
AI-এর যুগে এই ইন্টার-প্যাসিভিটি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখন শুধু হাসি নয়, আমাদের চিন্তা, বিচার এবং সৃজনশীলতা– সবই আমরা আউটসোর্স করে দিয়েছি। AI যখন আমাদের লেখা ঠিক করে দেয়, আমাদের হয়ে ইমেল ড্রাফট করে, বা আমাদের রুচি অনুযায়ী গান বেছে দেয়– সে তখন আমাদের হয়ে ‘উপভোগ’ বা ‘বাছাই’-এর কাজটা করে দিচ্ছে।
আমরা নাটক দেখে বলছি ভালো হয়েছে। আমরা সিনেমা দেখে বলছি ভালো হয়েছে। আমরা গান শুনে বলছি ভালো হয়েছে। আমরা বই পড়ে বলছি ভালো হয়েছে। আমরা ছবি দেখে বলছি ভালো হয়েছে।
কেউ মারা গেছে শুনলেও আমাদের কিছু মনে হয় না, খুন জখম রেপ হোক, কিংবা আরবল্লি হাঁসদেও নিয়মগিরি দেউচা নিকোবর– কিছুতেই আর কিছু যায় আসে না। ইউক্রেন গাজা বসনিয়া ভেনেজুয়েলা সুদান বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরা আসাম কেরালা রাজস্থান মণিপুর থেকে রোহিঙ্গা মেইতেই কুকি সাঁওতাল আদিবাসী দলিত প্রান্তিক– আমাদের কোত্থাও কিছুই ভালো শুনছি না। শুধু শুনছি হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের নানা মাত্রা অতিক্রম করার দেখনদারি চলছে। যেন, একদল উন্মাদ অপ-মানুষ প্রদর্শনী করছে নিজস্ব নিষ্ঠুরতার মাত্রা পেরিয়ে নতুন নতুন মাইলস্টোন ছোঁয়ার।
তবুও আমরা সবেতেই?
নাহ, এটা একদম অন্যরকম বুঝলেন তো! মানে একটু আলাদা একটা কিছু করার চেষ্টা করেছি। আর সেই দেখে-শুনে আমরা কী যে অপূর্ব গদগদ উরিব্বাস অসাধারণ ভালো হয়েছে, সে কী আর বলব!

ভালো থাকার ভান ও বুদ্ধিবৃত্তিক অস্বস্তি
আরে ভাই, ‘ভালোটা’ কী হয়েছে?
শিল্প তো আমাকে ইন্টেলেকচুয়ালি ডিসটার্ব করবে, আর ডিসটার্ব হলে কি আমার ভালো লাগে? যদি ডিস্টার্ব হলেও আমার ভালো লাগছে বলছি, তাহলে তো আমি তোষামোদ করছি।
এখানে একটু থামা যাক। ‘ইনটেলেকচুয়াল ডিস্টার্বেন্স’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক অস্বস্তি বিষয়টা আসলে কী? প্রকৃত শিল্প বা সাহিত্যের কাজ তো আমাকে আরাম দেওয়া নয়, বরং আমার বিশ্বাসে, আমার যাপনে, আমার সুবিধাবাদী শৃঙ্খলিত জীবনে আঘাত করা। কাফকা যেমন বলেছিলেন, বই হবে আমাদের ভেতরের জমে থাকা বরফ ভাঙার কুঠার। একটা ভালো সিনেমা দেখে আমার মনে হওয়ার কথা– আমি যেভাবে জীবনটা বাঁচছি, সেটা কি ঠিক? আমার সমাজের বৈষম্যগুলো দেখে আমার তো লজ্জায় কুঁকড়ে যাওয়ার কথা। এই যে অস্বস্তি, এই যে নিজের ভেতরের পুরনো দালানটা ভেঙে পড়ার শব্দ– এটাই তো শিল্পের সার্থকতা।
কিন্তু মুশকিল হল, আমরা এখন আর ‘ভাঙতে’ চাই না। আমরা চাই ‘এন্টারটেইনড’ হতে। আমরা চাই শিল্প আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বলুক– ‘সব ঠিক আছে, তুমি যেমন আছ, পৃথিবীটা যেমন চলছে, বেশ চলছে।’ আর যদি কোনও শিল্প আমাদের প্রশ্ন করে, আমাদের অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দেয়, আমরা চটজলদি সেটা এড়িয়ে যাই। অথবা সমাজের ভয়ে সেই অস্বস্তিটা চেপে রেখে তোতাপাখির মতো বলি– ‘আহা! কী গভীর, খারাপ সময়ে মন ভালো করা সুবাতাস!’

এই যে নিজের অনুভূতির সঙ্গে প্রতারণা, এটাই তোষামোদ। যেমন স্কুল কলেজে অফিসে উর্দ্ধতনের রংবাজি; পিকনিকে হানি সিংয়ের গলাবাজি; পাড়ায় পলিটিকাল পার্টির ভোটবাজি– সবেতেই আমি মিনমিন সুরে কেটে এবং কাটিয়ে পড়েছি, তেমনটাই আসলে তোষামোদ। যা আমার বাবা করেছিল, এবং আমি আমার সন্তানকে দিয়ে যাব। ছাগল-ভরা ঝরে ঝরে পড়া মাংসের রিলস আর বগল-ভরা স্ট্রালের ইএমআই-এর সহজ কিস্তি।
আমাদের এই সয়ে আর সইয়ে নেওয়ার রাজনীতিতেই নতুন সংযোজন AI-এর তেলবাজি, যা তোলাবাজিও বটে। যেখানে আমরা এক একটি ফিউডাল রাজত্বের রাজা এবং এক বিশাল গ্লোবাল প্রভুর গোলাম। কবিগুরু যে ‘আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে’ গানটা কোন অর্থে লিখেছিলেন– সেসব ভাবনা গুলিয়ে গুবলেট, ঝুলিয়ে ঝুলবারান্দা। সেই কথাই বলব এখন।
বলব দুটো শব্দ নিয়ে কিছু কথা, একটা ‘Sycophancy’ আর অন্যটা ‘Techno-feudalism’। সাইকোফ্যান্সি-র পাতি বাংলা তর্জমা করলে হতে পারে ‘মন জোগানো কথা বলা’। আর টেকনো-ফিউডালিজম-এর বাংলা তর্জমা করতে গেলে খুব কেজো একটা বাংলা করতে হয়। বিষয়টা আগে বুঝিয়ে বলা যাক।
তোষামোদের মনস্তত্ত্ব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফাঁদ
মানুষের তোষামোদে ক্লান্তি আছে, মেজাজ-মর্জি আছে। বসের মেজাজ খারাপ থাকলে অধস্তনের তোষামোদ খাটে না, আবার অধস্তনেরও সব দিন সমান তেল দেওয়ার ইচ্ছে থাকে না। কিন্তু এই শূন্যস্থান পূরণেই মঞ্চে প্রবেশ করে AI– এক অনন্ত, অফুরান এবং যান্ত্রিক ‘জি হুজুর’।

আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের এই যে ‘ভ্যালিডেশন’ বা স্বীকৃতির কাঙালপনা, ঠিক সেই দুর্বল রন্ধ্রপথেই তার অনুপ্রবেশ। আমরা যখন চ্যাটবটকে জিজ্ঞেস করি, ‘আচ্ছা, আমি কি ঠিক ভাবছি?’, সে কখনওই মুখের ওপর বলে না, ‘না, আপনার ভাবনাটা জঘন্য বা অবাস্তব।’ সে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ঘুরিয়ে বলে, ‘আপনার ভাবনাটি বেশ অভিনব, তবে এর সঙ্গে এটাও ভাবা যেতে পারে…’ লক্ষ করুন, প্রথমেই সে বলে নিল ‘অভিনব’। এই যে পিঠ চাপড়ে দেওয়া, এই যে আমার ইগোকে একটু সুড়সুড়ি দেওয়া– এটাই তো আমরা চাইছিলাম। রক্তমাংসের মানুষের কাছে যা ভিক্ষা করে পেতে হয়, অ্যালগরিদম তা অকাতরে, বিরামহীনভাবে বিলিয়ে দেয়।
মাইকেল এস. রথ তাঁর সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন পোস্ট-এর লেখায় যাকে বলছেন ‘ফ্রিকশনলেস ইন্টার্যাকশন’– মানে, কোনও ঘর্ষণ নেই, কোনও সংঘাত নেই। এক মসৃণ, পিচ্ছিল পথ, যেখানে আমরা দ্বিমত বা সমালোচনার কাঁটা এড়িয়ে শুধু নিজেদের ‘সঠিক’ মনে করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলি। AI হল সেই জাদুকরী আয়না, যে আয়নায় আমরা শুধুই নিজেদের সুন্দর এবং সঠিক প্রতিবিম্ব দেখি। সে সচরাচর আমাদের ভুল শুধরে দিয়ে বিরাগভাজন হতে চায় না, বরং আমাদের ভুল ধারণা বা কুসংস্কারগুলোকেই ‘কাস্টমাইজড ডেটা’ দিয়ে জাস্টিফাই করে। আর এই আত্মতৃপ্তিই হল সেই আফিম, যা আমাদের চিন্তাশক্তিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে।
আমি যেমন আমার ঊর্ধ্বে থাকা মানুষগুলিকে তেলিয়ে দিন গুজরান করছি, তেমনই, সেই একইরকম তোষামোদের আকাঙ্ক্ষা আসলে আমাদের মনে তৈরি হয়। সেই আকাঙ্ক্ষা কোথাও থেকে একটু পূরণ হলেই আমরা সেই মানুষটি (এখানে সেই AI মাধ্যমটিকে) বেশি ভরসা করে ফেলছি। ফলত সেই AI আমার নির্ভরতার সুযোগে আসলে আমার ভাবার ক্ষমতাটিকে গ্রাস করছে। আর আমার এই মৃত মেধার শরীরে বাসস্থান গড়ছে টেকনো-ফিউডালিজম বা টেকনো-সামন্ততন্ত্র।

টেকনো-সামন্ততন্ত্র: ডিজিটাল প্রজার নতুন অর্থনীতি
ঘুমন্ত মানুষের পকেট মারা সবথেকে সহজ। আর আমাদের চিন্তাশক্তিকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে সিলিকন ভ্যালির ডিজিটাল প্রভুরা ঠিক এই কাজটাই করছে। তারা আমাদের বুঝিয়েছে আমরা ‘ইউজার’ বা ব্যবহারকারী, কিন্তু আদতে আমরা হলাম ‘উপাত্তের খনি’ বা ‘ডেটা মাইন’।
সামন্ততন্ত্রে যেমন ভূমিদাস বা ‘Serf’-রা জমিদারের জমিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ফসল ফলাত আর বিনিময়ে পেত কেবল বেঁচে থাকার রসদ, আজ আমরাও ঠিক তাই করছি। গ্রিক অর্থনীতিবিদ ইয়ানিস ভারুফাকিস একেই চিহ্নিত করেছেন ‘টেকনো-ফিউডালিজম’ হিসেবে। তাঁর মতে, আমরা এখন আর পুঁজিবাদের যুগে নেই। পুঁজিবাদে মূল চালিকাশক্তি ছিল ‘মুনাফা’ (Profit) এবং ‘বাজার’ (Market)। কিন্তু আজকের ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাজার নেই, আছে ‘অলিন্দ’ বা ‘Fiefdom’।
ফেসবুক, গুগল বা আমাজনের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো হল সেই ডিজিটাল জমিদারি। এখানে কোনও মুক্ত বাজার নেই। আপনি যখন আমাজনে কিছু কেনেন, বা ফেসবুকে কিছু দেখেন, আপনি মার্ক জাকারবার্গ বা জেফ বেজোসের ব্যক্তিগত অ্যালগরিদমিক রাজত্বে বিচরণ করছেন। ভারুফাকিস বলছেন, এরা পণ্য বিক্রি করে যতটা না লাভ করে, তার চেয়ে বেশি লাভ করে ‘খাজনা’ আদায় করে। এই খাজনা টাকার অঙ্কে হতে পারে, আবার আমাদের মনোযোগের অঙ্কে হতে পারে।

আমরা সেখানে দিনরাত বেগার খাটছি। বিশ্বাস হচ্ছে না? ভেবে দেখুন, এই যে আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিলস দেখছেন, লাইক দিচ্ছেন, কমেন্টে তর্ক করছেন কিংবা চ্যাটজিপিটিকে দিয়ে লেখা লিখিয়ে নিচ্ছেন– এতে কার লাভ হচ্ছে? প্রতিটি ক্লিকে, প্রতিটি স্ক্রলে আমরা জেনারেট করছি অমূল্য ‘ডেটা’। এই ডেটাই হল একুশ শতকের ‘ফসল’ বা ‘ক্লাউড ক্যাপিটাল’। আমরা বিনামূল্যে কন্টেন্ট বানাচ্ছি, অ্যালগরিদমকে ট্রেন করছি, আর আমাদের সেই শ্রমের ওপর ভিত্তি করে ফুলেফেঁপে উঠছে টেক-জায়ান্টদের সাম্রাজ্য। তারা আমাদের কোনও পারিশ্রমিক দেয় না, দেয় শুধু ডোপামিনের ছোট ছোট কিস্তি– লাইক, শেয়ার আর ভিউজের লোভ।
সবথেকে ভয়ের কথা হল, আমরা আমাদের অজান্তেই আমাদের প্রভুকে আরও শক্তিশালী করে তুলছি। আমরা যত বেশি AI ব্যবহার করছি, তত বেশি সে আমাদের পছন্দ-অপছন্দ, দুর্বলতা আর কেনার ক্ষমতা সম্পর্কে জানছে। আমাদের ‘মৃত মেধা’ বা অলসতা আসলে তাদের কাছে কাঁচামাল। আমরা যত কম ভাবব, যন্ত্র আমাদের হয়ে তত বেশি ভাববে, আর ততই আমরা সেই যন্ত্রের মালিকের হাতের পুতুলে পরিণত হব। এটাই আধুনিক দাসত্ব– যেখানে শিকল দেখা যায় না, কারণ শিকলটা আমাদের হাতে নয়, আমাদের মগজে পরানো হয়েছে।
ইন্টারপ্যাসিভিটি: কেন আমরা বিদ্রোহ করি না?
এখন প্রশ্ন হল, আমরা কেন এই নতুন দাসত্ব মেনে নিচ্ছি? আমরা কি বুঝতে পারছি না যে আমরা শোষিত হচ্ছি?
এখানেই দার্শনিক স্লাভো জিজেকের ‘Interpassivity’ বা ‘আন্তঃনিষ্ক্রিয়তা’-র তত্ত্বটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। জিজেক বলছেন, সমস্যাটা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সমস্যাটা গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিক এবং মতাদর্শগত।

সাধারণত আমরা ‘ইন্টার-অ্যাকটিভিটি’-র কথা বলি, যেখানে মানুষ এবং যন্ত্র একে অপরের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ করে। কিন্তু জিজেক বলছেন, আমরা এখন এমন এক যুগে আছি যেখানে যন্ত্র আমাদের হয়ে আমাদের কাজটা করে দিচ্ছে, যাতে আমরা নিষ্ক্রিয় থাকতে পারি। একেই তিনি বলছেন ইন্টার-প্যাসিভিটি।
তিনি সিটকম বা হাস্যরসাত্মক অনুষ্ঠানের ‘ক্যানড লাফটার’-এর উদাহরণ দেন। টিভিতে যখন হাসির দৃশ্য আসে, তখন নেপথ্যে একটা হাসির শব্দ বাজানো হয়। জিজেক বলেন, ওই টিভি সেটটি তখন ‘আমার হয়ে হেসে দিচ্ছে’। আমি সারাদিনের ক্লান্তির পর বাড়ি ফিরে টিভি চালিয়ে বসে থাকি, আমার হাসার শক্তি বা ইচ্ছা না থাকলেও, টিভি আমার হয়ে সেই আবেগের কাজটা সেরে ফেলে, আর আমি এক অদ্ভুত স্বস্তি বোধ করি।
AI-এর যুগে এই ইন্টার-প্যাসিভিটি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখন শুধু হাসি নয়, আমাদের চিন্তা, বিচার এবং সৃজনশীলতা– সবই আমরা আউটসোর্স করে দিয়েছি। AI যখন আমাদের লেখা ঠিক করে দেয়, আমাদের হয়ে ইমেল ড্রাফট করে, বা আমাদের রুচি অনুযায়ী গান বেছে দেয়– সে তখন আমাদের হয়ে ‘উপভোগ’ বা ‘বাছাই’-এর কাজটা করে দিচ্ছে।
আমরা মানসিকভাবে এতটাই অলস বা ইন্টার-প্যাসিভ হয়ে পড়েছি যে, এই দায়িত্বটুকুও নিতে চাই না। আমরা চাই ‘ফ্রিকশনলেস’ জীবন। আমরা চাই না কোনও শিল্প আমাদের বিরক্ত করুক। আমরা চাই না কোনও চিন্তা আমাদের মাথায় চাপ ফেলুক। এই মানসিক পরাধীনতাই হল সেই আফিম, যা আমাদের টেকনো-ফিউডাল লর্ডদের পায়ে শিকল পরতে সাহায্য করছে। জিজেকের ভাষায়, আমরা জানি যে আমরা দাসে পরিণত হচ্ছি, কিন্তু আমরা একটা ‘সিনিকাল দূরত্ব’ বজায় রাখি– আমরা ভান করি যে আমরা সব বুঝি, কিন্তু কাজেকর্মে আমরা সেই দাসত্বকেই উপভোগ করি।

এই অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে কি তবে কোনও আলো নেই? আমরা কি অনন্তকাল এই ডিজিটাল লুপের মধ্যে আটকে থাকব, যেখানে আমাদের প্রতিটা অনুভূতি অ্যালগরিদম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত?
হয়তো আলোর রেখাটি লুকিয়ে আছে আমাদের ফেলে আসা ধুলোমাখা পথের বাঁকে। এই নিশ্ছিদ্র যান্ত্রিকতার পালটা উত্তর হতে পারে আমাদের লোকজ সংস্কৃতি বা লোকশিল্প।
কেন লোকশিল্প? কারণ প্রযুক্তির নিখুঁত দুনিয়ায় লোকশিল্পই একমাত্র আশ্রয় যা ‘অপূর্ণ’, পারফেক্ট নয়। AI যেখানে নিখুঁত ও মসৃণ তোষামোদ করে, লোকশিল্প সেখানে অমসৃণ, কাঁচা এবং মানবিক ভুলে ভরা। মাটির পুতুলের বাঁকা হাসি, পটের গানের সামান্য বেসুরো টান, বা যাত্রাপালার অতিরঞ্জিত অভিনয়– এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যন্ত্র নই। জীবন সবসময় ‘পারফেক্ট’ হতে হয় না, আর শিল্পের কাজ সবসময় মন জোগানো হতে নেই।
‘ক্লাউড’ বা মেঘে ভেসে থাকার এই মরীচিকা ছেড়ে লোকশিল্প আমাদের ধপাস করে মাটিতে নামিয়ে আনে। এখানে কোনও অ্যালগরিদমের দেয়াল নেই, আছে রক্তমাংসের মানুষের সরাসরি সংযোগ। এখানে ‘ভালো হয়েছে’ বলার জন্য কোনও লাইক বাটন টিপতে হয় না, বরং শিল্পীর ঘামের গন্ধ আর দর্শকের হাততালির শব্দ একাকার হয়ে যায়।

টেকনো-সামন্ততন্ত্রের এই মায়াজাল ছিঁড়তে হলে আমাদের হয়তো সেই অমসৃণ, অগোছালো এবং ‘ডিস্টার্বিং’ বাস্তবতার কাছেই ফিরে যেতে হবে– যেখানে তোষামোদ নেই, আছে প্রাণের স্পন্দন। সেখানেই হয়তো আমরা আমাদের বন্ধক দেওয়া মগজ আর হারিয়ে যাওয়া ‘আমি’কে পুনরায় খুঁজে পাব যন্তরমন্তরের ঘরের দেওয়াল ভেঙে। এই দেওয়াল ভাঙার এবং তোলার কাজটি আসলে অবিরাম, কারণ হীরকের রাজা জানে ‘ওরা যত বেশি পড়ে তত বেশি জানে তত কম মানে’, আর উল্টোদিকে উদয়ন পণ্ডিতেরা আমাদের ক্রমাগত জিজ্ঞাসা করে চলেছেন ‘তোমাদের এতদিন যা শিখিয়েছি, তা ভোলোনি তো?’
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved