Free Speech, Taslima Nasrin and Kolkata। Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

তসলিমা ফিরছেন, কলকাতা?

কলকাতায় তসলিমা নাসরিনের আগমনের কিছুদিন মাত্র আগে, ২২ জুলাই, যাদবপুরের এক ছোট্ট বইয়ের স্টল, ‘কাউন্টার এরা’য় একদল কট্টর এসে শাসিয়ে যায়। তারা জানায়, এই বইয়ের স্টলে ‘দেশদ্রোহী’ বই বিক্রি হয়। তাদের দোকান ভেঙে, পুড়িয়ে দেওয়া হবে– এতদূর শান্তির বার্তাও ক্ষমতাধারীরা জানিয়ে গিয়েছে। সময়ের দূরত্বে তসলিমা নাসরিনের ফেরা আর যাদবপুরের বইয়ের স্টলে হামলা খুব দূরবর্তী নয়।

Published by: Robbar Digital

Posted:August 1, 2026 11:55 am | Updated:August 1, 2026 1:27 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

একটা শহর কতখানি বেড়ে, তা চেনার উপায় কী? তার ঝকঝকে-তকতকেপনা? মেট্রো কানেকশন? স্কাইওয়াক? কতগুলো মনীষীমূর্তি রাস্তায় নেমে ঝড়-জলে ভিজেছেন আর কাক-পায়রারা একগাদা বাহ্যি করে ভরিয়ে রেখেছে, সেই পরিসংখ্যান দিয়ে? কিংবা, রাস্তায় দু’-তিন ফুট অন্তর গাছের সারি বসিয়ে? হ্যাঁ, মানছি, শহরকে ‘শহর’ হয়ে উঠতে এই সমস্ত কাঁচামাল লাগে। কিন্তু এই সবই তো তার বাইরেটা। দেখতে-শুনতে ভালো। কিন্তু শহরের মন?

যে কোনও শহরেরই আত্মপরিচয় আসলে গড়ে ওঠে তার বাসিন্দা দিয়ে। জনসংখ্যা নয়। ‘জনমন’ দিয়ে। সেই মন কীভাবে ভাবছে, কী চাইছে, যুক্তির পাল্লা দিয়ে ভাবছে না আবেগ দিয়ে? এবং সবচেয়ে বড় কথা– কতদূর সেই মন গ্রহণ করতে পারছে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে? বিনয় মজুমদারের বিখ্যাত পঙ্‌ক্তিটি খানিক অদলবদল করে যদি প্রশ্ন করা যায়: ভিন্নমত দিতে পারি, তুমি কি গ্রহণে সক্ষম? সেই শহরই তো প্রকৃত সভ্য, যে নিজের সমালোচকের জন্যও পুরু গদির আসন রাখে। যে শহরে প্রত্যেককে একমত, সে শহর সভ্য নয়– সে শহর শুধুই এক সভা-জমায়েত। সেখানে পুষ্ট করতালি আছে, কথার পরিসর নেই।

তসলিমা নাসরিন কলকাতায় ফিরলেন আজ। প্রায় ২০ বছর পর। শুধুই কি তসলিমা ফিরছেন? না কি কলকাতাও নিজের কাছে ফিরল খানিক? এ প্রশ্নের উত্তর আজকেই মিলবে না। ঘড়ির কাঁটা উত্তর দেবে এ প্রশ্নের। তবে এই স্বাধীনতার মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নির্ঘাত দু’-চার বাক্য বেশি খরচ হবে তসলিমার ফেরায়। ভারতে, ইদানীং খাস কলকাতাতেও ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ বড় বিচিত্রধর্মী। যতক্ষণ মতটা আমার মতো, ততক্ষণ তা মতপ্রকাশ। বিরুদ্ধে গেলেই সেটি ‘অপপ্রচার’, ‘আঘাত’, ‘ষড়যন্ত্র’, ‘অশালীনতা’, ‘সংস্কৃতিবিরোধিতা’, কিংবা অন্তিমকালে– ‘দেশদ্রোহ’। অভিধানের এত ব্যবহার সম্ভবত অভিধানও আশা করেনি।

zoom
পুরনো দিন। পুরনো তসলিমা

গত বছর সেপ্টেম্বরে, পশ্চিমবঙ্গ উর্দু অকাদেমিতে একটি ভাষণের দেওয়ার কথা ছিল জাভেদ আখতারের। জাভেদ আখতার, তিনি প্রবাদপ্রতিম। বঙ্গের সংস্কৃতি, কলকাতার সংস্কৃতির সঙ্গে বহুল পরিচিত। তিনি বিশ্বাস করেন এই কলকাতা সত্যজিতের, রবীন্দ্রনাথের– বিশ্বাস করেন কলকাতার মূল রসদ তার সংস্কৃতির নিরন্তর বৈভব। কিন্তু তিনি, সেই ভাষণ দিতে পারেননি অসহিষ্ণু উগ্র ধর্মীয় একদলের আপত্তিতে। জাভেদ আখতার তখন মন্তব্য করেছিলেন, কলকাতা বদলে যাচ্ছে। এ শহর ছিল বহু সংস্কৃতির শহর। এ শহর ছিল মুক্তমনের।

zoom
জাভেদ আখতার

সভ্যতার ইতিহাস বলছে, বিপরীত স্বরকে সহ্য করার ক্ষমতাই গণতন্ত্রের অক্সিজেন। কেউ জাভেদ আখতারের সঙ্গে একমত না-ও হতে পারে। সলমন রুশদির লেখা অপছন্দ হতেই পারে। তসলিমার ভাষা আপনার রুচিতে না-ও মিলতে পারে। কিন্তু তাঁদের বলার অধিকারটুকু রক্ষা করতে না পারলে, কাল আপনার বলার অধিকারটুকুও কেউ রক্ষা করবে না। তবে কী করতে পারি আমরা? দুরন্ত তর্ক করতে পারি। বাংলা ভাষায় শঙ্খ ঘোষের ‘ভিন্নরুচির অধিকার’ যেমন রয়েছে, তেমনই তো অমর্ত্য সেনের লেখা ‘দ্য আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’ও রয়েছে! এই ভিন্নরুচি থাকা এবং তেড়ে তক্ক করায় তো বাধা দেয়নি আমাদের গণতন্ত্র।

আসলে যে-বাক্যের সঙ্গে আমি একমত, তার স্বাধীনতা রক্ষা করা ঔদার্য নয়; যে-বাক্য আমাকে দেড়েমুশে অস্বস্তিতে ফেলে, তার স্বাধীনতা রক্ষা করাই ঔদার্যের অগ্নিপরীক্ষা। এ-ও ঠিক যে, অন্তত একজনকে, ভিন্নমতের কারণে নির্বাসনে যাওয়া মানুষকে, এই কলকাতা ফেরাল। কিন্তু প্রশ্ন, আজকে তসলিমার ফিরে আসা মাত্র কি শহরখানার মন আড়ে-বহরে বদলে গেল? যারা ছিল অসহিষ্ণু তারা ‘আহা আহা, কী চোখা ভিন্নমত’ বলে লম্ফ দেবে? জাভেদ আখতারকে কি পুনরায় ডাকা হবে? এতটা আশা কি করতে পারি আদৌ?

পারি না। কলকাতায় তসলিমা নাসরিনের আগমনের কিছুদিন মাত্র আগে, ২২ জুলাই, যাদবপুরের এক ছোট্ট বইয়ের স্টল, ‘কাউন্টার এরা’য় একদল কট্টর এসে শাসিয়ে যায়। তারা জানায়, এই বইয়ের স্টলে ‘দেশদ্রোহী’ বই বিক্রি হয়। তাদের দোকান ভেঙে, পুড়িয়ে দেওয়া হবে– এতদূর শান্তির বার্তাও ক্ষমতাধারীরা জানিয়ে গিয়েছে। সময়ের বিচারে তসলিমা নাসরিনের ফেরা আর যাদবপুরের বইয়ের স্টলে হামলা খুব দূরবর্তী নয়। ওঁর বই, লেখালিখি ও ভিন্নমত পোষণের ওপর আঘাত থেকেই তো একদিন নির্বাসিত হয়েছিলেন তসলিমা। এ কলকাতার অসহিষ্ণু মনগুলি তবে এখনও বদলাল না? যে-কলকাতা ছেড়ে গিয়েছিলেন, সে-কলকাতায় ফেরার জন্য, ওয়েলকাম ব্যাক তসলিমা নাসরিন…

BengaliLiterature Constitution FreedomOfExpression FreedomToWrite JavedAkhtar TaslimaNasrin Democracy Editorial Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on