
যশোধরা রায়চৌধুরীর সঙ্গে ঘণ্টাদশেক আড্ডা। যার একটি প্রধান অনুষঙ্গ ছিল বাংলা কবিতায় নারীর যৌন-স্বর; এবং তাঁর সম্পাদিত মেয়েদের কাব্য-ইতিহাস সংকলন ‘অনবদমনের কবিতা’। একটা সময়ের বাংলা কবিতায় মেয়েদের ‘আত্ম-শরীর-অন্বেষণ’ প্রসঙ্গে কথা বলতে বলতে নানা পথ ঘুরে উঠে এল অনালোচিত কবি রমা ঘোষের কবিতা। এল কবিতা সিংহ, শ্বেতা চক্রবর্তী, মিতুল দত্ত প্রমুখ কবিদের প্রসঙ্গও।
প্রচ্ছদের মোটিফটি সেঁজুতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা অনবদমনের কবিতা বইটির মলাট থেকে ব্যবহৃত।
যশোধরা: আগেরদিন আমরা সেই সাবভার্সনের জায়গাটায় ছেড়েছিলাম না?
রূপক: হ্যাঁ, সুতপা সেনগুপ্ত। এরপর সবে রমা ঘোষ শুরু করতে যাচ্ছিলাম, আপনার গলা ব্যথা করিয়েছিলাম! (হাসি) সেখান থেকেই শুরু করা যাক। আমি, ‘অনবদমনের কবিতা’য় ওঁর রেফারেন্স পাওয়া ইস্তক খুঁজে খুঁজে পড়ছি। ভেরি ফ্যাসিনেটিং! আমি আগে পড়িনি।
যশোধরা: ওঁকে খুব কমই পড়া হয়। আমিও ইনফ্যাক্ট বইয়ের কাজটার আগে পড়িনি। শুরুর প্রবন্ধটা যখন লিখছিলাম তখনই পথে পাই। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পথে অনেক কিছু পাওয়া যায় না, বলে না, যে– যখন তুমি একটা যাত্রায় বা খোঁজে আছ, সেই খোঁজটা চলার মাঝেই জীবন তোমায় আরও কিছু জিনিস সাপ্লাই করতে থাকে… সেভাবেই রমা ঘোষকে খুঁজে পেয়েছিলাম আমি। অদ্রীশ বিশ্বাস– আমার প্রেসিডেন্সির জুনিয়র (অকাল প্রয়াত), রমা ঘোষকে নিয়ে একটা বড় লেখা লিখেছিল, ফেসবুকেও দিয়েছিল, সেখান থেকেই পেয়েছিলাম। রমা ঘোষকে খুব অল্প লোকে খুব মন দিয়ে পড়েছে, অদ্রীশ, সোমব্রত সরকার তাদের মধ্যে দু’-একজন।
ওঁর একটা লাইন আছে না, ‘আমার কত সুখ হয়েছে বলা যায় না…’– একজন মেয়ে এত ব্লেটেন্টলি একথা জানাচ্ছে এই ব্যাপারটা বোধহয় বাংলা কবিতায় কমই পাওয়া যাবে। তাই না?

রূপক: আমার তো চোখে পড়েইনি! আপনি মূল প্রবন্ধে লিখেওছেন–
‘বাংলা কবিতার স্যাফো বলে তাঁকে অভিহিত করেন অদ্রীশ বিশ্বাস। নারী-নারীর সমকামী প্রেমের কবিতায় তিনি নিজের সাক্ষর রেখেছেন। এই নারীপ্রেম শরীরীও, প্রতীকীও। দার্শনিক তো বটেই।’
তবে আপনার বইটার শেষের দিকে দীপান্বিতা সরকারের লেখায় খানিকটা ইনক্লিনেশন পেয়েছি, তবে সেটাও এতটা প্রখর নয়।
যশোধরা: কোনটা বলো তো?
রূপক: দাঁড়ান পড়ছি–
‘কাঁচা বাঁশের শরীর ঘিরে ঘিরে কেমন লোভ নামে। যেসব ঠোঁট থেকে ঠোঁটে ফিরে যায় অমল বালিকা, আমিও কুড়িয়ে আনি ছেলেদের জিভ থেকে তোর বিলি করা ছোঁবল বিষ। চেখে চেখে দেখি। প্রেমের নিয়মে ঘুরে যাচ্ছে বহুবর্ণ মোমের শিখা। গলে গলে যায় আমার কতদূরের স্বপ্নে। আমিও শিখে যাচ্ছি নখের তুমুল পাপ। তোর মনোরম শিকারের ভিড়ে আশরীর একটি ফণা। আমি মুখে মুখ ভরে দেখি। প্রদীপ জ্বালাই আর ভাসাই নীচু খাতে। চূড়ার মুখে হাঁ বসে থাকি। আমাকে পোড়াবে মেয়ে? ওলো শঙ্খচূড়া আমিও বেদিনী হয়ে যদি তোকে নাচাই, নাচাই, নাচাই?’
যশোধরা: হ্যাঁ ঠিকই, এটার মধ্যে কিছুটা আছে। তাছাড়া এই কবিতায় খুব ভালো একটা শব্দের ব্যবহার আছে, ‘শঙ্খচূড়া’… শঙ্খচূড় সাপ আছে, কিন্তু শঙ্খচূড়া কথাটা তো কেউ কখনও লেখে না।
দেখো, নিজেকে মেয়েরা তো অনেকরকমভাবে এক্সপ্লোর করেছে, কাজেই এই কবিতায় যে সেই ভঙ্গি খানিকটা রয়েছে সেকথা হয়তো ঠিক। আমি মিতুলের ‘দূর্বা’ সিরিজের কবিতাটা এই সংকলনে দিয়েছিলাম কি না, মনে পড়ছে না…
‘যেভাবে বুকদুটোকে বেঁধে রাখিস
মনে হয় ওরা তোর মেয়ে…’
দিয়ে শুরু করে পরে এক জায়গায় ও বলছে–
‘হুটোপুটি করে ওরা স্নান করে
কেউ কাউকে একটুও কষ্ট না দিয়ে
যে যার মত একা…’

রূপক: না নেই। ইন্টারেস্টিং!
যশোধরা: আচ্ছা। কবিতাটা একেবারে অন্যরকম; মূলত সেলফ-এক্সপ্লোরেশন। মনে হবে স্নানঘরে আয়নার নিজের দু’টি স্তনের সঙ্গে কথা বলছে একটি মেয়ে। যেন দু’টি বন্ধু। আরেকটা কবিতাও তোমায় আমি শোনাচ্ছি, ওটা বইতে নেই, আমি পেয়েছি…
রূপক: কার লেখা?
যশোধরা: শ্বেতা চক্রবর্তী, উনিও খুব পাওয়ারফুল! তোমায় শোনাব বলেই লিখে রেখেছি। বোধহয় নতুন, কবিতাটার নাম ‘দোষ’–
“ও তরুণী কবি,
তুমি যতবার ‘স্তন’ শব্দ বলো আর ভয়ানক তৃপ্ত হও,
আমি ততবার তোমার আরও কাছে,
আরও আরও কাছে গিয়ে বলি, ‘ওদের নাম তুমি কী রাখলে?’
তুমি অবাক হয়ে বল, ‘স্তন মানে স্তন, তার আবার নতুন নাম কী?’
আমিও উত্তরে বলি, ‘যতদিন ওদের নাম উমনো-ঝুমনো,
লক্ষ্মী-সরস্বতী বা
দুর্গা-কালী না রাখো, ততদিন ওরা ঠিক ঝাঁকুনি দিতে পারবে না, জানো!
সে তুমি যতই ওদের ওই একটা নামেই ডাকো!’
তরুণী কবি, তুমি ভয়ানক বিরক্ত হয়ে বলবে, ‘আসলে বলুন,
আপনি স্তন উচ্চারণে ভয় পান!
আমি ভয় পাই না!’
আমি বলব, ‘আসলে কি জানো, ওদের নিয়ে লোফালুফি করতে দিলে যাকে,
সেও তাদের কোনো নাম দিল না?
অন্তত, সোনাবল আমার!
রূপাবল আমার! এমন কিছু?’
তরুণী কবি খুব রাগী!
আরও বিরক্ত হয়ে হাঁটা দেয়,
কাঁধে ঝুলি, ঝুলির ভেতর কবিতার ডায়েরি,
তার ভেতর স্তন আর স্তন…
আমি তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলাম
একটা শীত রঙের আদর, যাতে আগুন জ্বলার আরামে
শীতের ঝাণ্ডির রাত আরো মহীয়ান হয়ে ওঠে!
আরো জীবন্ত!
পারলাম না!
পুরোনো কবিদের এই এক দোষ!”

মিতুলের কবিতাটার সঙ্গে শ্বেতার কবিতার খানিকটা মিল পেয়েছি আমি।
রূপক: বাহ! শুধু আত্ম-অন্বেষণ নয়, যথেষ্ট সাবভার্সন এবং ভালনারেবিলিটিও আছে।
যশোধরা: ‘পীড়াসমূহ’ বইতে আমার নিজেরও এই ধরনের একটা লেখা আছে।
এইবার বলি, এক্সপ্লোরেটরি মেয়েদের মধ্যে সাধারণত একটা ফেমিনিস্ট প্রবণতা থাকে বলেই আমার মনে হয়েছে; তেমনই একটা স্ট্যান্ডপয়েন্ট থেকে তারা নিজেদের জাস্টিফাই করে হয়তো।
রূপক: যেমন?
যশোধরা: মানে ধরো ওঁদের অনেকেই বলেছে, ‘হোমোসেক্সুয়াল বন্ধুদের সঙ্গে মেশা খুব নিরাপদ। কারণ তাদের তো আমার ব্যাপারে ইন্টেরেস্ট নেই।’ অর্থাৎ, যৌনপণ্য হিসাবে পরিগণিত হওয়ার ভয়টা এত বেশি হয়ে গিয়েছে যে, সমকামী পুরুষের কাছে ‘দে ফিল কমফর্টেবল’। মেয়েদের সঙ্গে মেয়েদের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটা অনেকসময়ই থাকে।

রূপক: যেমন ‘ফায়ার’? শাবানা আজমি, নন্দিতা দাস?
যশোধরা: হ্যাঁ, দু’জন ব্যাটার্ড মানুষ নিজেদের মধ্যে একটা স্পেস খুঁজে নিচ্ছে, অর্থাৎ এই এমন একটা সম্পর্ক যেখানে অন্তত কোনও ভায়োলেন্স থাকবে না। সমকামী প্রেমের মতোই আত্মপ্রেমের মধ্যেও তো একটা ভায়োলেন্স-হীনতা আছে? (একটু থেমে) তুমি ‘অ্যানিম্যাল’ সিনেমাটা দেখেছ?
রূপক: হ্যাঁ, দুর্ভাগ্য হয়েছে। (হাসি)
যশোধরা: প্রেমের মধ্যেকার ভায়োলেন্স বলতে আমি ওইরকমই কিছু বোঝাতে চাইছি। কীরকম গা গুলিয়ে ওঠে না?
তো ওই ম্যাস্কুলিন টক্সিসিটির বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য যে এক ধরনের নন-ভায়োলেন্ট প্রেমের প্রয়োজন সেটা সমকাম এবং আত্ম-অন্বেষণ উভয়ের মধ্যেই আছে বলেই আমার ধারণা।
রূপক: সবক্ষেত্রে বোধহয় নয়, এরকম সার্বিকভাবে বলা যায় কি?
যশোধরা: নিশ্চয়ই যায় না, আমি একটু সরলীকৃত ভাবেই বলছি। এবং তোমার শুরুর কথায় ফিরে বলতে চাইছি, এই নন-ভায়োলেন্স রমা ঘোষে আছে। এবং আরও যে জিনিসটা আছে তা হল ইকোফেমিনিজম।

রূপক: একটা জিনিস দেখবেন? আপনাকে দেখাই, রমা ঘোষের কবিতার পাশে আমার নোট… (বোল্ড অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘ECOFEMINISM’)
যশোধরা: (হাসি) এই তো বেশ মিলে যাওয়া! সত্যিই ওঁর কবিতায় এত গাছপালা…
রূপক: রমা ঘোষের কথায় আরেকটু ঢোকার আগে, আপনার কাছে একটা কথা জানতে চাই, মানে আপনার কী মত– সেইটা আর কী! আমি আর শারদীয়া মাঝেমাঝেই এই বিষয়ে কথা বলি। আমার নিজের পরিসরে এমন অনেক পুরুষ আছেন, শারীরিকভাবে না হলেও মানস-অঙ্গে যাদের মধ্যে খানিকটা নারীত্ব বা ফেমিনিটি আছে। আমার মধ্যেই আছে, শারদীয়া নিজেই বলে। আমাদের দু’জনেরই মত হল, শারীরিকভাবে না-হয়েও মনের দিক থেকে তথাকথিত অর্থে একটু মেয়েলি (সামাজিক ধারণা অনুযায়ী) পুরুষদের সঙ্গে সেক্সুয়ালিটি নির্বিশেষে আমাদের সমাজের মেয়েরা খানিকটা বাড়তি নিরাপদ অনুভব করে। কেন করে, তা আমরা ভেবে বের করতে পারিনি। বলতে চাইছি এই সমস্ত ক্ষেত্রে প্রবল প্রেম বা যৌনতা থাকলেও আপনি যে ভায়োলেন্সটার কথা বললেন, সেটা সাধারণত অনেক কম। এটা আমাদের মত। এই বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কীরকম?
যশোধরা: দেখো, এই গোটা ব্যাপারটাও একধরনের সামাজিক কনস্ট্রাক্ট। তুমি তো মূলত এমপ্যাথি বা সূক্ষ্ম-স্তরের সহানুভূতির দিকটা নিয়ে কথা বলছ, আমাদের সমাজের নিয়মে সেটা পুরুষের না থাকলেও চলে, কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা যত বেশি পরিমাণে থাকা সম্ভব থাকুক। তেমনটাই এনকারেজ করা হয়। কাজেই উলটোদিকে কোনও মহিলার যদি এমপ্যাথি না থাকে সেটাও খুব দোষের। আবার উদাহরণস্বরূপ আমাদের চারপাশে অনেক মহিলা রাজনীতিবিদদেরও তো দেখতে পাই, যাদের প্রায় কোনওই এমপ্যাথি নেই (হাসি)। অর্থাৎ দু’দিকটাই আছে। আমার মনে হয়, সব মানুষের মধ্যেই দু’দিকটাই থাকে, তুমি কোনটাকে নার্চার করছ, তার ওপর তুমি কী হয়ে উঠছ, সেটা ডিপেন্ড করে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হল, যে সমস্ত ছেলেরা মায়ের সঙ্গে অনেকটা সময় থেকেছে, তাদের মধ্যে এই এমপ্যাথিটা তৈরি হয় বেশি, এবং তাদেরকে অনেক সময় সেই ‘মেয়েলি’ কনস্ট্রাক্টে ফেলা হয়।

রূপক: অবশ্যই। এবং তাই আমার মত হল আমাদের সামাজিক কনস্ট্রাক্টে ‘পুরুষ’ হওয়া বলতে যা বোঝায়, তার সঙ্গে এই ‘এমপ্যাথির’ দূরদূরান্ত অবধি বিশেষ সম্বন্ধ নেই বলেই তারা ‘মেয়েলি’।
যশোধরা: বলতে পারো। আমারও খানিকটা তেমনই মনে হয়। সমস্যা হল, এই ব্যাপারটাও অনেক ক্ষেত্রেই সিলেক্টিভ। কোনও বাবা হয়তো তার নিজের মেয়ের সম্বন্ধে দারুণ অনুভূতিপ্রবণ, কিন্তু বাড়ির বাইরে বেরলেই তিনি অন্য মানুষ!
রূপক: ঠিক। একই বয়সের অন্য একটি মেয়ের প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। খুবই গড়বড়ে ব্যাপার (হাসি)। যাক, রমা ঘোষে ফিরে আসি…
পরপর ওঁর কবিতা পড়তে গিয়ে আমার বারবার মনে হয়েছে, গোটা ব্যাপারটাই দারুণ জৈব, কোথাও ছক নেই, আবার একটা বুনন আছে। আপনি ‘ইকোফেমিনিজম’ কথাটা তুলে আনলেন, আমিও আনতাম, ওঁর বুনন গাছের মতোই। দু’-তিনটে লাইন পড়ে আপনাকে একটা প্রশ্ন করব।
যশোধরা: পড়ো।

রূপক:
‘…
মহুয়াগাছের সঙ্গে নীতা আজ পাতিয়েছে সই।
ভালো হয়ে গেলে, নীতা হ্যাভারস্যাক কাঁধে নিয়ে
আমরা পাহাড়ে যাব অর্কিডের খোঁজে,
পাহাড়ে নীতাকে চাই, না হলে পাহাড় খুব
নীচু হয়ে যায়।’
এই লাইনটা পড়ে প্রথমেই আমার সুনীল গাঙ্গুলির নীরার কথা মনে হল।
যশোধরা: হ্যাঁ, হ্যাঁ, মিল আছে কোথাও, ঠিক বলেছ। আসলে দেখো, বাচনভঙ্গিটা ‘ভাষা কীভাবে একজন আয়ত্তে আনছে’ তার ওপরও নির্ভর করে। তুমি দেখবে কবিতা সিংহের অনেক লেখাই অনেক সময় অনেক পুরুষ কবির মতো মনে হয়।
রূপক: না না, আমি একেবারেই ব্যাপারটা নিয়ে অনুযোগ করছি না। আমার প্রশ্নটা অন্য। ধরুন আরেকটা লাইন পড়া যাক–
‘…
বিকেলের ট্রেনে নীতা আবার ফিরছে
লাফিয়ে সাঁতরে উঠে যাই স্টেশনের দিকে।’
আমি একবারও বলতে চাইছি না যে উনি সুনীলের মতো লিখছেন, আমার প্রশ্ন এই নির্দিষ্ট কবিতায় বা নীতাকে নিয়ে লেখা অন্য কবিতায় এই ‘নীতা’ নামটা ‘নীরা’র উত্তরে ইচ্ছাকৃতভাবে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে– এমনটা আপনার কখনও মনে হয়েছে?
যশোধরা: হ্যাঁ, হতেই পারে, হয়ে থাকতেই পারে। কারণ ওই সময়েই তো প্রচুর নীরার কবিতা লেখা হয়েছে। এবং তখন নীরায় মানুষ এতই অভ্যস্ত যে উনিও আনকনশাসলি নামটা ব্যবহার করে থাকতে পারেন, সেটাও সম্ভব।

রূপক: আপনি আগেরদিন ‘Answering Back’ ইংরেজি সংকলনের প্রসঙ্গে ‘কবিতায় উত্তর দেওয়ার’ ব্যাপারটা নিয়ে বলছিলেন তার পরিপ্রেক্ষিতেই আমার আরও বেশি মনে হল। যদিও সেটা বুঝতে আরও ‘রমা ঘোষ’ পড়তে হবে।
যশোধরা: দেখো, রমা ঘোষকে নিয়ে আমি পরে আরেকটা বড় লেখা লিখেছি এবং ওঁর প্রায় সমস্ত সংকলনই আমি কিনে পড়েছি, কোথাওই তেমন কিছু পাইনি। আমার ওই লেখাটা এখনও বেরয়নি। নির্মিতি তো সর্বত্র আছে, ওঁর ক্ষেত্রেও থাকবেই। আমি ওঁর অন্য একটা কবিতার খানিকটা আগে পড়ি, বোঝাতে সুবিধা হবে।
রূপক: পড়ুন।
যশোধরা:
‘দুচোখে ভীষণ জ্বালা, আকণ্ঠ পিপাসা
বিপুল সম্ভোগে আমি বেহেড মাতাল
সারা রাত সারা দিন টনটনে ত্বক বেয়ে নামে
সুখ দুঃখ বুভুক্ষায় বিগলিত স্বেদ’
এরপর কিছু পরে উনি লিখছেন,
‘কোটি পিপীলিকা চেতনা মাড়িয়ে হাঁটে প্রতিক্ষণ’
অর্থাৎ একজন চেতনাবান কবিকে তাঁর চেতনাই কতটা কষ্ট দিচ্ছে! সেই কষ্টটাকেই তিনি কবিতা করে তুলছেন। একটা জায়গায় উনি বলছেন–
‘কবিতা দারুণ অনুভব
বিন্দু বিন্দু হৃদয় ক্ষরণ’
রূপক: বাহ!

যশোধরা: তুমি দেখবে ওঁর সমস্তটার মধ্যেই– পিপীলিকা থেকে শুরু করে বিন্দু বিন্দু– উনি যেন একটা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে নিজেকে দেখছেন। এটা খুব একটা কেউ করে না, পারেও না। কবিরা অনেক ব্যাপ্ত জগতের কথা লেখেন। ওঁর সমস্ত লেখার মধ্যেই এই ব্যাপারটা আমার খুব মেয়েলি মনে হয়। আমাদের মেয়েদের জীবনের মধ্যে তো সূক্ষ্মতা এবং ক্ষুদ্রতার একটা ব্যাপ্ত প্রাধান্য আছে– সেলাই করা থেকে শুরু করে রান্নায় মশলা দেওয়া অবধি সবেতেই– ওঁর কবিতায় সেই মেয়েলি ব্যাপারটা পেয়েছি আমি। তুমি ভাব, সেই আবারও রবীন্দ্রনাথ চলে আসবেই– ‘আমি মানব একাকী ভ্রমি, বিস্ময়ে ভ্রমি বিস্ময়ে’-র ব্যাপ্তি আর রমা ঘোষের নারীত্বের উদ্যাপন কোথাও বিপ্রতীপ না?
রূপক: কিন্তু যশোধরাদি, একটু সরে যাচ্ছি, রবীন্দ্রনাথের ব্যাপ্তি এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুষঙ্গ আলাদা করে দেখবেন কীভাবে আপনি? আমার তো মনে হয় ওই লাইনে উনি নিজেকে মহাবিশ্বের প্রেক্ষিতে আরও মাইক্রোস্কোপিক্যালি দেখছেন। (হাসি)
যশোধরা: হয়তো ঠিকই বলেছ। তোমায় রমা ঘোষের আরেকটা কবিতা শোনাই…
রূপক: পড়ুন।
যশোধরা:
বরফের মধ্যে জমে কাঠ হয়ে থাকা
দুষ্টনদী গর্ভজাত নীরক্ত ইলিশ
অক্ষরের শিরদাঁড়া অনর্থক কাঁটা
আমার কবিতা জানি চকচকে আঁশে
ঢেকে রাখা স্বাদহীন মাংসের পুতুল।
ফেরিওলা মেয়ে আমি ইলিশের ঝাঁকা
মাথায় চাপিয়ে ঢুকি ভদ্দর পাড়ায়
দরের কেচাল ফেঁদে লজ্জা দেবেন না,
আপনারা হাতে তুলে ঘরে ঢোকালেই
আহ্লাদে পায়রা আমি গর্বের বকম।
কার আঁশবটি কত মসৃণ ধারালো
কার নুনলঙ্কা কত জ্বালা বিচ্ছুরক
কোন সুধী তুষতাপে পোড়াবে আদ্যন্ত
পাড়া মাত করা মজা ইলিশের গন্ধে
ফোড়ন ছেটাবে কে কী– অপেক্ষা করি না।

এই যে ভদ্দরপাড়ায় আমি ইলিশের ঝাঁকা মাথায় নিয়ে ঢুকছি– এই ব্যাপারটা সাবভার্সন তো?
রূপক: নিঃসন্দেহে!
যশোধরা: উনি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুষঙ্গে এই জায়গাগুলোয় পৌঁছচ্ছেন, এটাই আমার মনে হয়েছে।
রূপক: ফ্যাসিনেটিং!
যশোধরা: আমি তোমাদের ভদ্রলোকের পাড়ায় ইলিশের ঝাঁকা নিয়ে মজা ইলিশ বেচে দিয়ে এলাম! অর্থাৎ আমার নিজের যা কিছু বলার তা আমি তোমাদের কবিতার সংসারে বেচে দিয়ে এলাম। বেসিকালি তো তাই!
রূপক: সাবভার্সন তো আছেই, নেগেশানও আছে! খুবই আন্ডারলাইং!
যশোধরা: এগজ্যাক্টলি! মজার ব্যাপার হল, উনি খুবই কম কথা বলেন। আমি জানি, আমি যদি ওঁর সঙ্গে কথা বলতে বসি, উনি এত কিছু বলবেনই না। উনি বলবেন আমি লিখেছি, আমার লেখা হয়ে গিয়েছে, ব্যস! আর কিছু বলার নেই (হাসি)! এইটা আমার ধারণা। আমি যতবার কথা বলতে গেছি উনি যে কবিতা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন– তেমনটা নয়।
আসলে রমা ঘোষ এতই স্বল্পচর্চিত, ওঁকে নিয়ে কথা বলতে বসলেই একটা আবিষ্কারের আনন্দ হয়।
রূপক: পড়তে গিয়েও!
যশোধরা: ওঁকে নিয়ে আরও চর্চা প্রয়োজন…
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved