Robbar

মহাবিশ্বের মহাসূত্র আবিষ্কারই ছিল হকিং-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 8, 2026 5:39 pm
  • Updated:January 10, 2026 5:33 pm  
Stephen Hawking and unified theory of science

১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে, তরুণ স্টিফেন হকিং আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এক যুগান্তকারী ফলাফলে পৌঁছন। এই কাজের মূল প্রেরণা ও সহযাত্রী ছিলেন রজার পেনরোজ– একজন ব্রিটিশ গণিতবিদ ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি জ্যামিতিক চিন্তা ও গভীর গাণিতিক অন্তর্দৃষ্টির জন্য খ্যাত। পেনরোজ আগে থেকেই দেখিয়েছিলেন যে একটি ভারী নক্ষত্রের ধ্বস ব্ল্যাক হোল গঠনের দিকে নিয়ে যায়, এবং সেই প্রক্রিয়ায় স্থান-কালের ভেতরে এক ধরনের চরম ‘ভাঙন’ অনিবার্য। হকিং ও পেনরোজ একসঙ্গে প্রমাণ করেন যে এই ধরনের ‘ভাঙন’ সিঙ্গুলারিটি কেবল বিশেষ বা আদর্শ পরিস্থিতির ফল নয়; বরং খুব সাধারণ ও বাস্তবসম্মত শর্ত মানলেই মহাবিশ্বের শুরুতে (বিগ ব্যাং) কিংবা ব্ল্যাক হোলের গভীরে স্থান ও সময়ের এই ‘ভাঙন’ অবশ্যম্ভাবী।

পল্লব বসু

একটা ইতিহাস দিয়ে শুরু করা যাক– ‘এ ব্রিফ হিস্টোরি অব টাইম’, সময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস– একটি বই। লেখক ব্রিটিশ পদার্থবিদ স্টিফেন ডাবলু হকিং। ১৯৮৮। আমি স্কুলে। তখনও আমাকে একটু জোরজার করে শিশু বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, তবে কিছু চোখ-তাকানির সঙ্গে। বইটা কীভাবে জোগাড় হল মনে নেই। মাঝারি মাপের পেপারব্যাক, বাংলা বইয়ের থেকে আয়তনে ছোট, কিন্তু মোটাসোটা। সম্ভবত এক আমেরিকা-ফেরত আত্মীয় দিয়েছিলেন। আমার তখন ইংরেজি পড়ার অত এলেম নেই। বাবা অঙ্কের শিক্ষক, তাঁর আমার গরমের ছুটিতে, প্যাচপ্যাচে লোডশেডিং-এ তাঁর কাজ হল আমাকে ট্রান্সলেশন করে বোঝানো।

 

বইটিতে হকিং-এর লক্ষ্য হল পাঠককে মহাবিশ্বের সব বড় বড় রহস্যের সঙ্গে পরিচয় করানো, যেমন বিগ ব্যাং, ব্ল্যাক হোল। চূড়ান্ত লক্ষ্য– মহাবিশ্বের সব ল (law)– সে মধ্যাকর্ষণের নিয়ম হোক, বা অনু-পরমাণুর ভেতরের বিজ্ঞান, সব ল-কে এক ল-তে বাঁধার যে অবিরাম চেষ্টায় আইনস্টাইন থেকে শুরু করে চার-পাঁচ প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা নিয়োজিত, সেই একমেবদ্বীতিয়ম, অমোঘ মহা ল-এর অনুসন্ধানের গল্প সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়া। যাই হোক, সেই গরমের ছুটিতে, ব্রিফ হিস্টোরি অব টাইম-এর শেষমেশ ঠিক কী বোঝা গেল বা গেল না, তাই বোঝা গেল না। তবে পাখি পাড়ার মতো কিছু buzz ওয়ার্ড শিখে দিগ্‌গজ হলাম: স্ট্রিং থিওরি, ব্ল্যাক হোল, বিগ ব্যাং ইত্যাদি।

বই-এর প্রচ্ছদে হকিং– হুইলচেয়ারে বন্দি। বুদ্ধাস্ত্রের প্রখরতায় মহাবিশ্বের গূঢ় থেকে গূঢ়তম রহস্য উন্মোচনে বিধাতার বা প্রাকৃতিক নিয়মের সঙ্গে খেলেছেন সাপলুডো। প্রকৃতি পঙ্গু করেছে তাঁর দেহকে, কিন্তু থামাতে পারেনি তাঁর মনন। বিশ্বের নবম আশ্চর্য– একটি স্টেলার অ্যাচিভমেন্ট ফর আস ফ্র্যাজাইল হিউম্যানস। এই ইমেজটা বিবিসি ইন্টারভিউ হোক বা সংবাদমাধ্যমে– চালানো হচ্ছিল, মানুষ খাচ্ছিলেন। শুধু কি হকিং জনপ্রিয় পপুলার সায়েন্স লেখক, ধূর্ত ইমেজ বিক্রেতা, না সত্যিই মহাবিজ্ঞানী? উত্তরটা আগেভাগেই বলে দিই। বিজ্ঞান জগতে হকিং-এর অবদান বিশাল, সুবিশাল। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী কিপ থর্ন তাঁর বইয়ের শুরুতে বলেছেন, হকিং তুলে গেছেন গভীর প্রশ্ন– যা পরবর্তী প্রজন্ম সমাধান করবে। আসলে হকিং-এর কাজ রত্নভাণ্ডার; তার মধ্যে কোহিনূর হীরে হল ব্ল্যাক হোল এনট্রপি। তবে হীরের আগে, প্রথম পান্না চুনি দিয়ে শুরু করব– হকিং-এর কাজ আস্তে আস্তে বোঝা যাক।

স্টিফেন হকিং

হকিং বলেছেন, তাঁর ১৯৬২ সালে পিএইচডি শুরু করার সময় তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে দুটো বড় স্তম্ভ ছিল: কোয়ান্টাম তত্ত্ব, যা মূলত পরমাণু ও তার ভেতরের জগতের কণাগুলোর আচরণ বোঝায়, আর মহাকর্ষের তত্ত্ব সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ, যা নক্ষত্র আর মহাবিশ্বের বড় স্কেলের গঠন ব্যাখ্যা করে। অনেকে তখন কোয়ান্টাম তত্ত্ব-র দিকেই যাচ্ছিলেন, কারণ সেটাই ছিল ‘হট’ বিষয়। কিন্তু রেবেল হকিং তুলনামূলকভাবে কম ভিড়ের, কম বোঝা, কিন্তু গভীর সমস্যায় ভরা দিক– মহাকর্ষের তত্ত্ব সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের পথটাই বেছে নেন। এখন, কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং সাধারণ আপেক্ষিকতাকে একসাথে মেশানো এত সহজ নয়। কারণ কোয়ান্টাম তত্ত্ব ছোট, কণিকামাত্রিক জগতকে বোঝায়, আর সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ বড়, মহাকর্ষীয় বস্তু ও স্থান-কালকে। কিন্তু যে মহাসূত্রের কথা হকিং তাঁর বইতে বলেছেন, সেই মহাসূত্র পেতে হলে এই দু’টি স্তম্ভকে আনতে হবে এক ছাদের তলায়।

সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের প্রাথমিক ধারণাটা আগে খোলসা করা যাক। ধরুন আপনি ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। হাত থেকে চাবিটা পড়ে গেল। খুব স্বাভাবিকভাবে নিচে পড়ল। এই ‘খুব স্বাভাবিক’ ঘটনাটার পেছনে আছে মহাকর্ষ। মহাকর্ষ সর্বব্যাপী, চাঁদকে ঘোরায় পৃথিবীর চারদিকে, আর পৃথিবীকে সূর্যের চারদিকে বেঁধে রাখে। আবার মহাবিশ্বকে সাজিয়ে তোলে– নক্ষত্র, ছায়াপথ– সবই একই গল্প: মহাকর্ষ। নিউটনের গল্পটা আমরা সবাই কমবেশি জানি– আপেল পড়ল, আর তাক করে নিউটন বললেন, সব বস্তু একে অন্যকে টানে। পৃথিবী বড় বলে টানটা আমরা বেশি টের পাই। দু’ শতক ধরে এটাই ছিল মাধ্যাকর্ষণের গল্প– খুব কাজের, খুব নিখুঁত। কিন্তু এরপর এলেন আইনস্টাইন। ১৯১৫ সাল। তিনি বললেন, ‘আসলে টানাটানি কিছু নেই।’ শুনে একটু অদ্ভুত লাগে, তাই না? একটা টানটান গদির ওপর যদি একটা ভারী লোহার বল রাখা হয়, গদিটা দেবে যায়। এখন পাশে একটা ছোট বল ছাড়লে সেটা সোজা না গিয়ে গদির ঢাল বেয়ে ঘুরতে ঘুরতে বড় বলটার দিকে চলে আসে। আইনস্টাইনের মতে, ভর আর শক্তি স্থান-কালের গদিটাকে বেঁকিয়ে দেয়। আপনি আর আমি সেই বেঁকে যাওয়া পথ ধরে হাঁটি– সেটাকেই আমরা মাধ্যাকর্ষণ বলে অনুভব করি। এটাই আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ। কংগ্র্যাটস! বুঝে আপনি পেলেন ‘জ্ঞানশ্রী’।

আলবার্ট আইনস্টাইন

হকিং-এর গবেষণার অন্যতম মূল বিষয় ছিল ব্ল্যাক হোল। তো কি এই ব্ল্যাক হোল? এখানে আসে নোবেলজয়ী সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখরের নাম। তিনি দেখিয়েছিলেন, কোনও নক্ষত্র যদি একটা নির্দিষ্ট ভরের (আজ যাকে ‘চন্দ্রশেখর সীমা’ বলা হয়) চেয়ে বেশি ভারী হয়, তাহলে সে নিজের মহাকর্ষের টান আর রাখতে পারবে না। ফলাফল– নক্ষত্রের ভেতর ধস। ফিরে যাই আমাদের গদিতে। এবার ধরুন, যদি লোহার বলটা অত্যন্ত ভারী হয়, তাহলে গদিটা শুধু দেবে যায় না– গদিটা ছিঁড়ে গিয়ে একটা গভীর গর্ত তৈরি হয়। সাধারণ আপেক্ষিকতার বিধান অনুযায়ী এটাই হল ব্ল্যাক হোল– যেখানে স্থান-কালের গদিতে যেন গর্ত হয়ে গেছে। সেই গর্তে একবার কিছু পড়লে আর বেরোতে পারে না। তাই ব্ল্যাক হোল শুধু কল্পবিজ্ঞান নয়, মহাকর্ষের অনিবার্য পরিণতি। ব্ল্যাক হোল শুধু ফ্যান্টাসি নয়, বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই বহু ব্ল্যাক হোলের সন্ধান পেয়েছেন। একটা বিশাল ব্ল্যাক হোল বসে আছে খোদ আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে।

১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে, তরুণ স্টিফেন হকিং আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এক যুগান্তকারী ফলাফলে পৌঁছন। এই কাজের মূল প্রেরণা ও সহযাত্রী ছিলেন রজার পেনরোজ– একজন ব্রিটিশ গণিতবিদ ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি জ্যামিতিক চিন্তা ও গভীর গাণিতিক অন্তর্দৃষ্টির জন্য খ্যাত। পেনরোজ আগে থেকেই দেখিয়েছিলেন যে একটি ভারী নক্ষত্রের ধ্বস ব্ল্যাক হোল গঠনের দিকে নিয়ে যায়, এবং সেই প্রক্রিয়ায় স্থান-কালের ভেতরে এক ধরনের চরম ‘ভাঙন’ অনিবার্য। হকিং ও পেনরোজ একসঙ্গে প্রমাণ করেন যে এই ধরনের ‘ভাঙন’ সিঙ্গুলারিটি কেবল বিশেষ বা আদর্শ পরিস্থিতির ফল নয়; বরং খুব সাধারণ ও বাস্তবসম্মত শর্ত মানলেই মহাবিশ্বের শুরুতে (বিগ ব্যাং) কিংবা ব্ল্যাক হোলের গভীরে স্থান ও সময়ের এই ‘ভাঙন’ অবশ্যম্ভাবী। ‘জ্ঞানভূষণ’।

সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর

সিঙ্গুলারিটি যেন গর্তের মধ্যে বসে কালসাপ। একবার ব্ল্যাক হোলে পড়লে খেলা খতম, টেনে নেবে সিঙ্গুলারিটি। তারপর? তার আর পর জানা নেই। কিন্তু সিঙ্গুলারিটিকে ঢেকে রাখে হরাইজন, সেটা গর্তের পরিধি। ঠিক যেমন কুঁড়ির ভেতরে লুকিয়ে থাকে কুসুম। বাইরে থেকে আমরা কুঁড়িটা দেখি, কিন্তু ভেতরের গঠনটা আর চোখে পড়ে না। ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রেও তাই– হরাইজনের বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরের সিঙ্গুলারিটি কিছুই দেখা যায় না। এই ধারণাটাকেই হকিং খুব জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কাজ দেখায়, হরাইজন একবার তৈরি হয়ে গেলে সেটাই ব্ল্যাক হোলের পরিচয় হয়ে ওঠে। বাইরে থেকে ব্ল্যাক হোলের হরাইজন আশ্চর্য রকম সরল– না ঘোরালে সেটি এক্কেবারে নিখুঁত গোলক। এই কারণেই বলা হয়, ব্ল্যাক হোলের ‘চুল নেই’। কোন নক্ষত্র থেকে কেমন করে হল এই ব্ল্যাক হোল, মুছে যায় সব ইতিহাস। ‘নো-হেয়ার থিওরেম’– হকিং-এর (অন্য গবেষকদের সঙ্গে) আরেক অভিযান।

হকিং আরও দেখান, দু’টি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ হলে তৈরি হবে এক নতুন ব্ল্যাক হোল, আবার এক নিখুঁত গোলক। তবে নতুন গোলকের হরাইজনের ক্ষেত্রফল আগের থেকে বাড়বে বই কমবে না! প্রশ্ন হল তো কী? পদার্থবিজ্ঞানে এনট্রপি নামে একটা কথা হয়, যা হল বিশৃঙ্খলতার পরিমাণ। সহজ করে বললে, এনট্রপি মানে ডিসঅর্ডার– যত বেশি এলোমেলো, তত বেশি এনট্রপি। এনট্রপি সবসময় বাড়ে, কারণ প্রকৃতি সহজ রাস্তা বেছে নেয়। গোছানো অবস্থা থেকে এলোমেলো হওয়ার উপায় অনেক বেশি, কিন্তু এলোমেলো অবস্থা থেকে আবার গোছানো হওয়ার উপায় খুব কম। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেম স্বাভাবিকভাবেই বেশি বিশৃঙ্খলার দিকে যায়। ঘর নোংরা করা সহজ, করা যায় হরেক উপায়ে, কিন্তু সাফাই করা শক্ত। এখন, ব্ল্যাক হোলের হরাইজনও যদি এনট্রপির মতো সবসময় বাড়ে, তাহলে হরাইজনের ক্ষেত্রফলই কি ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি? হরাইজন যত বড়, ব্ল্যাক হোলের বিশৃঙ্খলতা তত বেশি। হকিং-এর তাই দাবি। কিন্তু দাঁড়ান, ব্ল্যাক হোল বাইরে থেকে যদি একেবারে নিখুঁত গোলক হয়, তাহলে তার গায়ে কোনও দাগ, ভাঁজ বা আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকে না। এই নিখুঁত গোলাকার চেহারার মানেই হল, তথ্য হারিয়ে গেছে। নেই কোনও বিশৃঙ্খলা। এটাই হল ইনফরমেশন প্যারাডক্স। আমাদের গল্পের একটি মাইলস্টোন। বোঝার জন্য আপনি পেলেন ‘জ্ঞানবিভূষণ’।

২০১৯ সালে তোলা মেসিয়ার ৮৭ ব্ল্যাক হোলের ছবি

চুনি পান্নার ভাণ্ডার শেষ, এবার হকিংয়ের হীরে। আগে আমি বলেছি, হকিং পিএইচডি-র শুরুতে কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে মাথা ঘামাননি। কিন্তু তিনি ফিরে এলেন ১৯৭০-এর গোড়ায়। তখন তিনি দেখলেন, যদি আমরা কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে ব্ল্যাক হোলের প্রেক্ষাপটে নিয়ে আসি, তখন চমকপ্রদ কিছু ঘটে– ব্ল্যাক হোল থেকে বিকিরণ বেরতে শুরু করে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, কোয়ান্টাম মেকানিক্স ‘ঈশ্বরের জুয়া’। কারণ এটি অণু ও কণিকার জগতকে এলোমেলো, কোয়ান্টামভাবে আচরণ করায়, ফলাফল নিশ্চিত নয়– জুয়ার মতো। ফলাফল– ব্ল্যাক হোল আলো এবং তাপ বিকিরণ করতে শুরু করে। এটিকেই আজ আমরা ‘হকিং রেডিয়েশন’ বলি। এই আবিষ্কার ব্ল্যাক হোল পদার্থবিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে গণ্য হয়, কারণ এটি কোয়ান্টাম মেকানিক্স, সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ, এবং তথ্য-এনট্রপি সমস্যাকে একত্রিত করে। কারণ বিকিরণ মানেই তাপ, আর তাপ মানেই এনট্রপি।

আগে বলেছি, কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং সাধারণ আপেক্ষিকতাকে (মহাকর্ষ/গ্র্যাভিটি) একসাথে মেলানো সহজ নয়। ব্ল্যাক হোল এই দুই জগতের মিলনের চূড়ান্ত পরীক্ষা। হরাইজনের ক্ষেত্রফল এবং ব্ল্যাক হোলের তাপ– হকিং-এর কাজের মূল রেজাল্টগুলো একটা লিটমাস টেস্ট, এখন যদি ইনফরমেশন প্যারাডক্স সমাধান করে আপনি যদি এগুলোকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করে দিতে পারেন, তবে আপনার কোয়ান্টাম মহাকর্ষের তত্ত্ব জবরদস্ত, সম্ভবত আপনি নামিয়ে দিয়েছেন সেই মহা ল। পারলে, ‘জ্ঞানরত্ন’ আপনার খপ্পরে। হকিং শেষ জীবনে নিজে দাবি করেছিলেন যে ইনফরমেশন (তথ্য) প্যারাডক্স তিনি বুঝে ফেলেছেন, কিন্তু সহমত হননি অন্যান্য বিজ্ঞানীরা।

কিন্তু আমরা কত দূর এগিয়েছি এই চেষ্টা নিয়ে? কোয়ান্টাম মহাকর্ষের এক দাবিদার হল স্ট্রিং থিওরি। যেখানে বক্তব্য সবকিছুই ছোট ছোট স্ট্রিং দিয়ে তৈরি, মানে স্থান-কালও। স্ট্রোমিঞ্জার এবং ভাফা (১৯৯৬) দেখিয়েছেন, স্ট্রিং থিওরির কৌশল ব্যবহার করে বিশেষ কৌশলে তৈরি ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রে হরাইজনের ক্ষেত্রফল এবং এনট্রপি পুরোপুরি মিলছে। কিন্তু এই ব্ল্যাকহোলগুলো একদম ঠান্ডা কোনও তাপ নেই। সাধারণ ব্ল্যাক হোলের জন্য এখনও রয়েছে চ্যালেঞ্জ, তবে এটি প্রমাণ করে যে স্ট্রিং থিওরি ব্ল্যাক হোলের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য বোঝার শক্তিশালী হাতিয়ার। 

নয়ের দশকের শেষে, প্রখ্যাত স্ট্রিং থিওরিস্ট জুয়ান মালডাসেনা হলোগ্রাফি বা দ্বৈততার ধারণা উপস্থাপন করেন, যা কোয়ান্টাম মহাকর্ষ এবং ব্ল্যাক হোল পদার্থবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই ধারণা অনুযায়ী, একটি ব্ল্যাক হোল-সহ কিছু বিশেষ স্থান-কালকে একটি কোয়ান্টাম তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত করা যায়। ধরুন, এক ধরনের ঘরের মধ্যেই ব্ল্যাক হোল আছে, আর ঘরের দরজা বা সীমানায় কোয়ান্টাম থিওরি কাজ করছে। দ্বৈততা মানে যাহা জল, তাই পানি। কোয়ান্টাম থিওরি থেকেই জানা যাবে ব্ল্যাক হোলের সব আচরণ। নোবেলজয়ী ’ট হুফট এই ধারণাটি প্রস্তাব করেছিলেন যে, ব্ল্যাক হোলের ভেতরের তথ্য হরাইজনের ঠিক বাইরে যেন কোয়ান্টাম ফিল্ডে দৃশ্যমান এবং সংরক্ষিত থাকে, ফলে তথ্য কখনও হারায় না। মালডাসেনা তাঁর এই হলোগ্রাফিক নীতির মাধ্যমে ’ট হুফটের এই ধারণাকে একটি কংক্রিট ও গণনাযোগ্য রূপ দিয়েছেন। ব্ল্যাক হোলের হরাইজনে যেন সবসময় চলে কোয়ান্টাম জুয়া, ঈশ্বরের জুয়া যেন সিঙ্গুলারিটির কালসাপ করে দিচ্ছে ঢোঁড়া সাপ, তাই সে নষ্ট করতে পারছে না তথ্য। অর্থাৎ, ব্ল্যাক হোলকে দূর থেকে নিখুঁত গোলক মনে হলেও, ব্ল্যাক হোলের গর্তে যা পড়ে, তা একভাবে কোয়ান্টাম ফিল্ডের বিভিন্ন অবস্থায় বাইরে প্রকাশিত হয়। এটি ইনফরমেশন প্যারাডক্সের একটি সম্ভাব্য উত্তর। তবে অনেক কিছুই বোঝা বাকি। এখনও পর্যন্ত স্ট্রিং থিওরি দিয়ে পুরোপুরি বাস্তব সমর্থিত কিছু বের করা যায় না। 

জুয়ান মালডাসেনা

এবার আসি একটু ব্যক্তিগত আলোচনায়। শীতকালে কিছু ছুঁলে আমরা সবাই শক খাই, অতএব জানেন ইলেকট্রিক চার্জ কী বস্তু। অনেক বড় বড় নামজাদা গবেষণাপত্রের মধ্যে হকিং-এর একটি ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল কিছু ব্ল্যাক হোলের উপরে ইলেকট্রিক চার্জের প্রভাব বোঝা। এখন যদি ‘যাহা জল তা পানি’ হয়, তবে জলে ডাল সিদ্ধ হলে পানিতেও সিদ্ধ হবে। অতএব হোলোগ্রাফি অনুযায়ী চার্জড ব্ল্যাক হোলের ধর্ম বোঝা যাবে কোয়ান্টাম তত্ত্বের ব্যবহারেই। এটি আমার প্রথম গবেষণাপত্র, যা প্রকাশিত হয়েছিল American Physical Society-র একটি জার্নালে।

পেনরোজ, কিপ থর্নকে দেখেছি বারকয়েক। নামজাদা স্ট্রিং থিওরিস্টদের তো বটেই। হকিংকে আমি চাক্ষুষ দেখিনি। কিন্তু আমার জীবনে তাঁর একটা অদ্ভুত অবদান আছে। যা সর্বজনবিদিত নয়, হওয়ার কথাও না। জনস্বার্থেই বলা যাক। ১৪ মার্চ ২০১৮-তে তিনি যখন প্রয়াত হলেন, আমি হকিংকে সম্মান জানাতে কিঞ্চিৎ তাঁরই মতো দুষ্টুমি-মিশ্রিত রসিকতা দিয়ে বিতর্ক তৈরি করতেই ফেসবুকে একটা হ্যাজ নামলাম: যিনি (হকিং) আজন্ম নাস্তিক আর ঈশ্বরবিরোধী ছিলেন, তাঁর প্রতি ‘রেস্ট ইন পিস’ লেখা উচিত কি না। পোস্টটা কিঞ্চিৎ ভাইরাল হয়, নানা মুনি নানা মত জ্ঞাপন করতে থাকেন, ওঠে তর্কের ঝড়। আর আমার ভাবী বৌ-এর পোস্টটা পছন্দ হওয়ায় আমাকে ডিএম করেন। তাঁকে ভাসাভাসা চিনতাম, কিছু কমন বন্ধুও ছিল, কিন্তু সরাসরি আলাপ সেই শুরু।