Robbar

লীলাদিকে ‘রান্নার বই’ লিখতে বলেছিলাম আমিই

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 29, 2026 3:56 pm
  • Updated:January 29, 2026 3:59 pm  

লীলাদির বাড়ি গেলে উনি নিজের তৈরি নানারকম বিস্কুট আর এককাপ ওভালটিন খাইয়ে, বিভিন্ন গল্পগুজবে আমার সঙ্গে মেতে উঠতেন। প্রখর বুদ্ধি, ব্যক্তিত্ব ও কল্পনার ঝরনাধারায় আমি রোজই আপ্লুত হতাম– এ এক বিরল অভিজ্ঞতা। রাতে বাড়ি ফেরার তাড়ায়, সাড়ে আটটার মধ্যে নিজের হাতে তৈরি রকমারি জিভে-জল-আনা পদ না-খাইয়ে ছাড়তেন না। যে লীলাদির হাতের রান্না খেয়েছে, সে সারাজীবন তার অমৃত স্বাদ ভুলতে পারবে না।

অভিজিৎ বাগচী

১৯৬২ সালে আবার নতুন চেহারায় ‘সন্দেশ’ বেরল। তাই দেখে ছোটদের আনন্দের রেশ যেন কাটতেই চায় না! বিভাগ-বৈচিত্র ও সুললিত লেখার এক অদ্ভুত মিশেলে মনের জানলা খুলে গেল। ভাবনার বিশুদ্ধ আলো-বাতাসে মন মাতিয়ে, কল্পনার রঙিন জগৎ তাকে সাদরে বুকে জাপটে ধরলে– এ-ও এক প্রাপ্তি, বিরল অথচ শিশু-কিশোরদের কাছে পরম পাওয়া! বড়দের সঙ্গে ছোটরাও যে লিখতে পারে– তা একমাত্র সন্দেশেই সম্ভব (‘হাত পাকাবার আসর’– লেখা ও ছবি-সহ) ছাপার অক্ষরে শিশু-কিশোররা নিজেদের নাম দেখে খুশিতে ডগমগ হয়ে, এক অপার বিস্ময়ে মেতে উঠল। ছোটদের মাসিকপত্র অনেকরকম বেরিয়েছে, কিন্তু সেগুলো গড়পড়তা ধারণার বশবর্তী বলে ছোটদের ঠিক ‘আপনজন’ হয়ে উঠতে পারেনি। এখানেই এই ব‌্যতিক্রমী ভাবনার জন্য সন্দেশ-এর সম্পাদক-সম্পাদিকার দান অভাবনীয়। বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিশু সাহিত্যিক লীলা মজুমদারের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এ সম্ভব হত না।

লীলা মজুমদারের সঙ্গে আমার আলাপ খুব ছোট্টবেলায়। তিনি আমাকে ভালোবাসতেন ছেলের মতো। চৌরঙ্গী আর পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে এক বিরাট ম্যানসানের দোতলার ডানদিকের ফ্ল্যাটে প্রতি মাসে দু’-একবার যেতেই হত। ডেকে পাঠাতেন। নানা কথা উঠত। আমার নতুন লেখা নিয়ে নিজের কাছে রাখতেন। সবটা খুঁটিয়ে পড়ে তাঁর মতামত সেই পাণ্ডুলিপির বাঁদিকের মাথায় লিখে দিতেন। বানানও অন্য কালিতে ঠিক করে দিতেন। ছোটদের জন্য আমার ভাবনা ও বিষয় নির্বাচনের অভিনবত্বকে উনি খুবই পছন্দ করতেন। দীর্ঘ আলাপচারিতায় সান্নিধ্যে যখন বড় হয়েছি তখন উনি ওঁর লেখার সম্পর্কে আমার সাবলীল মতামতকে কেন জানি না, ভীষণ গুরুত্ব দিতেন। এ-ও আমার কাছে এক পরম পাওয়া, জীবনে এর ঋণ কখনও শোধ হবে না। বিভিন্ন সাহিত‌্য সেমিনারে উনি আমাকে নিয়ে গিয়েছেন, কত আলোচনা শুনেছি, কতটা ওই বয়সে বুঝেছি, জানি না। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে শুনতাম বলে তখনই অনেক কিছুই মনে দাগ কেটে গিয়েছিল।

লীলা মজুমদার

লীলাদির বাড়ি গেলে উনি নিজের তৈরি নানারকম বিস্কুট আর এককাপ ওভালটিন খাইয়ে, বিভিন্ন গল্পগুজবে আমার সঙ্গে মেতে উঠতেন। প্রখর বুদ্ধি, ব্যক্তিত্ব ও কল্পনার ঝরনাধারায় আমি রোজই আপ্লুত হতাম– এ এক বিরল অভিজ্ঞতা। রাতে বাড়ি ফেরার তাড়ায়, সাড়ে আটটার মধ্যে নিজের হাতে তৈরি রকমারি জিভে-জল-আনা পদ না-খাইয়ে ছাড়তেন না। যে লীলাদির হাতের রান্না খেয়েছে, সে সারাজীবন তার অমৃত স্বাদ ভুলতে পারবে না।

আমি প্রায়ই বলতাম, লীলাদি আপনি রান্নার ওপর একটা বই তো লিখতে পারেন! নানা কাজের চাপে উনি তখন না-লিখতে পারলেও, পরে, ১৯৭৯ সালে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে ‘রান্নার বই’ তাঁর মেয়ের সঙ্গে লেখেন। জনপ্রিয়তার নিরিখে এ আমার নয়, সমস্ত বাঙালি জাতির গর্ব ও বিশেষ প্রাপ্তি।

এই বইয়ের ভূমিকায় লীলাদিকে স্মরণ করি–
‘খেতে যখন হবেই তখন ভাল করে খাওয়া যাক না। ভাল করে খাওয়া মানেই এমন খাওয়া যার স্বাদ ভাল, দেখতে ভাল, বেশি পুষ্টিকর, সহজে ও কম সময়ে, কম খরচে রাঁধা যায়। আমাদের মতো প্রত্যেক পরিবার যদি এ রকম খাওয়া দিনে একবার, বোধহয় রাতে হলেই সম্ভব হয়– সকলে মিলে একসঙ্গে বসে হয়, তাহলে এমন একটা কোমল ও আন্তরিকতায় পরিবেশ তৈরি হয়, যার ফলে অনেক পারিবারিক সমস‌্যা মিটে যায়, তিক্ততা জমবার সময় পায় না।’

লীলাদির বুড়ি আয়া আমোদিনী ঘোষ ওঁকে কিছু রান্না শিখিয়েছিলেন। তাঁর কথাও উনি এই বইতে সযত্নে উল্লেখ করেছেন। এই রান্নাকে উনি বলতেন ‘দুঃখীর খাওয়া।’

একটা উদাহরণ দিই:

আমোদিনীর বড়া ও চাটনি
‘কী কী লাগবে ও কীভাবে হবে– আমোদিনী বলত, কাঁচকলাকে ঘেন্না করনি। অমনি ভাল করে ধুয়ে, খোসাসুদ্ধ চাকা চাকা করে কেটে হলুদ গোলা জলে সেদ্ধ করে নাও। সেদ্ধ হলে খোসা আর শাঁস আলাদা করে ফেল। খানিকটা তেঁতুল গোলায় একটু নুন, একটু শুকনো লঙ্কা বাটা, একটু আখের গুড় গুলে রাখো। তারপর কড়াইতে একপলা তেল দিয়ে পাঁচফোড়ন ছাড়া সুগন্ধ বেরুলে কাঁচকলার শাঁসটি ছেড়ে, দুবার নেড়ে, তেঁতুল গোলাটি দিয়ে নেড়েচেড়ে নাবাও। এই দিয়েই দুঃখী মানুষ একথালা ভাত খেয়ে ফেলে।

আর খোসাটার বাইরের শক্ত অংশটি ছাড়িয়ে ফেলে, চটকে নিয়ে নুন, কাঁচালঙ্কা, একটুখানি চালবাটা দিয়ে এক পলা তেলে ভেজে তুলত আমোদিনী। কোনও জিনিস ফেলতে চাইত না।’

‘রান্নার বই’য়ের মধ্যে পুরোপুরি সাবেকিয়ানার ছোঁয়া, ইউরোপীয় অধুনা কন্টিনেন্টাল রান্নারও বিশদ বিবরণ আমরা দেখতে পাই। এর বৈশিষ্টগুলো পরপর সাজালে এমনটা হয়:
(১) নিছক প্রণালি দিয়ে দায়সারা না করে, হাতে কলমে নিজে সেই সেই পদগুলো রান্না করে খেয়ে, তবে লেখা।
(২) রোজকার রান্নার নাম ধরে ধরে নানা পদের খুঁটিনাটি আলোচনা করে সেগুলোর হদিশ জানানো।
(৩) দেশজ ঘাঁটি মশলার ব‌্যবহার।
(৪) অসম্ভব পরিমিতি বোধ ও অযথা খরচ না-বাড়ানো।
(৫) হাতের কাছের উপকরণের উপর জোর দেওয়া।
(৬) সুস্বাদু ও স্বাস্থ‌্যকর পাক-প্রণালির ঠিকানা।
(৭) ছোটদের থেকে বড়দের জন্য রান্না নিয়ে বর্ণনা।
(৮) স্বাদ ও পুষ্টিগুণের কথা প্রত‌্যক্ষভাবে সাজিয়ে দেওয়া।
(৯) সাবেকি রান্নার পূর্ণ-মূল‌্যায়ন করা।
(১০) ভাল রাঁধুনি হওয়ার চেষ্টায় সুলভ উপকরণে নিজেকে প্রস্তুত করা ইত‌্যাদি।

ফিরে আসি, লীলাদির কথায়, ‘আমাদের দেশের মা-মেয়েদের এই বই দিলাম এই আশাতে যে, যে, তাঁরা নিজেরা বাড়িতে বসে পৃথিবীর একটা সেরা শিল্প-কর্মের সাধনা করছেন।’

পরিশেষে লিখেছেন ‘রান্নার বইয়ের এই নতুন নিবেদন আশা করি পাঠিকার, এমনকী, পাঠকেরও পছন্দ হবে। আজকের এই দৌড়-ঝাঁপ জীবনযাত্রায় যদি আমরা এতটুকু সময় ব অর্থের সাশ্রয় করে নিতে পারি তা হলে দেখব ব্যতিব‌্যস্ত জীবনেও কোথা থেকে যেন এসেছে এক ঝলক ফুর্তি, এক পল সোয়াস্তি।’

আমার মনে হয় বাংলা ভাষায় সচরাচর রান্নার চেয়ে রোগীর পথ্যের উদাহরণ খুব একটা পাওয়া যায় না। অথচ জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে রোগীর পথ্য সম্পর্কে তথ্য জানাটা অত্যন্ত দরকারি।

লীলাদি আমার ছড়াকে খুব পছন্দ করতেন। বেছে বেছে দরকারিগুলো ওঁর কাছে রেখে বাকিটা আমায় দিয়ে দিতেন। উদাহরণ হিসেবে ওটা খুব পুরনো হলেও, প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করলাম:

‘বাঙালিরা পাঁঠা হয়, রোববার হলে
দাপাদাপি লাঠালাঠি, বগলেতে থলে।
মাংসের ভেদাভেদ, কচি কিবা খাসি
মাটনের খুশবুতে, মুখে খালি হাসি।’

 … পড়ুন উপাদেয় বই …

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়: শ্যামল গাঙ্গুলির দেখা একেকটা বাজার আসলে একেকখানা উপন্যাস