
উৎস আলপনা হলেও, সমীর এখানে সেই রূপকল্পকে তাঁর দীর্ঘ শিল্প-উপলব্ধি আর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এক উন্মুক্ত চরাচরে পৌঁছে দিয়েছেন। ছবির প্লাস্টিক ধর্ম অর্থাৎ, ছবির রেখা, রং, স্পেসকে তিনি নিংড়ে নিয়ে এক নতুন চিত্রভাষার জন্ম দিয়েছেন। আলপনার যে সীমাবদ্ধতা সেই পেলব ভঙ্গিকে তিনি দুমড়ে-মুচড়ে এক জ্যামিতিক রূপের সঙ্গে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন! রেখার লিনিয়রাটি, রেখার সংযোগস্থানে কোণসৃষ্টি কিংবা ত্রিভুজ বা চতুষ্কোণের উপস্থিতি আলপনার রূপকে বর্তমান সময়ের নিষ্পেষণে এক যান্ত্রিক যন্ত্রণাদীর্ণ ফর্মে রূপান্তরিত করেছে!
সমীর আইচের চিত্রকলা সম্পর্কে শিল্পকলা-উৎসুক মানুষের মনে একটা ধারণা আছে! তিনি দীর্ঘদিন ধরে ছবি এঁকে যাচ্ছেন, মূলত অবয়ব নিয়ে সেইসব কাজ। সেই ফিগারেটিভ কাজে ভাঙন আছে, ডিসটরশান আছে, অবয়বকে পেরিয়ে একটা আধা-বিমূর্ত স্পেস তৈরির প্রচেষ্টা থাকে। সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর ছবিতে একটা মানবিক সূত্র লীন হয়ে থাকে সবসময়, ব্রিটিশ ভাস্কর হেনরি মুরের ভাষায় যাকে বলা যায়– ‘হিউম্যান এলিমেন্টস’!

সমীর আইচের যাপিত জীবন, তাঁর রাজনৈতিক সত্তা, তাঁর প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব যেন প্রতিফলিত হয় তাঁর সব শিল্পকলাতেই! তাঁর সৃষ্টি আর আচরণের মধ্যে কোনও পৃথক সত্তা গড়ে ওঠে না কোথাও! তাঁর রেখার মধ্যে যে দৃঢ় কৌণিকতা, তাঁর ফর্মে যে ইস্পাত-কঠিন বন্ধন, তাঁর স্পেস ছেড়ে রাখার মধ্যে যে-আত্মবিশ্বাস, তা তাঁর জীবনকেই ব্যপ্ত করে দেয় নিজের চিত্রপটে! শিল্পী সমীর আইচকে দেখলেই মনে হয় তিনি একটা কিছু ঘটিয়ে ফেলবেন এক্ষুনি, আর তা বলিষ্ঠভাবে ফুটে উঠবে তাঁর দৈনন্দিন কাজে কিংবা তাঁর চিত্রপটে! হয় তিনি মিছিলে হাঁটবেন, কখনও তিনি টিভিতে সাবলীলভাবে নিজের বক্তব্য রাখবেন, অগ্রজ শিল্পীদের ডেকে এনে শ্রদ্ধা ও সংবর্ধনা জানাবেন কিংবা দুঃস্থ শিল্পীদের জন্য ‘শিল্পী আস্থা’ গড়ে তুলবেন আবার পর মুহূর্তেই ক্যানভাসের ওপর ঘটিয়ে ফেলবেন তুমুল বিক্ষোভ, তীব্র টানাপোড়েন! এইভাবে তাঁর জীবনচর্চাই বিচ্ছুরিত হয় তাঁর তুলিতে, রঙে আর টেক্সচারে!

কিন্তু এবারে যে ঘটনাটা তিনি ঘটিয়ে ফেললেন, তা সম্পূর্ণ অভাবনীয়! এই বয়সে এসে নিজের ‘সিগনেচার’কে হঠাৎ বদলে ফেলতে বুকের পাটা লাগে যেকোনও শিল্পীর। পৃথিবীর খুব বেশি শিল্পী এটা পারেননি! পিকাসো পেরেছিলেন, এদেশে সুনীল দাস কিছুটা পেরেছিলেন। তবে সমীর আইচ যে-সংবেদনশীলতা নিয়ে কাজ করেন, তাতে আমাদের মনে হত যে, একদিন তিনি হয়তো এই বিন্দুতে পৌঁছবেন, যেখানে তিনি শিল্পের বহির্মুখ ছেড়ে অন্তর্মুখের দিকে প্রবেশ করবেন! ফিগারেটিভ কাজ ছেড়ে বিমূর্ততা স্পর্শ করতে চাইবেন! যেমন মাতিস বা নন্দলাল বসু শেষজীবনে করতে চেয়েছিলেন, একে হয়তো শিল্পের উচ্চমার্গে পৌঁছে শিল্পের লীলাখেলা বলা যায়! সেখানে লেখা, রং, স্পেস এক ইথারীয় তরঙ্গে একাকার হয়ে যায়!

সমীর আইচ বলেছেন যে, এবারের তাঁর আঁকার উৎস ভারতীয় লৌকিক আলপনার ফর্ম! আলপনার মধ্যে যে লিরিকাল ফর্ম, তা মানুষের কৌমচেতনার কাছে যুগে যুগে আবেদন রেখে এসেছে। অথচ তা আধুনিক শিল্পীদের হাতে খুব একটা বিকশিত হয়নি! ফলে আলপনা তার বিশুদ্ধ রূপ নিয়েই রয়ে গিয়েছে! লৌকিক ফর্মকে আধুনিক শিল্পকলার বিবর্তনে ব্যবহার পিকাসো করেছেন আফ্রিকান মুখোশ থেকে, মাতিস পার্সিয়ান গালিচা থেকে, ভ্যান গগ জাপানি উড কাট থেকে, যামিনী রায় কালিঘাট পট থেকে প্রভৃতি। আলপনার রেখার আদল যোগেন চৌধুরীর অনেক ফুল, শাখাপ্রশাখার ড্রয়িংয়েও এসেছে আগে। এবারে সমীর আইচ খুব সচেতনভাবে সেই আলপনার ফর্মকে প্রসারিত করে দিলেন এক বৃহত্তর প্রান্তরে।

উৎস আলপনা হলেও, সমীর এখানে সেই রূপকল্পকে তাঁর দীর্ঘ শিল্প-উপলব্ধি আর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এক উন্মুক্ত চরাচরে পৌঁছে দিয়েছেন। ছবির প্লাস্টিক ধর্ম অর্থাৎ, ছবির রেখা, রং, স্পেসকে তিনি নিংড়ে নিয়ে এক নতুন চিত্রভাষার জন্ম দিয়েছেন। আলপনার যে সীমাবদ্ধতা সেই পেলব ভঙ্গিকে তিনি দুমড়ে-মুচড়ে এক জ্যামিতিক রূপের সঙ্গে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন! রেখার লিনিয়রাটি, রেখার সংযোগস্থানে কোণসৃষ্টি কিংবা ত্রিভুজ বা চতুষ্কোণের উপস্থিতি আলপনার রূপকে বর্তমান সময়ের নিষ্পেষণে এক যান্ত্রিক যন্ত্রণাদীর্ণ ফর্মে রূপান্তরিত করেছে! আর তাঁর এবারের কাজের সবচেয়ে আশ্চর্যসুন্দর বিষয় হল, তাঁর ক্যানভাসে স্পেসের বা শূন্যতার ব্যবহার। এইসব ছবিতে যত না রেখা আছে, রং আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি অংশ শূন্য করে রাখা আছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘শূন্য করে ভরে দেওয়া যাহার খেলা’! এই অসামান্য স্পেসের ব্যবহার খুব বড় মাপের শিল্পবোধের পরিচয়, আর এ যেন এক দার্শনিকতা আর ধ্যানময়তাকে স্পর্শ করে ফেলা!

একটা ছবিতে সমীর নিখুঁতভাবে আলপনার ডিজাইন এঁকেও তার ওপর লাল রেখার দুর্মর ব্রাশ চালিয়েছেন, ভেঙে দিতে চেয়েছেন ওই ছবির ছন্দ! শঙ্খ ঘোষের ‘কল্পনার হিস্টেরিয়া’ গ্রন্থে এইরকম উল্লেখ আছে যে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একবার পুরো নিখুঁত ছন্দে কবিতা লিখে শেষকালে ছন্দ ভেঙে সচেতনভাবে একটা লাইন লিখেছিলেন কিংবা শিল্পী সুনীল দাস তাঁর ছবিতে রীতি মেনে ড্রয়িং করেও শেষ পর্যায়ে তাকে নির্মমভাবে বিকৃত করেছিলেন!

আলপনার আর একটা বড় সীমাবদ্ধতা– তার ডেকরেটিভ প্যাটার্ন! সমীর তাঁর ছবিতে এই আলংকারিক প্রবণতা বা সিমেট্রি তছনছ করে দিয়েছেন অসীম শিল্প নিপুণতা আর প্রগাঢ় চিত্রপ্রজ্ঞায়! আলপনাকে আধুনিক চেতনায় তিনি যেন বিনির্মাণ করেছেন।
সমীর আইচ আলপনা থেকে যাত্রা শুরু করলেও দিনের শেষে এ যেন পল ক্লির ছবির ‘প্লেফুলনেস’-এর কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়! শিশুদের ছবির মতো এক ‘অহৈতুকী’ মজার আনন্দে এইসব ছবি কখন যেন নির্মিত হয়ে যায়, সচেতন কোনও অভিপ্রায় ছাড়াই! আর একটা কথাও মনে হয় যে, এইসব ছবির মধ্যে এক অন্তর্লীন সুর যেন ধরা পড়ে।

ক্লাসিক মিউজিকের চেতনা তাঁর ছবিতে প্রোথিত করে দিতে চেয়েছিলেন কানডিনস্কি, যিনি ছিলেন অরগ্যানিক বিমূর্ত শিল্পের জনক। সমীর আইচের এইসব সৃষ্টিতে মন্দ্রিয়ানের ছবির জ্যামিতি, মিরোর ছবির বিস্ময়ও জেগে থাকে, যা দেখে বোঝা যায় যে, শুধু লৌকিক আলপনা নয়, বিশ্ব শিল্পকলার জগৎটা তিনি পরিভ্রমণ করেছেন নিবিড়ভাবে আর তার সারাৎসার তুলে এনেছেন এইসব ছবিতে! এইসব কাজে বিমূর্ততা থাকলেও লৌকিক ফর্ম আলপনাকে ছুঁয়ে আছে বলে শেষপর্যন্ত একটা ‘হিউম্যান এলিমেন্ট’ জড়িয়ে থাকে এইসব ছবির সর্বাঙ্গে।

গত দেড় বছর ধরে নির্মাণ করা এইসব চিত্রকলার প্রদর্শনী শুরু হয়েছে রিজেন্ট এস্টেটের বিসিএএফ গ্যালারিতে ১৩ মার্চ, শুক্রবার থেকে। চলবে ৩১ মার্চ অবধি! শিল্পী হিসেবে সমীর আইচের এই ‘নবজন্ম’ বা ‘রেজারেকশান’-এর অবশ্যই সাক্ষী থাকা প্রয়োজন শিল্প-পিপাসু দর্শকবৃন্দদের!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved