a prose about eyes eye contact and voyeurism | Robbar
Robbar
  • ২ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ২০ আগস্ট ২০২৬

চোখে চোখে কথা বলো

‘চোখে চোখে কথা’ আজকাল কেউ বলে না, সব না কি চোখ দিয়ে ঝারি মারে! চোখ দিয়ে উহ্য, ঝারি মারা বললেই যথেষ্ট। ঝারি মারা মানে ‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে’। লুকিয়ে দূর থেকে চোখ দিয়ে রূপ গিলছে। ‘চোখে চোখে কথা’ ঝারি মারার পরিণতি নয়। শুনেছি, ঝারি মারতে গিয়ে অর্থাৎ রূপমদিরা গোপনে পান করতে গিয়ে যদি ধরা পড়ে যায়, তাহলে তার কয়েক-রকম পরিণতি। যাকে ঝারি মারছিল, তার মৃদু সম্মতি থাকলে পরিণতি একরকম, এক্কেবারে সম্মতি না থাকলে পরিণতি আরেকরকম। আর প্রবল সম্মতি থাকলে কেস আরেক প্রকার।

Published by: Robbar Digital

Posted:August 20, 2026 9:32 pm | Updated:August 20, 2026 9:37 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

১৪.

বাংলা শব্দ খুঁজছি। বাঙালির সংস্কৃতি। আর কোথাও নয়, নিজের শরীরে। অঙ্গে আর অঙ্গের প্রত্যঙ্গে। এই যেমন ধরা যাক ‘চোখ’। ‘চক্ষু’ নয় ‘চোখ’। ‘চক্ষুশূল’ নয় ‘চোখের বালি’। ‘কটাক্ষ’ নয় ‘চোখ মারা’। গত কয়েকদিন ধরে দেখছি এ-পাড়ায় এসেছে কপোত-কপোতী যথা যুগল। নাম জানি না, ধাম জানি দোঁহের। উল্টোদিকের বাড়িতে থাকে। অফিস যায়, ফেরে। মাঝেমাঝে ঘরে বসেই কাজ করে। টের পাই। যাকে বলে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’। এই যে ওদের ‘চোখে চোখে’ রাখছি, তা কি আর এমনি?

চোখ থাকতে লোকে আজকাল চোখের মর্ম বোঝে না। কী এক ছাই মোবাইল, সারাক্ষণ স্ক্রিনয়ন। স্ক্রিনে নয়ন On। মোবাইল এদের তৃতীয় নয়ন। যা মানুষ, সর্বদেশেষু, স্ক্রিনয়নে সংস্থিতা। আমাদের যে প্রকৃতিদত্ত একজোড়া চোখ আছে, তা যেন ভুলেই গিয়েছে সবাই। আমি তাই ঘোর বর্ষায় চোখের কাজে পারঙ্গম হয়ে উঠেছি। লক্ষ্য একটাই। চোখে চোখে রাখা। কী এর অর্থ? নজরদারি? অভদ্র কৌতূহল প্রকাশ? তা হবে।

zoom
‘চারুলতা’ সিনেমার একটি দৃশ্য

চোখে চোখে রাখতে গিয়েই টের পাচ্ছি, এই বর্ষায় তাহাদের প্রেম অতীব ঘন। একে অপরকে ‘চোখে হারাচ্ছে’। চোখে হারায় মানে কী? মানে টের পেয়েছিলাম সেকালের ঠানদিদির কথায়। বলেছিলেন মুখ বেঁকিয়ে, ঝামটা দিয়ে। ‘ঢঙ্‌! আমাদের কালে এমন বেহায়াপনা দেখিনি। আছ তো একই সঙ্গে। সারাক্ষণ দেখা হচ্ছে। অথচ ভাব দেখ না! কাছে থেকেও যেন নেই। চোখে হারাচ্ছে! ছ্যা ছ্যা! রাম রাম! ঘোর কলি!’ তার মানে থেকেও না-থাকার অনুভূতি। পেয়েও না-পাওয়ার অনুভূতি। মিলনের মধ্যেও বিরহ। তাকেই বলে তবে চোখে হারানো। দেখলুম, প্রগাঢ়-সন্ধেবেলায় দু’টিতে ঘরের আলো নিভিয়ে মোমবাতি জ্বেলে চোখে চোখ রেখে বসে। ঠিক যেন তোমার চোখে আমার মণি টাপুর টুপুর। মণি তো নয়, দৃষ্টি বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছে। বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে বৃষ্টি। ঠানদি থাকলে বাড়ি মাথায় করত! বলত, ‘অনাছিস্টি কাণ্ড। বিজলির আলো থাকতে আলো জ্বালে না। জ্বালে মোমবাতি। আমাদের সময় বিজলি বাতি আর থাকত কতক্ষণ, তেলের কুপি আর লণ্ঠন। তা সে লণ্ঠনের কাচ পরিষ্কার করতে দিন কাবার! ঘর-সংসারের হাজারটা কাজ। আর এদের দেখো! আপনি-কোপনির সংসার। তায় আলো জ্বালে না। মোমবাতি জ্বেলে বসে থাকে।’

ঠানদিদির চোখা-ঝামটা কানে কল্পনা করতে করতে মনে হল– ‘তোমার চোখে আমার মণি টাপুর-টুপুর’ দশার আরেকটা অভিব্যক্তি হতে পারে– ‘চোখে চোখ লেগে জ্বলে ওঠে আলো/ চোখ নয় এ যে চকমকি/ দুজনেই আজ বড়ো জমকালো।’ লিখে মনে হল এ-জন্যই বলা হয়, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’ এই তো কবিতার ছিরি! তার থেকে চোখ নিয়ে আরও কিছু চোখা-চোখা বাংলা ভাবা যাক।

zoom
আলফ্রেড হিচককের ‘রেয়ার উইন্ডো’র দৃশ্য

‘চোখে ধুলো’ দিয়ে আজকাল কেউ কি কোথাও যেতে পারে? চারদিকে দেখার কত আয়োজন। সিসিটিভি তাছাড়া নিজের অচ্ছেদ্য অঙ্গ মোবাইল তো আছেই। মোবাইল থাকলে কারও চোখে ধুলো দেওয়ার উপায় নেই। সর্বত্র শ্যামের বাঁশি। বন্ধ রাখলে আলাদা। তবে কি না বন্ধ কি আর রাখে? দু’জনে পাশাপাশি বসে, কথা বলছে না। মোবাইল দেখছে। ‘চোখে চোখে কথা’ বলারও কি উপায় আছে? ‘চোখে চোখে কথা’ আজকাল কেউ বলে না, সব না কি চোখ দিয়ে ঝারি মারে! চোখ দিয়ে উহ্য, ঝারি মারা বললেই যথেষ্ট। ঝারি মারা মানে ‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে’। লুকিয়ে দূর থেকে চোখ দিয়ে রূপ গিলছে। ‘চোখে চোখে কথা’ ঝারি মারার পরিণতি নয়। শুনেছি, ঝারি মারতে গিয়ে অর্থাৎ রূপমদিরা গোপনে পান করতে গিয়ে যদি ধরা পড়ে যায়, তাহলে তার কয়েক-রকম পরিণতি। যাকে ঝারি মারছিল, তার মৃদু সম্মতি থাকলে পরিণতি একরকম, এক্কেবারে সম্মতি না থাকলে পরিণতি আরেকরকম। আর প্রবল সম্মতি থাকলে কেস আরেক প্রকার। কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই না কি চোখে চোখে কথা হয় না। প্রবল সম্মতি থাকলে আজকাল লোকে ‘ডেট’ করে। ডেট শব্দটাও ব্যাকডেটেড। ‘হুক আপ’ অভিধানে বহুকাল ঢুকে পড়েছে। সেখানে ‘চোখে চোখে কথা’র অবসর নেই। ‘কটাক্ষ’ নামক চোখের কাজের পরিশীলনের দিন গিয়েছে। চোখ গেল পাখি ডাকবে না। যা হবে তা দ্রুত-চকিত-সম্মত অথচ উদাসীন, স্মৃতিবিহীন, দায়হীন।

হায় রে কোথায় গেল চলে রবি ঠাকুরের দিন? তিনি লিখেছিলেন:

‘কথা কানে কানে,
মৌনমুখে হাতে হাত ধরা,
রজনীগন্ধায় সাজি ভরা,
চোখে চোখে চাওয়া,
দুরু দুরু বক্ষ নিয়ে আসা আর যাওয়া।’

এ-সব তো আর হয় না। তাই চোখে হারানোর একটা উপযুক্ত পদ খুঁজছিলাম। ‘দুঁহু কোরে দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া’– এই কি ‘চোখে হারানো’-র উপযুক্ত পদ নয়! মিলনে বিরহের ভাব। যাকে বলে প্রেমবৈচিত্ত্য। মিলনের মধ্যেও বিচ্ছেদের আশঙ্কা। হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল। তার সঙ্গে বজ্র ও বিদ্যুৎ। সেকালে শুনেছি, কারও কারও চোখে বিদ্যুতের কটাক্ষ খেলা করত। দৃষ্টি-বিদ্যুৎ হেনে রমণীরা বীরবরকে পরাভূত করতেন। আচ্ছা, দৃষ্টি-বিদ্যুৎ ঘরের বাংলায় কী হবে? ‘চোখে সে হেনেছে বিজলি/ অঙ্গ সকলি বিকলি।’ আবার কবি জেগে উঠছে! খারাপ টাইপের সব কবিতা লিখছে। এই ছাইভস্ম লোকাল-ট্রেনের ডেলিপ্যাসেঞ্জার মহলে চলতে পারে। তার বাইরে নয়।

zoom
‘হারবার্ট’-এর একটি দৃশ্য

সামনের বাড়িতে চোখ গেল। বজ্র-বিদ্যুৎ-বৃষ্টিতে বিচলিত মোমবাতি নিভে গিয়েছে। এদিকে ঘরের আলো জ্বলে ওঠেনি। সুতরাং, রবি ঠাকুরের পদ অন্যভাবে ভেঙে মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করতে শুরু করল। ‘সেদিন চৈত্রমাস/ তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ’ এই দ্বিপদীর বর্ষাকালীন খেলো রূপান্তর:

‘আজ শ্রাবণ সন্ধেবেলায়
আলো জ্বালি নাই মোম জ্বালি নাই
সময় কাটাই হেলায়
আছে কেবল চোখ
ঘরেতে নেই লোক
আপাতত একমাস
কে কার সর্বনাশ?’

এই শ্রাবণে রবি ঠাকুর নিত্য। বাকি সবই অনিত্য। সুতরাং…

…………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন সিরিয়াসলি নেবেন না-এর অন্যান্য পর্ব

…………………….

Eye Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Third Eye

Share this article on