Toulouse-Lautrec: Life of Struggle, Art and Expression। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তুলির কামনা, তুলির সাহস

মাত্র ৩৬ বছরের রঙিন বোহেমিয়ান জীবন আঁরি দ্য তুলুস-লোত্রেকের। সমাজের ওপর অভিমান থেকেই প্যারিসের নৈশজীবনের নেশায় মেতে উঠেছিলেন পৌনে পাঁচ ফুটের এই বামনশিল্পী, তাঁর দানবীয় প্রতিভা আর যৌনখিদে নিয়ে। মূলত মুলারুজের পোস্টার এঁকে এমন প্রসিদ্ধি এবং বাণিজ্যিক সাফল্যে পৌঁছন তিনি যে, ইউরোপীয় শিল্পের রূপকথায় তিনি এক অনন্য রাজকুমার।

শেষ আপডেট: আগস্ট ১৪, ২০২৬, ২০:১৬   
Facebook WhatsApp Messenger

১০৬.

একজন বামন শিল্পী। হাড়ের অসুখ নিয়ে জন্মেছে সে। দেহটা বয়স অনুসারে বাড়ছে। কিন্তু বাড়ছে না পা। অতএব সে যত বড় হচ্ছে, ততই বিকৃত হচ্ছে তার শরীর!

শেষপর্যন্ত পাঁচ ফুটের কাছাকাছি গিয়ে তার দেহের বাড় থামল। এবং দেখা গেল, প্রায় সবটাই তার ধড়। পা দুটো তুলনায় হাস্যকর খুদে। সে জন্মেছে ফ্রান্সের এক বিত্তবান অভিজাত পরিবারে। কিন্তু পারিবারিক আভিজাত্য এই বিকৃত সন্তানকে মেনে নিতে পারে না। সে বড় হতে হতে বুঝতে পারে, আসলে সে পারিবারিক লজ্জা! বিশেষ করে মেয়েরা তাকে দেখে তাচ্ছিল্যের চোখে। পারিবারিক পরিসরে সে কাটায় ‘নির্বাসিত’ জীবন।

zoom
তুলুস লোত্রেক

পা দুটো হাড়ের অসুখে বাড়তে পারেনি। কিন্তু তার ধড় যত বেড়েছে, তত তাগড়াই হয়েছে তার খিদে। কিন্তু কোন অভিজাত ধনী ঘরের সুন্দরী মেয়ে তাকে বিছানায় নেবে? তবে তার তো অর্থের অভাব নেই। সুতরাং, তার ধড় যে-ই তাকে বলে খুব খিদে পেয়েছে, সে চলে যায় বেশ্যাদের বাড়ি। সেখানে ফেলো কড়ি মাখো তেল। অত বাছাবাছি নেই। বরং সে বেছে বেছে বেঁটে মেয়েদের কাছে যায়। এবং দরাদরি করে না। ফলে বিছানায় ডাক পায়। এবং ডাক পায় অফুরন্ত মদে। সে নিজেও ভাবতে পারেনি, এত ছোট রুগ্ন শরীরে এত প্রবল তেষ্টা থাকতে পারে মেয়েমানুষ আর মদের!

zoom
লোত্রেকের আঁকায় বনিতালয় (১৮৯৪)

হঠাৎ সে একদিন গেল প্যারিসের সবথেকে দামি আর খানদানি বনিতালয় মুলারুজে। রজনী-রূপবতীদের ছড়াছড়ি সেখানে। তাদেরই একজন নিল তাকে কোলে তুলে! দিল তাকে দাঁড় করিয়ে টেবিলের ওপরে। আর সবার সামনে বলল, “আমাদের কাছে তোর কিছু পাওয়ার নেই। আর তোর কাছেও আমরা কিছু পাব না। দু’দিক থেকেই ফক্কা!” সবাই হেসে উঠলো হো হো করে। সে চুপ করে রইল, টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে। তারপর মুখ নিচু করে বলল, ‘আমি একটা জিনিস খুব ভালো পারি। ছবি আঁকতে। আর আমি ছবি আঁকি প্যারিসের বেশ্যাপাড়ার। এই প্রথম এলাম মুলারুজে। আমার ‘বিছানায় চুমু’ নামের ছবির সিরিজটার খুব কদর হয়েছে!

‘দেখি তো কেমন হয়েছে তোর– ‘কিস ইন বেড’ সিরিজের ছবি, সঙ্গে আছে?’

‘ওই বাক্সতে আছে’, বলে বামন শিল্পী।

zoom
ক্যান ক্যান ড্যান্সে মডেল রোজ। শিল্পী: লোত্রেক

বেশ্যার দল বাক্স খুলে বের করে আনে ছবির তাড়া। তারপর তারা অবাক। তবে তাদের মধ্যে কেউ কিন্তু ভাবতে পারেনি এই সব ছবির দাম এককালে হবে কোটি কোটি টাকা! তারা শুধু দেখে প্রায় প্রত্যেকটা ছবিতে একটা ছোটখাটো পুরুষ এক দীর্ঘাঙ্গী নারীর ওপরে শুয়ে তাকে নানাভাবে চুমু খাচ্ছে, তীব্রতম চুমু, অনন্ত সময় ধরে! এবং কোনও কোনও ছবিতে পুরুষের তলায় সেই নারী তার দু’টি দীর্ঘ পা দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে পুরুষটিকে, যার মধ্যে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে সঙ্গমের রতিসুখ।

zoom
‘কিস ইন বেড’ সিরিজের ছবি (১৮৯২)

এই সব ছবি দেখে বিস্মিত, বিহ্বল সেই বেশ্যা, যে বামন শিল্পীকে কোলে তুলে টেবিলের ওপরে পুতুলের মতো রেখে দিয়েছিল, সেই রূপবতীকে সেই শিল্পী বলে, ‘আমি তোমার ছবি আঁকতে চাই, তুমি রাজি?’ ‘আগে বল, তোর কী নাম?’ বলে রাতের সেই রজনীগন্ধা। বামন শিল্পী বলে, ‘আমার নাম আঁরি দ্য তুলুস-লোত্রেক’। নাম শুনে সবাই থ! আপনি অভিজাত লোত্রেক পরিবারের সদস্য? বলে নার্ভাস রূপসী। উত্তরে টেবিলে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ চুমু খায় তুলুস-লোত্রেক রাতের রজনীগন্ধার ঠোঁটে। রূপসী খুব দামি সুরার গন্ধ পায় শিল্পীর মুখে। চুমু শেষ করে তুলুস বলে, ‘এবার বলো, তোমার নাম কী?’
‘আমার নাম রোজ কিংবা রুজ। আপনার যা খুশি বলতে পারেন। এবং আমি রাজি।’
‘কীসে রাজি?’
‘আপনার মডেল হতে?’
‘একটা শর্ত আছে কিন্তু’, টেবিলে দাঁড়িয়ে বলে বামন শিল্পী।
‘কী শর্ত?’
‘তুই আমাকে তুই বলবি। বেশ্যাদের সঙ্গে খিস্তিখেউর করলে আমার খুব জমে। আর মদ মেয়েমানুষ ছাড়া আমি ছবি আঁকতেই পারি না রোজ, এটা মনে রাখবি।’
‘আজ কেন এসেছি জানিস রোজ?’
‘ছবি আঁকবি?’
‘তোদের ক্যান ক্যান ড্যান্সের ছবি আঁকব। আর আমার ছবি থেকে তোরা পোস্টার করবি। দেখবি তোদের মুলারুজ আর ক্যান ক্যান ডান্স কী জনপ্রিয় হবে! আর দেখবি কত মানুষ আমার আঁকা পোস্টার কিনবে!’
‘কিন্তু আমরা যখন একটা পা ফাঁক করে মাথায় তুলি, সব দেখা যায়, সে সব আঁকবি না কি?’
‘সব আঁকব। তোদের যেমন লজ্জা নেই। আমারও নেই।’

হাসির ছররা ছোটায় বেশ্যারা।

zoom
লোত্রেকের আঁকা মুলারুজের ছবি

তুলুস-লোত্রেকের জন্ম ১৮৬৪-র ২৪ নভেম্বর। আর মৃত্যু ১৯০১-এর ৯ সেপ্টেম্বর। মাত্র ৩৬ বছরের রঙিন বোহেমিয়ান জীবন। সমাজের ওপর অভিমান থেকেই প্যারিসের নৈশজীবনের নেশায় মেতে উঠেছিলেন পৌনে পাঁচ ফুটের এই বামনশিল্পী, তাঁর দানবীয় প্রতিভা আর যৌনখিদে নিয়ে। মূলত মুলারুজের পোস্টার এঁকে এমন প্রসিদ্ধি এবং বাণিজ্যিক সাফল্যে পৌঁছন তিনি, যে ইউরোপীয় শিল্পের রূপকথায় তিনি এক অনন্য রাজকুমার। প্যারিস জয় করে তিনি যান লন্ডনে। সেখানে তাঁর গভীর সখ্য হয় অস্কার ওয়াইল্ডের সঙ্গে। সমকামী হওয়ার অপরাধে যখন ওয়াইল্ডের জেল হল, তখন এই বামনশিল্পী সাহস দেখিয়ে ছিলেন ওয়াইল্ডের
সমর্থনে প্যারিস এবং লন্ডন কাঁপিয়ে।

zoom
‘কিস ইন বেড’ সিরিজের আরেকটি ছবি

তিনি প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে ছিলেন রোজকে। এবং প্যারিসের নৈশজীবন নিয়ে তাঁর অধিকাংশ ছবিতে শরীর দিয়েছে রোজ। কিন্তু রোজ একটি কথা জানায়নি কিশোর তুলুসকে। সেই গোপন কথাটি হল, রোজের শরীর বহন করছে সিফিলিসের সংক্রামক।

একদিকে যৌনরোগ সিফিলিস, অন্যদিকে মদের মারাত্মক নেশা। বামনশিল্পীর ছোট্ট শরীরটা পক্ষাঘাতে হয়ে গেল অসাড়। ততদিনে রোজি হারিয়ে গিয়েছে প্যারিসের অন্ধকারে। তবে তাকে চিরদিনের আলো দিয়ে গিয়েছেন তুলুস-লোত্রেক।

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য লেখা

………………….

French painter Henri de Toulouse-Lautrec In Bed The Kiss Painting Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on