

পৃথিবীটা যে স্রেফ মানুষ জাতটার নয়, পৃথিবীটাকে একঘেয়ে তিতকুটে করে দেওয়ার কোনও অধিকারই যে নেই, ‘প্রাইভেসি’ শব্দটা স্রেফ মানুষের নয়, প্রাণীকূলেরও রয়েছে– এই বিষয়টা আন্তরিকভাবে শরীরে-মনে গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রশ্নপত্রের ছাই ঘেঁটে কেউ কেউ যেন খুঁজে পায় ভাষার আগুন। যে আগুন, তারা ছড়িয়ে দিতে পারে উত্তরপত্রে। ভাইরাল জগৎ পারাবার থেকে দূরে, ওই গোপন উত্তরপত্রগুলি যেন ভবিষ্যতের পাণ্ডুলিপির বীজ হয়ে ওঠে, এইটুকু আশা।
আপাতদৃষ্টিতে এমন ভিত্তিহীন মন্তব্য তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উড়িয়ে দেওয়াই যেতে পারে। কিন্তু যেখানে প্রধানমন্ত্রী এ-কথা বলছেন এবং ‘দেশবিরোধী’– এই শব্দচয়ন করছেন, তখন বুঝতে হবে, এর নেপথ্যে সুচতুর একটি রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে।
নিজেদের জীবনও যেখানে অনিশ্চয়তার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে, সেই কাশ্মীরী মানুষরাই হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন বহু দূরের ইরানের যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের দিকে। বুদগাম, বারামুল্লা– এইসব অঞ্চলে চলছে স্বতঃস্ফূর্ত তহবিল সংগ্রহ। কেউ দিচ্ছেন নগদ অর্থ, কেউ গয়না, কেউ-বা বহুদিনের সঞ্চয়। এমনকী, ছোট ছোট শিশুও তাদের পিগি ব্যাঙ্ক ভেঙে তুলে দিচ্ছে সব কিছু।
কিছু কিছু ‘ভিড়’ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক আগ্রাসনের আরেক চতুর মুখচ্ছবি। ভিড়ের মধ্যে সেই মিশে থাকা ভিড় আনন্দজল-ভরা চোখের চিৎকৃত ‘ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া’ বা ‘জনগণমন’র মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায় ‘ভারতমাতা কি জয়’ কিংবা ‘জয় শ্রীরাম’। ভিড় থেকে আলাদা হয়ে ওঠে আরেক ভিড়।
শেষমেশ রাত ৯টার ঘণ্টাধ্বনি। একযোগে হাততালি। স্টল থেকে রাস্তায় নেমে আসা। চারপাশ দেখে নেওয়া, চারপাশের মধ্যে আকাশের পতনোন্মুখ চাঁদটিও পড়ে। চোখ ছলছল। হাতে হাত, জড়িয়ে ধরা। বন্ধুবান্ধব, অর্ধপরিচিত-অপরিচিতর দিকেও কয়েক পলক বাড়তি দৃষ্টি। মলিন হাসি। বারেবারে আর আসা হবে না। ওই যে অলীক বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হয়েছিল বইপত্রিকা, প্রকাশন– হয়তো প্রকাশন আর নেই, বন্ধুত্বও– তবুও আলিঙ্গন, তবু কিছু মায়া রয়ে গেছে।
বইমেলার আনাচেকানাচে পেত্নী, ব্রহ্মদৈত্য, ভূত-মুখোশ পরে উদ্দাম নাচ– ভয়াল, ভয়ংকর, আতঙ্ক, অঘোরী, পিশাচ, বই, বাণিজ্য, বিপণনে মিলে মেলার মাঠে এক্কেবারে কুম্ভীপাক! অজানার উদ্দেশে বাঙালির দুর্মর আকর্ষণ বরাবরই। আবার মোচ্ছবেও বাঙালির বেজায় আগ্রহ। সেই পথ ধরেই বীভৎস রস ক্রমে আসিতেছে।
এক ফোক্কড় যুবককে গীতা বেচতে এসেছিলেন এক টিকি-রসকলি ভক্ত-সেলসম্যান। যুবকের চটজলদি উত্তর: ‘হরেকৃষ্ণ, আমি সিপিয়েম করি’ এবং পলায়ন। আরেক জন, ৫৫০ নম্বরে আদমের স্টলের ভেতরে এক সুন্দরীকে দেখে মন্তব্য করে গেলেন– ‘দ্যাখ, দ্যাখ, আদমের স্টলে ইভ!’ আবেগপ্রবণ হয়ে কবিতা পাঠ করতে গিয়ে একটি ছেলে, স্পষ্ট শুনলাম, মাইকে বললেন– ‘শীৎকার কবে আসবে, সুপর্ণা!’ মেলা ভাঙার পরে পশ্চিমবঙ্গ মণ্ডপে ঢুকতে বাধা পেয়ে এক যুবক বন্ধুকে ফোনে জানালেন– পশ্চিমবঙ্গে লকআউট, নিশ্চয়ই বাম সরকার ফিরছে।
শনিবারের বারবেলায়, নিশ্চিতভাবেই বহু বাঙালিই পরস্পরের পাদুকায় পদাঘাত করেছেন, নেহাত বইমেলার সঙ্গে সংস্কৃতির একটা ঘাঁতঘোঁত আছে, বাস-ট্রাম-মেট্রো-ট্রেন হলে একটা এসপার-ওসপার হয়ে যেত নিশ্চিত! তবে মেলাতেও খাস বাংলায়, সাংস্কৃতিক পদ্ধতিতে খিস্তি করার বেশ কিছু উপায় আছে। সত্রাজিৎ গোস্বামীর ‘অকথ্য শব্দের অভিধান’, অভ্র বসুর ‘বাংলা স্ল্যাং: সমীক্ষা ও অভিধান’, কিন্নর রায়ের ‘খিস্তোলজি’র মতো বই অনায়াসে শত্রুপক্ষকে গিফট করে বলুন, ‘সব আপনারই জন্য!’
ভিড়ভর্তি মেলার মাঠে দু’ হাত অন্তর ছবি! হাতছানি দিয়ে ডাকছে, কতকটা আদ্যিকালের ছাপানো বিজ্ঞাপনের অদৃশ্য সুরে– ‘না কিনুন, একবার হাতে নিয়ে দেখুন!’ বিস্তর শিল্পী, লেখক, সম্পাদক, ছাপাখানার কর্মীদের সমবেত সম্মেলনে এক মহা ধুমধাম। বইয়ের ছবি? ছবির বই? নাকি ছবিতে গল্প? কোনটা? বোধহয় সবগুলোই সত্যি।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved