
গোটা ভারতবর্ষ যে-বাংলার ছানাকে ‘অপবিত্র’, ‘মৃতদুগ্ধ’ বলে অচ্ছুৎ করে রেখেছিল, সেই ছানা কীভাবে দেবভোগ্য হল! অসম্ভবকে সম্ভব করলেন যে-মহাপুরুষ তিনি হলে বাংলার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। পুরীর রাজা প্রতাপরুদ্রদেব শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপালাভ করে মহাপ্রভুতেই নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। গৌর-কৃপাধন্য রাজা মহাপ্রভুর তিরোধানের পর ৭ বছর রাজত্ব করেছিলেন। মহাপ্রভু পুরীতে ছিলেন ১৮ বছর এবং পরের ৭ বছর মোট ২৫ বছর ধরে মহারাজ পুরীর মূল মন্দিরে রাজভোগ হিসেবে ‘ছানা’কে জুড়ে দিয়েছিলেন, কারণ তাঁর প্রাণের ঠাকুর শ্রীচৈতন্যর প্রিয় ছিল ছানা ও ছানার মিষ্টান্ন এবং রান্নাতেও ছিল ছানার পদ।
গরুর দুধ গোটা ভারতে পবিত্র। বৈদিক যুগে গো-দুগ্ধে যে পায়েস হত, তার পরিচয় ছিল ‘চরু’ নামে। সোমযজ্ঞে এই চরুর অধিকারী হলেন দেবী অদিতি। ঋগ্বেদের যুগে অদিতিকে বলা হল ‘বিশ্বে দেবাঃ’ অর্থাৎ সর্বদেবতা স্বরূপিণী।
দেবতারা এক সময় বর দিয়েছিলেন– ‘অদিতিকে নিয়েই যজ্ঞ আরম্ভ করতে হবে।’ সেই থেকে সোমযজ্ঞের আরম্ভে অদিতিকে উদ্দেশ্য করেই যজ্ঞের শুরু, যখন পৃথিবীতে যজ্ঞ করার অধিকার দেওয়া হল, তখন যজ্ঞ থেকে অদিতিকে বাদ দেওয়া হল। তখন অভিমানী অদিতি দেবতাদের সঙ্গ ত্যাগ করেন। মর্তে যজ্ঞে কোনও ফললাভ হচ্ছে না, কারণ ‘অদিতি’ নেই। সমস্যা হল, দেবতারা অদিতিকে বলতে পারছেন না– মর্তে তোমাকে যজ্ঞ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণ’-এ (২/১) দেখা যাচ্ছে, দেবতারা অদিতিকে বলেন, তোমার প্রসাদে আমরা যজ্ঞের বিষয়টি প্রকৃষ্টরূপে জানতে চাই। অদিতি বললেন, ‘ভালো কথা, তবে যজ্ঞের সব বিষয়টি বলব; তবে পৃথিবীতে সমস্ত যজ্ঞই আমাকে নিয়ে আরম্ভ হবে এবং আমাকে দিয়েই শেষ হবে।’ দেবগণ বললেন, ‘তা-ই হবে।’
এই বরের কারণে যজ্ঞের চরু, অর্থাৎ পায়েস যজ্ঞে দু’ভাগে ব্যবহৃত হল– ‘প্রার্থনায় চরু’ অর্থে যজ্ঞ শুরুর চরু এবং ‘ঔদরনীয় চরু’ অর্থে যজ্ঞ সমাপ্তির চরু। দুই ভাগের চরুই অদিতির অংশরূপে স্বীকৃতি পেল।
‘চরু’ অর্থাৎ পায়েস করতে গেলে দুধের প্রয়োজন। ঋগ্বেদে (৮/১০০/১৫) অদিতিকে একটি গাভীরূপে কল্পনা করা হয়েছে–‘অদিতি রুদ্রদের মাতা, বসুদের দুহিতা, আদিত্যদের ভগিনী, অমৃতের আবাস স্থল, অপাপবিদ্ধ জ্যোতিষ্মতী গাভী, তাঁকে হিংসা করো না।’ অন্য একটি ঋকে ‘অদিতি ধেনু, যজ্ঞের জন্য দুগ্ধবতী হোক’– বলা হয়েছে।
বৈদিক যুগ থেকেই দুধের ব্যবহার দেখা যায়। বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার অন্যতম এক রত্ন অমরসিংহ তাঁর ‘অমরকোষ’ অভিধানে (বৈশ্যবর্গ ২/১৪৬) দুগ্ধের নাম প্রসঙ্গে ‘দুগ্ধ, ক্ষীর, পয়স’ বলে উল্লেখ করেছেন। দুধে একফোঁটা জল না-মেশালেও দুধের শরীরে জল রয়েছে। দুধকে জ্বাল দিয়ে ঘন করলে অর্থাৎ জলীয় অংশ সরে গেলে যে সার পদার্থ পাওয়া যায়, তাকে ‘ক্ষীর’ বলা হয়। ওই অমরকোষেই (নানার্থবর্গ: ৩/৫৫৮) অন্যত্র ‘ক্ষীর’ অর্থে দুগ্ধ ও জল– দুটো-ই বলা হয়েছে। দুধের নিজস্ব সার-দুগ্ধই (দুধের মধ্যে যে জল থাকে), তা নিয়েই খাঁটি ক্ষীর-দুগ্ধ।
উষ্ণ দুধে দই যোগ করলে তাকে ‘আমিক্ষা’ বলা হয়। অমরকোষে টীকায় ‘আমিক্ষা’-র কথায় লেখা হয়েছে ‘আমিক্ষেতি’। ‘শ্বতে আবর্ত্তিতে উষ্ণে ক্ষীরে দধিযোগতো যা বিকৃতিঃ সা আমিক্ষা।’ এই লেখা থেকে পরিষ্কার– গরম দুধে দধি সংযুক্ত হলে দুধ বিকৃতি হয়ে যা তৈরি হয় তার নাম আমিক্ষা। বাংলায় এই ‘বিকৃত’ চেহারা পাওয়া দুধের শ্বেতাংশকে বলা হয় ‘ছানা’।

ছানার আর একটি সংস্কৃত নাম হল ‘কিলাট’– ‘নষ্ট দুগ্ধস্য পক্বস্য পিণ্ডঃ প্রোক্তঃ কিলাটকঃ।’ অর্থাৎ পক্ব (জ্বাল দেওয়া দুধ) নষ্ট দুগ্ধের পিণ্ডকে ‘কিলাট’ বলে। পিণ্ডাকৃতি হয় বলেই এর অন্যতম নাম ‘কিলাট’।
সংস্কৃতে ছানার আর একটি নাম রয়েছে ‘কূর্চ্চি’ বা ‘কূর্চ্চিকা’। অমরকোষে (বৈশ্যবর্গ ২/১২২) লেখা হয়েছে ‘কূর্চ্চিকা ক্ষীরবিকৃতি’। দুধ বিকৃতি রূপ পেয়ে নাম হয়েছে ‘কূর্চ্চিকা’। ছানার আরও একটা নাম আছে– ‘পক্বং দধ্নাসমং ক্ষীর বিজ্ঞেয়া দধিকূর্চ্চিকা’– দধির সহিত দুগ্ধ পক্ব হলে যে ক্ষীরবিকার তৈরি হয় তার নাম ‘দধি-কূর্চ্চিকা’।
প্রাচীন ভারতে ‘ছানা’ নামটির পরিচয় ছিল না, দুগ্ধ বিকৃতি রূপ দিয়ে ওই দুধের শ্বেতপিণ্ডকে সংস্কৃতে পাওয়া গেল তিনটি নাম– ১. আমিক্ষা, ২. কিলাট, ৩. কূর্চ্চিকা বা দধিকূর্চ্চিকা। বিক্রমাদিত্যের সময়কাল থেকে বাংলা ছাড়া ভারতবর্ষে নষ্টদুধের পিণ্ড বলে কোনও রাজ্যের মানুষই ছানা নিজেরা খেত না। শুধু তা-ই নয়, মৃত দুগ্ধ বলে ছানাকে বাতিল করা হয়েছিল। ছানার তৈরি কোনও মিষ্টান্নাদি দেবতার পূজায় দেওয়া হত না। বৈদিক যুগে গোদুগ্ধকে ‘হোমদ্রব্য’ বলে শ্রদ্ধা করা হত। এই দুগ্ধ যদি কোনওরূপ দোষযুক্ত হয় (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৫/২৫/২) অথবা দুগ্ধ পাকের সময় যদি অশুদ্ধ হয় (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৭/৩২/৩) তাহলে সেই দুধ দেবতার পূজায় দেওয়া যায় না। এই কারণে প্রাচীন ভারতবর্ষে অশুদ্ধ বা দোষযুক্ত দুগ্ধরূপ ছানাকে দেবতার ভোগে নিবেদন করা হয়নি।
বাংলা ছাড়া ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মন্দিরে মন্দিরে ক্ষীরের সন্দেশ দিয়ে পুজো হয়– এর পরিচয় ‘প্যাড়া’ সন্দেশ নামে। মিষ্টিরূপ ক্ষীরের নাম কিন্তু ‘প্যাড়া’ নয়। অমরকোষ অভিধান মতে (শূদ্রবর্গ ২/৭৮)– বেত্রাদি নির্মিত ঝাঁপীর নাম ‘প্যাড়া’ বা ‘পেড়া’। বেতের তৈরি ঝাঁপিতে ক্ষীরের শুকনো মিষ্টি রেখে ফুল ইত্যাদি পুজোর উপকরণ সাজিয়ে ভক্তের হাতে দেওয়া হয়, সেই ঝাঁপির অর্থাৎ প্যাড়ার নামেই মিষ্টির নাম হয়ে যায় প্যাড়া।
বাংলার ‘ছানা’ শব্দটি মূল সংস্কৃত থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। সংস্কৃত ‘ছিন্ন’ শব্দেই ‘ছানা’ শব্দের মূল। যেমন চিহ্ন শব্দ থেকে ‘চেনা’ শব্দটি এসেছে, তেমনই ‘ছিন্ন’ থেকে ‘ছেনা’ বা ‘ছানা’ তৈরি হয়েছে। দুধ ছিঁড়ে যায় বলে ‘ছানা’ নাম। কিন্তু সংস্কৃতে ‘ছানা’ অর্থবাচক ‘ছিন্ন’ বলে কোনও শব্দ নেই, সংস্কৃত ‘ছিন্ন’ শব্দের অর্থ ‘ছেঁড়া’ এবং দুধ ছিঁড়ে গিয়ে ছানা হয় বলেই আমরা সংস্কৃত ‘ছিন্ন’ শব্দকে এই অর্থে ব্যবহার করে আসছি।
বাংলা ভাষায় ‘ছানা’ শব্দে যে ‘শাবক’ বোঝায়, তার মূলে ওই সংস্কৃত ‘ছিন্ন’ শব্দ। মায়ের সঙ্গে সন্তানের নাড়ির সম্পর্ক। নাড়ি ছিন্ন করে বা কেটে সন্তানকে আলাদা করা হয়, তাই এখনও গ্রাম বাংলায় ছেলেপুলেদের ‘ছানা-পোনা’ বলা হয়।
‘ছানা’ নামকরণ নিয়ে আর একটি মত রয়েছে। এই মতানুসারে, গরম দুধকে টক দই সংযোগে জল এবং সাদা সারাংশ আলাদা হয়ে যায়– তখন বাংলার মিষ্টান্ন শিল্পীরা সাদা সুতির কাপড়ের হালকা পাতলা টুকরোতে ‘ছেনে’ জল থেকে পিণ্ডকার শ্বেতাংশ বস্তুকে তুলে জলহীন করে নেয় বলে এর নাম ‘ছেনা’ বা ‘ছানা’ হয়েছে। ‘ছানা’ শব্দটি অবশ্যই বাংলার নিজস্ব শব্দ।
গোটা ভারতবর্ষ যে-বাংলার ছানাকে ‘অপবিত্র’, ‘মৃতদুগ্ধ’ বলে অচ্ছুৎ করে রেখেছিল, সেই ছানা কীভাবে দেবভোগ্য হল! অসম্ভবকে সম্ভব করলেন যে-মহাপুরুষ তিনি হলে বাংলার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে মহাপ্রভুর আবির্ভাব হয়– ‘শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নবদ্বীপে অবতরি।/আটচল্লিশ বৎসর প্রকট বিহারী।’ ৪৮ বছরের জীবনের ২৪ বছর ছিলেন সংসারে, ২৪ বছর সন্ন্যাসে। সন্ন্যাসের ২৪ বছরের মধ্যে আবার ১৮ বছরই ছিলেন পুরীতে– ‘অষ্টাদশবর্ষ কেবল নীলাচলে স্থিতি।’ পুরীর রাজা প্রতাপরুদ্রদেব শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপালাভ করে মহাপ্রভুতেই নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। গৌর-কৃপাধন্য রাজা মহাপ্রভুর তিরোধানের পর ৭ বছর রাজত্ব করেছিলেন। মহাপ্রভু পুরীতে ছিলেন ১৮ বছর এবং পরের ৭ বছর মোট ২৫ বছর ধরে মহারাজ পুরীর মূল মন্দিরে রাজভোগ হিসেবে ‘ছানা’কে জুড়ে দিয়েছিলেন, কারণ তাঁর প্রাণের ঠাকুর শ্রীচৈতন্যর প্রিয় ছিল ছানা ও ছানার মিষ্টান্ন এবং রান্নাতেও ছিল ছানার পদ।
রাজার কাছে ভগবান জগন্নাথ, শ্রীকৃষ্ণ এবং চৈতন্য মহাপ্রভু– এই তিন রূপের এক মিলিত রূপের নাম শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য। প্রভু জগন্নাথ এবং শ্রীকৃষ্ণকে ভোগ নিবেদন করে মহাপ্রভুকে প্রসাদ গ্রহণ করার বিষয়টিকে ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ গ্রন্থে (অন্তলীলা) লেখা হয়েছে:
জগন্নাথের ভিন্ন ভোগ কতক বাড়িল।
চৈতন্য প্রভুর লাগি আর ভোগ কৈল।।
ইষ্টদেব নৃসিংহ লাগি পৃথক বাড়িল।
তিনজনে সমর্পিয়া বাহিরে ধ্যান কৈল।।
দেখি শীঘ্র আসি বসিলা চৈতন্য গোসাঞি।
তিনভোগ খাইল কিছু অবশিষ্ট নাই।।
স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য গাসাঞি।
জগন্নাথ নৃসিংহসহ কিছু ভেদ নাই।।
এই ভক্তি ও বিশ্বাসে মহারাজা পুরীর মন্দিরে রাজভোগে যুক্ত করলেন মহাপ্রভুর ছানা। এভাবেই জগন্নাথদেবের ‘বরাতি ভোগ’-এ ‘ছেনা-চটকা’, ‘ছেনা-মন্ডা’– সন্ধ্যাধূপের ভোগে যে ‘রসাবলি’ মিষ্টান্নটি দেওয়া হয়– তা দুধ ও ছানার তৈরি। ‘বলগণ্ডি’-ভোগে ‘ছেনা’, ‘ছানার বড়া’ প্রভৃতি মহাপ্রভুর সময়কাল থেকে পুরীর মন্দিরে প্রবেশাধিকার পায়।
এই সময় থেকে ছানা বা ছানার মিষ্টি দ্রব্যাদি সর্বজনীন হয়ে গেল। ছানা দেবভোগ্য হল অবশ্যই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্যই– একথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved