Robbar

প্রশ্ন নিয়ে কিছু প্রতিপ্রশ্ন

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 6, 2026 7:52 pm
  • Updated:July 6, 2026 8:41 pm  
Jadavpur University admission test paper became viral for pattern | Robbar

এ নিশ্চিত যে, প্রশ্নপত্রটি এক ঝটকায় ‘প্রশ্নপত্র’ সম্পর্কে যা যা ধ্যানধারণা, তাতে বেমক্কা টান মারে। কিন্তু এইসবের পরেও, সন্দেহ– বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়তে এসে এই প্রশ্নপত্র কদ্দুর একজন বাংলা পড়ুয়ার ভবিষ্যনির্দেশ করে? অন্তরালের খোঁজ, মনের প্রস্তুতি, ক্রিয়েটিভিটির প্রদীপে জোরসে ঘষা– দেখতে-শুনতে চমৎকার লাগলেও, সেই প্রদীপের দৈত্যটি বেরিয়ে এসে ‘যো হুকুম মেরে আকা’ বললে, আমরা কি জানি, কী কাজ আমরা দেব তাকে বাংলাভাষায়? কীসে মিটবে তার দৈনন্দিন খিদে? অ্যাকাডেমিক চর্চার পরিসর পেরিয়ে বাংলা ভাষায় কাজ করার ক্ষেত্রটি কতটা প্রস্তুত?

রোববার ডিজিটাল ডেস্ক

সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সমাজমাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হয়েছে। এ কোনও নতুন ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কারের মতো খবর নয়। দুম করে মন্দ থেকে মৃদুমন্দ বা ভালো হয়ে যাওয়ার মতো ‘ব্রেকিং নিউজ’– দলদস্যুদের দল বদলানোর ব্যাপার নয়। গত কয়েক বছর ধরে, প্রায়শই, ধারাবাহিকভাবে এই প্রবেশিকা প্রশ্নপত্রের নমুনা সমাজমাধ্যমের তেলকড়াইতে পড়ামাত্র চিড়বিড়াৎ! আর তা উদগ্র বঙ্গচিত্তের স্ক্রোলজীবনের অঙ্গ হবে, তা তো স্বাভাবিকই। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ, সোশিওলজি মায় লিঙ্গুইস্টিক্স নিয়ে জীবনে একটি বাক্যও বিনিময় নয়, কিন্তু বাংলা তো মাদারটাং। কল সেন্টার ফোন করলে হিন্দি, অফিসে ইংরেজি, বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা-শ্বশুর-শাশুড়ি থাকলে হামেশাই বাংলা, সন্তান থাকলে ইংরেজি-হিন্দির ঝালমুড়ি– এই তো বাঙালির ভাষাস্কোপ। কিন্তু বয়স হয়, মন গুড়গুড় করে। কী একটা জানি গল্প জানতুম, কী একটা ভাষায় যেন বন্ধুদের গাল দিতুম, বুকের ওপর কী একটা বই নিয়ে যেন ঘুমিয়ে পড়তুম গ্রীষ্মছুটিতে– অতএব এই কী-যেন-তুতো বাঙালি এরকম প্রশ্নপত্রের সামনে ধূপ জ্বালিয়ে খানিক আত্মসংস্কৃতি চর্চা করবে না, সে কী হয়! 

সকলেই জানেন, বা জেনে নিন এই বেলা, প্রশ্নপত্রটির উৎকর্ষ নিয়ে বেজায় হুলস্থুল চলছে! জনা কয়েক, হয়তো উচ্চমাধ্যমিকের পর জীবনে বাংলা বই রাখার জায়গাটিকে ডিজইনফেক্ট করে অন্যান্য কার্যকর বস্তুতে ভরিয়ে রেখেছিলেন, তাঁরাও এইবেলা কলম চুলকে-টুলকে একাকার, পরিষ্কার জানাচ্ছেন– এই প্রশ্নপত্র পেলে কোন কোন উত্তর লেখায় ব্রতী হতেন। ২১ ফেব্রুয়ারি– দুচ্ছাই– যাদবপুরের বাংলা প্রবেশিকা পরীক্ষার দিনই ‘আন্তর্জাতিক ভাষাদিবস’ বলে ঘোষণা হোক– এহেন মর্মে প্রবল ঘর্মে ঘচঘচ করে নব্য প্রতিষ্ঠিত সরকারকে ইংরেজিতে দামড়া চিঠি লিখে ফেললেন বলে! কে বোঝাবে প্রতি বছর একই দিনে প্রবেশিকা না-ও হতে পারে। কেউ কেউ নস্টালজিয়ার ঢেকুর তুলেছেন, কেউ কেউ সগৌরব ঘোষণা করেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি পাস করেছেন। এ নিয়ে সত্যিই কোনও সন্দেহ নেই, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যক্রমের গতানুগতিক তন্দ্রা, পঠনপাঠনের সেকেলে আরামকেদারাটিকে বারেবারেই ভাঙতে সক্ষম হয়েছে। সেই ভাঙনের বিভা পড়ুয়াদের জীবনেও এসে পড়েছে বহুবার, রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনেও তারা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর তুলনায় খানিক বেশি সরব, সচল, উচ্চকিত। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস যে রক্তচক্ষুময় সীমার দড়িটিকে পুড়িয়ে খাক করে দিতে পারে, মাঝেমাঝে হদ্দবুড়োদের টের পাওয়ায় তারা। তা নিয়ে সমাজে ও সমাজমাধ্যমে যাদবপুর নিয়ে কম দড়ি টানাটানি হয় না। 

প্রশ্নপত্র পৃষ্ঠা ১

তবে, শুধু যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এককভাবেই এহেন মননশীল-সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের আয়োজন করে, তা নয়। খোঁজখবর নিলে দেখা যাবে, আরও কিছু প্রতিষ্ঠান, হাবে-ভাবে খানিক আলাদা হলেও– প্রশ্নপত্রে চিন্তাবৃত্তিকেই গুরুত্ব দিয়েছে, তথ্যকে নয়। এটা ঠিকই যে, এই ধাঁচের প্রশ্নপত্রে পাঠ্যক্রমের যে জংলা তিতকুটে পাঁচিল, তা পেরিয়ে যাওয়ার বেয়াদব ফুর্তি আছে। সদ্য ফুরফুরে, সাহিত্য পড়ার স্বপ্ন দেখা মনটা এই প্রশ্নপত্রকে আদর করতে জানে, প্রশ্নপত্রও জানে ওই মনটাকে পরিচর্যা করতে। পরিচর্যার থেকেও বড় কথা– সাহস। নিজের কথাটুকু বলার। নিজের মতো করে আলগোছে বা গুছিয়ে ভাবার, কল্পনা করার। কেবল তথ্যের পাঁচন গিলে যে সাহিত্যের দূরতর পড়ুয়া হওয়া যাবে না, এই সারসত্যটিকে প্রবেশক দরজার বাইরেই বুঝিয়ে দেওয়া গেল। 

প্রশ্নপত্র পৃষ্ঠা ২

কিন্তু প্রশ্ন: এই ভাইরাল প্রশ্নপত্রটি কি বাংলা ভাষা-সাহিত্যের পড়ুয়াদের গুণমান ইঙ্গিত করে কোনওভাবে? প্রশ্নপত্র যাঁরা করেছেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবেই দূরদর্শী, খুঁতখুঁতে, সচেতন ও সহানুভূতিসম্পন্ন– একজন উড-বি সাহিত্যের পড়ুয়াকে স্রেফ আয় তোর মুন্ডু না, হৃদয়টাকেও দেখি– এমনটা তাঁরা চেয়েছেন। পরখ করেছেন ভিতরটা কতটা প্রস্তুত, বা প্রস্তুত করে নেওয়া যাবে কি না। এ নিশ্চিত যে, প্রশ্নপত্রটি এক ঝটকায় ‘প্রশ্নপত্র’ সম্পর্কে যা যা ধ্যানধারণা, তাতে বেমক্কা টান মারে। কিন্তু এইসবের পরেও, সন্দেহ– বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়তে এসে এই প্রশ্নপত্র কদ্দুর একজন বাংলা পড়ুয়ার ভবিষ্যনির্দেশ করে? অন্তরালের খোঁজ, মনের প্রস্তুতি, ক্রিয়েটিভিটির প্রদীপে জোরসে ঘষা– দেখতে-শুনতে চমৎকার লাগলেও, সেই প্রদীপের দৈত্যটি বেরিয়ে এসে ‘যো হুকুম মেরে আকা’ বললে, আমরা কি জানি, কী কাজ আমরা দেব তাকে বাংলাভাষায়? কীসে মিটবে তার দৈনন্দিন খিদে? অ্যাকাডেমিক চর্চার পরিসর পেরিয়ে বাংলা ভাষায় কাজ করার ক্ষেত্রটি কতটা প্রস্তুত? মিডিয়া, বিজ্ঞাপনের কপি, স্ক্রিপ্ট লেখা, ইউটিউব– কোন পথে খুলে যাবে বাংলার ভাষায় গুপ্তধনের দরজা? গুপ্তধন না-হোক, সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার মতো উপার্জনের ক্ষমতা আসবে কোন কাজের পরিসর থেকে? যে প্রশ্নপত্রর মায়ায় ও ছায়ায় পড়ুয়ার সঙ্গে প্রাথমিক আলাপচারিতা হয়ে রইল বিশ্ববিদ্যালয় ও পঠনপদ্ধতির, যে-স্বপ্নের পালে বেজায় বাতাস লাগল, তা কি চলিষ্ণু থাকবে? না কি তা গড় ক্লাসে, সেমিস্টারে, কালের জলহাওয়া লেগে, ভবিষ্যৎভাবনার দুশ্চিন্তার মুষড়ে পড়বে? যে উদ্ভাবনী মনের জৌলুস সে দেখাতে পেরেছিল উত্তরপত্রে, বাংলা পড়তে এসে সেই সৃজনশীলতা ক্লাসরুমে সমাদর পাবে তো? নিশ্চিতভাবেই বাংলা ভাষা নিয়ে চমৎকার কেরদানি করা যায়। আরও ৪০০ রকম অপূর্ব, অভাবনীয়, লোভনীয় প্রশ্ন তৈরি করা যায়, যা ভাইরাল হবে। তা হয়তো রোজগার নিয়ে দুশ্চিন্তাহীন, বাংলা সাহিত্য নিয়ে পরোয়াহীন, মুখরোচক বাঙালির সান্ধ্য আড্ডার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যেসব পড়ুয়া ইতিপূর্বেই এই অভিনব প্রশ্নাবলির সম্মুখীন হয়েছে– তারা জানে– এই প্রশ্নপত্রর লাবণ্যর চেয়ে বাস্তবের বাংলা ভাষা নিয়ে চিন্তা-চর্চার মালিন্য ঢের বেশি। তথ্যকে তেমন আমল না-দিলেও, পাত্তা না-দিলেও, ইউজিসি-র ‘নেট’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে তথ্য-সংস্কৃতিরই জয় অনিবার্য। 

আবেগ ছেঁটে দিয়ে যদি দেখি, তবে এহেন প্রশ্নপত্রের চরম উৎকর্ষেও বিশেষ কিছু যায়-আসে না। কারণ যাঁরা প্রশ্ন করছেন, তাঁরা বাংলা সাহিত্যের সম্মাননীয় শিক্ষক, ভাষার প্রতি, পড়ুয়াদের প্রতি তাঁরা দায়বদ্ধ। কিন্তু যাঁরা পরীক্ষা দিতে আসছেন, ভাবছেন বাংলা নিয়ে পড়ব, তাঁরা কী লিখছেন উত্তরপত্রে– সেটাই আসলে বিচার করবে বাংলা ভাষার একালের পডুয়া কতটুকু ভাবছে। ভাবতে পারছে। এই যে প্রশ্নপত্র, তা তাদের লিখতে-পড়তে-ভাবতে ভালো লাগছে তো? তারা চাইছে তো এই নতুন স্রোতটায় ভেসে যেতে? যদি এমনটা না হয়, যদি পাঠ্যক্রমের ঘুলঘুলিতেই আটকে থাকে বাংলাভাষার লাবডুব– তবে প্রশ্নপত্র ক্রমে ভাইরাল হবে, উত্তরপত্র ক্রমে দৈন্য। ফেসবুকীয় তরজায় উত্তরোত্তর ভাসতে থাকবে বাংলা ভাষা, কিন্তু তাতে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের পড়ুয়াদের এত্তবড় লবডঙ্কা! 

তবু, প্রশ্নপত্রের ছাই ঘেঁটে কেউ কেউ যেন খুঁজে পায় ভাষার আগুন। যে আগুন, তারা ছড়িয়ে দিতে পারে উত্তরপত্রে। ভাইরাল জগৎ পারাবার থেকে দূরে, ওই গোপন উত্তরপত্রগুলি যেন ভবিষ্যতের পাণ্ডুলিপির বীজ হয়ে ওঠে, এইটুকু আশা। এইটুকু বাংলাভাষা।