World Cup Glory: Changing Face of Celebration in India। Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

জয়ের উল্লাস অথচ ভিড়ের ভাঙন

কিছু কিছু ‘ভিড়’ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক আগ্রাসনের আরেক চতুর মুখচ্ছবি। ভিড়ের মধ্যে সেই মিশে থাকা ভিড় আনন্দজল-ভরা চোখের চিৎকৃত ‘ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া’ বা ‘জনগণমন’র মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায় ‘ভারতমাতা কি জয়’ কিংবা ‘জয় শ্রীরাম’। ভিড় থেকে আলাদা হয়ে ওঠে আরেক ভিড়। বিভেদের চিহ্ন বহন করে, যখন দেশ জিতেছে। তা হিন্দু বা মুসলমানের দেশ না– সক্কলের দেশ। হ্যাঁ, এখনও যাঁরা এসআইআর তালিকায় বিচারাধীন, দেশ তাঁদেরও।

Published by: Robbar Digital

Posted:March 9, 2026 7:07 pm | Updated:March 9, 2026 8:12 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

রবিবার। সদ্য জাঁকিয়ে বেলা পড়েছে। শহর-মফস্সলে এদিন মধ্যবিত্ত বাজারের ব্যাগ খানিক ভারী। অন্যান্য দিনের তুলনায় বাজার সফরও খানিক শ্লথ। থমকে-থমকে। অচেনা, একেবারে অপরিচিত কারও সঙ্গেও টুকটুক ক্রিকেট-কথন। অভিষেক শর্মার প্রতি খচে লাট কত শর্মা! বেকারি বিস্কুটে দাঁতালো আক্রমণ দেখে মনে হচ্ছিল রান পা-পেলে তাঁকে এবার চিবিয়েই খাবেন! রবিবারের বারবেলাতেও সূর্যকুমার ছাড় পাচ্ছিলেন না। গম্ভীরকে হাতে ধরে কোচিং শিখিয়ে দেবেন, এমন গম্ভীরগুরুও ছিলেন অনেকে। আর কে না-জানে, চায়ের দোকান এইসব দিনে জ্যোতিষালয় হয়ে ওঠে। ঘিঁষাপিটা, আলুভাতে-মার্কা জীবন হাবেভাবে বদলে যায় এই ক্রিকেটধর্মের দেশে। যদিও আজকাল, ক্রিকেটের সঙ্গে ‘ধর্ম’ জুড়ে দিতে ইচ্ছে করে না আর। ক্রিকেট ক্রিকেটই। আর কোনওরকম জল তাতে যেন না এসে মেশে। ‘ধর্ম’ এদেশে এমনই এক আকারপ্রকার নিয়েছে।

zoom
ট্রফি জয়ের আনন্দে উত্তাল গ্যালারি

রবিবার। রাত ১১টা। যদিও প্রায় আধঘণ্টা আগে থেকেই বাজি ফাটতে আরম্ভ করে দিল। অকাল দীপাবলি। সদ্য দোল গেল, ভারতের ‘রং-বাজি’র এমন সমন্বয় আগে হয়েছে? ততক্ষণে নির্ঘাত বেলার ওই চায়ের দোকানের ক্রিকেট সমালোচকেরা নিজেদের পুরনো বক্তব্যগুলিকে গোলা মেরেছেন। অতএব, অভিষেক শর্মা এখন বীরেন্দ্র শেহবাগ। গম্ভীর সাদা বলের ক্রিকেটে শ্রেষ্ঠ ভারতীয় কোচ। সঞ্জু স্যামসন কী বিপুল ব্যতিক্রম– নির্ঘাত কেউ কেউ বলে উঠবেন এ তো ‘রজনীকান্ত’– পরপর তিন ম্যাচে এমন খেলা তিনি ছাড়া আর কে-ই বা। এইবেলা বলে রাখা ভালো, স্যামসন জানিয়েছিলেন বটে, তিনি আদ্যন্ত রজনীফ্যান!

যে কোনও বিশ্বকাপ জয়েই মানুষ, বিশেষ করে, আমাদের এই মহামানবের সাগরতীরের মানুষের চিত্তচাঞ্চল্য দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে ওঠে। এই আবেগকে সন্দেহ করা উচিত না। ‘দেশ’ জিতেছে বলে কথা। যদিও এদেশে এমন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী-সমর্থকের সংখ্যা কিছু কম নয়, যাঁরা যে কোনও মুহূর্তেই দেশ কার ও কার দেশ নয়– এই বিতর্ক উসকে দেন। কথায় কথায় দেখতে চান কাগজ। ট্রেনে-বাসে-ট্রামে, যাকে-তাকে পাকড়ে দেশপ্রেমের সংজ্ঞা বোঝান, মৌখিক প্রশ্নোত্তর করেন, জাতীয় সংগীত গাইতে বলেন। চিৎকার করে বলতে বাধ্য করেন ‘জয় শ্রীরাম’। এদেশেই ধর্ষক, খুনিদের মালা পরিয়ে সংশোধানাগার থেকে আমজীবনে ফেরার ছাড়পত্র দেওয়া হয় বিশেষ ওই রাজনৈতিক দলের বদান্যতায়। হে পাঠক, আপনি হয়তো ভাবছেন, বেশ তো চলছিল ক্রিকেট-কথন, এসব আবার কেন? আচ্ছা, ক্রিকেটে ফিরি।

’৮৩ সালের বিশ্বকাপ, ২৫ জুন, ভারত যখন প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছিল, কীরকম ছিল সেই পরিবেশ? শচীন তেণ্ডুলকর ২০২৪ সালে সেই স্মৃতির কথা লিখেছিলেন এক্স হ্যান্ডেলে: ‘আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই রাতের কথা, যদিও ৪১টা বছর পেরিয়ে গিয়েছে। আমাদের বিল্ডিং এবং প্রতিবেশী বাড়িগুলোকে তখন অবিশ্বাস্য দেখাচ্ছিল! রাস্তা ভরে গিয়েছে মানুষের আনন্দনৃত্যে, আকাশ ভরে গিয়েছে বাজির আলোয়– একেই বলে সত্যিকারের ম্যাজিক।’

২০১১ সালের বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতিও অনেকেরই মনে পড়বে নির্ঘাত। অদূরের ২০২৪ এখনও স্মৃতিটাটকা কিংবা সদ্য গতকাল, ৮ মার্চ রাতের নতুন ইতিহাসে তো মানুষ এখনও ভাসছেন। ২০২৪ সালে, মেরিন ড্রাইভে বিশ্বকাপ জয়ের পর যে-বিজয় সমাবেশ– ২৯ জুন জড়ো হয়েছিলেন ৩ লাখেরও বেশি ক্রিকেটভক্তরা। জনা ১৪ জন সেই উল্লাস-উত্তেজনায় আঘাত পেয়েছিলেন। কেউ কেউ উঠে পড়েছিলেন গাছে, কেউ কেউ বিজয়ীদের গাড়িতে ওঠারও চেষ্টাচরিত্র করেছিলেন বলে জানা গিয়েছিল। কিন্তু এসবের বাইরেও, আরেকটি ভিড়-চরিত্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল বিজয়োল্লাসের নামে শহরে-মফস্সলে-গ্রামে। যে-উল্লাস, ক্রমে ভিড়কে আর ‘ভিড়’ থাকতে দেয় না। কিছু কিছু ‘ভিড়’ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক আগ্রাসনের আরেক চতুর মুখচ্ছবি। ভিড়ের মধ্যে সেই মিশে থাকা ভিড় আনন্দজল-ভরা চোখের চিৎকৃত ‘ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া’ বা ‘জনগণমন’র মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায় ‘ভারতমাতা কি জয়’ কিংবা ‘জয় শ্রীরাম’। ভিড় থেকে আলাদা হয়ে ওঠে আরেক ভিড়। বিভেদের চিহ্ন বহন করে, যখন দেশ জিতেছে। তা হিন্দু বা মুসলমানের দেশ না– সক্কলের দেশ। হ্যাঁ, এখনও যাঁরা এসআইআর তালিকায় বিচারাধীন, দেশ তাঁদেরও।

ভিড়– আসলে তো মিশে থাকারই তো এক সংহত রূপ। এদেশে ক্রিকেটের জয় ভুলিয়ে দেয় মানুষের দৈনন্দিন আর্তনাদ, রোজের অক্ষম বাঁচা-মরা, দিন আনি রাত খাইয়ের আলো-অন্ধকারে যাওয়া। দেশের এই জয়, প্রায় বুথ লুঠের মতো করেই ছিনিয়ে নেওয়া যায় কি ‘ভারতমাতা কি জয়’ স্লোগানে? অথচ ভিড়ের মধ্য থেকে বারবার করেই, ছুটে আসছিল এই স্লোগান। রমজান মাস বলে কি স্বর আরও তীব্র হয়ে উঠছিল? ‘ভারতমাতা’র ইতিহাস, অবন ঠাকুরের ছবি, দেশীয় চৈতন্যের দিকে, জাতীয়তাবাদের দিকে যে ইঙ্গিত করেছিল, তা ঐতিহাসিক। সেদিনের ভারতমাতার যে-রূপ ভারতবর্ষের কাছে দাঁড়িয়েছিল, আজকের ভারতের কাছে সেই ‘ভারতমাতা’ এক অর্থ বহন করে না।

zoom
অবনীন্দ্রনাথের ভারতমাতা

শব্দ প্রতিদিন তার অন্তর্গত অর্থ বদলাতে বদলাতে হাঁটে। বদলে যায়, শব্দের স্থানিকতা, ব্যপ্তি, শব্দ ব্যবহারের রুচিবোধও। কোন অর্থে, কী প্রয়োজনে, একটি ভিড় বারবার উচ্চারণ করে যৌথ শব্দমালা, তা গূঢ় সময়বোধের আতশকাচের তলায় রেখে দেখা দরকার।

এখনও, এই ক্রিকেট বোর্ডের অসীম রাজনৈতিক ক্ষমতা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় লেখা রইল ভারতের বিশ্বজয়– ভারতমাতার নয়। ফলে ভারতমাতার হয়ে যাঁরা ম্যাচ খেলছেন, তাঁরা খেলতে থাকুন।

শুধু গুলিয়ে ফেলবেন না মাইরি! ভক্তে এবং ক্রিকেটভক্তে।

………………….

পড়ুন রোববার ডিজিটাল ডেস্ক-এর অন্যান্য লেখা

………………….

Changing Celebrations CricketCulture CricketFever FansOfIndia MenInBlue NewAgeCelebration Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar T20 World Cup Team India

Share this article on