


জীবনে একবার আশাকে সামনে থেকে গাইতে শুনেছি। নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম। বয়স হয়ে গিয়েছে সুরসম্রাজ্ঞীর। তাও আরডি-র লেজেন্ডারি টিমের সঙ্গে গাইছেন দমকে। ‘ইজাজত’-এর গানটা গাইতে গিয়ে থামিয়ে দিলেন হঠাৎ। জমছে না। আঙুল তুলে বারণ করলেন কিছু বাজাতে। খালি গলায় ধরলেন, ‘ওহ রাত বুঝা দো, মেরা ওহ সামান লওটা দো’… বুকের ভেতর দিয়ে কী একটা কষ্টস্রোত ওঠানামা করছিল। খালি গলায় গানটা একসঙ্গে কত মুহূর্ত যে মনে পড়িয়ে দিল। নায়িকার গলার ফাঁসের মতোই চেপে বসছে বিষম স্মৃতিপাথর। নীরবতার কথাগুলো আলো হয়ে জ্বলে উঠছে অন্ধকারের হাতে হাতে। ‘একশো ষোলা চাঁদ কি রাতে’। ‘এক তুমহারে কান্ধে কা তিল’। আমার অনুরাধা-বিকেল একটু একটু করে আমায় ছেড়ে যাচ্ছে কবেকার নিষ্ঠুর প্রত্যাখানে। ক্ষতির কাছেই যাবতীয় ঋণ আমার। তবু অবাধ্য মেয়েটাকেই তো ভালোবাসতে চেয়েছি চিরকাল, বলো।
উত্তম-সৌমিত্র, মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের মতো একটা লতা-আশাও ছিল আমাদের। ‘সাজদা’ অ্যালবামটা বেরনোর পর জগজিৎ-লতার গানগুলো ছেয়ে ছিল প্রেম হারানো রাতফ্যাকাসে আর্তনাদে। লতার ক্যাম্প আওয়াজ তুলছিল, আশা নিশ্চয়ই এমনটা পারবে না! আমরা লড়ে যাচ্ছিলাম ‘উমরাও জান’ নিয়ে, ওগুলোও তো গজল। প্রতিপক্ষের বক্তব্য, এক-আধটা গান হয়ে যায় কম্পোজারের কল্যাণে, পুরো ক্যাসেট হয় না। এইসব আকচা-আকচির মধ্যেই আবিষ্কার করলাম– ‘কাশিশ’ অ্যালবামটি। গুলাম আলি আর আশা ভোঁসলে। ‘ফির শাওন কি রুত পবন চলে তুমহে ইয়াদ আয়ে, তুমহে ইয়াদ আয়ে’। একদিকে গুলাম আলির খরখরে অমসৃণ খুনখারাপি কণ্ঠ, অন্যদিকে রেশম রেশম মধুক্ষরা স্বর, পাশাপাশি শুনলে মরে যাওয়ার মতো অনুভূতি। ‘ন্যায়না তোসে লাগে সারি রায়না জাগে, তুনে চুরায়ি মোরি নিন্দিয়া তু হি তো চ্যায়ন চুরায়ে’। গজল হোক বা গীত– এ জিনিস শুনে রাতের ঘুম উড়ে যাওয়ার জোগাড়। আশা অলওয়েজ আশাতীত। যেখানে বাকিরা থামে, আশার উড়াল সেই রানওয়ে থেকেই।

স্বর্গের দেবীরা গান গাইলে সে কণ্ঠস্বর যেমন হত লতা মঙ্গেশকরের, মর্তমানুষী গাইলে তা অনেকটাই আশামাফিক। প্রার্থনা কম, আবেদন বেশি। এমন নয় যে, লতা– ‘আ জানে যা’ গাননি, কিংবা আশা– ‘যেতে দাও, আমায় ডেকো না’। কিন্তু মোদ্দা মুনশিয়ানার ব্যাপারগুলো ধরনে আলাদা। কেন এরকমটা হল? দুই জিনিয়াসের জীবন, লড়াই– একবার ফিরে দেখি বরং।
চারের দশকে, যখন অকালে পিতৃহীনা দুই বোন আস্তানা গাড়ছে বম্বের খুলিতে, এদেশে ‘সিনেমা’ বস্তুটির বয়স তখন খুব বেশিদিনের নয়, প্লে-ব্যাকের বয়স আরও কম, অনিশ্চিত এক লক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে মঙ্গেশকর পরিবার। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকরের কাছে তালিম আর অজানা আত্মবিশ্বাস– এই মূলধনটুকুই সম্বল। হিন্দি ছবির গান জগতে তখনকার উল্লেখযোগ্য নারীকণ্ঠ শামসাদ বেগম। সে জায়গা পাওয়ার চেষ্টায় লতা কেরিয়ারের শুরুতে তাঁর মতো করেই গাইতেন। পাঁচের দশকের লতার মধ্যে শামসাদের প্রভাব স্পষ্ট, পরবর্তীকালে টোনালিটি বদলে যায় অবশ্য। আশা ছোট থেকেই বড় হয়েছে দিদির পিঠোপিঠি, দিদি সবসময়ই ফার্স্ট, প্রথম চয়েস আর সে অবধারিত সেকেন্ড ফিডল। পরিবারের একটা স্পেশাল নেকনজর ছিল বড়মেয়ের ওপর, যেমন থাকে সনাতন ভারতীয় পরিবারে। রাজকুমারী এলিজাবেথের যেমন সবই প্রপার, আর পরের বোনের চালচলন সবই বেঠিক। লতা-আশার সম্পর্ক এই পথ ধরেই চলেছে।
চারের দশকেই প্লে-ব্যাকের সুযোগ মিলেছে আশার, কিন্তু তার পরের একটা যুগ ধরে ছোটবোন দেখেছে দিদির উত্থান। হিন্দি গানে লতা-যুগ গড়ে উঠছে ধীরে ধীরে, আর আশা পেয়েছে কিছু অসম্মানের সুর। গীতা দত্তের গলা নকল করত আশা, ওই গায়কিটা তাঁর অনেক কাছের মনে হত। কিন্তু তাঁর মতো গাওয়ার সুযোগই বা কোথায়!

ছবিতে সব ভালো মেয়েদের গান করেন লতা, আশা পায় ভ্যাম্পের গান। ছবি শেষে ভ্যাম্পের মতো, গানগুলোও মরে যায় কেমন। চার ও পাঁচের দশকে ভারতীয় নারীর যে যুগবৈশিষ্ট্য, সেই পতিব্রতা, ধর্মপ্রাণা, কোমল গৃহবধূর কণ্ঠে ভরসার আশ্রয় পেত লতা মঙ্গেশকারের গলা। আশার গলায় ছিল এক অযাচিত উচ্ছ্বাস, সেজন্য ঘরে-বাইরে কথা শুনতে হত। নিজের দিদি যদি গানের মানচিত্রে অখণ্ড ভারত জুড়ে থাকে, বোনকে সেই জনপ্রিয়তার কিছু মাশুল দিতে হয় বইকি!
আশার জীবনের সিদ্ধান্তগুলোতেও বাড়ির অমত ছিল। সে পালিয়ে বিয়ে হোক, কিংবা চটুল গান পরিবেশন। এই প্রতিকূলতায় একমাত্র সিলভার লাইনিং– ওপি নাইয়ার-এর সঙ্গে আলাপ। আশা ভেসে গিয়েছিলেন সে প্রেমে, গলায় ঝুলত সুপুরুষ ওপি-র ছবিওলা লকেট– এমনও শোনা যায়। কেন এই অকারণ বেশি বেশি মুগ্ধতা? হয়তো আশার গায়কিকে তিনি কোথাও একটা মর্যাদা দিয়েছিলেন। একটা বিশেষ অ্যাপিল নিয়েও যে গানটাকে অ্যাপ্রোচ করা যায়, ওপি দেখিয়েছিলেন। প্লে-ব্যাকে সিচুয়েশনই ভগবান, ক্যাবারে নাচিয়ের গলায়, নিশি-নটিনেস দরকার হলে লাগবে। এই ছুতমার্গের জায়গাটা থেকে আশাকে বের করে এনেছিলেন ওপি। আর সিংহাসনে বসালেন আরডি। ’৬৬ সালের ছবি ‘তিসরি মঞ্জিল’। আরডি-র সুরে সেই প্রথম আশা, তৈরি হচ্ছে ভারতীয় সংগীতের অন্যতম সুরেলা অধ্যায়। কতরকমভাবে যে আশার কণ্ঠকে শুষে নিয়েছেন রাহুল। দু’জনেরই যেন দু’জনকে দরকার ছিল ভীষণ। বিয়েটা ছিল নিয়মরক্ষার ব্যাপার, ‘হাওয়া কে সাথ সাথ… ঘটা কে সঙ্ সঙ্… ও সাথী চল!’ আসল বিয়েটা– গানের নানা নিরীক্ষায়, আগেই হয়ে গিয়েছিল।

ছয়ের দশকের সময় থেকে ভারতীয় নারীসমাজও নিজস্ব স্বর ফিরে পাচ্ছিল। ‘মহানগর’-এর আরতি চাকরি করতে বেরল, পরিবারের শত ভ্রূকুটি সত্ত্বেও। ‘মাদার ইন্ডিয়া’র আইডিয়া একটু বদলাতে শুরু করল। নিজেদের পছন্দ-অপছন্দের জায়গাটা স্পষ্ট করল নতুন প্রজন্ম। বিটলস্-ম্যানিয়ার ঢঙে দেশের প্রথম রোমান্টিক সুপারস্টার রাজেশ খান্নার গাড়িতে চুমুতে ভরিয়ে দিল তারা। প্রবল সমালোচনা হল বটে, কিন্তু পরিস্থিতি যে কে সেই রইল! এক নব্যনারী প্রজন্মের উত্থান ঘটল, ঠাকুরঘর পেরিয়ে যারা পাবে বসল হাতে সিগারেট নিয়ে।

স্বরবদলের এই সন্ধিক্ষণে আশা নতুনভাবে উঠে এলেন। বেলবটম নারীর হাতিয়ার হল, আশার গান। ধর্ম, রাজনীতি, পারিবারিক মূল্যবোধ– সব নিয়ে হতাশ হিপিপ্রজন্ম যখন গেয়ে ওঠে, ‘দম মারো দম/ মিট যায় হাম/ বোলো সুবহ শাম/ হরে কৃষ্ণ হরে রাম’। জিনাত আর আশার হাত ধরে এক নতুন আধুনিকতাকে চিনল ভারত। ভালো মেয়ের গানে সমাজের প্রতি চ্যালেঞ্জ কম, খারাপ মেয়ের গানে প্রতিবাদের পোড়া অন্তর্বাস, দু’-চোখের আগুন।

লতার জায়গা চিরকাল লতারই ছিল, অতবড় সুরেলা কণ্ঠ এ মহাদেশ আর পেয়েছে কখনও! কিন্তু আশাও যেন জন্ম নিল বহু ছাইচাপা অপমানের অন্ধকার ঠেলে। বাড়ির দায়িত্ববান বাধ্য মেয়েরও যেমন সোহাগ প্রাপ্য, ততটাই আদর প্রাপ্য অবাধ্য রেবেল মেয়েটার। দিদির পথ ধরে না হেঁটে তাঁকে যে অন্যভাবেও ছুঁয়ে ফেলা যায়, দেখিয়েছেন আশা। ক্যাবারে গানও একরকমের গান, হেলেনের সঙ্গে চিরকালীন যুগ্মজয়ী আশাও। দুই বোনের মধ্যে বিবাদ বাঁধানোর চেষ্টা কিছু কম হয়নি, হিন্দি ফিল্ম থেকে ট্যাবলয়েডে স্টোরি– কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, দিদি-বোন একে অপরকে কাছে টেনে নিয়েছেন। যখন আশা গাইছেন ‘খালি হাত শাম আ আয়ি হ্যায়, খালি রাত জায়েগি’ বা ‘মেরা কুছ সামান, তুমহারে পাস পড়া হ্যায়’ গায়কীর মধ্যে যেন সাংলির ছেলেবেলা, দিদিকেই যেন ফিরে দেখছে জন্ম বেয়াড়া ছোটবোন।

জীবনে একবার আশাকে সামনে থেকে গাইতে শুনেছি। নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম। বয়স হয়ে গিয়েছে সুরসম্রাজ্ঞীর। তাও আরডি-র লেজেন্ডারি টিমের সঙ্গে গাইছেন দমকে। ‘ইজাজত’-এর গানটা গাইতে গিয়ে থামিয়ে দিলেন হঠাৎ। জমছে না। আঙুল তুলে বারণ করলেন কিছু বাজাতে। খালি গলায় ধরলেন, ‘ওহ রাত বুঝা দো, মেরা ওহ সামান লওটা দো’… বুকের ভেতর দিয়ে কী একটা কষ্টস্রোত ওঠানামা করছিল। খালি গলায় গানটা একসঙ্গে কত মুহূর্ত যে মনে পড়িয়ে দিল। নায়িকার গলার ফাঁসের মতোই চেপে বসছে বিষম স্মৃতিপাথর। নীরবতার কথাগুলো আলো হয়ে জ্বলে উঠছে অন্ধকারের হাতে হাতে। ‘একশো ষোলা চাঁদ কি রাতে’। ‘এক তুমহারে কান্ধে কা তিল’।
আমার অনুরাধা-বিকেল একটু একটু করে আমায় ছেড়ে যাচ্ছে কবেকার নিষ্ঠুর প্রত্যাখানে। ক্ষতির কাছেই যাবতীয় ঋণ আমার। তবু অবাধ্য মেয়েটাকেই তো ভালোবাসতে চেয়েছি চিরকাল, বলো।
…………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা
…………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved