Robbar

গুহাচিত্রে শিকারের ছবির মতোই রোমাঞ্চকর বাজারপাঠ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 2, 2026 7:35 pm
  • Updated:February 2, 2026 7:45 pm  

‘বাজার করিবার সহজ উপায়’। রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের এই কাব্যগ্রন্থটি, উপাদেয় বইয়ের তালিকায় রাখতেই হল। ‘রোববার’ পত্রিকায় দীর্ঘদিন ‘রোববারের বাজার’ লেখার আগে, এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছিল ‘রুচিরঙ্গ’ প্রকাশন থেকে। যে সকল বাঙালির জিভে স্বাদ নেই, তাঁরা মন দিয়ে পড়ুন। স্বাদ ফিরে পাবেন, নিশ্চিত।   

সেবন্তী ঘোষ

আরব সাহিত্যের এক অনন্য নাম কবি কুশাজিম। বিশেষ করে তাঁর খাদ্যকেন্দ্রিক কবিতা যা ‘গ্যাস্ট্রোনমিক পোয়েট্রি’ বলে সুবিখ্যাত। কুশাজিম ইবন ইয়াহইয়ার সময়কাল মোটামুটি ৮৫০-৯৩০ খ্রিস্টাব্দ ধরা যেতে পারে। এই সময়টি ছিল আব্বাসীয় যুগের সাংস্কৃতিক স্বর্ণযুগ। যেখানে প্রেম, যুদ্ধ বীরত্ব বা ধর্মীয় ভাবনা প্রধান ছিল, সেখানে কুশাজিম শিকার ইত্যাদির পাশে ভোজন সংস্কৃতিকে কবিতার বিষয় করে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন। এই খাদ্য শুধু খিদে মেটানোর উপকরণ নয়, আনন্দ উদযাপনের সঙ্গে সঙ্গে হালকা রসিকতা ও আত্ম বিদ্রুপের স্বাদ তার পরতে পরতে মেশা। রুটি, মাংস, মধু ,মশলা সুগন্ধি পানীয় এমন ভাবে বর্ণনা করছেন, যে তার সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা, খাবারের রং,গন্ধ, তাপ, নিখুঁত চিত্রকল্পে ভর দিয়ে কবিতায় উঠে আসছে। সব মিলিয়ে কুশাজিমের খাদ্য কবিতা আরব সাহিত্যে একটি ব্যতিক্রমী মানবিক ধারা তৈরি করেছে– যেখানে কবিতা নেমে আসে রান্নাঘর ও ভোজনটেবিলে, আর জীবনকে উদযাপন করে স্বাদের ভাষায়। এই খাদ্য-কবিতাগুলিতে কুশাজিম প্রথাগত গম্ভীর কাব্যবিষয় থেকে সরে এসে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সুখকে মর্যাদা দিয়েছেন। ফলে তাঁর কবিতা ঐতিহাসিক দিক থেকেও মূল্যবান। আব্বাসীয় যুগের খাদ্যাভ্যাস, রুচি ও সামাজিক জীবন একেবারে জীবন্ত হয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে কুশাজিমের একটি কবিতা পঙ্‌ক্তি দেওয়া ১৩ শতকের কাপ

অক্ষম অনুবাদে খানিকটা এমন দাঁড়ায়–

রুটি যখন উষ্ণ,
আর মাংস ঝরে পড়ে নরম আঁশে,
তখন রাজত্ব আর দারিদ্র
দু’টিই চুপ করে থাকে
মধুর মতো ঝরে পড়ে সস,
মশলার গন্ধে জেগে ওঠে মন,
জিহ্বা তখন যুক্তির চেয়ে জ্ঞানী–
সে জানে, সুখ কোথায়।
কে বলেছে দর্শন বইয়ে থাকে?
জিহ্বা তখন যুক্তির চেয়ে জ্ঞানী–
সে জানে, সুখ কোথায়।
একটি ভালো ভোজই যথেষ্ট
মানুষকে মনে করিয়ে দিতে–
জীবন বেঁচে থাকার জন্য সুন্দর

কথাগুলি উত্থাপিত হল এই কারণে যে, রসনা বিলাস শুধুমাত্র গদ্যের বিষয় নয়। কবি মন, বলা যায় দেশে দেশে রসস্নিগ্ধ মন কবিতায় স্বাদের বাহার এনেছে।

বাজার বিষয়ক লেখায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘরানায় খানিক হেঁটে, একেবারে নিজস্ব সিগনেচার স্টাইলে কলম পাকড়ে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছেন রজতেন্দ্র। ‘বাজার করিবার সহজ উপায়’– এই কবিতা বইটি প্রকাশিত হয়েছিল সেই ২০১২ সালে। রচনাকাল ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯। প্রকাশ মাত্রই কবিতা পাঠক এবং কবির গুণমুগ্ধরা চমকপ্রদ বিষয় বিন্যাসে আলোড়িত হয়েছিল। যেমন তাঁর কাপালিক বিষয়ক কবিতাগুচ্ছের পাঠ স্মৃতি দীর্ঘদিন সঙ্গে থেকে গিয়েছে। এই মুগ্ধতা নিয়ে কিছু আলোচনা করতে গেলে পক্ষপাত থেকে যায় এবং সেটি এই লেখায় থাকবেও।

রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘বাজার করিবার সহজ উপায়’ বাংলা আধুনিক কবিতার এক স্বতন্ত্র ও ব্যতিক্রমী সংযোজন। শিরোনামেই যে দৈনন্দিনতার ইঙ্গিত, কবিতাগুলিতেও তারই বিস্তৃত রূপ দেখা যায়– বাজার, কেনাবেচা, সংসার, মধ্যবিত্তের হিসেবনিকেশ– সব কিছু মিলিয়ে এক গভীর সামাজিক ব্যঞ্জনা তৈরি হয়েছে। এখানে বাজার কেবল পণ্য কেনার জায়গা নয়; বাজার হয়ে ওঠে সম্পর্ক, মূল্যবোধ ও জীবনের দরদাম করার এক প্রতীকী পরিসর। কবিতাগুলির ভাষা সরল, কথ্য এবং তীক্ষ্ণ। অলংকারের বাহুল্য নেই, কিন্তু শব্দের সংযমী ব্যবহারে তৈরি হয়েছে এক ধরনের মৃদু ব্যঙ্গ ও অন্তর্লীন বিষাদ।

সূচনায় দেখি, ‘যেভাবে আকাশের সঙ্গে সমুদ্রের নক্ষত্রের সঙ্গে জোনাকির এবং ঘুড়ির সঙ্গে রামধনুর একটা স্পষ্ট অথচ দূরসূত্র রয়েছে ঠিক তেমনিভাবেই রয়েছে বাজারের সঙ্গে ভোরবেলার খাদ্য চিন্তার।’ জোনাকি, ঘুড়ি বা রামধনুর সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্র সমুদ্র আকাশ আসতে পারে কিন্তু পাঠকের কল্পনায় ভোরবেলার খাদ্যচিন্তার কথা আসবেই না। আর এই বোধের উন্মীলন ঘটছে কীভাবে? ‘ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বাসী খাটের ওপরে বাবু হয়ে চোখ বন্ধ করে সেদিন সকাল ও রাত্তিরের খাবার থালার কথা এক মনে চিন্তা করতে হবে। ‘বাসি খাট’ শব্দবন্ধটি এই অংশটির ভরকেন্দ্র। ‘বাসি মুখ’ হলে সে গল্পের দিকে চলে যেতে পারত, ‘বাসি খাট’ সেই অভিমুখ কবিতার দিকে ঘুরিয়ে দেয়।

আলু, বেগুন, পটল, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ঢেঁড়স, পেঁয়াজ, ঝিঙে, কুমড়ো, ডাঁটা, লাউ, পেঁপে, মুলো, মোচা, থোড় ইত্যাদি বিষয়কেন্দ্রিক কবিতা লেখা দড়ির উপর হেঁটে যাওয়ার মতো। খেতে যত সহজ, শব্দ বাক্যে কবিতায় রূপ দেওয়া তত কঠিন।

এই সবজি হাট থেকে যে কোনও কবিতা আপনি তুলে নিতে পারেন। যেমন পটল কবিতায়, তার পাখোয়াজের মতো রূপ বর্ণনা সেরে তার শরীরে মৃদঙ্গ মাদল ঢোলকের সমরূপ খুঁজে নিচ্ছেন যখন, বেশ বাদ্যযন্ত্রের নান্দনিকতায় দুলছেন, তখনই অতর্কিতে আসে, ‘হালকা হলুদ-আভা সোনা ব্যাঙ উলটানো পেট’ উপমা। এ-ও বেশ চলছিল। আদ্যন্ত পটল স্বভাবেই রসনা নিবিষ্ট ছিল। কিন্তু লেখা ঘুরে গেল শেষে এসে।

দু চোখে সন্ধ্যা নামে
যমুনা নদীর জলে কাঁপা কাঁপা ভেসে ওঠে
রঘু রাই আর তাজমহল

জাফরি, বৃক্ষ, অন্যান্য সৌধের ফাঁক-ফোকর এবং সামনে থেকেও রঘু রাই প্রেমিকের মুগ্ধতা ছড়িয়ে যে তাজমহলের ছবি তুলেছিলেন, ক্যামেরার লেন্স সেখানে তাজের উপাসক। ঠিক তেমনভাবেই সর্ব ইন্দ্রিয় দিয়ে শব্দে, বাক্যে পটল মুগ্ধতার ছবি পরতে পরতে ছড়িয়ে দিয়েছেন কবি।

‘মোচা’য় গিয়ে আবার কবি আপনাকে বিপর্যস্ত করবেন। শুরুতে হাটুরে মানুষের মতো মোচার প্রবেশ। আলু-পটলের মতো বিঘা বিঘা অপর্যাপ্ত নয়। বাজারে অল্প কিছু মানুষ অল্প কিছু মোচা নিয়ে বসেন।

যেসব হাটুরে একটু মুখ চেনা তাদের মোচার গায়ে বিশ্বাস জমে থাকে পরতে পরতে

এই বিশ্বস্ত উপমায় বেশ একটু স্বস্তি হল। এরপরেই কবির মোচা যেন জ্যান্ত ইন্দ্রিয়ঘন মনুষ্য শরীর পেয়ে গেল,

কাঁঠালি কলার মোচা বেঁটে আর মোটাসোটা
মাথাখানি ভোতা যেন পেঁচাদের লোমশ উরত

এরপর মোচা বিষয়ক স্বাদ, নির্বাচন ও রন্ধন বর্ণনা পেরিয়ে কষগন্ধী লেখাটি গড়িয়ে চলছে, পাঠক হঠাৎ করে যেন দালির ছবিতে ঢুকে যাবেন। অথবা থম মেরে বসা জীবনানন্দকে দেখে ফেলবেন।

শেষাবধি কত দূর এক একটি মোচা কোটা যাবে
এই ভেবে অন্ধকারে
আয়নার ধার থেকে উড়ে আসে রুপোলি চামচ

এঁচোড় কবিতায় ঠিক এরকমই জোরালো অভিঘাত নিয়ে আছড়ে পড়বে। এঁচোড় খোসার নিচে গন্ধর্বের গান শুনতে পান তিনি। একেবারে শেষ লাইনে, ‘গ্রামবাসী শেয়ালেরা কাঁঠাল ফুলের বনে অদৃশ্য মশারি টাঙায়’– বাক্যটিতে শিয়ালের কাঁঠাল প্রীতি মুছে না গিয়েও আপনি এক অপার্থিব দৃশ্যচিত্রের কাছে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন।

হগ মার্কেট

সবজি বাজার ছেড়ে এবার আপনি চলে যেতে পারেন রক্তমাংসময় নাড়ি-ভুঁড়ি, ছিন্ন মস্তকের মাছ বাজারে। কত যে বৈচিত্র। মছলিখোর বাঙালির একান্ত নিজস্ব মৎস্য প্রীতি, ছবি ও গদ্যে, রম্যরচনায় জগৎখ্যাত। রজতেন্দ্র সেখানে চিরস্থায়ী কবিতার ছবি টানিয়ে দিয়েছেন। চিতল ও ফলুই, ভেটকি, পারশে ও ভাঙর, ইলিশ, পাবদা ,কই তোপসে, আড়, বাটা, বোয়াল, ট্যাংরা, গুলে, কাচকি, কাজরি, গাঙধারা, বাঁশপাতা, আমোদি, খয়রা, তাড়ুই, ন্যাদস আরও কত কী! নদী দূষণ, পুকুর চুরির ফলে এর মধ্যে অনেক মাছ এখন দুষ্প্রাপ্য। বাঙালির লুপ্তপ্রায় মৎস্য স্মৃতির মানচিত্র এঁকেছেন যেন কবি।

পদ্মার ইলিশ বিষয়ে দেখি, ‘এতটাই দীর্ঘ তারা–/সমস্ত স্টিমারঘাট, ফেরি, ফগ লাইট চাপা পড়ে যায়/ তার নিচে’। ঠাট্টা করে বলা হত কোম্পানির স্টিমারের পোড়া তেল খেয়ে নাকি গঙ্গার ইলিশ পুষ্ট। ঘটি বাঙালের মতো গঙ্গা-পদ্মার ইলিশের পুঙ্খানুপুঙ্খ তফাত করেছেন কবি।

চিতল ও ফলুই-এর পার্থক্য করছেন কবি। ‘চিতলের লেজে থাকে তিন খালি কালো তিল/ জ্ঞানজীবী, পণ্যজীবী, কর্মজীবী– ব্রহ্মা-বিষ্ণু মহেশ্বর’। রসস্নিগ্ধ টিকা ও টিপ্পনী কবিতার ছত্রে ছত্রে। ‘পুরুষ আড়ের চেয়ে মহিলা আড়ের স্বাদ বেশি– এই কথা গুরুজীর বলা’।

খাদ্য ও রসনা যে কোন স্তরে বিরাজ করতে পারে, রজতেন্দ্রর এই কবিতাগুলি না-পড়লে বোঝা যায় না। যেখানে ধড়মুন্ডু প্রতি মুহূর্তে আলাদা হয়ে রক্তের ফিনকি স্রোত, সেখানে তো ‘রুপোলি রংয়ের মধ্যে শুয়ে থাকা হিংস্রতা’ থাকবেই। পারশে ও ভাঙর মাছে তফাত দেখাচ্ছেন। পারশের ছোট মাথা, ভাঙরের মাথা বেশ বড়। ‘চোখ দুটি ঢ্যালা-ঢ্যালা। যেন দূরবিন চোখে দিয়ে জলচর ভাস্কো-দা-গামা’।

সমুদ্রজীবীদের মধ্যে ম্যাকরেল বর্ণনায় খুঁজে পাচ্ছেন, ‘ম্যাকরেল মাছের গা বন্দুকের নলের মতো কালো’, ‘সমুদ্রের বিষণ্ণ আগুন’– নিয়ে এই মাছ মাশরুম ব্রোকোলি আর ক্যাপসিকাম কুচির সঙ্গে পরিবেশিত হয়। এই যে অনুষঙ্গ নির্মাণ, পমফ্রেট বা ম্যাকরেল দিশি পুঁটি বা মৌরলার মতো আত্মজন নয়, তা কবিতা শরীরে ঝালে ঝোলে মেখে আছে। যেমন মৌরলা কবিতায়, ‘মৌরলার অম্বল রেঁধে আগেকার গিন্নিরা কানপাশা উপহার পেত’। এই কানপাশায় মৌরলা, গুলেরা যেন ঘরের পাশের দিশি মানুষটি। ছোট নদী খাল-বিলেই যাদের আটপৌরে জীবন কাটে।

শেষ করি ‘ন্যাদশ/ মিনি ও তেলাপিয়া’ কবিতা দিয়ে–

পিয়াসা ছবির হিরো গুরু দত্ যেমনটি একাকী ছিলেন,
বর্ষার ধানখেতে এক একটি মেনিমাছ
তার চেয়েও একা হয়ে ঘোরে।

লজ্জা নিয়ে জলের তলার নুড়ি পাতার ফাঁকে নিশ্চল বসে থাকা এই মাছ, ভয় পেলে স্থির থাকা ন্যাদসের গায়ে হাত দিলেও সে নড়ে না– কী অন্তরঙ্গ এই নিরীক্ষণ! এমন অপূর্ব মাছ-সাম্রাজ্যে কবি একইসঙ্গে তার সৌন্দর্য পিয়াসী ও হত্যাকারী। একইসঙ্গে তার মুগ্ধ পূজক ও ভক্ষক। এই জটিল, ভয়ংকর সৌন্দর্যবোধ নিয়ে কবিতাগুলি পড়তে পড়তে পাঠক যেন মানবমনের জিনবাহিত আদিম সুরটি খুঁজে পাবেন, যেখানে গুহাচিত্রে শিকারের ছবি অপার মুগ্ধতায় এঁকে রাখত হন্তারক মানুষ।

… আরও পড়ুন উপাদেয় বই নিয়ে অন্যান্য লেখা …

৫. প্রায় শতবর্ষ প্রাচীন ‘পাক-প্রণালী’ থেকে ভেসে আসে চিৎপুরের সেকেলে ঘ্রাণ

৪. বিফের মতো সুপাচ্য, পুষ্টিকর মাংস ভূ-ভারতে নেই, মেয়েকে চিঠিতে লিখেছিলেন বুদ্ধদেব বসু

৩. পানীয় সংবাদ

২. লীলাদিকে ‘রান্নার বই’ লিখতে বলেছিলাম আমিই

১. শ্যামল গাঙ্গুলির দেখা একেকটা বাজার আসলে একেকখানা উপন্যাস