
মির্জাখানির সহপাঠিনী, সেণ্ট লুইর ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা রয়া বেহেশ্তি জবারহ্র স্মৃতিচারণায়, ‘ইরানে আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম, মেয়েদের অঙ্ক বা বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে কোন নঞর্থক ধারণা ছিল না। আমাদের কোনওদিন মনে হয়নি যে অঙ্ক মেয়েদের জন্য নয়।’ কিন্তু কতটুকু সেই আলোকিত পরিসর, যেখানে মরিয়ম মির্জাখানি বা রয়া বেহেশ্তির মতো মনীষা লালিত হয়? কতটুকু সেই সমাজের পরিসর, যেখানে পথেঘাটে হেডস্কার্ফ কেবলই একটা বাহুল্য ডেকোরাম, যাকে প্রচলিত ব্যবস্থার ভিত্তিহীন আবদার মাত্র ভেবে সহ্য করা চলে? কতটুকু সেই সুযোগ সুপ্রাপ্য, যেখানে মেয়েরা স্বপ্ন দেখতে পারে বিধাতার কার্পণ্যকে অতিক্রম করার?
গণিতজ্ঞ কেন ওনো সম্প্রতি ফেসবুকে জানিয়েছেন, পরিচালক ম্যাট ব্রাউন একটি বায়োগ্রাফিক্যাল ফিল্ম বানাচ্ছেন ‘মরিয়ম: দ্য মিরর অ্যান্ড দ্য ম্যাপ’, সহযোগী প্রযোজক হিসাবে থাকছেন অধ্যাপক ওনো ও অধ্যাপক মঞ্জুল ভার্গব।
ইরানের গণিতবেত্তা মরিয়ম মির্জাখানি– যিনি আবিশ্বে গণিতের সর্বোচ্চ পুরস্কার ফিল্ডস্ মেডেলের প্রথম (২০১৪) মহিলা প্রাপক– হার্ভার্ডে স্নাতকোত্তর পড়াশোনার সময়ে ক্লাসের পড়া ফারসিতে নোট নিতে সচ্ছন্দ বোধ করতেন। ফারসি সেই হাতে-গোনা ভাষা-ক’টার মধ্যে, যাতে উচ্চাঙ্গ গণিত লেখা চলে। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মানের মতো সাম্রাজ্যবাদী ভাষাগুলি বাদে মান্দারিন ছাড়া এই দুর্লভ সৌভাগ্য অন্য কোনও ভাষার হয়নি।

মির্জাখানির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে ইরানের প্রতিষ্ঠানগুলি তাঁর যা ছবি ব্যবহার করেছে, তাতে খোলা চুলের ওপর হেডস্কার্ফ ‘ফটোশপ’-এর অপচেষ্টায় কেবলই নিজেদের হাস্যাস্পদ করে তুলেছে।
পৃথিবীর সর্বত্রই অ্যকাডেমিকসে মেয়েদের অংশগ্রহণ অপেক্ষাকৃত কম। অক্সফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো, ছাত্রী ও গবেষিকাদের বিশেষ উৎসাহ দিয়ে ছেলে-মেয়ের সংখ্যা প্রায় সমান করতে পেরেছে। ইউরোপে জ্যুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরুষ বিদ্যার্থীর সংখ্যা মেয়েদের প্রায় দ্বিগুণ। যে চিনে সাত দশক আগে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা পুরুষ ও নারীর বিভেদ রাখেনি, সেখানে ৎসিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও তাই। এনআইটিতে আমার মাস্টার্স কোর্সে (অঙ্কে) ৩:১ অনুপাত ছিল ব্যতিক্রমী ভালো। বাকি এশিয়া বা লাতিন আমেরিকার অবস্থা পাঠকের অনুমানের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।
ইরানে ১৯৭৯-এ খোমেইনির অভ্যুত্থানের আগে যে অনুপাত ছিল বাকি প্রাচ্যের পক্ষে স্বাভাবিক, গত কয় দশকে তা আইভি লিগের পরিসংখ্যান ছুঁয়ে ফেলেছে। উচ্চশিক্ষার্থীর মধ্যে আধাআধি মেয়ে, দেশের সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শরীফ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকস্তরে অন্তত ৪০ শতাংশ মহিলা।

যে দেশে হেডস্কার্ফের আবরণ ছাড়া মেয়েদের পথেঘাটে বেরনো বারণ, উপাসনালয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ, কয়েকটির বাইরে জীবিকা চয়নও– সেই মুল্লুকে এই পরিসংখ্যান আশ্চর্যই বটে। আয়াতোল্লা খামেনেয়ি ট্যুইট করেছিলেন, ‘প্রেইজ গড, আমাদের মেয়েরা বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বিদ্যাচর্চা এবং ক্রীড়ায় বিশ্বসেরা।’
এর কিছুটা সভ্যতার স্বাভাবিক বিবর্তনে। সরকারি চেষ্টাও আছে হয়তো। ১৯৭৯ সালে খোমেইনির অভ্যুত্থানের পরে ব্যতিক্রমী পড়ুয়াদের জন্য দুটো স্কুল বানানো হয়– একটা ছেলেদের জন্য, একটা মেয়েদের। পরে আরও। তার কঠিন এনট্রান্স পরীক্ষা থাকে। মির্জাখানি ছিলেন তেহ্রানের ফর্জানগান্ গার্লস্ স্কুলের ছাত্রী।
তবে প্রলেতারিয়ার নিজাম সরকারের সমর্থকদের মুখে প্রতিধ্বনিত এই শুকনো পরিসংখ্যান বহু ভ্রান্ত ব্যবহারে ক্লিষ্ট হয়ে উঠেছে।
ডেসক্রিপটিভ স্ট্যাটিসটিক্সের প্রথম দিনের ক্লাসে স্যার আমাদের বলেছিলেন, ‘দেয়ার আর থ্রি টাইপস্ অব লাইজ্– লাইজ্, ড্যাম্ লাইজ্ অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্স!’ ডেটা নিষ্প্রাণ– বিশ্লেষণের দ্বারা তাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠায় অসংগতি ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের মতো উৎকট হয়ে উঠতে পারে। অতএব, ড্যাম লাইজ্ হিসাবে স্ট্যাটিসটিক্সের ব্যবহার সুচারুরূপেই হয়ে থাকে। পরিসংখ্যানের জন্য আহৃত তথ্য হতে হবে পক্ষপাতহীন, যা বিনা কারসাজিতে তুলে ধরবে মরুচারিণী ইরানি বালিকার পিঠের পাখনা, পায়ের বেড়ি।

নইলে যে ক্রীড়ার সাফল্য নিয়ে খামেনেয়ির এত গর্ব, তার শরিকদেরই ধরুন না। ইরানি গ্র্যান্ডমাস্টার দর্সা দরখসানি ২০১৭ সালে স্পেনে অনবগুণ্ঠিতা দাবা খেলার অপরাধে ইরানের হয়ে খেলার অধিকার হারান। শাসনতন্ত্রের এই অন্যায় জুলুমের প্রতিবাদে মার্কিন চ্যাম্পিয়ন নাজি পাইকিড্জে-বার্নেস্ সে-বছর ইরানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণে অস্বীকৃত হন। বিশ্বসেরা দাবাড়ু সারা খাদম, আত্বসা পৌরকাশয়ান্ ২০২২ সালে মাহ্সা আমিনির হত্যার প্রতিবাদে হিজাব ছাড়া খেলেন। এঁদের মাধ্যমে ইরান ক্রীড়াজগতে আরও যা খেতাব পেতে পারত তা গেছে আমেরিকায় আর স্পেনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির ইহুদী ফিজিসিস্টদের ঝেঁটিয়ে ম্যানহাটানে নিয়ে গিয়ে আমেরিকা যেভাবে বিশ্বজয়ী হয়েছিল।
রুচি ও প্রচলনের দ্বৈত প্রভাবে নির্দিষ্ট পরিধেয়, বা ক’টা স্কুল-কলেজে ছাত্রীর সংখ্যা দিয়ে দেশের মেয়েদের সার্বিক অবস্থার বিচার হয় না। মির্জাখানি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সফল বহু প্রবাসী পারসিকার মধ্যে একজন। ইরানিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ফিলোজফির অধ্যাপক হুসেন মাসুমি হামেদানির বিশ্লেষণে, ‘ইরানে মেয়েদের সহজ অধিকারে কিছুই নেই। তাই তাদের চেষ্টা করতে হয় বিজ্ঞান বা শিল্পের বিদ্বৎমণ্ডলীতে জায়গা করে সামাজিক পরিস্থিতিকে একটু সহনীয় করবার। অনাদর একটা মস্ত সুবিধা– পরিশ্রম ছাড়া সে আর কোনও বিকল্পই বাকি রাখে না।’

মির্জাখানির সহপাঠিনী, সেণ্ট লুইর ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা রয়া বেহেশ্তি জবারহ্র স্মৃতিচারণায়, ‘ইরানে আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম, মেয়েদের অঙ্ক বা বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে কোন নঞর্থক ধারণা ছিল না। আমাদের কোনওদিন মনে হয়নি যে অঙ্ক মেয়েদের জন্য নয়।’
কিন্তু কতটুকু সেই আলোকিত পরিসর, যেখানে মরিয়ম মির্জাখানি বা রয়া বেহেশ্তির মতো মনীষা লালিত হয়? কতটুকু সেই সমাজের পরিসর, যেখানে পথেঘাটে হেডস্কার্ফ কেবলই একটা বাহুল্য ডেকোরাম, যাকে প্রচলিত ব্যবস্থার ভিত্তিহীন আবদার মাত্র ভেবে সহ্য করা চলে? কতটুকু সেই সুযোগ সুপ্রাপ্য, যেখানে মেয়েরা স্বপ্ন দেখতে পারে বিধাতার কার্পণ্যকে অতিক্রম করার?
২০১৮-তে জাফর পানাহির ছবি ‘সে রোখ’ এসেছিল কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে। উত্তর-পশ্চিম ইরানের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে মর্জিয়া। তেহ্রানের কনজার্ভেটরির এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে সে। কিন্তু গ্রামসুদ্ধ লোক ঠিক করে রেখেছে, ‘ওকে পড়তে দেব না। ওকে পরিবারের মুখে চুনকালি লাগাতে দেব না।’ স্বভূমিকায় জাফর পানাহির সঙ্গে মেয়েটি কোনওক্রমে যোগাযোগ করে, যদি তিনি এসে গ্রামের ও পরিবারের লোকের মত পরিবর্তন করাতে পারেন। বাস্তবে যা প্রায় কখনওই ঘটে না, অথচ ঘটতে বাধা নেই– তা সিনেমায় সম্ভব হল। অর্ধেক ইরান বাই রোড গিয়ে অভিনেত্রী বেহ্নাজ জাফরির সঙ্গে পানাহি সেই গ্রামে পৌঁছলেন। তিনিও ফিল্ম লাইনের লোক– তাঁকে গ্রামের লোকের কী সাংঘাতিক খাতির! অথচ মর্জিয়ার ড্রামা স্কুলে পড়তে চাওয়ার মতো ‘স্বেচ্ছাচারের অধিকার কেবল শবদেহের আছে।’

জাফর বুঝতে পারেন না, এই দ্বিবিধ ব্যবহার কেন। তিনি পুরুষ আর মর্জিয়া মেয়ে বলে? না কি, সাফল্যের ময়ূরপুচ্ছ কুঁচকানো নাককে অনেকটা সোজা করে দেয়? হয়তো মর্জিয়া কোনওদিন বিদেশের চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পেয়ে এলে গ্রামের চৌমাথায় এরাই তার মূর্তি বানাবে।
শুধু তাই যে নয়, তা বোঝাবার জন্য পানাহি ‘ইসলামিক বিপ্লবে’র আগের যুগের একজন প্রথিতযশা অভিনেত্রীর কথা বলেছেন। অধুনা কপর্দকহীনা বৃদ্ধা শাহারাজাদ সেই গ্রামের এক কোনায় ঘর বেঁধে একা থাকেন। ইরানের সরকারের মতোই গ্রামের লোক তার ছায়া মাড়ায় না। তিনি যে ‘মোৎরে’, বিনোদন-পসারিনী।
পপুলিস্ট শাসনতন্ত্র জনসাধারণের বিপুল উচ্ছ্বাসের মধ্যে ক্ষমতায় এসে তার উন্নয়নটুকু কয়েকটা মেট্রোপলিসের বাইরে পৌঁছে দিতে পারে না। বিষ আরও সহজে সংক্রামক। আপনি হয়তো বলবেন, মর্জিয়া মেয়েটি– যার নামটি চিত্রনাট্যকারের চয়ন তার মন-মর্জির সামাজিক স্বীকৃতিকে বিদ্রূপ করেই– কি ভারতবর্ষের অখ্যাত কোণে জন্মায় না? কিন্তু লিখিত সংবিধানে ভারত সরকার, শাসক দল নির্বিশেষে, তার পক্ষে থাকত। শাসনতন্ত্রের প্রশ্রয়ে যে জুলুম, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কোনও উপায়ই ইরানের আজেরবাইজানি মেয়ে মর্জিয়ার অনায়ত্ব।

তাদের কথা মেট্রোপলিসে পৌঁছায় না, বিশেষ করে ইরানের মতো মরুভূমির দেশে। আমাদের এটা বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। ভারতবর্ষের প্রাণকেন্দ্র বোম্বাই-দিল্লি নয়– তার গ্রাম, ধানখেত, গো-পালন। ইরানে কিন্তু জনসংখ্যা তেমন সমবণ্টিত নয়– যা কিছু ঐশ্বর্য ঘনীভূত হয়ে আছে মরুদ্যানের ন্যায় শহরগুলিকে কেন্দ্র করে। বাকি ইরান এত ইতস্তত, এত বিচ্ছিন্ন, যে তার প্রভাব রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতিতে অতি সামান্য।
তেহ্রানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে তেহ্রানেরও মাত্র প্রগতিশীল পরিবারের মেয়েরা, ইকো-সিস্টেমের মধ্যে মশাল না হোক, প্রদীপ হাতে দাঁড়াবার সাহস ও সচ্ছলতা যাদের আছে। তাদের সংখ্যা ক্লাসরুমে বা রিসার্চ ল্যাবে যতই হোক, তাই দিয়ে সমগ্র দেশের বিচার করা অবিচার। মর্জিয়ার মতো মেয়েদের মর্জিমতো জীবন কাটানো কেবল চৈতালি রাতের স্বপ্ন।
ইরানের তারুণ্যের সংঘর্ষের প্রতীক হয়ে একটা ছবি আজ সারা বিশ্বের কাছে পৌঁছেছে। কানাডা-প্রবাসিনী একটি ইরানি মেয়ে সুচারু তাচ্ছিল্যে সিগারেটের আগুনে খামেনেয়ির ছবি পুড়িয়ে ফেলছে। ধূম্রপান স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকারক হতে পারে, কিন্তু হেডস্কার্ফের ফাঁস মধুরতর নয়। এঁটে-ধরা ফাঁসটি ছেঁড়ার জন্য যেন আড়মোড়া ভাঙা, জেগে ওঠার সাবলীল ছন্দে। ছবিটির বক্তব্য সহজ, আবেদনে অসামান্য তীব্রতা।

যুদ্ধ বেঁধে যাবার আগে পর্যন্ত ইরান বিদ্রোহ করছিল। আশা করি, যুদ্ধের রাজনীতির মধ্যে তার আকাঙ্ক্ষিত বিপ্লবের মর্মবাণী ক্ষুণ্ণ হবে না।
খোমেইনির ‘পপুলিজম’ নির্বোধের বোধ্য ছিল। আজ ইরান যে মুক্তি চায়, তার আলো তেহ্রানের হাইরাইজে কার্পেটে-মোড়া লিভিং রুমে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার স্বাদ ও সম্ভাবনা পৌঁছে দেবে সেই প্রত্যন্তবাসিনীদের অবগুণ্ঠনের অন্তঃপুরেও– কবিগুরুর কলম ধার করা বাংলার সেই ‘সাধারণ মেয়ে’র মতোই যারা ‘ফরাসী জর্মান জানে না, কাঁদতে জানে’।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved