what mamata banerjee taught us in supreme court | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিরোধিতার সহজপাঠ

সুপ্রিম কোর্টের এই ঘটনা নিয়ে, রাজ্য-দেশ উত্তাল। গত দু’-তিন দিনে কম কাগজ-কালি খরচ হল না। ডিজিটাল নিউজে ট্রেন্ডের তালিকায় ঘুরঘুর করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিল্লিযাত্রার ছবি, সুপ্রিম কোর্টের সওয়ালের নানা ভঙ্গি। দেশ নয়, বিশ্বের কাছেই এ ঘটনা অভিনব। এই অভিনবত্বের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন এখনও ভাসে। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, অত্যন্ত সফল রাজনৈতিক কেরিয়ার গড়ে, এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসলে কী শেখাচ্ছেন আমাদের?

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬, ১৯:৫০   
Facebook WhatsApp Messenger

৩১.

কালো চাদর। বাংলা শাড়ি। হাতে নথি। ভ্রু কুঞ্চিত।

এই কুঁচকে থাকা ভুরুকে আপনি বরাবর চেনেন। সে আপনি বাংলার হোন বা বাংলার বাইরের। এই কপালে ভাঁজ পড়ে তখন, যখন বাংলার চিরাচরিত চেনা আবহ বদলে যায়। এ বড় সুখের সময় নয়, এ বড় আনন্দের সময় নয়। এ এমন এক সময়– যখন জাতধর্ম নির্বিশেষে মিলেমিশে থাকার দীর্ঘকালীন বঙ্গ-ইতিহাস আঘাতপ্রাপ্ত হয়। যখন নাগরিকত্ব প্রমাণের অজুহাতে সুচতুরভাবে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয় সংখ্যালঘুদের, যখন অপদস্থ করা হয় আমআদমিকে, যখন একের পর এক বিএলও আত্মহত্যার খবর ভাসতে থাকে বঙ্গের বাতাসে। কত সাধারণ মানুষও তো আত্মহত্যা করেছেন ভিটে হারানোর ভয়ে। সংখ্যাটা একেবারেই কম নয়, পরিসংখ্যান বলছে: অন্তত ১০০! কত প্রবীণ-প্রবীণা, বাংলার সম্মাননীয় বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত বীতশ্রদ্ধ এই আজব সংকটে। এই পরিস্থিতিতে, মানুষ কি সত্যিই জানত না, বাংলার অভিভাবক মুখ খুলবেন? দ্রুত চলন হবে তাঁর? একের পর এক করে চলবেন এই এমন সব প্রশ্ন, যাতে দুঃসময়ের এই ধাঁধার উত্তর পাওয়া যাবে ঠিক?

মানুষ জানত। কারণ মানুষ তাঁকে এভাবেই চিনেছেন। এই-ই তো আমাদের চিরাচরিত, অতিপরিচিত মুখ্যমন্ত্রী। তিনি একটুও দমেননি। তিনি এখনও প্রাণোচ্ছল, উত্তেজিত, দুঃসাহসিক। এখনও বেপরোয়া– সাধারণের জন্য একক। অনেকেই বলবেন, সংকট কীসের? নাগরিকত্ব সংশোধন কি সংকটের? না, তা মনে করেননি স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও। তিনি শুধু বলেছেন, ২৩ বছরের নাগরিকত্ব সংশোধনের কাজ ৩ মাসের মধ্যে কীভাবে করা সম্ভব এই লোকবল নিয়ে? পশ্চিমবঙ্গের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা চিরকালীন। তার পাশাপাশি এসআইআর নিয়ে এই পরিমাণ ধোঁয়াশা, নিদেনপক্ষে বাংলা-বলিয়ে পশ্চিমবঙ্গবাসীর মনেই বিতৃষ্ণা তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি। নানা প্রকারে কেন্দ্র বারবার পশ্চিমবঙ্গবাসীর প্রতি নির্দয়তার প্রমাণ দিয়ে চলেছে– আমমানুষের সেই সম্মিলিত ক্ষোভই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে গিয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। কথা বলতে বাধ্য করেছে। ইতিহাস বলছে, এই প্রথম কোনও মুখ্যমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সওয়াল করলেন, লড়লেন, নিরন্তর প্রশ্নবাণ ছুড়লেন।  

এসআইআর কী? মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টতই বলেছেন, বাদ দেওয়ার চক্রান্ত মাত্র। এছাড়া কিছু নয়। প্রশ্ন করেছেন, কেন অন্য কোনও রাজ্যে নেই মাইক্রো অবজার্ভার, আছে পশ্চিমবঙ্গতেই? তাঁর অভিযোগ, মাইক্রো অবজার্ভাররাই নাম মুছে ফেলছে নথি থেকে। বঙ্গভোটের ইতিহাস বলছে, পশ্চিমবঙ্গ বড় শক্ত ঘাঁটি। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এখনও পর্যন্ত গো-বলয়ের চক্রান্তে পা দেয়নি। তাঁরা হিন্দু হতে পারেন, মুসলমান হতে পারেন, খ্রিস্টান-জৈন-পারসি কিংবা অন্য যে কোনও ধর্মাবলম্বী মানুষ হতে পারেন– কিন্তু তাঁরা বিশ্বাস করেন এই বাংলা মাটি কোনও একটি বিশেষ ধর্মের মানুষের একচ্ছত্র আধিপত্যের নয়। ‘প্রত্যেকে আমরা প্রত্যেকের তরে’– এই বিশ্বাস এখনও মন্দিরের ঘণ্টায়, বিকেলের আজানে মিশে আছে। মুখ্যমন্ত্রী এই বাংলারই প্রতিনিধি। তিনি ভারতের বিবিধ বৈচিত্রের পক্ষে। 

শুরুতেই তিনি সুপ্রিম কোর্টে যাননি। নির্বাচন কমিশনকে লিখেছিলেন ৬টি চিঠি। প্রশ্ন তুলেছিলেন, যে প্রশ্ন করার জন্যই তিনি রাজ্যের শ্রেষ্ঠ বিরোধী থেকে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বে। সেই প্রশ্ন করেছেন তিনি দিল্লিতেও, সুপ্রিম কোর্টের অঙ্গনে। বলাই বাহুল্য, নির্বাচন কমিশন নিশ্চুপ। প্রত্যুত্তরের কোনও ক্ষমতা তারা দেখায়নি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী থেমে থাকেননি কোনওদিন। মানুষের পক্ষে সওয়াল করতে তাঁর ঠোঁট কাঁপেনি কখনও।

স্বাভাবিকভাবেই, কেন্দ্র এ নিয়ে খাপ্পা! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না করে, ৫ তারিখের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বিরক্তি দেখিয়েছেন এই বলে যে, ‘আদালতের ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে!’ সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ! এই পোড়া দেশে, এখনও ঘরে-বাইরে যে কোনও দুই মানুষের ঝামেলা হলে, তা শেষ হয় ‘কোর্টে দেখে নেব’ বলে। এখনও এদেশে বিচার চাইতে পৌঁছতে হয় কোর্টের তল্লাটেই, কোনও রাজদরবারে নয়। আইন-ব্যবস্থাকে এখনও নিজের অঙ্গুলিহেলনে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি হিন্দুত্ববাদী নানা গাঁট।

সুপ্রিম কোর্টের এই ঘটনা নিয়ে, রাজ্য-দেশ উত্তাল। গত দু’-তিন দিনে কম কাগজ-কালি খরচ হল না। ডিজিটাল নিউজে ট্রেন্ডের তালিকায় ঘুরঘুর করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিল্লিযাত্রার ছবি, সুপ্রিম কোর্টের সওয়ালের নানা ভঙ্গি। দেশ নয়, বিশ্বের কাছেই এ ঘটনা অভিনব। এই অভিনবত্বের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন এখনও ভাসে। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, অত্যন্ত সফল রাজনৈতিক কেরিয়ার গড়ে, এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসলে কী শেখাচ্ছেন আমাদের?

শেখাচ্ছেন বিরোধিতার পাঠ। তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এতে নিহিত আছে কি নেই, তার থেকে বড় কথা– তিনি মানুষের জন্য, মানুষের পাশে– আবারও নিবিড়ভাবে এসে দাঁড়ালেন। আজকের কোনও তরুণ-তরুণী, যাঁরা নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ারে প্রবেশ করতে চলেছেন, বা এমন কেউ যাঁরা যুব রাজনীতি করেন এখনই, এমনকী, যাঁরা দীর্ঘকাল পার্টিজীবী, তাঁদের কাছে বিরোধিতার ‘সহজপাঠ’ তৈরি করলেন এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। যে সহজ পাঠের একটাই ভাষা– আপন করে নেওয়ার। যে সহজ পাঠ ফিরিয়ে দেয় মানুষের নিশ্চিন্ত ঘুম, কারণ আরেকজন, তাঁদের হয়ে জেগে আছেন ঠিক। উগ্র হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনের বিপরীতে এই বাংলার পদ্মপাতার ওপর টলতে থাকা চিরকালীন শিশিরজল তিনি, বাংলার একান্ত আপন চিরস্থায়ী ছবির মতো অটল, উজ্জ্বল।

………… পড়ুন ওপেন সিক্রেট-এর অন্যান্য পর্ব …………

পর্ব ৩০: পুরনো-নতুনের কথোপকথন

পর্ব ২৯: পয়সা দিলে ‘ঈশ্বর’ও বিক্রি আছে

পর্ব ২৮: ব্রিগেডে গরিব মার খেলে কলকাতার এখনও শ্বাসকষ্ট হয়

পর্ব ২৭: রিলের পুজোয় রিয়েল পুজোর গন্ধ নেই!

পর্ব ২৬: আমার মূর্তির অনতিদূরে যদি রমার একটা মূর্তি করা যায়

পর্ব ২৫: তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ ‘বাংলাদেশি’ ভাষায় ‘সোনার বাংলা’, আর বাংলায় ‘জনগণমন’ লিখেছিলেন?

পর্ব ২৪: বর্ষাকাল মানেই বাঙালির কনফিউশনের বন্যা!

পর্ব ২৩: ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!

পর্ব ২২: শচীন-বিরাটরা আসেন-যান, ভারত থেকে যায়

পর্ব ২১: কিং কোহলি দেখালেন, ধৈর্যের ফল বিরাট হয়

পর্ব ২০: মনকে শক্ত করো টেস্ট, রাজা আর ফিরবেন না

পর্ব ১৯: মুকুল কিংবা ফিলিস্তিনি বালক, খুঁজে চলেছে যে যার ঘর

পর্ব ১৮: ধোনিবাদ: ধাঁধার চেয়েও জটিল তুমি…

পর্ব ১৭: সাদা সাদা কালা কালা

পর্ব ১৬: গতবারের বিক্রি প্রতিবারই ছাপিয়ে যায় বইমেলা, কারণ দামবৃদ্ধি না পাঠকবৃদ্ধি?

পর্ব ১৫: সেন ‘মায়েস্ত্রো’কে ভুলে বাঙালি দেখিয়েছে, সে আজও আত্মবিস্মৃত

পর্ব ১৪: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসই বাঙালির প্রকৃত সান্তা

পর্ব ১৩: প্রবাসে, দোতলা বাসে, কলকাতা ফিরে আসে

পর্ব ১২: না-দেখা সেই একটি শিশিরবিন্দু

পর্ব ১১: ঘোর শত্রুর বিদায়বেলায় এভাবে বলতে আছে রজার ফেডেরার?

পর্ব ১০: অভিধানের যে শব্দটা সবচেয়ে বেশি মনুষ্যরূপ ধারণ করেছে

পর্ব ৯: জোট-অঙ্কে ভোট-রঙ্গ

পর্ব ৮: দক্ষিণ বিসর্জন জানে, উত্তর জানে বিসর্জন শেষের আগমনী

পর্ব ৭: পুজো এলেই ‘সর্বজনীন’ নতুবা নিঃসঙ্গ?

পর্ব ৬: এক্সক্লুসিভের খোয়াব, এক্সক্লুসিভের রোয়াব

পর্ব ৫: শাসন-সোহাগের দ্বন্দ্বসমাস

পর্ব ৪: পাঁকাল সাধনায় নাকাল

পর্ব ৩: দেখা ও না-দেখার সিদ্ধান্ত

পর্ব ২: মহাবিশ্বে যে টোকে না, সে বোধহয় টেকেও না

পর্ব ১: অফিসে দৈবের বশে প্রেমতারা যদি খসে

BLO Election commission Mamata Banerjee Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar SIR Supreme Court

Share this article on