প্রচ্ছদ থেকে যেন বাংলা ভাষার, আমাদের বাংলাদেশের শ্যামলিমার ঘ্রাণ, স্পর্শ পাওয়া যায়। তিনি আসলে বাংলা প্রচ্ছদকে এমন একটা খোলা আকাশ দিয়েছিলেন, যেখানে দাঁড়িয়ে প্রাণ ভরে শ্বাস নেওয়া যায়। আজকাল বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ শ্বাস নিতে ভুলে যাচ্ছে– ভুলে যাচ্ছে তার নিজস্ব ঘরানা। পিজি হসপিটালের উডবার্ন ওয়ার্ডে জীবনের শেষ সময়ে ক্যানসার-পীড়িত পূর্ণেন্দু তাঁর শেষ সাক্ষাৎকারে দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে বলেছিলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরেই সভাসমিতিতে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছি। অভিমানে, ক্ষোভে। আসলে আমরা যে কিছু করেছি, সেকথা যেন মনেই হয় না। প্রচ্ছদের কথাই ধরো, এতদিন বইয়ের জন্য ভেবেছি, কাজ করেছি, একথা যেন কেউ মনেই করে না। এখন মনে হয়, ৩০০০ মলাট না এঁকে ৩০০ রান করলে অনেক বেশি সম্মান পেতাম। আসলে ইতিহাস বোধটাই আমরা নষ্ট করে ফেলেছি।’ বাংলা প্রচ্ছদের জগৎ যেন না ভোলে তার পূর্ণেন্দু পত্রীর মতো আকাশ আছে। যে আকাশ রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, আলো কোনওকিছু দিতেই কার্পণ্য করে না। উপেক্ষা আর আত্মবিস্মৃতিকে জয় করে প্রচ্ছদশিল্পের সেই আকাশের নীচে দাঁড়ানোর সময় এসেছে, যেখানে প্রচ্ছদে ও অক্ষরশিল্পে মিশে গিয়েছে কাব্যগুণ। আর এখানেই কবি পূর্ণেন্দু ও প্রচ্ছদশিল্পী পূর্ণেন্দুর অখণ্ড সত্তা পূর্ণেন্দু পত্রীকে প্রচ্ছদশিল্পের তথা অক্ষরশিল্পের কবি করে তুলেছে।

zoom

তথ্যসূত্র:
১. পূর্ণেন্দু পত্রী, ‘নিজের সম্পর্কে’, দ্র. মঞ্জুষ দাশগুপ্ত (সম্পা) [পূর্ণেন্দু পত্রী: শিল্পী ও ব্যক্তি, সমন্বয়, পৃ. ১২৫]
২. হান্ড্রেড মাইলস, দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যা, ঐশিক দাশগুপ্ত (সম্পা) [পৃ. ৩৯] 

bengali book cover Book cover cover design fine art illustration Little Magazine Purnendu Pattrea Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shakti Chattopadhyay পূর্ণেন্দু পত্রী

Share this article on