
ঈশ্বর আর আমি এক অফিসে কাজ করেছি ১৬ বছর। আবারও বলছি, আমার কোনও লেখা কোনওদিন পড়েননি। এই ব্যক্তিগত তথ্যটি শেয়ার করলাম। যা কিছু ব্যক্তিগত তা-ই পবিত্র বলে। এই বাউল ঈশ্বর একদিন ট্যাক্সি করে ঘুরলেন সারা কলকাতা। আর সম্ভবত ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে রেখে কখনও বারদুয়ারি, কখনও শ বারে হৃদয় ভেজালেন। ট্যাক্সির বিল বেশ ওপরে। অত টাকা ঈশ্বরের নেই। ট্যাক্সি ড্রাইভার ঈশ্বরকে চেনে না। সে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা থানায়। তখনও মোবাইল মর্তভূমিতে অবতীর্ণ হয়নি। অফিসের ল্যান্ডফোনে সুনীলদাকে ঈশ্বর জানালেন, শ’ খানেক টাকা এনে তাঁকে থানা থেকে উদ্ধার করতে। কিন্তু অত টাকা কার পকেটেই বা থাকতে পারে? ঈশ্বর বললেন সুনীলদাকে, চাঁদা তুলতে।
মিথ-মিথ্যার মায়াজালে, রাতদিনের অন্তহীন তারল্যে তিনি ভাসছেন, কখনও আনন্দে, কখনও গভীর যাতনায়, কখনও বাউল উদাসীনতায়। এমন একজন বাঙালি মহাকবিকে আমি দেখেছি অন্তত ১৬ বছর খুব কাছের অপার দূরত্ব থেকে, যে-দূরত্ব রচনা করেছে তাঁর মহাকাশের মতো প্রতিভা।
আর কোনও এমন বাঙালি আমি দেখিনি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো। যিনি বাংলা ভাষাকে ছুঁলেই, কী পদ্যে, কী গদ্যে, ঘটে যায় একই সঙ্গে প্রাণদান, চক্ষুদান, মনদান। আমাকে যতবার ছুঁয়েছেন, মাথায় চাঁটি মেরে, পিঠে হাত বুলিয়ে, পানভূমিতে জড়িয়ে চুমু দিয়ে, মনে হয়েছে ঈশ্বর ছুঁলেন আমাকে। এই ঈশ্বর আমার কোনও লেখা কোনও দিন পড়েননি। তাই লজ্জায় ভুগতে হয়নি আমাকে আমার লেখার ভাগাড়ের জন্যে।
বাংলা পদ্যের এই বাউল ভগবানের প্রথম কবিতার বই, ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’, বেরল ১৯৬১-তে। আমি ২০। আমি ছাত্র। সবে প্রেমে পড়েছি কলির। সে আমার এক অধ্যাপকের বছর ১৩-র পাকা মেয়ে, যে কবিতা লেখে। তাকে উপহার দিলাম শক্তিদার প্রথম কবিতার বই। কবিতা কখন কীভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে এই প্রথম ও শেষবারের মতো পদ্যের গরিমায়, কলির সঙ্গে এই সিক্রেট ভাগ করে নিতে। শক্তিদার সঙ্গে এইভাবে জড়িয়ে গেল আমার অন্তর যাপন।

১৯৬৫। বেরল শক্তিদার পদ্যের মহাকাব্য, ‘ধর্মে আছো, জিরাফেও আছো’। সেই বছরেই বিয়ে করলাম বছর ১৫-র কলিকে। কলিকে বিয়ের উপহার, ধর্মে + জিরাফে মেশানো এই অতুল পদ্যগুচ্ছ। সঙ্গে একটু লেখা: কী আশ্চর্য। জিরাফের কণ্ঠ বোবা। ধর্ম বোকা কথায় ভরা! তখন শক্তিদার সঙ্গে আমার আলাপের প্রথম আলো! বিয়ের ১০ বছরের মধ্যে, আদালতের যাচিত নির্দেশে, আমাদের বিয়ের আলো যখন নিভে গেল, তার ক’দিনের মধ্যে শক্তিদার সঙ্গে আমার দেখা। চৌরঙ্গীর কোনও পানঘরে। আমার বিচ্ছেদের ব্যথা ফুটে উঠল শক্তিদার চোখে। ঈশ্বরকে আজও বুঝিনি। কত মানুষকে কত কষ্ট দিচ্ছেন বিশ্ব জুড়ে। অথচ আমার ঠুনকো কষ্টে তাঁর চোখে জল!

এই ঈশ্বর আর আমি এক অফিসে কাজ করেছি ১৬ বছর। আবারও বলছি, আমার কোনও লেখা কোনওদিন পড়েননি। এই ব্যক্তিগত তথ্যটি শেয়ার করলাম। যা কিছু ব্যক্তিগত তা-ই পবিত্র বলে। এই বাউল ঈশ্বর একদিন ট্যাক্সি করে ঘুরলেন সারা কলকাতা। আর সম্ভবত ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে রেখে কখনও বারদুয়ারি, কখনও শ বারে হৃদয় ভেজালেন। ট্যাক্সির বিল বেশ ওপরে। অত টাকা ঈশ্বরের নেই। ট্যাক্সি ড্রাইভার ঈশ্বরকে চেনে না। সে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা থানায়। তখনও মোবাইল মর্তভূমিতে অবতীর্ণ হয়নি। অফিসের ল্যান্ডফোনে সুনীলদাকে ঈশ্বর জানালেন, শ’ খানেক টাকা এনে তাঁকে থানা থেকে উদ্ধার করতে। কিন্তু অত টাকা কার পকেটেই বা থাকতে পারে? ঈশ্বর বললেন সুনীলদাকে, চাঁদা তুলতে। চাঁদা তোলা তো হল। পদ্যের ঈশ্বর সংকটে। সুতরাং, চাঁদা প্রশ্নের অতীত। টাকা নিয়ে সুনীল গাঙ্গুলি থানা থেকে মুক্ত করলেন ঈশ্বরকে। বললেন, এই অবস্থায় অফিসে যাসনি, বাড়ি চলে যা শক্তি। কবি তখনই পকেট থেকে বের করলেন বেশ কিছু টাকা। অবাক সুনীলদার প্রশ্ন, তোর কাছে এত টাকা, আর তুই আমাকে চাঁদা তুলতে বললি ট্যাক্সিভাড়া দেওয়ার জন্য? –এই টাকাটা তো পান করার জন্য। বাজে খরচের জন্য নয়। চ এখন আমার সঙ্গে। এত কষ্ট করলি। হতবাক সুনীলদার অসহায় প্রশ্নের উত্তরে বললেন, একই দেহে ভাষা ও ভাবের ভগবান।

ঈশ্বরের পাড়ার এক উঠতি বড়লোক কিনলেন গাড়ি। এবং প্রতি প্রাতে না কি গাড়িস্নান শুরু করলেন ঈশ্বরের বাড়ির কাছে। তারপর সেই গাড়ির স্তুতি ও স্তব। পদ্য লিখে আর যাই হোক গাড়ি হয় না। বিশেষ করে বাংলা পদ্যের তো কানাকড়ি মূল্য। উঠতি ধনীর এই ভাবটি বিচ্ছুরিত হতে লাগল– ভাবে ভঙ্গিতে কথায় চুপকথায় কৌলীন্যে কটাক্ষে। শোনা গেল, না কি তারাপদ রায় বললেন, শক্তি আর থাকতে না পেরে একটা একলা খালি ডবল-ডেকার বাস পাকড়াল মধ্য রাতের কলকাতায়। বলা যায়, ঈশ্বর ঘটালেন এই অসম্ভব মিরাকেল। এই হল গিয়ে পদ্যের শক্তি। শেলি তাঁর ‘ইন ডিফেন্স অফ পোয়েট্রি’ প্রবন্ধের শেষ লাইনে প্লেটোর কবিতাবিরোধী সব কথার গালে চড় কষিয়ে লিখেছেন, ‘poets are the unacknowledged legislators of the world’। ওটা যে কথার কথা নয়, সেটাই না কি প্রমাণ করেছিলেন মধ্যরাতের কবি ও ঈশ্বর, এই কলকাতায়। সেই দোতলা বাসের ওপরে আসীন হয়ে প্রবেশ করলেন তিনি পাড়ায়। এবং পদ্যের জিরাফের মতোই তিনি গলা বাড়ালেন ধনীর দোতলার বেডরুমে। চটকে দিলেন অর্থের নিরর্থ অহং।

অফিসে শুরু হল দুপুরে ডাবের দাপাদাপি। দুপুরবেলার দুর্দান্ত গরম মাথায় নিয়ে তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে রাস্তায় না গিয়ে কাজের জায়গায় কাজ করতে করতে, দারুণ সব কপি নামাতে নামাতে, পবিত্র ডাবের জলে তৃষ্ণা নিবারণের স্বর্গীয় ভাবনাটি না কি প্রথম উঁকি দিল অলীক শক্তিসম্পন্ন পদ্যের ঈশ্বরের মাথায়। ডাব আসতে শুরু করল অফিসের ডেস্কে। তখন অবিশ্যি সেই দপ্তরের অন্য রূপ। শুরু হয়নি কর্পোরেট সংস্কৃতির রুটিন মার্চ। তখনও বিরাজ করছে প্রতিভার প্রহর ও প্রাঙ্গণ। অফিসে তখনও ঈশ্বরের নিজস্ব উঠোন ও উন্মাদনা। ডাবের ম্যাজিক রিয়েলিটি তৈরি করল দফতরে কাজের এক অফুরন্ত আনন্দ এবং তন্ময় তারল্য। এবং পদ্যের ঈশ্বর ভাসতে লাগলেন হিরণ্ময় বাক্য ও সৃষ্টির সাগরে। সেই ভগবানকে নিজের চোখে দেখেছি। আরোহণের পথে ডাবের মধ্যে ভদকা কিংবা সস্তা ‘কান্ট্রি লিকার’ ঢুকলেও কী অলৌকিক ইন্টেলেকশন সম্ভব, প্রতিভার আলো কোন আলোকবর্ষ দূরত্ব মুহূর্তে কভার করতে পারে, সেটা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ক’দিনের জন্যে পদ্যের ঈশ্বরের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলাম আমি, কিংবা আমরা অনেকেই, মহাকাশে। তারপর এল বিত্তমধ্য নালিশ। বন্ধ হল ডাবের আরোহণ। ঈশ্বর ফিরে গেলেন দুপুরবেলার তৃষ্ণার্ত অবরোহণে। আমাদের সোনার মোহর কুড়িয়ে রাখার পালাও ফুরল। এখনও ছড়িয়ে আছে আমার স্মৃতিশক্তিতে সেই সব ঈশ্বর-মুহূর্তের হিরে পান্না মুক্তো মাণিক্য। বিত্তমধ্য প্রতিরোধ তাদের নাগাল পায় না আমার মনকেমনের পানশালার বিপন্ন বিষণ্ণ বিধুরতায়। পদ্যের ভগবান কখনও কখনও আজও আসেন সেখানে, খোলা গলায় রবীন্দ্রনাথের গান শোনাতে। শক্তিদার কণ্ঠের তেপান্তরে আমি যেভাবে পেয়েছি রবীন্দ্রনাথকে, আর কোথাও পাইনি তাঁকে। বুঝেছি, রবীন্দ্রসংগীত চায় কণ্ঠে ভাবের মদ ও উন্মত্ততা। আর চায় বক্ষ জুড়ে তৃষ্ণা। যে উন্মত্ততা ও তেষ্টা ছিল শক্তিদার অনর্গল প্রকাশের নিরবচ্ছিন্ন অঙ্গ!
……………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন স্মৃতিশক্তি-র অন্যান্য লেখা
……………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved