day-12-international-kolkata-book-fair-boi-mela-2026 | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

বইমেলায় ভূতের কেত্তন

বইমেলার আনাচেকানাচে পেত্নী, ব্রহ্মদৈত্য, ভূত-মুখোশ পরে উদ্দাম নাচ– ভয়াল, ভয়ংকর, আতঙ্ক, অঘোরী, পিশাচ, বই, বাণিজ্য, বিপণনে মিলে মেলার মাঠে এক্কেবারে কুম্ভীপাক! অজানার উদ্দেশে বাঙালির দুর্মর আকর্ষণ বরাবরই। আবার মোচ্ছবেও বাঙালির বেজায় আগ্রহ। সেই পথ ধরেই বীভৎস রস ক্রমে আসিতেছে। ফিক ফিক হাসিতেছে।

Published by: Robbar Digital

Posted:February 3, 2026 3:12 pm | Updated:February 3, 2026 3:40 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

‘মেলা’ কমে আসিতেছে। দিনগুলো এক এক করে অতীত হতে হতে কখন যে বই-মাঠ-ধুলো-মেলা ‘অদ্য শেষ রজনী’-র দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে ঠাহরই হয়নি। অব্যাহতি নেই, নেই কোনও যতিচিহ্ন। সময়ের আবর্তে পড়ে দশচক্রে বইমেলা নিজেই ‘ভূত’ বা ‘অতীত’ হবে। হাতে আর মোটে একদিন! তারপরই সাজানো মেলা যাবে শুকিয়ে। মাঠ শুনশান, স্টল ঠুকঠাক, ইতস্তত ছড়িয়ে ভাঙা দিনের ঢেলা। যাইহোক, সোমবারের মেলায় যা দেখা গেল তাতে করে সন্দেহের অবকাশ রইল না যে, দুক্কুরবেলা হোক অথবা সন্ধে-রাত, বইমেলার চাবিকাঠি ভূতেদের হাতেই! তাই ঢিল-ছোঁড়া স্টল দূরত্বে তেনাদের লক্ষ্যভেদ ঠিক কতখানি সরেস আর অব্যর্থ, তার তত্ত্বতালাশ একটু উল্টেপাল্টে দেখা যাক কড়চার এবারের কিস্তিতে।

zoom
সুধীর মৈত্রের অলংকরণে ভূতের ছবি

২০২৬-এর বইমেলায় ভূতেদের ভবিষ্যৎ যে উজ্জ্বল সে খবর কড়চার পাতাতেই উঠেছে, কিন্তু পাঠকের খরচার খাতা? সেখানেও তো মুদ্রারাক্ষসেরই দৌরাত্ম্য! ‘আজকাল বোধহয় যুগান্তকারী বই ছাড়া অন্য কিছু লেখাই হচ্ছে না, যা দেখছেন সবই বেস্টসেলার!’, পথচলতি কানে এল এক প্রৌঢ় পাঠকের মন্তব্য। টিপ্পনীর সুরে বললেও কথাটা নেহাৎ ফেলনা নয়কো। একটি পরিচিত স্টলে নিজের চোখেই দেখেছি একই বইয়ের দু’টি আলাদা মুদ্রণ (যথাক্রমে জানুয়ারি ও এপ্রিল ২০২৬!) একযোগে বিক্রি হতে। পিওডি বা প্রিন্ট অন ডিমান্ডের দৌলতে একটি মুদ্রণের প্রিন্ট রানের (ক’কপি বই ছাপা হয়েছে) খতিয়ান ‘ভ্যানিশ’! এর মধ্যে ভীষণ একটা ‘ইয়ে’ ব্যাপারও আছে। কারও বই ৫০০ কপি বিক্রি হয়ে এডিশন ফুরনো আর পিওডিতে ছাপা ৫০ কপি বেচে মেলার মাঠে ‘প্রথম মুদ্রণ নিঃশেষিত’ ঘোষণা করে দেওয়ার মধ্যে যে ফারাক, সেও পাঠকের অগোচরেই থেকে যায়। জটায়ু থাকলে এসব দেখেশুনে নির্ঘাত বলতেন, ‘গায়ে কাঁটা দিচ্ছে মশাই!’

zoom
শিল্পী: সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘পাঞ্জো প্রথমে চালাত নৌকো।… নদীতে নদীতে ঘুরতে ঘুরতেই সে মাধ্যমিক পাশ করে গেল। পাঞ্জো বলে সে তারার আলোয় খবরের কাগজের হেডিং আর পুন্নিমের চাঁদের আলোয় স্কুলের বই পড়তে পারে। আর গান গাইবার পক্ষে নদীর হাওয়ার চেয়ে ভালো মাইক নাকি আর হয় না।’– এমন ভূতের গল্প পড়তে কার না ভালো লাগে? পুরনো কেতাবের স্টলে মিলে গেল অমরেন্দ্র চক্রবর্তীর লেখা ‘ভূতের বাঁশি’ বইখানি। ক্ষীণকায় বইটি অধুনা দুর্লভ। কৃষ্ণেন্দু চাকীর প্রচ্ছদ এবং অলংকরণ আগাগোড়া সমৃদ্ধ করেছে এমন আশ্চর্য ভৌতিক কাহিনিকে।

লীলা মজুমদার বহু আগেই বলে গিয়েছিলেন, সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে তিন ধরনের গল্পে– ভূতের, চোরের আর প্রেমের। বস্তুত, বাঙালির চিরাচরিত ভূতের গপ্পে ভয়, উদ্বেগ, রোমাঞ্চ পরিপূর্ণভাবে থাকলেও, তাতে এক ধরনের আলগোছে রসিকতার আমেজ ছিল। সে দিন গিয়েছে চলে। কুড়ি কুড়ি বছরের পার না হলেও, গত সাত-আট বছর ধরে বাংলা বইয়ের বাণিজ্যিক থিম সং একটাই– ‘নমো তন্ত্র, নমো তন্ত্র!’ তবে এ ঠিক তন্ত্রের অ্যাকাডেমিক চর্চা বা তাত্ত্বিক প্রসারের পরিসর-বৃদ্ধির ব্যাপার নয়, বরং থ্রিলারের প্লট বা আবহের উপকরণ হিসেবেই হুড়মুড়িয়ে বেড়েছে এর ব্যবহার। বলা যায় সৌমিত্র বিশ্বাসের ‘হেরুক’ উপন্যাসের হাত ধরেই বইপাড়ায় তন্ত্রের এহেন পুনরুত্থান। বইমেলার আনাচেকানাচে পেত্নী, ব্রহ্মদৈত্য, ভূত-মুখোশ পরে উদ্দাম নাচ– ভয়াল, ভয়ংকর, আতঙ্ক, অঘোরী, পিশাচ, বই, বাণিজ্য, বিপণনে মিলে মেলার মাঠে এক্কেবারে কুম্ভীপাক! অজানার উদ্দেশে বাঙালির দুর্মর আকর্ষণ বরাবরই। আবার মোচ্ছবেও বাঙালির বেজায় আগ্রহ। সেই পথ ধরেই বীভৎস রস ক্রমে আসিতেছে। ফিক ফিক হাসিতেছে।

zoom
বইমেলায় ভূতের নাচ

‘ভূতেরা বড় মিথ্যুক’– একথা প্রেমেন্দ্র মিত্র টের পেয়েছিলেন সবার আগে। হাল আমলে তেমনই সব মিথ্যুক ভূতেরা এসে জড়ো হয়েছে ভোটার তালিকায়। (তারা কেউ কেউ নাকি এসে মাঝেমধ্যে ভোটও দিয়ে যান!) তাজ্জব ব্যাপার, কলেজ স্ট্রিট থেকে তারা বেমালুম উধাও। শেষমেশ বইমেলায় তাদেরই কয়েকজনকে খুঁজে পাওয়া গেল। তাও সুলভেই। এ. মল্লিকের স্টলে উঁকিঝুঁকি দেওয়ায় দেখা দিল রমাপদ চৌধুরীর ভূতের ছড়ার সেই বিখ্যাত কালো ছোট্ট বইখানা– ‘ভূতগুলো সব গেল কোথায়?’ মলাট এবং পাতায় পাতায় সুধীর মৈত্র-র আঁকা চোখজুড়োনো সব ছবি। আহা! এই না হলে ভূতবাজার! মেলার মাঠে পুরনো বইপত্তর ঘেঁটে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা সংকলনের পাতায় যখন চোখে পড়ে স্বয়ং কবির স্বাক্ষর, তখন সেও একদিক থেকে মনে করিয়ে দেয় সূক্ষ্ম অতীত বা ‘ভূত’ শব্দের আরেক মর্মার্থ। বিখ্যাত লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক এঁরা হয়তো আর জীবিত নেই, কিন্তু তাঁদের হস্তাক্ষর সম্বলিত পুরনো, পোকা ধরা, জীর্ণ বইগুলিতে যেন এখনও লেগে আছে সেইসব মানুষদের প্রজ্ঞার গুঁড়ো। বুঝ যে জন জান সন্ধান!

স্বয়ং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন এক অমোঘ লাইন: ‘ওই ভূত, বাপরে!’ শুধু তাইই নয়, তারানাথ তান্ত্রিকের স্রষ্টা প্রথম দু’টি গল্পেই চিনিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর সৃষ্ট নতুন চরিত্রটির জাত। পাঠকদের পরম সৌভাগ্য এই যে, বিভূতিভূষণের পরবর্তী দুই প্রজন্মের হাতে এখনও সার্থকভাবে এগিয়ে চলেছে এই সিরিজ! মেলার মাঠে তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘তারানাথ তান্ত্রিক সমগ্র’-র পাশাপাশি পাঠক সাগ্রহে পড়ছেন মিত্র ও ঘোষ থেকে প্রকাশিত তিনটি একক বই– তারানাথের প্রত্যাবর্তন, তারানাথের ব্রহ্মাস্ত্র এবং রুদ্রদেব তারানাথ। এই তিনটি বইই লিখেছেন বিভূতিভূষণের পৌত্র, তথাগত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিন প্রজন্ম ধরে একই চরিত্রকে যথাযথভাবে উপস্থিত করার নজির খুব বেশি নেই বাংলায়!

zoom
রমাপদ চৌধুরীর ছড়ার বই ‘ভূতগুলো সব গেল কোথায়’-এর প্রচ্ছদ

কলকাতা পৌরসভার স্টলে আয়োজিত ছোট প্রদর্শনীটিতে স্থান পেয়েছে আদ্যিকালের যাবতীয় জিনিসপত্র, দলিল দস্তাবেজের ছবি। তার মধ্যে একটিতে কলকাতা শহরের ম্যাসকট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে হাড়গিলে পাখির ছবি। বহুকাল আগেই যারা লুপ্ত হয়েছে শহর কলকাতা থেকে। কলকাতা শহরের ‘বাস্তব ভূত’ তো এরাই! মেলার আবহে এক ঝলক ছুঁয়ে আসা গেল সেই অতীতকে।

zoom
কলকাতা পৌরসভার স্টলের প্রদর্শনী থেকে- হাড়গিলে আর পুরনো কলকাতার ছবি

‘অলৌকিক’ শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে বই-ছাপিয়েদের আসল ‘কিক’। ‘ভূত’ ছেপে-পড়ে পাঠক-লেখক-প্রকাশক সক্কলে খুশি। ভৌতিক এবং তান্ত্রিক থ্রিলার হলে তো কথাই নেই। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে বইকি। ‘রায় পরিবারের ভূতের গপ্‌পো’ বইটি বছর কয়েক আগে বাজারে এনেছিলেন বিচিত্রপত্র গ্রন্থন বিভাগ। এবার তাঁরা এনেছেন ‘রায় পরিবারের রহস্য গল্প’। কৃষ্ণেন্দু চাকীর আশ্চর্য লেটারিং প্রচ্ছদের আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। কিন্তু ভূত কি ব্রাত্য? কক্ষনও না। বারিদবরণ ঘোষের লেখা ‘পুরনো কলকাতার ভুতুড়ে বাড়ি’ বইটি নবকলেকরে ফিরিয়ে এনেছেন তাঁরা। আর নতুন ভূত? সেও আছে। সন্দেশী দেবাশিস সেনের লেখা ভৌতিক গল্পের সংকলন ‘যেখানে ভূতের ভয়’ মেলায় প্রকাশিত হয়েছে। দেবাশীষ দেবের প্রচ্ছদ সহজেই আভাস দেয় গল্পগুলির মেজাজের।

ভূতেদের খপ্পর এড়াতে পারেনি লিটিল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নও! শ্মশান ভূতেদের প্রিয় আস্তানা। সেই ‘শ্মশান’ নিয়ে দুই খণ্ডে বিস্তৃত আশ্চর্য বই মিলবে ‘তাবিক’-এর টেবিলে। লেখক এবং প্রকাশক অলোক সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে এমন অ্যাকাডেমিক কাজ এবং সেল্ফ-পাবলিশড বইয়ের ভিড়ে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা বিরল। 

দিন কয়েক আগে সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে মেলায় প্রকাশিতব্য একটি নতুন বইয়ের বিজ্ঞাপন পড়ে। বইয়ের নাম: ‘নোবেলজয়ী সত্যজিৎ’ পাঠকরা তাজ্জব! রীতিমতো হইচই ফেলে দেওয়া ঘটনা! এ তো জানা ছিল না! সত্যজিৎ রায় নোবেলও পেয়েছিলেন? উক্ত স্টল নম্বরে পাঠকেরা সদলবলে হানা দেওয়ায় মেলার মাঠেই প্রকৃত সত্যি সামনে এল। প্রকাশক কাঁচুমাচু হয়ে জানালেন, “মিসটেক হয়ে গিয়েছে স্যার। উৎসাহে এবং শ্রদ্ধায় ‘অস্কার’ লিখতে গিয়ে ‘নোবেল’ লিখে ফেলেছে প্রেসের লোক। মেলার মাঠে অন্তত কয়েকশো লোক এসে খোজ করে গিয়েছেন! কী যে লজ্জার কথা! বইটার নাম ‘অস্কারজয়ী সত্যজিৎ’, এসে পড়বে মেলার শেষে!”

ওই যা বলেছিলুম, ছাপাখানার ভূতেরা গোলমাল পাকাতে ওস্তাদ। কিন্তু আর নহে বেশিদিন। কল্যই শেষ রজনী। কাল থেকে কোথায় বা কী, মেলার ফাঁকি মিলিয়ে যাবে চট করে!

………………………………………………………………….
ব‌ইমেলার কড়চা নিয়মিত পড়ছেন তো? তা, কেমন লাগছে? আমরা আপনাদের মতামতের প্রত্যাশী। আমাদেরকে মেল করতে পারেন যে কোনও দিন, যখন খুশি– ভালোবাসায়, জিজ্ঞাসায়, বন্ধুত্বে, শত্রুতায়, আবদারে– [email protected]– এই মেল আইডিতে। ………………………………………………………………….

………. পড়ুন বইমেলার কড়চা-র অন্যান্য পর্ব ……….

১১. বইমেলার বিবিধ কৌতুকী

১০. মেলায় পাবেন শ্রেষ্ঠ শত্রুর জন্য উপহারের বই!

৯. ‘না কিনুন, একবার হাতে নিয়ে দেখুন!’

৮. বইমেলার লিটল ম্যাগ টুকরো টুকরো দৃশ্যের আনন্দভৈরবী

৭. মেলার মাঠ খেলার মাঠ

৬. অনর্গল বইয়ের খোঁজে

৫. দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ভিড়ে পাঠকও কি দুষ্প্রাপ্য?

৪. ছাব্বিশের বইমেলা বাণীপ্রধান!

৩. বই পোড়ানোর চেয়ে গুরুতর অপরাধ বই না পড়া

২. মালিককে গিয়ে বল, ‘ব‌ইমেলা’ এসেছে!

১. ইতনা বেঙ্গলি বুকস!

49th International Kolkata Book Fair Book fair book lovers horror stories Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar thriller

Share this article on