
জলাভূমিকে বলা হয় পৃথিবীর বৃক্ক। বৃক্ক যেমন ছাঁকনির মতো আমাদের শরীর থেকে দূষিত পদার্থ ছেঁকে বাইরে বের করে দেয়, তেমনই জলাভূমি নানা দূষিত বর্জ্য পদার্থকে ছেঁকে ফেলে পরিবেশকে দূষণমুক্ত হতে সাহায্য করে। অত্যন্ত ধীরগতিতে চলা এক ধারাবাহিক দূষণ ও নিধনের প্রক্রিয়ায় আজ পৃথিবীর বৃক্ক বিপন্নতার দোরগোড়ায়। জলাভূমি বা জলজ বাস্তুতন্ত্র যে একটি সম্পদ, সেকথা বুঝতে আমাদের অনেক সময় লেগে গিয়েছে। একটি জলজ বাস্ততন্ত্রের সজীব ও নির্জীব উভয় ধরনের উপাদানগুলি ব্যবহার করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের কর্তব্য ছিল কিন্তু আজ সমগ্র জলাভূমিকেই আমাদের লোভের শিখায় আহুতি দিয়েছি। পৃথিবীর ভূমির ৬ শতাংশ জলাভূমি। ‘ডাইরেক্টরি অফ এশিয়ান ওয়েটল্যান্ড’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে মোট জলাভূমির সংখ্যা ২৭৪০৩টি। ‘ওয়াইল্ড লাইফ ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া’-র সার্ভে অনুযায়ী, ভারতে প্রতি বছর ২-৩ শতাংশ জলাভূমি হ্রাস পাচ্ছে এবং মোট জলাভূমির মাত্র অর্ধেক অংশ জীবিত।
সুকুমার রায়ের ‘অবাক জলপান’ নাটকে তৃষ্ণার্থ পথিককে একটু জল পাওয়ার জন্য কীই না বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল, সেকথা আমাদের প্রায় প্রত্যেকেরই জানা। এই হাস্যরসাত্মক ছোট নাটকটির মধ্যে দিয়ে লেখক জল যে কেমন মহার্ঘ বস্তু হতে পারে, তা তুলে ধরেছিলেন। যা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে শুধু শহরবাসী নয়, গ্রামাঞ্চলের মানুষও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। এই তো দিনকয়েক আগে আমাদের গ্রামে আবার একটি বাড়িতে বোরিং করতে দেখলাম। আসলে গরম পড়ার আগেই তীব্র জলকষ্ট থেকে বাঁচার চেষ্টা। কিন্তু সবক্ষেত্রে তাও সফল হচ্ছে না। বোরিং করেও মিলছে না জল। এ এক অবাক কাণ্ড! পৃথিবীর তিনভাগ জল, তাও এত জলের কষ্ট! কিন্তু এই তিনভাগ জলের মধ্যে মাত্র ২.৫ শতাংশ জল মিঠে অর্থাৎ ব্যবহার যোগ্য। এখানেই শেষ নয়। এই ২.৫ শতাংশ জলের মধ্যে ৬৮.৭ শতাংশ হিমাবাহ এবং বরফের চাদর হিসাবে জমাট বেঁধে আছে এবং ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণ মাত্র ৩০.১ শতাংশ।

ভূমির ওপর মাত্র ১.২ শতাংশ জল ব্যবহার যোগ্য। তাই স্বাভাবিক ভাবে বোঝা যাচ্ছে, পৃথিবীতে ব্যবহারযোগ্য সহজলভ্য জলের পরিমাণ অতি নগণ্য। আর আমরা এই অমূল্য সম্পদটিকে রক্ষার পরিবর্তে নির্বিচারে নষ্ট করে চলেছি। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর থেকে প্রায় ৪০০ শতাংশ হারে জল উত্তোলন করা হচ্ছে জলের চাহিদা পূরণ করতে। একটি চমকে দেওয়ার মতো রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলে জলের স্তর ১১ মিটার নীচে চলে গিয়েছে। ২০১৯ সালে চেন্নাইয়ের তীব্র জল সংকট চোখে আঙুল দিয়ে সারা দেশকে দেখিয়েছিল, কী দুর্বিষহ পরিস্থিতি আসতে চলেছে আগামী দিনে! তবুও আমরা নিজেরদের ভুল শুধরোইনি বরং যথেচ্ছাচারে বিনষ্ট করে চলেছি আমাদের আশপাশে থাকা জলাভূমিগুলিকে। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র বর্তমানে বাসযোগ্য জায়গার অভাব, তাই যখন বনাঞ্চল নিধন সম্পন্ন হয়ে গেল তখন মানুষের সর্বগ্রাসী লোভ ধ্বংস করতে লাগল একটার পর একটা জলাশয়, দীঘি, পুকুর, ডোবা এমনকী ছোট নদীগুলিও। আমাদের ছেলেবেলায়, আজ থেকে বছর ৩০ আগেও অনেক ডোবা পুকুর ছিল আমাদের পাড়ায়। ধীরে-সুস্থে সুপরিকল্পিতভাবে সেইসব জলাশয় ভরাট করে বসতি স্থাপন শুরু হয়েছিল। আজও সেসবের ছবি স্মৃতিপটের ধূসর পাতায় থেকে গিয়েছে।

জলাভূমিকে বলা হয় পৃথিবীর বৃক্ক। বৃক্ক যেমন ছাঁকনির মতো আমাদের শরীর থেকে দূষিত পদার্থ ছেঁকে বাইরে বের করে দেয়, তেমনই জলাভূমি নানা দূষিত বর্জ্য পদার্থকে ছেঁকে ফেলে পরিবেশকে দূষণমুক্ত হতে সাহায্য করে। অত্যন্ত ধীরগতিতে চলা এক ধারাবাহিক দূষণ ও নিধনের প্রক্রিয়ায় আজ পৃথিবীর বৃক্ক বিপন্নতার দোরগোড়ায়। জলাভূমি বা জলজ বাস্তুতন্ত্র যে একটি সম্পদ, সেকথা বুঝতে আমাদের অনেক সময় লেগে গিয়েছে। একটি জলজ বাস্ততন্ত্রের সজীব ও নির্জীব উভয় ধরনের উপাদানগুলি ব্যবহার করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের কর্তব্য ছিল কিন্তু আজ সমগ্র জলাভূমিকেই আমাদের লোভের শিখায় আহুতি দিয়েছি। পৃথিবীর ভূমির ৬ শতাংশ জলাভূমি। ‘ডাইরেক্টরি অফ এশিয়ান ওয়েটল্যান্ড’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে মোট জলাভূমির সংখ্যা ২৭৪০৩টি। ‘ওয়াইল্ড লাইফ ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া’-র সার্ভে অনুযায়ী, ভারতে প্রতি বছর ২-৩ শতাংশ জলাভূমি হ্রাস পাচ্ছে এবং মোট জলাভূমির মাত্র অর্ধেক অংশ জীবিত।

ইতিহাসের পাতা উল্টোলে দেখা যাবে, যে কোনও সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদী বা জলাভূমিকে কেন্দ্র করে। এখনও মনুষ্য-বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে মানুষকে জলাভূমির আশেপাশেই সমাজ তৈরি করতে দেখা যায়। কোনও এলাকার প্রয়োজনীয় জলের চাহিদা পূরণ করার দায়িত্বে থাকে সেই এলাকার জলাভূমি। কিন্তু উৎপাদিত জলের থেকে ব্যবহার্য জলের পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে সাম্যাবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। শুধু দৈনন্দিন জীবনে জলের ব্যবহার নয়, জল আজ ‘বাণিজ্যিক’ পণ্যে পরিণত হয়েছে, তাই এই হাহাকার! কলকারখানার বর্জ্য এবং রাসায়নিক মিশছে নিকটবর্তী জলাশয়ে আর সেই দূষিত জল সম্পূর্ণ জলজ বাস্তুতন্ত্রটির ভারসাম্য নষ্ট করছে। ভূগর্ভস্থ জল অতিরিক্ত তোলার পরিণাম হিসাবে বাড়ছে জলে আর্সেনিকের মাত্রা। জলাভূমিতে জলজ উদ্ভিদের হ্রাস পাওয়ার কারণে জলে ভারী ধাতুর মাত্রা বাড়ছে আর এইসব থেকে সর্বাগ্রে বিপাকে পড়ছে জলজ প্রাণীরা। একটি জলজ বাস্তুতন্ত্রে বিভিন্ন জলজ জীবের বাস তাদের মধ্যে সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উভচর প্রাণীরা। পৃথিবী থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উভচর প্রাণী হারিয়ে গিয়েছে। গত ৩০-৪০ বছরে প্রায় ২০০-র বেশি ব্যাঙের প্রজাতি হারিয়ে ফেলেছি আমরা। এর কারণ হিসাবে জীববিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন উভচর প্রাণীরা পরিবেশ পরিবর্তনে দ্রুত সাড়া দেয়। শুধু উভচর প্রাণীরা নয়, দেশীয় মাছেদের একটা বড় অংশ এখন বিপন্নতার দোরগোড়ায়। একটি সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, গঙ্গায় পাওয়া যায় এমন মাছেদের ২৩০টি প্রজাতির প্রায় ১০ শতাংশ সংকটের মুখে। মাছ ছাড়াও একসময় যে জীবটি গঙ্গার বুকে মুক্তভাবে শ্বাস নিতে উঠে আসতে দেখা যেত, সেই গাঙ্গেয় শুশুক আজ বিপন্ন। সবকিছুর মূলে হচ্ছে জলদূষণ আর জলদূষণের একটি বড় অংশের জন্য দায়ী আমাদের কার্যকলাপ। বিভিন্ন পরিযায়ী পাখি যে ভারতে আসে, শীতের সময় তার বড় অংশ হল বিভিন্ন প্রজাতির হাঁস। জলে বাস করা এইসব হাঁসের প্রজাতিও এখন সমস্যায় পড়েছে জলাভূমি ধ্বংস হওয়ার কারণ। তাই বহু পরিযায়ী পাখি মুখ ফেরাচ্ছে। জলের আশপাশে বাস করা বিভিন্ন বন্য জন্তু– যেমন গোসাপ, বেজি, মেছোবিড়াল, উদবিড়াল এবং বিপাকে পড়েছে কারণ এরাও এদের বাসা হারাচ্ছে। এরা এখন কয়েকটি নির্দিষ্ট জলাভূমির সীমিত অংশের বাসিন্দা হয়ে থেকে গিয়েছে। জলাভূমি সুরক্ষিত থাকলে এরাও সুরক্ষিত থাকবে।

জলাভূমি যে সুরক্ষিত করতে হবে– এই বিষয়ে ভাবা শুরু হয়েছিল জলজ বাস্তুতন্ত্র বিপন্ন, তা বোঝার প্রায় ২৬ বছর পর। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকে বললেও, টনক নড়েনি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের। ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ক্যাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী ইরানের রামসার শহরে এই জলাভূমি সংরক্ষণ নিয়ে একটি বৈঠক আয়োজিত হয়েছিল। এই বৈঠকে জলাভূমি সংরক্ষণ ও তার সুসংগত ব্যবহারের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৯৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে এই দিনটি ‘বিশ্ব জলাভূমি সংরক্ষণ দিবস’ হিসাবে পালিত হওয়া শুরু হয়। প্রত্যেক বছর একটি ‘মূল ভাবনা’র ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশে এই দিনটি পালন করা হয়। জলাভূমি রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক অর্থাৎ ‘পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রালয়’ (MoEFCC) প্রত্যেক বছর ‘বিশ্ব জলাভূমি সংরক্ষণ দিবস’ পালনের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলি চিহ্নিত করে সেগুলির সুরক্ষা প্রদান করে। যেসব জলাভূমিগুলি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সবেথেকে বেশি সেগুলি চিহ্নিত হয় ‘রামসার সাইট’ হিসাবে।

আমাদের দেশে মোট ৯৮-টি জলাভূমি ‘রামসার সাইট’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তামিলনাড়ুতে সর্বাধিক (২০টির বেশি) ‘রামসার সাইট’ আছে। পশ্চিমবঙ্গে দু’টি জলাভূমি ‘রামসার সাইট’-এর তকমা পেয়েছে, সেগুলি হল পূর্ব-কলকাতা জলাভূমি এবং সুন্দরবন জলাভূমি। ২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি মোট ১৭২টি রাষ্ট্র এই দিনটি পালন করে। এবারের মূল ভাবনা ছিল– ‘জলাভূমি এবং ঐতিহ্যগত জ্ঞান: সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উদযাপন’। এবারের এই মূল ভাবনাটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কারণ সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল জলাভূমিকে কেন্দ্র করে তাই জলাভূমির সঙ্গে জড়িত আছে এই অঞ্চলের স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি। এক্ষেত্রে কৃষি, বিভিন্ন লোকাচার এবং ধর্মীয় আচারের কথা উল্লেখ করতেই হয়। এসব কিছুর অধিকাংশ তৈরি হয়েছিল জলাভূমিকে রক্ষা করার জন্য, কারণ প্রাচীন কাল থেকে মানুষ জল ও জলজ সম্পদের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল। তাই এই সবের মেলবন্ধনে জলাভূমিকে সুরক্ষিত করাই এই বছরের বিষয় ভাবনার উদ্দেশ্য। তবে কেবল একটি দিন পালিত করেই আমাদের কর্তব্য শেষ হয়ে যায় না। কোনও অঞ্চলের জলাভূমি রক্ষা করে পারে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ। যেমনটা করে দেখিয়েছেন ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ, পূর্ব-কলকাতা জলাভূমি সংরক্ষণের মধ্যে দিয়ে। একই দৃষ্টান্ত দিয়ে বলতে চাই নিজের এলাকার পুকুর থেকে নদী সবকিছু রক্ষার দায়িত্ব আমাদের নিজের। সামান্য ডোবা ভরাট বন্ধ করেও নিজের এলকার জলাভূমিটি বাঁচানো যায়, সেই সঙ্গে এই এলাকার পরিবেশ সুরক্ষিত হয়। নদীর বালি চুরি করে নদীকে বিপজ্জনক করে তুলছে একদল মুনাফালোভী মানুষ, এদের থেকে নিজের এলাকাকে রক্ষা করতে হবে। শুধু বালি নয়, আমাদের চোখের সামনে এমন অনেক ছোট নদী, পুকুর, খাল, বিল চুরি হয়ে যাচ্ছে। সেসব রক্ষা করে সুরক্ষিত করতে হবে নিজেদের ভবিষ্যৎ। আগামীর জন্য ‘জলজ সম্পদ’ সুরক্ষিত করে যাব, ‘নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’ হোক।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved