Robbar

তোমার রঙেরই গৌরবে: যৌনতার চৈতন্যধারা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 2, 2026 7:03 pm
  • Updated:March 2, 2026 7:03 pm  

আমরা ফিরে তাকাব শুধু এই প্রকার থেকে প্রকারান্তরে তাঁর যাওয়াটির দিকে। ভাগীরথী তীর থেকে সাগরতীরে যাওয়ার মতো সে যাওয়া। সে যাওয়ায় রঙের খেলা আছে। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটকের বসন্তগানে পথিক ঠাকুরদা খেলাতে হার মানবেন না যে! তো সেই প্রাণের খেলার গানে পথিকপুরুষ নারী হয়ে ওঠেন তাঁর হৃদকমলের রাঙা রেণুর রজঃসম্ভবা প্রতীকে। রাজার উত্তরীয় রাঙা হবে সেই রেণুতে।

প্রচ্ছদের ছবি: যামিনী রায়

শৈবাল বসু

কোমল রেখাবের শ্রুতি লাগল গভীরে। হরিরিহ শব্দের ‘হরি’তে। 

শুনছেন বসে গৌরাঙ্গ। দূরে কাজল-কালো দারুবিগ্রহ। কোনও দেবাঙ্গনা গাইছেন গীতগোবিন্দম, বসন্ত পঞ্চমের রাগে?

‘বিহরতি হরিরিহ সরসবসন্তে…’ এইটুকু শুনে কি উঠে দাঁড়ালেন গোরা! মৃদঙ্গ মর্দলায় চারমাত্রার বোল উঠেছে, বেজেছে মঞ্জিরা, ভিতরে ভিতরে মঞ্জরীভাবে বারবার নৃত্যপর হয়ে উঠছেন গোরাচাঁদ। নীলাচলে তিনি কালা নন, রাধা। শৃঙ্গাররসে তাঁর ভিতর ভিজে যায়, রথারূঢ় জগন্নাথের সামনে প্রেমবশে তিনি উচ্চারণ করেন শৃঙ্গারশ্লোক:

যঃ কৌমারহরঃ স এব হি
বরস্তাএব চৈত্রক্ষপাস্

রেবারোধসি বেতসীতরুতলে চেতঃ সমুৎকণ্ঠতে।।

(যে পুরুষ রেবানদীর তীরে বেতসী তরুতলে একদা আমার কৌমার্য হরণ করেছেন, তিনি আজ আমার বিবাহিত স্বামী। যে চৈত্ররজনীতে তিনি আমার কৌমার্য হরণ করেছিলেন, আজও তেমনই চৈতালি রাত। আমিও সেই একই নায়িকা… বাড়ি নয়, সেই বেতসতরুগৃহে যাবার জন্য আমায় চিত্ত উৎকণ্ঠিতা)। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটকের রাজা যেমন তাঁর বসন্তপুরুষের উদ্দেশে গেয়ে ওঠেন, ‘নব শ্যামল শোভন রথে, এসো বকুল বিছানো পথে’, যেন সেই রথ থেকে সেই বেতসবনের বাতাস আসে তাঁর প্রিয়ের গন্ধ মেখে। আর রথের ধ্বজা আকাশে ওড়ে যেন তাঁর উতলা উত্তরীয়ের মতো।

উনিশ শতকের তৈলচিত্রে শ্রীচৈতন্য

আমাদের চৈতন্যদেব যতবার জগন্নাথ বিগ্রহকে দেখেন, তাঁর মনে হয় তিনি রাধা, সম্মুখে কৃষ্ণ।

‘সেই তুমি সেই আমি সে নব সঙ্গম
তথাপি আমার মন হরে বৃন্দাবন

ব্রজে তোমার সঙ্গে যেই সুখ আস্বাদন
সে সুখ সমুদ্রের ইঁহা নাহি এক কণ’

পুরাণে আছে, রাধার সঙ্গে কৃষ্ণের দেখা হচ্ছে কুরুক্ষেত্রে। বিবাদ বিরোধ বিচ্ছেদ মাখা সেই যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁরা মিলিত হচ্ছেন, কিন্তু সে মিলনে ব্রজধামের সুখ কই? শ্রীক্ষেত্রে মহাপ্ৰভু– লোকজন রাজ পরিচর পরিকর পরিবেষ্টিত। একান্ত নিভৃত বৃন্দাবন, একান্ত সখা কোথায় তাঁর?

‘ইঁহা রাজবেশ সঙ্গে ক্ষত্রিয়ের গণ
তাঁহা গোপগণ সঙ্গে মুরলী বদন।’

জনসমাজে যৌনপরিচয় প্রকাশের যে বিপন্ন বিষাদ, যাঁকে আধুনিক নারীবাদী লেখক জুডিথ বাটলার বলছেন ‘মেলানকোলিয়া অব জেন্ডার’ (জেন্ডার ট্রাবল), সেই আভাস যেন আসে এই অন্যতর আক্ষেপ-অনুরাগে।

কৃষ্ণদাস কবিরাজের পয়ার জানে না, সময় জানে, ঘর আর পথের কোন সংঘাতে কবি গেয়ে ওঠেন, ‘ওগো তোরা জানিস যদি, আমায় পথ বলে দে… আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে!’

চৈতন্য চরিতামৃতের অন্তঃখণ্ডে আছে স্বরূপ দামোদরের সঙ্গে গৌরাঙ্গের নিভৃত লীলারস আস্বাদনের কথা। তখন বাইরের লোকের প্রবেশ বারণ।

‘দিনে নৃত্য কীর্তন ঈশ্বর দরশন
রাত্রে রায় স্বরূপ সনে রস আস্বাদন’

(১১শ অধ্যায়, অন্তঃখণ্ড, চৈতন্য চরিতামৃত)

তুহিন মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘লোকায়ত চৈতন্য’ বইতে লিখছেন:

‘নবদ্বীপলীলায় চৈতন্যের মধ্যে রাধাভাব কখনও সখনও দেখা গেলেও তাঁর মধ্যে কৃষ্ণভাবই ছিল প্রধান। আর নীলাচলে চৈতন্যের মাধ্যমে কৃষ্ণ বোঝার চেষ্টা করতে তাঁর সঙ্গে সঙ্গমে রাধার রতিসুখ।’

অথচ নবদ্বীপের গোরাচাঁদ যেন প্রবল পুরুষ। তাঁর দুই বিবাহিত স্ত্রী ছাড়াও পরকীয়া রমণীপ্রেমের উল্লেখ এনেছেন একাধিক সন্ধানী গবেষক। অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তী মুকুন্দদাসের যে ‘আদ্য কৌমুদী’ উদ্ধার করেন, তাতে দেখি:

‘সন্ন্যাস করিয়া প্রভু সাধে পরকীয়া
সার্বভৌম নন্দিনী শাটি কন্যাকে লইয়া।
মহাপ্রভুর পরকীয়া শাটি কন্যা লইয়া
অটল রতিতে সাধে সামান্য মানুষ হইয়া।।’

কিন্তু নারীপুরুষ সম্পর্কই যে একমাত্র প্রণয়সম্পর্ক, এই প্রায় অবিচল লিঙ্গের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসেন চিরপথিক গৌর। 

শ্রীরাধিকা হলেন আরাধিকা, কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি, চরিতামৃতকারের ভাষায়, ‘রাধা পূর্ণ শক্তি কৃষ্ণ পূর্ণ শক্তিমান’ (আদি খণ্ড, ৪র্থ অধ্যায়)। আর গৌরাঙ্গসখা গদাধর?

‘গদাধর আদি প্রভুর শক্তি অবতার’ (চরিতামৃত, আদি, ৭ম) কিন্তু শক্তি তো একজন?এখানে তো বহুবচন?

ফিরে তাকাই কৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলায়। ‘কৃষ্‌’ ধাতু থেকে তিনি কৃষ্ণ। কর্ষণপ্রিয় পুরুষ আকর্ষণপ্রিয়ও বটে। লীলায় তিনি গোপীদের বস্ত্রহরণ করেন। আর আমাদের গোরাচাঁদ কী করলেন?

‘আচম্বিতে একদিন ধন্য রম্য বেলে
নিজজন সঙ্গে ক্রীড়া করে সন্ধ্যাকালে।।
সবার অঙ্গের বস্ত্র নিলা তো কারহিয়া
আনন্দে হাসয়ে সবে বিনগ্ন করিয়া।।
সব জন লজ্জায় অবশ ভেল তনু
করে আচ্ছাদয়ে অঙ্গ চাটু কহে পুনঃ।।

(চৈতন্যমঙ্গল, লোচনদাস, মধ্য খণ্ড)

বাকি পুরুষ পরিকর অনেকেই যদি তাঁর ‘গোপী’ হন, তবে গদাধর?

‘তিঁহো লক্ষ্মীরূপা তাঁহা সম কেহ নাঞি।’

(চরিতামৃত, আদিখণ্ড, ১০ম)

অর্থাৎ লক্ষ্মীদেবী যেমন ভগবান বিষ্ণুর অদ্বিতীয়া হ্লাদিনী শক্তি, তেমনি গদাধর শ্রীগৌরাঙ্গের পরমা শক্তি।

আর কেমন ছিল দুই জন্মসূত্রে পুরুষের সম্পর্ক?

গোরাচাঁদ বলছেন,

‘আমার অঙ্গসেবায় গদাধরের অভিলাষ
গদাধরের অঙ্গে মোর সতত বিলাস।।’
(চৈতন্যমঙ্গল, জয়ানন্দ)

শিল্পী: যামিনী রায়

আর কেমন প্রকাশ্য আচরণ? রাস বিনোদনকালে–

‘গৌরদেহে শ্যামতনু দেখে ভক্তগণ।
গদাধর রাধারূপ হইলা তখন।।

ক্ষণে গৌরলীলা গদাধর করি সঙ্গে।
ক্ষণে শ্যামলীলা রাধা রাসরস রঙ্গে।।’

(চৈতন্যমঙ্গল, লোচনদাস, মধ্যখণ্ড)

আবার, 

‘চৌদিকে বেড়িয়া ভক্তমাঝে গৌরহরি
মদে মতোয়াল যেন কিশোরা কিশোরী।।’ 

(চৈতন্যমঙ্গল, লোচনদাস, মধ্যখণ্ড)

জুডিথ বাটলার তাঁর পথভাঙা গ্রন্থ ‘জেন্ডার ট্রাবল’-এ বলছেন জেন্ডার হল এক ধরনের পারফরম্যান্স। কেবল হয়ে ওঠা নয়, করে ওঠা। আমাদের চৈতন্যদেব শুধু করে উঠলেন না, করে দেখালেনও। ‘লীলা’ শব্দটির মধ্যে পারফরম্যান্সের ইশারা আছে, আর নট নর্তক জনমনরঞ্জক শ্রীচৈতন্য সেটিকে নিয়ে যাচ্ছেন একটি প্রদর্শনবিদ্যার স্তরে।

তুহিন মুখোপাধ্যায় তাঁর গবেষণায় কখনও চৈতন্যের যৌনতাকে বলছেন সমলৈঙ্গিক, কখনও বলছেন বিষমলৈঙ্গিক। আমরা এইভাবে নির্দিষ্ট কোনও খাঁচায় বেঁধে রাখতে চাই না সম্পর্ককে। আমাদের প্রেমের ভগবান প্রেম থেকে প্রেমান্তরে যান যে!

কখনও মানবীপ্রকৃতির গদাধরের সঙ্গে তাঁর নারীপুরুষদাম্পত্য। আবার নীলাচলে তিনি নারী। তাঁর উত্তরীয় তখন হয়ে উঠবে আঁচল।

প্রভু আর প্রিয়-র মধ্যেকার উচ্চতা ভেঙে যাবে। প্রিয়াসুখসম্ভোগের আস্বাদনের আশায় দেবতা নেমে আসবেন প্রিয়ের আসনে, একটি সমতলে। স্বরূপ দামোদর এই বহুমাত্রিক যৌনতার আড়ালে গূঢ় তত্ত্বের ইশারা দিয়েছেন। সেই ইশারা কৃষ্ণদাসের চরিতামৃতে আছে বইকি। আমরা বরং সে বইয়ের আদিপর্বের একটি পয়ারের দিকে চোখ মেলে চাইব। দেবতা বলছেন–

‘রস আস্বাদিতে আমি কৈল অবতার।
প্রেম রস আস্বাদিল বিবিধ প্রকার।।’

আমরা ফিরে তাকাব শুধু এই প্রকার থেকে প্রকারান্তরে তাঁর যাওয়াটির দিকে। ভাগীরথী তীর থেকে সাগরতীরে যাওয়ার মতো সে যাওয়া। সে যাওয়ায় রঙের খেলা আছে। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটকের বসন্তগানে পথিক ঠাকুরদা খেলাতে হার মানবেন না যে! তো সেই প্রাণের খেলার গানে পথিকপুরুষ নারী হয়ে ওঠেন তাঁর হৃদকমলের রাঙা রেণুর রজঃসম্ভবা প্রতীকে। রাজার উত্তরীয় রাঙা হবে সেই রেণুতে। কালা আর গোরাচাঁদ, কালো ধেলো, নানা রঙের গৌরবে আলো হয়ে উঠবে। সবার রঙে রং মিশিয়ে বয়ে যাবে এক অফুরান চৈতন্যের ধারা।