Robbar

ভালোবাসিকরণ, ভালো বশীকরণ!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 12, 2026 3:08 pm
  • Updated:February 12, 2026 3:46 pm  

এবার ভাবা দরকার, প্রেমে বশ করতে চেয়েছে কারা? আর তাতে হচ্ছেই বা কারা? আমার ধারণা, এই চাওয়া তাদেরই, যারা নিজেরা নিজেদের ঠিক করে ভালোবাসেনি। কারণ নিজেকে ভালোবাসেনি বলেই চেয়েছে কেউ এসে ওকে ভালোবেসে দিক। নিজের হয়েও দিক আর ওর হয়েও দিক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমায় আমার মতো ভালোবাসতে গেলে যদি অপর প্রান্তের মানুষটিকে ঘোমটা নামিয়ে বা আড্ডা থামিয়ে রাখতে হয়, তাহলে কপালে দুঃখ আছে।

শিলাদিত্য চ্যাটার্জি

‘প্রেমে বশীকরণ! নিজের পছন্দের মানুষকে পেতে হলে যোগাযোগ করুন… 9830…’

তারপরের সংখ্যাগুলো আমার জানা নেই। কারণ অফিসের উল্টোদিকের থামে সাঁটা পোস্টার ছিঁড়ে গিয়েছিল। অদ্ভুতভাবে এইসব পোস্টার জম্মে গোটা পিস দেখলাম না! কে বা কারা যে এই পোস্টার ছিঁড়ে বেড়ায়, তা এক জটিল প্রশ্ন! কিন্তু তার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হল– ভাগ্যের শিকে কি ছিঁড়েছিল কোনও দিন কারওর এই নম্বরে ফোন করে? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন এই নম্বরে কি কোনও দিন ফোন গিয়েছে আদৌ? গিয়ে থাকলে কেন গিয়েছে? কেন-র চেয়েও বেশি জরুরি– কারা করেছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: যে অন্যকে প্রেমে বশ কর‍তে পারে সে কি এই মন্ত্র নিজের জীবনে ব্যবহার করেনি? না কি করতে পারেনি? তার কারণ ইতিহাস সাক্ষী আছে, অন্যের প্রেমে সাহায্য করতে সেই সলমানেরাই গিয়েছে যাদের জীবনে ক্যাটরিনা জোটেনি।

এই সমস্ত প্রশ্ন আমাদের মাথাতে আসে। আমরা কারা? না আমরা তারা নই! আমরা মানে, আমার মতো কাঠ সিঙ্গল যারা, মানে যারা রাত তিনটের সময় জেগে প্রেমের মরশুমে প্রেম নিয়েই ফরমায়েশি লেখা লিখছে, তার কারণ যাকে দু’দিন আগে গানের লিংক পাঠিয়ে লিখেছিলাম, ‘শুনে জানাস!’, সে সিন করে রেখে দিয়েছে। এবার প্রশ্ন এলেই তো হল না, প্রকৃত সিঙ্গল যদি প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণে ওভার থিংকিং না-ই করল, তাহলে সে কীসের সিঙ্গল। তো আসুন একসঙ্গে ভাবা যাক। আশা করছি, আপনিও সিঙ্গল, কারণ না হলে আমার লেখা পুরোটা পড়বেন বলে ভাববেনই বা কেন? আর যদি সিঙ্গল না-ও হন, সত্যান্বেষণের স্বার্থে ধরা যাক আপনিও আগামী ২ মিনিট তাদেরই দলে, বারবার মরে যায় যারা…!

প্রথমে ভাবা যাক, সত্যিই যদি প্রেমে বশ করা যেত বা যায় তাহলে কি তা আদৌ প্রেম? কারণ প্রেমের আসল ক্ষীরটাই তো মতের অমিলে। স্থান-কাল-সীমানা ভেদে যাকে মনোমালিন্য, বাদানুবাদ, বাওয়াল, ক্যাচাল, কিচাইন, ক্যাচড়া বলে ডাকা হয়েছে। এবার এই যাবতীয় যা, তা না থাকলে মনে হবে রোববার দুপুরে কেউ সবজিসিদ্ধ খেতে দিয়েছে নুন ছাড়া। নুনহীন সেদ্ধ খাবার শরীরের পক্ষে ভালো হলেও মনের পক্ষে তো না! তাই অসন্তোষ প্রয়োজন। একদম মাত্রা মেপে। কিন্তু প্রয়োজন। টারবুলেন্স কাটিয়ে ফ্লাইট নরমাল অবস্থায় এলে যেমন নিজের জীবনের প্রতি মায়া বেড়ে যায় তেমনই সম্পর্কেও টারবুলেন্স না থাকলে প্রেম মরে যায়। ঝঞ্ঝা-পরবর্তী প্রেমের তাই বিশেষত্ব আলাদা। তা কেবল সুন্দর না, বাটারস্কচীয় সুন্দর! আর যেসব গল্পে এই ঝঞ্ঝা নেই তারা আসলে প্রত্যেকে সুপ্ত আগ্নেয়গিরি পুষে রেখেছে মনের গভীরে। জানবেন যেদিন ফাটবে, সেদিন সবার ফাটবে। তাই হয়তো কোনও এক ইন্টারভিউতে এক বাঙালি পরিচালক বলেছিলেন, ‘যাদের পড়ার টেবিল খুব গোছানো থাকে তাদের জানবেন ড্রয়ার ভর্তি জঞ্জাল!’

এবার ভাবা দরকার। বশ করার আদতে দরকার হয় কেন? প্রেম, যা না কি মনকে অবশ করে দেয় তাকে বশে আনার চেয়ে কষ্টের আর কী-ই বা হতে পারে! কিন্তু এই বশে আনার কারণ আদতে কী? আমার ধারণা আমাদের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বশ হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। বা হালফিলের ভাষায় ‘ট্রেন্ড’। কিন্তু বশ্যতা কি বরাবরই ট্রেন্ডিং ছিল না? হয়তো ছিল, কিন্তু এমন ছিল না। মনে আছে, ছোটবেলায় বাবা মজা করে ধাঁধা জিজ্ঞেস করত,
‘বলো তো,
পৃথিবীটা কার বশে?’
আমি বোকার মতো ভুলভাল উত্তর দিয়ে শেষে হার স্বীকার করলে বাবা বলত,
‘প্রশ্নের মধ্যেই তো উত্তর,
পৃথিবী টাকার বশে!’

কিন্তু এই পৃথিবী টাকার বশে নেই। আমরা প্রত্যেকে এই মুহূর্তে যার বশ্যতা স্বীকার করেছি তার নাম ‘মেটা’। সেই মেটার জনক যার নীলরঙা সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে বসে আমার এই অপ্রয়োজনীয় লেখা আপনি পড়ছেন। তারই অন্য এক প্ল্যাটফর্ম জুড়ে অনবরত মানুষ একে-অপরকে ঠকিয়ে চলেছে যে, তারা ভালো আছে বাকিদের চেয়ে। তাই ঝিরঝিরে টিভি দেখে মনমরা হয়ে বড় হওয়া এক প্রজন্ম বুঝে উঠতে পারছে না এত রং নিয়ে তারা কী করবে? তাই এই বশ্যতা স্বীকার করা ছাড়া উপায় থাকছে না। কিন্তু মজা হল, টাকা হোক আর মেটা– বিভিন্ন সময়কালে এই পৃথিবী চালানো সব বিলিয়নয়েরাই জানে বশ করার আসল চাবিকাঠি হল মানুষকে এই ভ্রান্ত ধারণায় বিশ্বাস করানো যে, আসলে ‘তুমিই বস!’ ক্ষমতাহীন মানুষদের ভুলিয়ে রাখার লজেন্সের নাম ‘এস্থেটিক’। তাই একদল মানুষ মেতে আছে সেই এস্থেটিকের খেলায়। সেই খেলা মানুষকে শেখায়, ঝগড়াও হোক, কিন্তু হলুদ আলো জ্বালিয়ে। অভিমানেরও বিজিএম থাকুক শুভা মুদগলের কণ্ঠে। লোকসমাজে কেউ যেন না বোঝে– দু’জন মানুষ রোজ রাতে আস্তে আস্তে একে অপরের থেকে মাইল খানেক দূরে চলে যাচ্ছে এক বিছানায় শুয়েও। তাই সবাই রিল স্ক্রল করতে কর‍তে মিথ্যে আশ্বাস নিয়ে ঘুমোচ্ছে। ইন্সটা বলছে, ‘ডোন্ট ওয়ারি, এভরিথিং আন্ডার কন্ট্রোল…’। শেষের ‘অফ মাইন’টা ‘ইতি গজ’ হয়ে ভেসে যাচ্ছে ক্লাউডে!

এবার ভাবা দরকার, প্রেমে বশ করতে চেয়েছে কারা? আর তাতে হচ্ছেই বা কারা? আমার ধারণা, এই চাওয়া তাদেরই, যারা নিজেরা নিজেদের ঠিক করে ভালোবাসেনি। কারণ নিজেকে ভালোবাসেনি বলেই চেয়েছে কেউ এসে ওকে ভালোবেসে দিক। নিজের হয়েও দিক আর ওর হয়েও দিক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমায় আমার মতো ভালোবাসতে গেলে যদি অপর প্রান্তের মানুষটিকে ঘোমটা নামিয়ে বা আড্ডা থামিয়ে রাখতে হয়, তাহলে কপালে দুঃখ আছে। কপালে দুঃখ তারও যে বশবর্তী হল। কারণ সে জম্মভোর এত ইমোশনাল লাথিঝ্যাঁটা খেয়েছে যে, তার জন্য গ্যাস আর লাইট– দুটো স্বতন্ত্র শব্দই নয় আর। তাই তার সঙ্গে মানুষের মতো ব্যবহার করলেই সে বাতাসে ভায়োলিন শুনতে পায়। তাই সে নিজের অজান্তে অপর প্রান্তের মানুষকে দিয়ে দেয় তার জীবনের রিমোট। ব্যাস, সেখানেই কবি কেঁদেকেটে একসা করেন। আসলে একদিন না একদিন তো বশবর্তীরও টনক নড়ে, এ জন্মে হোক বা পরজন্মে। তখন সে চুক্তি থেকে মুক্তি চায়। কিন্তু চুক্তি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আটকে রাখে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই চুক্তির নাম, ‘লোকে কি বলবে!’ আর কতিপয় যারা সেই চুক্তি ছিঁড়ে ফেলে বেরিয়ে আসে, তারাই বুঝতে পারে যে বশ করা প্রেমে বাস করা যায় না। তাই তারা তারপর থেকে কারওর মন জোগাতে নিজের ড্রেসিং চয়েস পালটায় না। কারওর হৃদয় পেতে নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়ে আইফোন কেনে না। কারওর কথায় শাহরুখ খান-কে ওভাররেটেড বলে না। কিন্তু তার প্রিয় মানুষের বিলিভ সিস্টেমকেও সে মান্যতা দেয়। কারণ সে মুক্তি পেয়ে বুঝতে পারে যে সবার শৈশব আলাদা, তাই সবার বেঁচে থাকাটাও আলাদা। তাই যে চুক্তি ছিঁড়ে একবার মুক্তির আনন্দ পেয়েছে, সে জানে যে ভালো থাকার কোনও সংজ্ঞা হয় না, ভালোবাসার কোনও টোটকা নেই আর প্রেমে পড়ানোর জন্য কোনও মন্ত্র আবিষ্কার হয়নি। তাই যে চুক্তি ছিঁড়ে পালিয়েছে, সে-ই সম্ভবত দায়িত্ব নিয়ে জায়গায় জায়গায় সেঁটে থাকা বশীকরণের পোস্টারও ছিঁড়ে বেড়ায়।