Robbar

একটি ফুসফুস নিয়েই ভারতীয় সংগীতের ‘বিস্ময়চিহ্ন’ হয়ে উঠেছিলেন কুমার গন্ধর্ব

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 12, 2026 4:48 pm
  • Updated:January 12, 2026 6:02 pm  

আমাদের মনে থাকবে ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘Singing Emptiness: Kumar Gandharva Performs the Poetry of Kabir’ বইটার কথা। আধুনিক কন্নড় সাহিত্যের বিখ্যাত লেখক ইউ আর অনন্তমূর্তি ১৯৯১ সালে বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় বসে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিন্ডা হেস-কে (যিনি তার কিছুদিন আগেই কবিরকে নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন) বলেছিলেন, কুমার গন্ধর্বের কবির-ভজন তাঁর অবশ্যই শোনা উচিত এবং কুমারের গাওয়া কবিরের ভজনের একটা ইংরেজি অনুবাদ আলাদা করে তাঁর প্রকাশ করা উচিত। এরই ফল ‘Singing Emptiness’। কবিরের ভজন এবং তার পরিবেশনা-উদ্বুদ্ধ এরকম আন্তর্জাতিক প্রকাশনার নাম কি চট করে আমাদের মনে পড়ে?

রাজীব চক্রবর্তী

অভিনেতা, সংগীততাত্ত্বিক এবং বিশিষ্ট হারমোনিয়াম-শিল্পী গোবিন্দ সদাশিব তেম্বে (১৮৮৮-১৯৫৫) তাঁর সম্পর্কে একবার বলেছিলেন যে, তিনি ভারতীয় সংগীত জগতে স্বয়ং এক প্রশ্নচিহ্ন। কেউ আবার মজা করে বলেছেন– না, প্রশ্নচিহ্ন নয়, তিনি এক বিস্ময়চিহ্ন। কুমার গন্ধর্ব (০৮.০৪.১৯২৪ – ১২.০১.১৯৯২) ভারতীয় সংগীত জগতের এমন এক তারকা যিনি নিজস্বতায় ভাস্বর, স্বকীয়তায় বিশিষ্ট এবং বিতর্কিতও বটেন।

শিবপুত্র সিদ্ধরামাইয়া কোমকলি ওরফে কুমার গন্ধর্ব

একেবারে শিশুবয়স থেকেই তাঁর সংগীত প্রতিভার প্রকাশ মুগ্ধ করেছিল নামীদামি সব সংগীতগুণীদের। ১৯৩৬-এর ফেব্রুয়ারি মাসে বোম্বের জিন্নাহ্‌ হলে ১১ বছর ১০ মাস বয়সী কুমার গন্ধর্ব গান গেয়ে সাড়া ফেলে দেন। সারা ভারতের প্রায় সমস্ত প্রথিতযশা সংগীত সাধকেরা উপস্থিত ছিলেন সেদিনের সেই অনুষ্ঠানে। কুমার এলেন, গাইলেন এবং জয় করলেন। উপস্থিত অনেকেই উচ্ছ্বসিত স্বতঃস্ফূর্ততায় নানা পুরস্কারে স্বীকৃতি জানিয়েছিলেন সেদিনের সেই নাম-না-জানা বাচ্চাটিকে। কুমার গন্ধর্ব এভাবেই তাঁর ৬৭ বছর ৯ মাসের জীবনে বারবার তাঁর চিন্তার অভিনবত্বে আর প্রতিভার দীপ্তিতে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন।

শিশুবয়স থেকেই তাঁর সংগীত প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছিল

১৯২৪-এর ৮ এপ্রিল কর্ণাটকের বেলগাঁওয়ে এক লিঙ্গায়ত পরিবারে শিবপুত্র সিদ্ধরামাইয়া কোমকলির জন্ম। মাত্র ছ‍য় বছর বয়সে লিঙ্গায়ত গোষ্ঠীর আধ্যাত্মিক গুরু তাঁর নামকরণ করেছিলেন কুমার গন্ধর্ব। কুমারের বাবা সিদ্রমাপ্পা নিজেও ছিলেন গানের মানুষ– আবদুল করিম খানের ভক্ত; আর তাঁর সংগ্রহে ছিল বিরল রাগের বিরলতর সব বন্দিশ। পরিবারের সাংগীতিক পরিবেশ কুমারকে গানের পরিসরটুকু তৈরি করে দিয়েছিল। ছোট থেকেই কুমারের এক অসামান্য প্রতিভা ছিল– বিভিন্ন ঘরানার বিখ্যাত সব গায়কের রেকর্ড শুনে অবিকল সেইসব গান তুলে নিতে পারতেন। এই তুলে নেওয়াটা নিছক অনুকরণ করা নয়– ৭৮-আরপিএম রেকর্ডের সেই সাড়ে তিন মিনিটের গান শুনে কুমার সেই রাগের একটা সম্পূর্ণ রূপ গলায় তুলে নিতে পারতেন। কীভাবে পারতেন তার ব্যাখ্যা করতে হলে তিন অক্ষরের ‘প্রতিভা’ শব্দটি ছাড়া আর বিশেষ কিছু আমাদের হাতে নেই। রেকর্ডে গান শুনেই রামকৃষ্ণবুয়া ভাজে, আবদুল করিম খান, ফৈয়াজ খান, ওঙ্কারনাথ ঠাকুর, মাস্টার কৃষ্ণরাও, সোয়াই গন্ধর্ব, মল্লিকার্জুন মনসুর, কেসরবাই কেরকর-এর গান তুলে রীতিমতো গাইতেন কুমার। কিন্তু এই পর্ব বেশিদিন চলেনি তাঁর।

মঞ্চে মধ্যমণি

১৯৩৬-এ বোম্বের জিন্নাহ্‌ হলের সেই অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিলেন প্রোফেসর বি. আর. দেওধর (১৯০১-১৯৯০)। দেওধরের নিজের সংগীত শিক্ষায় নানা ঘরানার বহু কিছু এসে মিলেছিল– তিনি তৈরি করে নিয়েছিলেন নিজস্ব একটা স্টাইল যাতে কোনও বিশেষ ঘরানার ছাপ ছিল না। কুমার গন্ধর্বকে প্রফেসর দেওধর নিলেন তাঁর ছাত্র করে। ‘দেওধর স্কুল অব মিউজ়িক’-এ এসে কুমার যেন ভারতীয় সংগীতের মহাসমুদ্রের খোঁজ পেলেন– যেখানে নানা ঘরানার নদীর প্রবাহ তাঁকে ‘সক্ষম স্বাধীন’ করে দিল। সক্ষম স্বাধীনতা এল তাঁর চিন্তায়, গায়নে। কোনও নির্দিষ্ট ঘরানার বন্ধন থেকে তিনি তাঁর গানকে মুক্ত করে দিলেন– অবশ্যই প্রোফেসর দেওধরের অভিভাবকত্ব তাঁকে এই কাজে এগিয়ে দিয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই কুমারের দুটো বিশেষ গুণ ছিল– স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা, আর সেই চিন্তাকে প্রকাশ করার সাহস। তাঁর গানে তিনি তাঁর নিজস্ব অনুভূতি আর বিশ্লেষণী ক্ষমতাকে প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি জানতেন এবং মানতেন যে, তাঁর সংগীত ভাবনা মিলবে না সকলের সঙ্গে, হয়তো শ্রোতারা তা গ্রহণও করবেন না– কিন্তু জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরিচিত পথে হাঁটার মানুষ কুমার গন্ধর্ব ছিলেন না কোনও কালেই। ১৯৬৫ সালে কুমারের নিজের লেখা এবং সুরে বাঁধা ১৩৬-টি বন্দিশ নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘অনূপরাগবিলাস’ নামের সংকলন– এই সংকলনের ১৭-টি বন্দিশ তাঁর নিজের তৈরি ১১-টি রাগের জন্য লেখা, ১০৭-টি বন্দিশ প্রচলিত ৫৭-টি রাগে, আর বাকি বন্দিশ নানা মিশ্র-রাগের জন্য লেখা। এর ভূমিকায় বিশিষ্ট সংগীতশাস্ত্রী বামনরাও দেশপাণ্ডে আমাদের জানিয়েছিলেন– কুমারের এই যে এত এত সৃষ্টি, তার রহস্য। কুমার গন্ধর্ব নাকি তাঁকে বলতেন যে চলতে ফিরতে, যে কোনও কাজের সূত্রে তিনি যা দেখতেন, যা শুনতেন সবকিছুকেই তাঁর মনে হত সংগীতে প্রকাশ করতে হবে– ধরতে হবে জীবনের সামগ্রিকতার সুরে, কথায়। এই প্রণোদনা থেকেই তাঁর নতুন নতুন বন্দিশ রচনা, সুরের পথে বিবাগী হাওয়ার ঝাপটা দেও‍য়া। 

সুরের পথে বিবাগী হাওয়ার ঝাপটা

বি. আর. দেওধরের কাছে কুমারের শিক্ষা চলেছিল ১১ বছর– ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৭। এর মধ্যেই কুমার দেওধরের ইশকুলে গান যেমন শেখাতে থাকেন, সেই সঙ্গে চলতে থাকে সারা দেশ জুড়ে তাঁর গানের অনুষ্ঠান। জীবনের দু’-দশক পার করার আগেই কুমার গন্ধর্ব ভারতীয় সংগীতের এক খ্যাতিমান নাম হয়ে ওঠে। কিন্তু এই নাম, অর্থ কিছুই তাঁকে সেভাবে শান্তি দিতে পারছিল না। যে কোনও সৃষ্টিশীল মানুষের মতোই তিনি খুঁজে চলেছিলেন তাঁর নিজস্ব ভাষা, প্রকাশভঙ্গি। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৭ কুমারের জীবনের ক্রান্তিকাল– এই সময়ে তিনি একের পর এক মঞ্চসফল অনুষ্ঠান করছেন, খ্যাতি ছড়াচ্ছে চারদিকে, কিন্তু কিছুতেই শান্তি পাচ্ছেন না মনে। সংগীতের যে নিজস্ব স্বর, প্রকাশভঙ্গি তিনি খুঁজে চলেছেন– তার কিনারা পাচ্ছেন কোথায়! ১৯৪১-এর কোনও এক সন্ধেয় বোম্বের এন. পাওয়েল অ‍্যান্ড কোম্পানির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কুমার– যেন পরাজিত এক হতাশ নায়ক, চোখের জল বাধ মানছে না কিছুতেই। এই হতাশা তাঁকে ঘুরিয়ে মেরেছে অনবরত। ১৯৪৭ সালে, কুমার, দেৱাস-এ তাঁর সংগীতজ্ঞ বন্ধু কৃষ্ণরাও মজুমদারের কাছে যেতে থাকেন সারাদিন-রাত তাঁকে গান শোনাবেন বলে। এভাবে ১০ দিন কেটে যায়। এক রাতে কুমার গাইছেন ভীমপলশ্রী। সেইদিন গান গাইতে গাইতেই কুমার যেন আবিষ্কার করলেন তাঁর গানের সত্যিকারের রাস্তা। কুমারের কথায়– সেদিন থেকেই তাঁর যাত্রা শুরু হল তাঁর একেবারে নিজের তৈরি পথে। সেদিন থেকে যতদিন বেঁচেছিলেন কুমার গন্ধর্ব, ততদিনই তিনি নিয়ত পরীক্ষানিরীক্ষা করে গিয়েছেন তাঁর গানে, কবিতায়। এই যে প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙে-গড়ে চলা তার একটা অসামান্য বর্ণনা আছে তাঁরই একটি কবিতায়–

‘ম্যায়ঁ থা জিসকে পিছে পিছে
অব ম্যায়ঁ উসকে আগে আগে
দেখা যব ম্যায়ঁ আগে পিছে
দেখা সব কুছ আগে আগে’

[যাঁদেরকে অনুসরণ করেছি
তাঁদের পিছনে ফেলে এসেছি
কিন্তু সামনে-পিছনে তাকালে এখনও দেখি
সবাই আমার আগেই রয়েছেন]

এ কবিতা তো তাঁর নিজেকেই পেরিয়ে যেতে না-পারার অক্ষমতাজাত– এই অক্ষমতার অনুভূতিই তাঁকে নতুনতর সৃষ্টির প্রণোদনা জুগিয়েছে সন্দেহ নেই। 

প্রথম স্ত্রী ভানুমতী কৌঁসের সঙ্গে

 

১৯৪৭-এ কুমার বিবাহ করেন দেওধর ইশকুলে শিখতে আসা তাঁরই ছাত্রী ভানুমতী কৌঁসকে। এই বিয়ে তাঁদের সুখী, আনন্দিত করলেও, সে সুখ বা আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রাণঘাতী টিবি রোগে আক্রান্ত হলেন কুমার। পরবর্তী প্রা‍য় পাঁচ বছর তাঁর কাটবে বোম্বে থেকে দূরে মধ্যপ্রদেশের দেৱাস-এ, বিশ্রামে। কিন্তু একজন সৃষ্টিশীল মানুষের মন কি সত্যিই সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিতে পারে? এই সময়েই সংগীতে যে নিজস্বতার সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন তাকে পরিপূর্ণ করে তুললেন– সংগীত অভ্যাসের মধ্য দিয়ে নয়, চিন্তার বিস্তারে। সঙ্গে হল আর-একটি লাভ– স্থানীয় লোকগান দু’-কান ভরে শুনতে থাকলেন, যে-গান তৈরি করবে, গড়ে তুলবে পরিণত কুমার গন্ধর্বকে। প্রায় ৩০০ লোকগান তিনি সংগ্রহ করেছিলেন এই সময়। অদমিত প্রাণশক্তিতে কুমার নিজেকে সুস্থ করে তুললেন– এই সময়ে তাঁর স্ত্রী ভানুমতীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ঘরে-বাইরে তিনি লড়াই করেছেন সমানে। ১৯৫৬ সালে তাঁদের প্রথম সন্তান মুকুল শিবপুত্রের জন্ম এবং ১৯৬১-তে দ্বিতীয় সন্তান যশোবর্ধনের জন্ম এবং ভানুমতীর মৃত্যু হয়। এরপরে কুমার বিবাহ করেন তাঁর আর-এক ছাত্রী বসুন্ধরা শ্রীখণ্ডেকে (১৯৩১-২০১৫), যিনি কুমারের শেষদিন পর্যন্ত তাঁর সাংগীতিক যাত্রায় সহযাত্রীর ভূমিকা পালন করেছেন। কুমার-ভানুমতীর পুত্র মুকুল শিবপুত্র, মুকুল-পুত্র ভুবনেশ, কুমার এবং বসুন্ধরার কন্যা কলপিনী কোমকলি নিজেরাও প্রতিষ্ঠিত গায়ক হিসেবে। মধুপ মুদ্‌গল, বিজয় সরদেশমুখ, সত্যশীল দেশপাণ্ডে (বামনরাও দেশপাণ্ডের কনিষ্ঠপুত্র), পন্ধারিনাথ কোলহাপুরের মতো প্রতিষ্ঠিত ছাত্র-গায়কেরাও তাঁর সাংগীতিক ধারাকে আজও বহন করছেন। 

শেষদিন পর্যন্ত তাঁর সহযাত্রী ছিলেন দ্বিতীয় স্ত্রী বসুন্ধরা শ্রীখণ্ডে

আমরা তাঁর রচিত যে বন্দিশের কথা বললাম একটু আগে, কুমার এই ধরনের বন্দিশকে বলেছেন ‘ধুন-উগম’ রাগ, অর্থাৎ লোক-ভিত্তিক গান বা রাগ। তিনি বিশ্বাস করতেন আমাদের তথাকথিত উচ্চাঙ্গ সংগীতের মূল নিহিত লোকসংগীতে– এই বিশ্বাস বা তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত বহুদিন থেকেই। কিন্তু কুমার গন্ধর্ব তাঁর গানে, গায়কীতে, পরিবেশনায় এই বিশ্বাসটিকে প্রকাশ করেছেন অসামান্য প্রায়োগিক দক্ষতায়। মনে রাখতে হবে ট্যুবারক্যুলোসিস তাঁর একটি ফুসফুস চিরতরে অক্ষম করে দেয়– সেই শারীরিক সীমাবদ্ধতাও তিনি পেরিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর নিজস্ব গায়কি তৈরি করে নিয়ে। তাঁর রাগরূপায়ণ নিয়ে সমালোচনা কিছু কম হয়নি। তাঁর বিলম্বিত খেয়ালকে তো মগুবাই কুর্দিকর খুবই সমালোচনা করেছেন, এমনকী কুমারের গুরু দেওধরও কুমারের গায়কিতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। কেউ কেউ বলেছেন কুমার গন্ধর্ব এক অলোকসামান্য নষ্ট প্রতিভা– রাগরূপায়ণের ব্যাপারে তাঁর চিন্তাভাবনা বিশুদ্ধবাদীদের খুশি করেনি, কিন্তু কিছুতেই নিজের গায়কি, প্রকাশভঙ্গি, রাগরূপায়ণের নিজস্বতা তিনি ত্যাগ করেননি। তাঁর সামগ্রিক সংগীতভাবনা সাংগীতিক পরিমণ্ডলের বাইরেও নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের উদ্বুদ্ধ করেছে নানাভাবে– ছবি, ভাস্কর্য, স্থাপত্যবিদ্যা এবং সাহিত্য প্রভাবিত হয়েছে কুমার গন্ধর্বের সাংগীতিক চিন্তার বিভায়। ১৯৬৭ সালে কবির, সুরদাস এবং মীরাবাই-এর ভজন নিয়ে ‘ত্রিবেণী’, তুলসীদাস এবং তুকারামের ভজন নিয়ে তিনি একাধিক মঞ্চসফল অনুষ্ঠান করেছেন। মারাঠি থিয়েটারের গায়ক-নায়ক বাল গন্ধর্বকে নিয়ে গোটা মহারাষ্ট্র ঘুরে অনুষ্ঠান করেছেন। ১৯৬৬ সালে বর্ষা, হেমন্ত এবং বসন্তের গান নিয়ে পর্যায়ক্রমে ‘গীত-বর্ষা’, ‘গীত-হেমন্ত’ এবং ‘গীত-বসন্ত’ অনুষ্ঠান, ১৯৭৩ সালে বসন্তের গান নিয়ে ‘ঋতু রাজ ম‍্যহ্‌ফিল’, মল্লারে সুরারোপিত গান নিয়ে ‘রাগ দর্শনমালা’ তাঁর সাংগীতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কিছু উল্লেখনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থেকে গেছে।

কবিরের নির্গুণ ভজন পরিবেশনেও কুমার গন্ধর্ব তাঁর প্রথাভাঙা-ছাপ রেখেছেন। শবনম বীরমণির তৈরি ‘কোই সুনতা হ্যায়’ তথ্যচিত্রে কুমারের কবির-যাপন ধরা রয়েছে। আমাদের মনে থাকবে ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘Singing Emptiness: Kumar Gandharva Performs the Poetry of Kabir’ বইটার কথা। আধুনিক কন্নড় সাহিত্যের বিখ্যাত লেখক ইউ আর অনন্তমূর্তি ১৯৯১ সালে বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় বসে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিন্ডা হেস-কে (যিনি তার কিছুদিন আগেই কবিরকে নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন) বলেছিলেন, কুমার গন্ধর্বের কবির-ভজন তাঁর অবশ্যই শোনা উচিত এবং কুমারের গাওয়া কবিরের ভজনের একটা ইংরেজি অনুবাদ আলাদা করে তাঁর প্রকাশ করা উচিত। এরই ফল ‘Singing Emptiness’। কবিরের ভজন এবং তার পরিবেশনা-উদ্বুদ্ধ এরকম আন্তর্জাতিক প্রকাশনার নাম কি চট করে আমাদের মনে পড়ে? কুমার গন্ধর্বের খ্যাতি এবং স্বীকৃতির ব্যাপ্তি এতটাই। এইসব স্বীকৃতির কাছে তাঁর ‘পদ্মভূষণ’ (১৯৭৭) বা ‘পদ্মবিভূষণ’ (১৯৯০) প্রাপ্তি বা তাঁর নামে মধ্যপ্রদেশ সরকারের আলাদা করে ‘কুমার গন্ধর্ব সম্মান’ দেওয়া উল্লেখনীয় নয়। কুমার ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের নিবিষ্ট ছাত্র হয়েও তার রীতিপদ্ধতিকে আজীবন প্রশ্ন করে গিয়েছেন– খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন নতুন এবং নিজস্ব রাস্তা। এই প্রশ্ন করার এবং প্রশ্ন করতে পারার স্পর্ধা কুমার গন্ধর্বকে ভারতীয় সংগীত জগতে একটা বিশিষ্ট এবং নিজস্ব স্থান দিয়েছে।

আমাদের সময়ের বিশিষ্ট কবি, সমালোচক অশোক বাজপেয়ীর বক্তব্যের সঙ্গে আমরাও ঐক্যমত্য পোষণ করি– ‘As long as the qualities of courage, imagination and originality remain possible, along with contemporaneity and dynamism within the classical, Kumar Gandharva will remain with us as a true messenger and a vigilant watchman’। নন্দলাল বসুর কথা মনে পড়ে– ‘অনেকে মনে করেন, চিত্রে একটি মুহূর্ত (moment, unit, time) নিয়ে কারবার আর কবিতায় গানে অনেকগুলি মুহূর্তের প্রবাহ।… কবিতায় গানেও আসলে অনেক মুহূর্ত নেই। তার সবগুলো খণ্ড খণ্ড মুহূর্তকে অনুসরণ করে যতক্ষণ না একটি অখণ্ড মুহূর্তের ধারণায় পৌঁচচ্ছি ততক্ষণ কবিতা বা গানকে পাইনি। কবিতা বা গানের সূচনায় ঐ অনন্য মুহূর্তটি আছে আভাসে, পরিণামে আছে নিশ্চিত উপলব্ধিরূপে।… শিল্পক্ষেত্রে একটা ইন্দ্রিয়গোচর বস্তুকে অপর-একটা ইন্দ্রিয়গোচর বস্তু করে তোলাই শিল্পের একটা বিশেষ কৌশল। গায়ক বা কবি বিশেষ খুশি হন যখন সুর দিয়ে বা কথা দিয়ে রূপের আভাস দিতে পারেন– যখন প্রভাত বা সন্ধ্যা বা ঘনঘটার ছাপটি ছন্দ ও সুরের গুণে ফুটে ওঠে।’ কুমার গন্ধর্বের সারা জীবনের লক্ষ্য ছিল জীবনের প্রভাত, সন্ধ্যা বা ঘনঘটার রূপটিকে সামগ্রিকতার অভিব্যক্তিতে বাঁধা তাদের সুরের মায়াজালে ঘিরে রেখে।