review on sesh tara krishanu। Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

অমরত্বের দাবি রাখে যে শেষ তারা

‘শেষ তারা কৃশানু’ কৃশানু দে-কে জানার অনন্য অভিজ্ঞান। যেখানে অধ্যায়ের বাঁকে বাঁকে কোথাও ধরা দিয়েছেন ফুটবলার কৃশানু, কোথাও ব্যক্তি কৃশানু, কোথাও আবার বন্ধু কৃশানু। পরিসংখ্যান আর তথ্যের কচকচানি নয়, বরং বক্তব্যের সহজতায় এবং আবেগের সংযোগে ফুটে উঠেছে সেই ফেলে আসা সোনালি অতীত। পড়তে পড়তে পাঠকের চোখের সামনে ধরা দেবে সেই কালখণ্ড। ভেসে উঠবেন বাঁ-পায়ের জাদুকর, যাঁর শৈল্পিক মূর্চ্ছনায় আবিষ্ট হয়ে থাকত একদা ভারতীয় ফুটবল।

Published by: Robbar Digital

Posted:February 13, 2026 5:27 pm | Updated:February 13, 2026 5:29 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

৩২.

‘সকলেই কবি নয়; কেউ কেউ কবি’। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও ভুল নয়। কবিত্ব সাধনার বস্তু, শ্রম ও সাধ্যের লব্ধ ফল।

ফুটবল খেলাটাও কবিতার ভুবনের মতো। ফুটবল মাঠে সকলেই ফুটবলার হতে পারে, কিন্তু সকলেই শিল্পী নয়। কবির কথা ধার করেই বলতে হয়, কেউ কেউ শিল্পী।

কে এই শিল্পী?

বল পায়ে যিনি সবুজ মাঠে শিল্পের মায়াজাল বুনে চলেন, মগ্ন-তপস্বীর মতো মন্ত্রমুগ্ধ করেন অগণন সমর্থক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। সবুজ ময়দান যাঁর পায়ের ছোঁয়ায় হয়ে ওঠে জীবন্ত ক্যানভাস। ভারতীয় ফুটবল আঙিনায় তেমন শিল্পী হয়তো হাতেগোনা। তবু আছে। জ্যোতিষ্কলোকের সেই মধ্যগগনে ধ্রুবতারা হয়ে বিরাজ করছেন একজন, তিনি– কৃশানু দে। ভারতীয় ফুটবলের মারাদোনা। এক ক্ষণজন্মা ম্যাজিশিয়ান।

zoom
কৃশানু দে

বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি। সে তার ইতিহাসকে মনে রাখেনি, ভুলতে বসেছে। তার সত্তা থেকে সে কালে কালে বিচ্যুত হয়েছে। তবু সেই কক্ষচ্যুত বাঙালির একটা ইতিহাস রয়েছে, উত্তম-সুচিত্রা রয়েছে, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় রয়েছে, আর রয়েছে কৃশানু দে। ভুল বললাম। বাঙালির একটা কৃশানু দে ছিল, আছে এবং থাকবে। চিরকাল।

এসব কথার কথা নয়। বরং অনিমেশ অনুভূতি, যা জাগ্রত হয় ‘শেষ তারা কৃশানু’ গ্রন্থপাঠে। কৃশানু-পুত্র সোহম দে ও সাংবাদিক কৃশানু মজুমদারের যৌথ সম্পাদনা ও সংকলনে এই গ্রন্থ কৃশানু দে-কে জানার অনন্য অভিজ্ঞান, অনবদ্য বটে। যেখানে অধ্যায়ের বাঁকে বাঁকে কোথাও ধরা দিয়েছেন ফুটবলার কৃশানু, কোথাও ব্যক্তি কৃশানু, কোথাও আবার বন্ধু কৃশানু। পরিসংখ্যান আর তথ্যের কচকচানি নয়, বরং বক্তব্যের সহজতায় এবং আবেগের সংযোগে ফুটে উঠেছে সেই ফেলে আসা সোনালি অতীত। পড়তে পড়তে পাঠকের চোখের সামনে ধরা দেবে সেই কালখণ্ড। ভেসে উঠবেন বাঁ-পায়ের জাদুকর, যাঁর শৈল্পিক মূর্চ্ছনায় আবিষ্ট হয়ে থাকত একদা ভারতীয় ফুটবল। সেই অজাতশত্রু সৃষ্টিশীল তারকাকে কেন্দ্র করে এই ব্যতিক্রমী বই, তামাম ফুটবল অনুরাগীদের উপহার দেওয়ার জন্য প্রশংসা প্রাপ্য প্রকাশক ব্ল্যাকলেটার্সেরও।

ব্যক্তিগত অনুভবের জায়গা থেকে দু’-এক কথা না-বললেই নয়। খেলা অন্তপ্রাণ পরিবারের সূত্র ধরেই ফুটবলের সঙ্গে নাড়ির যোগ গড়ে উঠেছে সেই ছোটবেলা থেকে। প্রতিটি সবুজ-মেরুন সমর্থকের মতোই মোহনবাগান আমারও মাতৃসম। সেই প্রেরণায় পরিচিত হয়েছি কিংবদন্তি ফুটবলারদের সঙ্গে। তাঁদের স্নেহ, ভালোবাসায় ঋদ্ধ হয়েছি বরাবর। তাই কৃশানু দে আমার কাছে কোনও সুদূর নীহারিকা নন, বরং খুব কাছের, আবেগ ও বিস্ময়ের এক মানুষ। যাঁকে ঘিরে বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের সোনালি ইতিহাস লেখা হয়েছে। সেই ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে ‘শেষ তারা কৃশানু’-তে।

আক্ষরিক অর্থেই কৃশানু দে ভারতীয় ফুটবলের শেষ নক্ষত্র। ছোট ক্লাব বাদ দিলে কলকাতা ময়দানে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল মিলিয়ে সর্বোচ্চ স্তরে ১৮ বছরের তাঁর ফুটবল জীবন। এই আঠারো বছরে অনেক মণিমাণিক্যতুল্য সাফল্য তিনি উপহার দিয়েছেন ভারতীয় ফুটবলকে। মারডেকায় থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক হোক কিংবা মোহনবাগান জার্সিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা, ক্রমে ক্রমান্বয়ে কৃশানু হয়ে উঠেছিলেন বনস্পতি। সেই ছায়ায় আলোকিত হয়ে দেশের দুই সেরা ক্লাব এবং অবশ্যই ভারতীয় ফুটবল।

একদা ‘কৃশানু-বিকাশ’ জুটিকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে ক্লাব ফুটবলের দলবদল। সেই দলবদলের রোমাঞ্চ হার মানাবে সিনেমার ক্লাইম্যাক্সকেও। রুদ্ধশ্বাস সেই কাহিনি সময়ের জল, হাওয়ায় আজ মিথে পরিণত। টুকরো টুকরো সেই গল্প, স্মৃতিকে বিনি সুতোয় মালায় গাঁথার অসাধ্যসাধন করেছে সোহম এবং কৃশানু মজুমদার– ‘শেষ তারা কৃশানু’তে।

zoom
কৃশানু দে-বিকাশ পাঁজি, সঙ্গে কোচ পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়

মোহনবাগান কৃশানুর প্রথম বড় ক্লাব। শেষ বড় ক্লাবও। জহুরি জহর চেনে, শৈলেন মান্নারও নাকতলার ‘রন্টু’কে চিনতে ভুল হয়নি। তাঁর হাত ধরেই ১৯৮২-তে মোহনবাগান জার্সি গায়ে চাপান কৃশানু। তারপর কখনও ইস্টবেঙ্গল, আবার কখনও মোহনবাগান– ডিফেন্স চেরা থ্রু, বল পায়ে হিরন্ময় দৌড়, রামধনুর মতো বাঁকা শটে হৃদয়হরণ করেছেন ভারতীয় ফুটবলের মারাদোনা। হয়েছেন গৃহস্থের গর্ব, পড়শির ঈর্ষা। তাঁর দ্যুতিতে কখন‌ও মোহনবাগান, কখন‌ও ইস্টবেঙ্গল জার্সিতে গোলের বন্যা ছুটিয়েছেন বিকাশ পাঁজি, কখনও চিমা ওকেরি।

আসলে কৃশানু প্রকৃত অর্থেই ছিলেন প্লে-মেকার। শ্যাম থাপার মতো কিংবদন্তি জানাতে ভোলেননি, ‘কৃশানুর পাস থেকে গোল না করাই ছিল কষ্টের।’ মোহনবাগান সচিব সৃঞ্জয় বোসের কথা ধার করেই বলতে হয়, ‘আজ যদি মোহনবাগান মাঝমাঠে কৃশানু দে-র মতো একজন প্লেয়ার থাকত, তাহলে প্রতি ম্যাচে দশটা করে গোল হত’। আসলে কৃশানু দে ছিলেন ভিনদেশিদের বিরুদ্ধে এই দেশের জবাব। তাঁর কোনও বিকল্প হয় না। যেমন হয়নি সুব্রত ভট্টাচার্য, চুনী গোস্বামী কিংবা শৈলেন মান্নার। ‘শেষ তারা কৃশানু’-তে প্রতি ছত্রে রয়েছে আবেগের ধারাস্নান। মাত্র ৪১ বছরে কৃশানুর অকালপ্রয়াণ মেনে নিতে পারেন না তাঁর একদা সতীর্থ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য থেকে অলোক মুখোপাধ্যায়, বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য থেকে বিকাশ পাঁজি– কেউ-ই। শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় কৃশানু জীবন্ত হয়ে ওঠেন তাঁদের ভাষ্যে।

zoom
পিকে-র কোচিংয়ে প্রশিক্ষণরত কৃশানু, অদূরে চিমা ওকেরি

পুত্র সোহম এবং সাংবাদিক কৃশানু মজুমদার, উভয়ে ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর দুই প্রাক্তনী। ব্যক্তিগত পরিচয় সূত্রে জানি, ফুটবল উভয়ের ধ্যানজ্ঞান। আর সেই সাধনায় কৃশানু দে তাদের আরাধ্য। মায়ের মারের হাত থেকে ছেলেকে বাঁচানো, লুকিয়ে চকলেট, আইসক্রিম কিনে দেওয়া ঘুম না এলে চাচা চৌধুরীর কমিকস পড়ে শোনানোর নানা স্মৃতিকথায় সোহম দে-র লেখা যথার্থ পিতৃতর্পণ। ততটাই  মনোগ্রাহী স্ত্রী পনি দে স্মৃতিচারণা। ইস্টবেঙ্গল কর্তা দেবব্রত সরকারের স্মৃতিচারণায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে আট ও নয়ের দশকে দলবদলের টানটান উত্তেজনা। আজকের ‘পেশাদারিত্ব’-এর যুগে যা কার্যত বিরল দৃশ্য। ’৮৫-তে মোহনবাগান-অনুরক্ত কৃশানুকে ইস্টবেঙ্গলে এনে মাঠের বাইরে ‘ডার্বি’ জিতেছিল লাল-হলুদ। সেই মাস্টারপ্ল্যানের নেপথ্যে ইস্টবেঙ্গলের জীবন-পল্টু দাসের জুটির সঙ্গে ছিলেন ময়দানের ‘নীতুদা’ও। আবার ’৯২-তে সেই আদরের ‘রন্টু’ই তাঁর নীতুদার আপত্তি অগ্রাহ্য করে গায়ে চাপিয়েছিলেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানের জার্সি। ডার্বি নিয়ে কতটা নিখুঁত ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা ছিলেন রন্টু, তা জানাতে ভোলেননি লাল-হলুদ কর্তা।

zoom
মোহনবাগান মাঠে চেনা মেজাজে কৃশানু দে

নাকতলার প্রভাত সংঘ থেকে রাজেশ খান্না, ক্রিকেট-প্রেম থেকে ফুটবল মাঠে ইন্দ্রজাল বিছিয়ে দেওয়া– কৃশানু দে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর জীবনপ্রবাহকে ধরতে চেয়েছে এই গ্রন্থ। ত্রুটি-বিচ্যুতি কি নেই? আছে। স্মৃতির সরণি বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, যদি পাঠকরা জানতে পারতেন সেই সময়ের দলবদলের অন্যতম কাণ্ডারি টুটু বোসের কৃশানু নিয়ে দু’-চার কথা। কিংবা বন্ধু কৃশানুকে নিয়ে চিমার আত্মোপলব্ধি, তাহলে মন্দ হত না!

তা সত্ত্বেও ম্যাচের ৯০ মিনিটের মতোই এ গ্রন্থ টানটান, উত্তেজনায় ভরা এক নস্ট্যালজিক দমকা বাতাস। স্মৃতিলেখ-র মোড়কে এ এক আশ্চর্য রূপকথা। যার ক্ষয় নেই, অবিনশ্বর। কৃশানু দে-র মতোই।

 

শেষ তারা কৃশানু
সংকলন ও সম্পাদনা: সোহম দে, কৃশানু মজুমদার
ব্ল্যাকলেটার্স
৫০০ টাকা

 

………… পড়ুন ওপেন সিক্রেট-এর অন্যান্য পর্ব …………

পর্ব ৩১: বিরোধিতার সহজপাঠ

পর্ব ৩০: পুরনো-নতুনের কথোপকথন

পর্ব ২৯: পয়সা দিলে ‘ঈশ্বর’ও বিক্রি আছে

পর্ব ২৮: ব্রিগেডে গরিব মার খেলে কলকাতার এখনও শ্বাসকষ্ট হয়

পর্ব ২৭: রিলের পুজোয় রিয়েল পুজোর গন্ধ নেই!

পর্ব ২৬: আমার মূর্তির অনতিদূরে যদি রমার একটা মূর্তি করা যায়

পর্ব ২৫: তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ ‘বাংলাদেশি’ ভাষায় ‘সোনার বাংলা’, আর বাংলায় ‘জনগণমন’ লিখেছিলেন?

পর্ব ২৪: বর্ষাকাল মানেই বাঙালির কনফিউশনের বন্যা!

পর্ব ২৩: ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!

পর্ব ২২: শচীন-বিরাটরা আসেন-যান, ভারত থেকে যায়

পর্ব ২১: কিং কোহলি দেখালেন, ধৈর্যের ফল বিরাট হয়

পর্ব ২০: মনকে শক্ত করো টেস্ট, রাজা আর ফিরবেন না

পর্ব ১৯: মুকুল কিংবা ফিলিস্তিনি বালক, খুঁজে চলেছে যে যার ঘর

পর্ব ১৮: ধোনিবাদ: ধাঁধার চেয়েও জটিল তুমি…

পর্ব ১৭: সাদা সাদা কালা কালা

পর্ব ১৬: গতবারের বিক্রি প্রতিবারই ছাপিয়ে যায় বইমেলা, কারণ দামবৃদ্ধি না পাঠকবৃদ্ধি?

পর্ব ১৫: সেন ‘মায়েস্ত্রো’কে ভুলে বাঙালি দেখিয়েছে, সে আজও আত্মবিস্মৃত

পর্ব ১৪: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসই বাঙালির প্রকৃত সান্তা

পর্ব ১৩: প্রবাসে, দোতলা বাসে, কলকাতা ফিরে আসে

পর্ব ১২: না-দেখা সেই একটি শিশিরবিন্দু

পর্ব ১১: ঘোর শত্রুর বিদায়বেলায় এভাবে বলতে আছে রজার ফেডেরার?

পর্ব ১০: অভিধানের যে শব্দটা সবচেয়ে বেশি মনুষ্যরূপ ধারণ করেছে

পর্ব ৯: জোট-অঙ্কে ভোট-রঙ্গ

পর্ব ৮: দক্ষিণ বিসর্জন জানে, উত্তর জানে বিসর্জন শেষের আগমনী

পর্ব ৭: পুজো এলেই ‘সর্বজনীন’ নতুবা নিঃসঙ্গ?

পর্ব ৬: এক্সক্লুসিভের খোয়াব, এক্সক্লুসিভের রোয়াব

পর্ব ৫: শাসন-সোহাগের দ্বন্দ্বসমাস

পর্ব ৪: পাঁকাল সাধনায় নাকাল

পর্ব ৩: দেখা ও না-দেখার সিদ্ধান্ত

পর্ব ২: মহাবিশ্বে যে টোকে না, সে বোধহয় টেকেও না

পর্ব ১: অফিসে দৈবের বশে প্রেমতারা যদি খসে

East Bengal Indian Football krishanu dey Mohun Bagan Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on