
এত স্থান, অঞ্চল, পরিসরের পরে যে জ্বলজ্বল করে কিংবা ধুকপুক– তা হল হৃদয়। প্রেমের শ্রেষ্ঠ উপত্যকা। কুতুব মিনারে হাঁটছিলাম। বেজায় ভিড়। কাঠচাঁপা ফুলের দু’-তিনটি গাছ। একটি গাছের নীচে বসেছিল বছর বাইশের এক যুবক। কোলে মাথা রেখে একটি মেয়ে। পরনে বোরখা। কোনও কথা নেই। শুধু তাকিয়েছিল। কী ভীষণ সেই তাকিয়ে থাকা! ওরা যখন উঠে যাচ্ছে, দেখি পাথরের ওপরে লেখা: মরিয়ম+অঙ্কিত। পাশে একখানি হৃদয়। সেই হৃদয়ের ওপরে যখন ঝরে পড়ে কাঠচাঁপা ফুল, তখন আমি নিশ্চিত, ভারত হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত হবে না কোনও দিন।
ইচ্ছে হয়, একটা স্কুটার কিনি। সন্ধেবেলা, যখন অমৃতা প্রীতম দাঁড়িয়ে থাকবেন দিল্লির কোনও বাসস্টপে! সেই স্কুটার চালিয়ে হাজির হবেন ইমরোজ। পৌঁছে দেবেন ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র অফিস পর্যন্ত। অমৃতা কাঁধে আলতো হাত রাখবেন কি? জানি না। যা জানি, সেটা কবিতা। অমৃতা লিখবেন। বাড়ি ফিরে। খেয়ালে। বেখেয়ালে। অথবা, রেডিওর সান্ধ্য অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে। ‘আজনাবি, তুম মুঝে জিন্দেগি কি শাম মে কিউ মিলে/মিলনা থা তো দোপ্যাহের মে মিলতে…’ আর স্কুটার? ততক্ষণে প্রেমের রাজধানী।

উপলক্ষ যদি শুধুই প্রেম, অপাপবিদ্ধ আর উথালপাতাল– তবে একখানা স্কুটারও দিব্যি রোম্যান্টিক হটস্পট। তেমনই, হারবার্টের ছিল চিলছাদ। হাওড়া ব্রিজ, ভিক্টোরিয়ার চূড়ো– কিচ্ছুটি চোখে পড়েনি। সে কেবল দেখেছিল দু’-বাড়ি পরের একটা ছাদ। ছাদে ফ্রকপরা সেই মেয়ে! বুকি। সামান্য চিলছাদ, তবু একফালি প্রেমের অঞ্চল। কী গভীর! হারবার্ট আর হাতছানি দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকত বুকি। ছাদের পাঁচিলে হারবার্ট লিখছে, ‘ব’। পাথরে পাথর ঘষে। ‘ব’-এর ওপরে ঝরে পড়ছে নক্ষত্রের ওম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে…

কীভাবে সন্ধে নেমে আসে, টের পেয়েছিল সে। গড়ের মাঠে। শহর কলকাতার বিখ্যাত প্রেমের ময়দান। পাশেই ছিল প্রেমিকা। বিস্ময়ে সে দেখছিল, এই বিপুল আকাশের ব্রাইটনেস কেউ অল্প অল্প করে কমিয়ে দিচ্ছে। প্রেমিকা ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তত। তারপর? এক চুমুতে সন্ধে নেমেছিল। কতশতবার! ময়দানের ওপারে, যে রাস্তাটা যাচ্ছে ধর্মতলার দিকে, সেখানে বিন্দু বিন্দু আলোর স্রোত। অনিবার্যভাবেই মনে পড়েছিল, ‘ইটার্নাল সানশাইন অফ দ্য স্পটলেস মাইন্ড’। জমে বরফ হয়ে যাওয়া বিস্তৃত একটা লেকের ওপর দিয়ে হাঁটছে জোয়েল আর ক্লিমেন্টাইন। পা হড়কে যাচ্ছে দুজনেরই। জোয়েল ভয় পাচ্ছে। তারপর দুজনেই বরফের ওপর শুয়ে পড়ছে। ক্লিমেন্টাইন বলছে, ওই নক্ষত্রগুলোর নাম জানো তুমি? আমরা দেখছি, একেবারে টপশটে, জোয়েল আর ক্লিমেন্টাইন পাশাপাশি শুয়ে। বরফের জমিতে সূক্ষ্ণ সামান্য চিড়। ক্র্যাক। ফাটল। তবু ভেঙে যাচ্ছে না।

অতএব কী বুঝলেন মশাই? প্রেমের জন্য বাঁধাধরা স্থান বলে কিছু নেই। হতে পারে না। বোধহয় নিয়মও নেই তেমন। দুটো মানুষ শুধু তৈরি করে নেয় প্রেমের পরিসর। যেন প্রেমালু একটা আবরণ। হাজার রকম মানুষের ভিড়েও, ভীষণরকম ব্যক্তিগত। নিরালা। ঘন। অবশিষ্ট জগতের সঙ্গে সংযোগের ভাষাটিও কিঞ্চিৎ বদলে বদলে গেছে তখন। তা সম্ভব। রাস্তার ধারের কোনও চায়ের দোকানে। লাল রঙের মিছিলে। দূরপাল্লার ট্রেনের কামরায়। তবু প্রেম উদযাপনের জন্য, রোমিও আর জুলিয়েটের ম্যাজিক কিংবা শরীরে অপূর্ব কোনও আলোকচ্ছটা প্রথমবারের মতো টের পেতে, কেউ কেউ বেছে নেয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। মাথার ওপর আদিমকালের একটা পরি। পরির মায়া। অথবা, যে প্রেম-যুগল জাতে উঠছে, হারাচ্ছে চোখে ও কথায়, যেন এক মন্ত্রগুপ্তি– দু’-এক মুহূর্তেই ঘেঁটে দিচ্ছে দিনরাতের সমস্ত হিসেব! বেছে নিতে পারে, বাগবাজার ঘাট। কখনও-বা আউট্রাম ঘাট। রবীন্দ্র সরোবর। পার্ক স্ট্রিট অথবা ভবানীপুর সেমেটারি। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখছেন, ‘রুবি কখন আসবে’। রুথ স্টিফেনের কাঁচা কবরের পাশে বসে আছে রুবি। কাঁদছিল অঝোরে। বিল্বমঙ্গলের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে এক বছর পরে। কবরের পাশে ডালিম গাছ। হলুদ ফুল। আসলে দু’জনে প্রেমের কথাই বলে। যৌনতার কথা। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কথাও। আর বলে, এ-সমাজ প্রেমের যে প্যারামিটার নির্মাণ করে দিয়েছে, চাপিয়ে দিয়েছে নানাবিধ রেস্ট্রিকশন কিংবা গণ্ডি, সেগুলো তারা মানবে না। শেষবারের মতো অগ্রাহ্য করবে বিবাহ। ঠিক তারপরই সন্দীপন তৈরি করেছিলেন অতিলৌকিক দৃশ্যপট:
–শত শত মৃত মানুষকে সাক্ষী রেখে রুবি আমার কাছে জানতে চেয়েছিল, ‘তুমি কি অপেক্ষা করতে পারবে?’
–শত শত মৃত মানুষকে সাক্ষী রেখে আমি কথা দিয়েছিলাম, ‘হ্যাঁ’।
শহর থেকে এইবার একটু মফস্সলের দিকে যাই? নৈহাটি? হাসনাবাদ? চুঁচুড়া? তাহলে নিঝুম একটা স্টেশনই হয়ে ওঠে প্রেমের অঞ্চল। ছোট্ট একটা পার্ক, যার মধ্যিখানে একটা পচাপুকুর। অথবা, গঙ্গার বিস্তৃত দুই পাড়ে আশ্চর্য সমস্ত ঘাট। গঙ্গাজলের আলোবাতাস না-পেলে সমস্ত প্রেমই বোধহয় অপুষ্টিতে ভোগে। অপরিণত হয়ে, একসময় মরে যায়। জলের সাক্ষাৎ পেয়েছিল সেই ছেলেটাও। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের ওপরতলায়। প্রথম সারিতে বসে। যে মেয়েটি পাশে ছিল, তখনও সে প্রেমিকা নয়। মঞ্চে ছিল, ‘বুকঝিম এক ভালোবাসা’। নাটক শেষে, দু’জনেই বুঝতে পারে, দু’জনের ভেতরে বইতে শুরু করেছে ব্রহ্মপুত্র নদী। বাঁধ ভেঙে যাবে শিগগিরই। ছেলেটা এগিয়ে দেয় একটা রুমাল।

প্রেমের স্থান-মাহাত্ম্যের নির্দিষ্ট কোনও সংজ্ঞা নেই, হে পাঠক। মফস্সল ছাড়িয়ে আরেকটু গ্রামে পৌঁছলে, মাঠজোড়া নিষ্কলুষ সবুজ ধানখেতই প্রেমিকার শাড়ির মতো মনে হয়। সেখানে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল নেই, সাধের বাগবাজার ঘাট নেই, আছে একটা বাঁশের তৈরি মাচা। দূরবিনে শুধু ধরা পড়ে, মাচা থেকে ঝুলছে চারটে পা। কখনও দোলে। কখনও ঠোক্কর লাগে। পরক্ষণেই প্রগাঢ় হয়। কখনও প্রাচীন বটগাছের নীচে বসে থাকে তারা। হাতে হাত। যেন প্রত্নযুগের শিকড় ছড়িয়ে যায় এভাবেই। তখনও সাক্ষী ছিল একটা বিল। বাঁওড়। কিংবা খাল।
আসলে মানুষ-মানুষীর দৃষ্টি। সেগুলোই পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে ভালোবাসায়। তৈরি করছে অকল্পনীয় যত প্রেমের ক্ষেত্র। যেমন ওং কার ওয়াই। ‘ইন দ্য মুড ফর লাভ’ ছবিতে বলেছিলেন একটা উঠে যাওয়া সিঁড়ির কথা। যে সিঁড়ির মাথায় জ্বলে থাকবে হলুদ আলো। সেখানেই দু’জনের প্রত্যহ দেখা হবে। প্রেম হবে। পরবর্তী সময়ে, সেগুলোকেই আমরা আসলে বলব, প্রেমগলি। অন্ধকার। তবু নিষ্প্রাণ নয়। রাণা রায়চৌধুরীর একটি কবিতায় লিখবেন, “মন অ্যান্টি পোয়েট্রি খোঁজে/খোঁজে এ-গলি, ও-গলি/খোঁজে স্ট্রিটলাইট নিভে আছে এ রকম গণতান্ত্রিক পথ…” সেই গণতান্ত্রিক পথে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে সাইকেলে চেপে চলে যেতে পারে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে।

এত স্থান, অঞ্চল, পরিসরের পরে যে জ্বলজ্বল করে কিংবা ধুকপুক– তা হল হৃদয়। প্রেমের শ্রেষ্ঠ উপত্যকা। হৃদয়ে স্থান জুটলেই, প্রেম তবে সত্য। কুতুব মিনারে হাঁটছিলাম। এলোপাথাড়ি। রবিবার। বেজায় ভিড়। যেখানে ইলতুতমিসের কবর, সেখান থেকে অল্প হাঁটলেই কাঠচাঁপা ফুলের দু’-তিনটি গাছ। একটি গাছের নিচে বসেছিল বছর বাইশের এক যুবক। কোলে মাথা রেখে একটি মেয়ে। পরনে বোরখা। কোনও কথা নেই। শুধু তাকিয়েছিল। কী ভীষণ সেই তাকিয়ে থাকা! গোটা পৃথিবীটা থ মেরে গিয়েছে যেন! ওরা যখন উঠে যাচ্ছে, দেখি পাথরের ওপরে লেখা: মরিয়ম+অঙ্কিত। পাশে একখানি হৃদয়। সেই হৃদয়ের ওপরে যখন ঝরে পড়ে কাঠচাঁপা ফুল, তখন আমি নিশ্চিত, ভারত হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত হবে না কোনও দিন।
তাই, ইচ্ছে হয়, একটা স্কুটার কিনি। আপনাদের জন্য রেখে যাই, এ-লেখার শেষে।
……………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন রোদ্দুর মিত্র-র অন্যান্য লেখা
……………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved