
আমাদের গিয়েছে যে উলের দিন, একেবারেই কি গিয়েছে? কিছুই কি নেই বাকি? শীত পড়েছে যখন জাঁকিয়ে, পুরনো গরম জামার মধ্যে থেকে, কখনওসখনও বেরিয়ে পড়ে আমাদের পুরনো শীত, পুরনো উলে-বোনা গরম জামার দিনকাল। নয়ের দশক থেকে ধীরে ধীরে এই বদলে যাওয়া পৃথিবীতে, সেই উল-বোনা জামা অনেকটা টাইমমেশিন।
উল। ভেড়া। মেষ। মেষপালক। গোধূলি নেমে আসা বিকেলে, অস্তগামী সূর্যের সামনে দিয়ে এগিয়ে আসছে বাদামি চুলের দীর্ঘকায় মেষপালক, তার সামনে শ্বেতবর্ণ ভেড়ার পাল– এহেন দৃশ্যের কথা ভাবলেই, অশান্ত মন নরম হয়ে আসে। লোককথায় ভিন্নঅর্থে যিশুখ্রিস্টকে ‘মেষপালক’ বলা হয়। ঠিক যেমন শ্রীকৃষ্ণকে ‘গোঠের রাখাল’ বলা হয়। উত্তরের হাওয়া যত তীব্র হয়, তত বেশি করে সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়– ‘কৃষ্টে আর খ্রিস্টে’ তফাত মুছে যায়। ‘আমি’ আর ‘তুমি’ মিলে ‘আমরা’ হয়ে যায়। শীতের পড়ন্ত বেলায় জীবন তখন ওমে জড়াতে চায়। ওম অর্থে উষ্ণতা। হাতে বোনা উলের দস্তানার ওপর কাঁটার ফোঁড়ে আদরের মানুষটির নাম ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে, বুনি পিসির শাড়ির কোল থেকে উলের গোলাখানি গড়িয়ে যায় অনন্তের দিকে…
ভেড়ার পশম থেকে উল তৈরি হয়। ঘাড়ের পশম থেকে মোলায়েম অথচ পোক্ত উল প্রস্তুত হয়। আবার গলার পশম থেকে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের উল তৈরি হয়। সামনের পায়ের পশম থেকে তৈরি উল ততখানি জুতের নয়, যতখানি মজবুত ও আঁশ ওঠা রোঁয়া থাকে পিছনের পা থেকে পাওয়া উলে। এছাড়া কিছু বিশেষ প্রজাতির ছাগল, খরগোশ প্রমুখ প্রাণীর পশম থেকেও উল তৈরি হয়। এই মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়া উল উৎপাদনে সারা পৃথিবীতে প্রথম স্থানে। আর ভারত নবম স্থানে। এদেশের কাশ্মীর, রাজস্থান, গুজরাত প্রমুখ অঞ্চলে উল উৎপাদন হয়। তবে তা পরিসংখ্যান মাত্র। সেটা নিতান্তই বাহ্যিক। পরিসংখ্যান দিয়ে যদি সব মাপা যেত, তাহলে শতকরা ৮০ ভাগ ইমোশনাল কমপ্যাটিবিলিটি নিয়ে, প্রেমের বিয়ে বা তথাকথিত লাভ ম্যারেজগুলো ভেঙে যেত না।

একটা সময় ছিল, যখন শীত আর উল ছিল সমার্থক। শহর ও মফস্সলের বিশেষ স্টেশনারি দোকানগুলোতে তখন শীতের শুরুতে সাদা ও রঙিন উলের গোলা থাকত। থাকত উল বোনার হরেক নম্বরের কাঁটা। আরেকটু ভ্যারাইটি খুঁজলে কলকাতার বড়বাজার বা শিয়ালদহ মার্কেট বা গড়িয়াহাট থেকে দেশি-বিদেশি উলের গোলা কিনে আনত বাড়ির পুরুষরা, মা-বউদের মুখে হাসি ফোটাতে। শীতের দুপুরে নরম রোদে পিঠে খোলাচুল বিছিয়ে বাড়ির বউদের মুখ আর উলের কাঁটার স্পিড দুই দ্রুতবেগে চলত– ‘পিন্টুর মা বিধানকে এমন বশ করল, যে বেচারা সারাজীবন আইবুড়ো থেকে গেল। পিন্টুর বাবা তো মদ খেয়ে সব উড়িয়ে দেয়। বিধানের স্কুল মাস্টারির টাকাতেই তো সংসার চলে। বিধানের বাপে তো সব দেখেও চোখ উল্টে থাকে। বিধান স্কুলে যাওয়ার আগে পিন্টুর মা নাকি ভাতের গরাস পাকিয়ে পিন্টু আর বিধানকে একসঙ্গে খাইয়ে দেয়। বলি কত রঙ্গ দেখাবি টিয়ে, তুলসীতলায় আঁশ ছড়িয়ে…’ পাড়ার এক গিন্নির মুখে এই কথা শুনে ঝালমরিচমাখা হাসির রোল উঠত আড্ডায়। আর এইভাবেই দুপুর গড়ানো বিকেলগুলো জুড়ে তৈরি হত আমাদের সোয়েটার, হাতমোজা, নকশাকাটা মাফলার।
তখন তো মোবাইল ফোন ছিল না। ট্রেনে লেডিস কম্পার্টমেন্টে যাঁরা অনেক দূরে ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করতেন, তখন তো তাঁদের ফোনে মাইক্রোড্রামা দেখে টাইম কিল করার সুযোগ ছিল না। তাঁরা উল বুনতেন। কাঁটার দিকে চোখ সোজা রেখে। ট্রেনের দুলুনিতে সোজা উল্টো গন্ডগোল যাতে না হয়, যাতে অনেকখানি বোনার পর ঘর পড়ে না যায়। তাহলে তো সেই ঘরপড়া জায়গাটা ছ্যাঁদা হয়ে ফড়ফড় করে খুলে যাবে… আর এতখানি স্বপ্নবুনন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। তাই ডেলিপ্যাসেঞ্জারির উলবোনা রমণীদের চোখ, উলের কাঁটা থেকে সরত না।

আমার চেনা এক পাড়াতুতো ঠাকুরমার আবার নেশা ছিল, ফি-বছর শীতে একখানা অন্তত উলের জিনিস বানাবে। এক বছর বড় ঘরের নাতির সোয়েটার, তো তার পরের বছর সেজঘরের নাতনির দুইরঙা উলটুপি। কোলচাঁছা ছোটছেলেটার বিয়ের পর মাস না-ঘুরতেই ছোটবউ পোয়াতি হয়েছিল। কর গুনে ঠাকুমা দেখেছিল, প্রসববেদনা ছোটবউয়ের শীতেই উঠবে। সেবার সারা বছর ধরে সদ্যোজাত বাচ্চার গা ঢাকা সোয়েটার, উলের পা মোজা, টুপি, ঝরা উল ভরে কাঁথা ঠাকুমা বানিয়েছিল। না। শীতে ছোটবউয়ের প্রসব বেদনা ওঠেনি। তার আগেই কলতলায় ভরাপেটে আছাড় খেয়ে… ঠাকুমা ততদিনে প্রায় একটা বড় ডালডার টিনভর্তি ছোট বাচ্চার উলের জিনিস বানিয়ে ফেলেছে। চান্স পেয়েই বড় বউ কথা শুনিয়েছিল, ‘বাচ্চা জন্মের আগে কেউ বাচ্চার জিনিস গড়ে? ঘোড়া কেনার আগেই চাবুক কিনে ফেললে, আর ঘোড়া ঘরে ঢোকে না।’ ঠাকুমা সেই উলের বানানো জিনিসগুলো প্রাণে ধরে ফেলতে পারেনি। কে জানে, খুব শীতের রাতে বুড়ি গোপন তোরঙ্গ খুলে সেই জামাগুলো বুকে জড়িয়ে, ওম নিত কি না… যে শিশু পৃথিবীতে এল না তার ওম… নাকি এই ওম তার বিশ বছর আগে যক্ষায় পট্ করে মরে যাওয়া স্বামীর… যে আর কোনও দিন ফিরে আসবে না! সব হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ওম-উষ্ণতা কি একই হয়? উল তা ধরতে পারে? যে উলে শীতের দেশের ভেড়ার শরীরের তন্তু মিশে আছে… মিশে আছে মেষপালকের চোখের জল? হ্যাঁ। উল অনেকটাই পারে। মেয়েদের হাইস্কুলে ওয়ার্ক এডুকেশনের জন্য কাঁচা হাতের রিপ বুননের সবুজ মাফলার বুনতে গিয়ে ফার্স্ট গার্লের যদি মনে পড়ত বয়স স্কুলের একই ক্লাসের অঙ্কে ভীষণ কাঁচা ছেলেটির মুখ! তখন কী হবে? কী আর হবে! যা হওয়ার তাই হত। সব সর্বনাশের দায় তো শীতের উলের গোলা নেবে না। তার ভারি বয়েই গিয়েছে, কার মনের মাফলারে কার মুখ ভেসে ওঠে তার হিসেবনিকেশ রাখতে! এমনিতেই উল বড্ড ইমোশনাল। আবেগী। দুনিয়াদারির অঙ্কে সে কাঁচা।

দুনিয়াদারির অঙ্কে কাঁচা হলে, হিসেব না-জানলে একদিন খেলার মাঠ থেকে অযোগ্যের হাতে ঘাড়ধাক্কা খেয়ে বেরিয়ে যেতে হয়। উলের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ন্যাচারাল ফাইবার খাঁটি উলের ব্যবহার কমেছে। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে অ্যাক্রিলিক বা পলিয়েস্টার জাতীয় কৃত্রিম, সিন্থেটিক ফাইবার। চটকদার, সস্তা, বাহারি, দাম আয়ত্তের মধ্যে। দোকানে গেলেই ঝপ করে কিনে ফেলা যায়। কিছুদিন পরার পর, ছিঁড়ে গেলে, ডাজ নট ম্যাটার। ততদিনে পয়সা উসুল হয়ে গিয়েছে।
হাতে বোনা উলের সোয়েটার হল অভিমানী প্রেমিক বা প্রেমিকার মতো। কথায় কথায় যার নাকের পাটা ফুলে যায়। একটু এদিক-ওদিক হলেই বিগড়ে যায়। খাঁটি উলের জিনিস ব্যবহারের অনেক নিয়ম। তাকে যত্ন করে নিমপাতা, ন্যাপথলিন ভাঁজে রাখতে হয়, যাতে পোকা না কাটে। উষ্ণ জলে আলতো হাতে ধুতে হয়। সরাসরি তীব্র রোদে না দিয়ে, হালকা রোদে শুকোতে হয়। আজকের শশব্যস্ত সময়ে মানুষ নিজেকেই সামলিয়ে উঠতে পারছে না! সেখানে উল নিয়ে এত রঙ্গ-তামাশা সে করবে কীভাবে? তাই অভিমানী প্রেমিক বা প্রেমিকা বা হাতে বোনা ন্যাচারাল ফাইবার উলের সোয়েটার আমাদের জীবন থেকে প্রায় বিদায় নিয়েছে। সে জায়গায় শর্টটার্ম সিচুয়েশনশিপের মতো নানা ব্র্যান্ডের সিন্থেটিক উলেন সোয়েটার, স্টোল, পলিয়েস্টার কটন ব্লেজার জায়গা নিয়েছে। অনেক রং। অনেক অপশন। তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় রিচ বাড়াতে দিনে দুটো ইনস্টা-স্টোরি পোস্ট করতে হয়। সেসব হাতে বোনা সোয়েটার পরে করা যায় না। আর সোয়েটার বুনবেটাই বা কে? পাড়ার মা, কাকিমা, বউদি, জেঠিমারা এখন তো সবাই অবসরে ইনফ্লুয়েন্সার। রিল বানায় সবাই। অনেকগুলো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ফোনে। সেখানে সবার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে অহরহ ট্যালেন্ট জাহির করতে হয়। তুমি বকফুলের বড়া বানালে, আমি পোস্ত আর কর্নফ্লাওয়ারের ব্যাটার বানিয়ে তাতে নিমপাতা চুবিয়ে ভেজে দেব। তোমাকে যদি টিভিতে দিদি নম্বর ওয়ানে দেখা যেতে পারে, আমিও নিজের ধেই নৃত্যের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে, বুস্ট করে ভাইরাল হতে পারি। ঠাকুমারা আজকাল প্রায় সবাই বৃদ্ধাশ্রমে। বা একা বাড়িতে থাকে। চোখের ছানি অপারেশনের পরে চারটে চোখের ড্রপ একহাতে দিতে হয়। নিঃসঙ্গ নিস্তরঙ্গ জীবনে ঘোলাটে দৃষ্টি আজ আর শীতের দুপুরে উলবোনায় উষ্ণতা খোঁজে না। একা থাকার অবসাদে চুল্লির আগুনে চুল্লির সুড়ঙ্গপথ তার প্রিয় মনে হয়।

আজ আমাদের জীবনের শীতকালে উল শেষ বিদায়ের যাত্রাপথে! আমরা সেই অভিশপ্ত হোমো স্যাপিয়েন্স, যারা সারাদিন হই হই করে কাটানোর পর, রাতের ঘন অন্ধকারে দুম করে একা হয়ে যাই। আমাদের ঘুম আসে না রাতে। হাবিজাবি রিল স্ক্রোল করতে করতে চোখের পাতা এঁটে আসে। স্বপ্নে হাতছানি দেয় আজ্ঞাবাহী এ আই প্রেমের দোসর। আজ আমাদের জীবনের শীতকালগুলোতে উল খুব দরকার– খাঁটি ন্যাচারাল ফাইবার, ভেড়ার পশমের উষ্ণতার মতো রাশি রাশি রঙিন নরম উল ঝরে পড়ুক ‘তুমি’-র সমার্থকে। আজকের ভালোবাসাহীন জীবনে, নিঃশর্ত চুম্বনের আশ্লেষে প্রতিটা শীত জুড়ে ‘উল’ ছেয়ে থাক, এই কামনায় আমি মনে মনে তোমার দিকে ছুড়ে দিতে থাকি লাভ পার্পল রঙের উলের গোলা। আগামী শীতে সেইসব উল বুনে ভালোবাসা তৈরি হবে নিশ্চিত। আমি না থাকলেও, আমার উলের ভালোবাসা প্রতিটা শীতে তোমার বরাদ্দ হয়ে থাকবে…
……………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন পারমিতা মুন্সী-র অন্যান্য লেখা
……………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved