biva chowdhury unremembered bengali scientist। Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

উপেক্ষার পৃথিবীতে বিভা চৌধুরী যেন মেঘে ঢাকা তারা

১৯৪৭ সালে ব্রিটেনের এক বিজ্ঞানী ড. সিসেল পাওয়েল ফুলটোন ফটোগ্রাফিক প্লেট ব্যবহার করে এই একই পরীক্ষা করেন। স্বাভাবিকভাবেই সফল হন তিনি। বিভা চৌধুরীর দেখানো পথই তিনি অনুসরণ করেছিলেন। ১৯৫০ সালে নোবেল পুরস্কারের সম্মানিত করা হয়েছিল সিসিল পাওয়েলকে। সিসেল পাওয়েল তাঁর বক্তৃতায় বিভা চৌধুরীর এই মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে কাজের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন। তবে ওই অতটুকুই। বিভা চৌধুরীর কাজের কথা আর কোথাও প্রকাশিত হয়নি।

Published by: Robbar Digital

Posted:January 17, 2026 5:59 pm | Updated:January 17, 2026 5:59 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

বসু বিজ্ঞান মন্দির-এর একটি ল্যাবরেটরিতে নিবিষ্ট মনে কাজ করে চলেছেন গবেষক ড. দেবেন্দ্রমোহন বসু। পরীক্ষাগারে গবেষণায় একবার নিজেকে নিয়োজিত করলে হুঁশ থাকত না তাঁর। নিজের কাজের ব্যাপারেও যথেষ্ট খুঁতখুঁতে ছিলেন। এদিকে তাঁর ল্যাবরেটরির বাইরে অপেক্ষারত মেয়েটি এই নিয়ে তিনদিন এসে বসে রয়েছে! একবার যদি মাস্টারমশাইয়ের দেখা পাওয়া যায়।

সদ্য পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছে মেয়েটি। সময়টা ১৯৩৬ সাল। একে তো পদার্থবিজ্ঞানের মতো বিষয়। এই নিয়ে পড়াশোনা করছে কোন মেয়ে! যাবতীয় সাবধানবাণী, বিস্ময়-মাখানো দৃষ্টি, তির্যক মন্তব্যের গণ্ডি পার করে এসেছে মেয়েটি। সে তখন জেদি। দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডক্টর দেবেন্দ্রমোহন বসুর কাছেই গবেষণা করবে। পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়ে মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণা করবে এমনটা মনস্থির করেই রেখেছে। কিন্তু মাস্টারমশাই যে কিছুতেই সময় দিতে পারছেন না। অবশেষে একদিন দিলেন।

মেয়েটির রেজাল্ট চমকে দেওয়ার মতো। তার গবেষণায় আগ্রহ, মেধা পছন্দ হয়েছিল দেবেন্দ্রমোহন বসুর। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে মেয়েদের করার মতো কাজ কোথায়! তাই অধ্যাপক দেবেন্দ্রমোহন বসু রাজি হলেন না। মেয়েটিও হাল ছাড়ার পাত্রী নয়। দেবেন্দ্রমোহন বসুর সঙ্গেই গবেষণা করবে, একেবারে পণ করেই এসেছিল রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে। মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে কাজ করতে চায় সে, অধ্যাপক বসুকে নির্দ্বিধায় জানায় মেয়েটি। তার জেদ প্রবল। যথেষ্ট মেধাবি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৬ সালের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী ব্যাচের একমাত্র ছাত্রী ছিল সে। পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শুরু হওয়ার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ তৃতীয় ছাত্রী ছিল সেই মেয়েটি। তার ইচ্ছে, স্বপ্ন এবং প্রবল আগ্রহ দেখে অবশেষে রাজি হলেন ডিএম বসু। এভাবেই দেবেন্দ্রমোহন বসুর অধীনেই প্রথমবার মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ পেয়েছিলেন বিভা চৌধুরী,  প্রথম বাঙালি মহিলা পদার্থবিদ।

zoom
বিভা চৌধুরী

বিভা চৌধুরী যে সময় নিরলসভাবে পড়াশোনা ও গবেষণার কাজ করেছেন, তখন নারীশিক্ষার পরিসর তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মসমাজ তখন নারীশিক্ষা নিয়ে নানা দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। সাহিত্যিক হিসেবে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনও আত্মপ্রকাশ করেছেন। নারী অগ্রগতি, নারীশিক্ষার স্রোত বইতে শুরু করেছে।

বিভা চৌধুরীর আরেকটি বাড়তি সুবিধা ছিল। তিনি মুক্তমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবা বঙ্কুবিহারী চৌধুরী ছিলেন ডাক্তার। হুগলি জেলার ভাণ্ডারহাটি গ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়াশোনা করেছিলেন। সেই সূত্রেই আলাপ হয়েছিল উর্মিলা দেবীর সঙ্গে। উর্মিলা দেবীর পরিবার ব্রাহ্মধর্ম অবলম্বনকারী ছিলেন। তাঁর বোন নির্মলা দেবী ছিলেন ডাক্তার নীলরতন সরকারের স্ত্রী। উর্মিলা দেবীর পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে বঙ্কুবিহারী চৌধুরীর। ব্রাহ্মধর্মের নীতি, কাজ ভালো লেগে যায় তাঁরও। তিনি নিজেও এই ধর্ম অনুসরণ করেন। পরবর্তীকালে উর্মিলা দেবীর সঙ্গেই বিয়ে হয়েছিল বঙ্কুবিহারী চৌধুরীর। তবে মোটেই এই পথ সহজ ছিল না। ব্রাহ্মধর্ম অবলম্বন করার অপরাধে নিজের ভিটেমাটি ছাড়তে হয় তাঁকে। স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। ব্রড স্ট্রিটে একটি ছোট্ট বাড়িভাড়া করে বসবাস শুরু করেছিলেন।

১৯১৩ সালে জন্ম হয় বিভা চৌধুরীর। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের পরিবারে বিভা চৌধুরী সব সময়ই পড়াশোনার পরিবেশ পেয়েছেন। এমনকী তাঁর অন্য ভাইবোনরাও যথেষ্ট কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন। বিভার বড়দি রমা চৌধুরী ব্রাহ্ম বালিকা স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। আরেক বোন নীলা চৌধুরী যাদবপুর বিদ্যাপীঠের শিশু বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন দীর্ঘদিন। ছোট বোন উমা চৌধুরী সোশাল সাইকোলজি-তে ডক্টরেট। নারীশিক্ষার অগ্রগতির যুগ শুরু হয়ে গেলেও বিজ্ঞানে মেয়েদের প্রবেশাধিকার তখনও সেভাবে ছিল না। এক্ষেত্রে বিভাকে সৌভাগ্যবতী বলা চলে। পারিবারে পড়াশোনার পরিসর পেয়েছেন বরাবর। তাই নিজের পছন্দমতো বিষয়ে গবেষণা করায় পারিবারিক বাধার মুখোমুখি হতে হয়নি।

zoom
বিভা চৌধুরী (বাঁ-দিকে)

কলকাতার বেথুন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে বিভা কলেজে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর ১৯৩৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে ভর্তি হন। পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তখনকার সময়ে সে ছিল এক গর্বের বিষয়! ‌বিভা চৌধুরী ছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সময় পদার্থবিদ্যার স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ ছাত্রীর সংখ্যা ছিল মাত্র দুই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেই নিজের স্বপ্নের পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যান বিভা।‌ গবেষণার জন্য যোগ দেন বসু বিজ্ঞান মন্দিরে। দেবেন্দ্রমোহন বসুর অধীনে মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে কাজ করেন। বিভা চৌধুরীই ছিলেন প্রথম মহিলা পদার্থবিদ যিনি এই বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন।

গবেষণার ক্ষেত্রে বরাবর নিষ্ঠাবান ছিলেন বিভা চৌধুরী। অন্তরালে থেকেই কাজ করতে ভালোবাসতেন। ক্লাউড চেম্বার বা মেঘকক্ষের সাহায্যে মহাজাগতিক কণার ভর নির্ণয় করার চেষ্টা করছিলেন বিভা চৌধুরী ও দেবেন্দ্রমোহন বসু। কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। ক্লাউড চেম্বার বা মেঘকক্ষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু অসুবিধা ছিল। বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টায় মন দেন বিভা চৌধুরী। এই পথের খোঁজ করতে গিয়েই তিনি জানতে পারেন মারিয়েটা ব্লাউ নামে এক পদার্থবিজ্ঞানীর কথা। সেই সময় ভারতে সায়েন্স কংগ্রেস উপলক্ষে একটি বিশেষ আলোচনায় মারিয়াটা ব্লাউ-এর কথা বলেন বোথে ও টেলর। এ নিয়ে পরে কাজ শুরু করেন বিভা চৌধুরী ও দেবেন্দ্রমোহন বসু। এই পরীক্ষাটি করার জন্য তাঁরা ফটোগ্রাফিক প্লেট ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। ডিএম বসু এবং বিভা চৌধুরী দু’জনেই এই গবেষণা করার জন্য ১৯৩৮ সালে সান্দাকফু পর্বতশৃঙ্গে প্রায় ১২,০০০ ফুট উচ্চতায়, বহুদিন ধরে মহাজাগতিক রশ্মির সামনে উন্মুক্ত ফটোগ্রাফিক প্লেট ব্যবহার করে পরীক্ষাটি করেন। তাঁরা দেখেন এই প্লেটে মহাজাগতিক রশ্মি এসে পড়লে প্লেটে থাকা আয়োডাইড সিলভার অর্থাৎ, রুপো ও আয়োডিনে ভেঙে যায়। পরে তা আটকে থাকে প্লেটে। এই প্লেটটি রশ্মির গতিপথের ক্ষেত্রে একটি প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। প্লেটে থাকা বিন্দুগুলো মৌলিক কণার গতিপথ নির্ধারণ করে। এই পরীক্ষাটি করার সময় বিভা চৌধুরী এবং দেবেন্দ্রমোহন বসু কোনও রকম মেঘকক্ষের সাহায্য নেননি। বিভা চৌধুরী প্রথমে মেঘকক্ষের পরিবর্তে ফটোগ্রাফিক প্লেট ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অবশ্যই সমর্থন ছিল দেবেন্দ্রমোহন বসুর। তখনকার সময়ের নিরিখে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এটি যুগান্তকারী কাজ হিসেবেই বিবেচিত হয়। তাঁদের কাজ নিয়ে পরপর দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল ‘নেচার’ পত্রিকায়। ১৯৪১ এবং ১৯৪২ সালে।

zoom
জওহরলাল নেহরু, বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে দেবেন্দ্রমোহন বসু (পিছনে বাঁ-দিকে)

ফটোগ্রাফিক প্লেট ব্যবহার করে মহাজাগতিক রশ্মির ভর নির্ণয়ের গবেষণাটি প্রথম শুরু হয়েছিল কলকাতার ল্যাবরেটরিতে বসেই। বিভা চৌধুরী এবং দেবেন্দ্রমোহন বসু একসঙ্গেই কাজটি শুরু করেছিলেন। কিন্তু সম্পূর্ণ পরীক্ষাটি কলকাতায় বসে করা সম্ভব হচ্ছিল না। দার্জিলিং, সান্দাকফু এবং ফারি জং নামের এলাকাকেই তাঁরা বেছে নেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই উন্নত ছিল না। দুর্গম জনপদ হিসেবেই পরিচিত ছিল এই তিনটি জায়গা। এই কঠিন উচ্চতায় গবেষণার কাজটি সম্পন্ন করতে একবারও পিছিয়ে যাননি বিভা। কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মির উৎস খুঁজে বেড়াতেন সারাদিন। ফটোগ্রাফিক প্লেটে তাঁরা এমন কিছু কণার দাগ দেখতে পান, যা পরিচিত ইলেকট্রন বা প্রোটনের মতো নয়। এই নিয়ে গবেষণা করার জন্য তাঁদের প্রয়োজন ছিল উন্নত মানের ‘ফুল টোন সেনসিটিভ প্লেট’। এই প্লেট ভারতে আসত ইংল্যান্ড থেকে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। যুদ্ধের কারণে ইংল্যান্ড থেকে সরঞ্জাম আসাও বন্ধ। সেই কারণে বিভা চৌধুরী ও দেবেন্দ্রমোহন বসুর গবেষণা থেমে যায় মাঝপথে। তবে যতটুকু কাজ করতে পেরেছিলেন তাঁরা, সেই গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। তাদের এই গবেষণালব্ধ ফলাফল পরবর্তী সময়ের গবেষকদের পথ দেখায়। পরবর্তীকালে জানা যায় বিভা চৌধুরীরা ‘পায়ন’ কণার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু ফটোগ্রাফি প্লেট ব্যবহার করতে না পারায় বিষয়টি সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব হয়নি। তাই তাঁদের প্রকাশিত প্রবন্ধে পায়নের উল্লেখ ছিল না। বিভা চৌধুরী এবং দেবেন্দ্রমোহন বসুর এই গবেষণার কথা তখন দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৯৪৭ সালে ব্রিটেনের এক বিজ্ঞানী ড. সিসেল পাওয়েল ফুলটোন ফটোগ্রাফিক প্লেট ব্যবহার করে এই একই পরীক্ষা করেন। স্বাভাবিকভাবেই সফল হন তিনি। বিভা চৌধুরীর দেখানো পথই তিনি অনুসরণ করেছিলেন। ১৯৫০ সালে নোবেল পুরস্কারের সম্মানিত করা হয়েছিল সিসিল পাওয়েলকে। সিসেল পাওয়েল তাঁর বক্তৃতায় বিভা চৌধুরীর এই মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে কাজের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন। তবে ওই অতটুকুই। বিভা চৌধুরীর কাজের কথা আর কোথাও প্রকাশিত হয়নি। কোথাও তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়নি। অথচ বিভা নিরলসভাবে নিভৃতে তাঁর গবেষণার কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। ১৯৪৫ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে গিয়েছিলেন। সেখানে মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণারত অধ্যাপক প্যাট্রিক ব্ল্যাকেটের অধীনেও কাজ করেছেন। ১৯৪৯ সালে পদার্থবিদ্যার একটি বিষয় বায়ু ঝর্ণা নিয়ে “এক্সটেনসিভ এয়ার শাওয়ার’স উইথ পেনিট্রেটিং পার্টিকলস” নামে একটি গবেষণাপত্র জমা দেন, যার জন্য ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫২ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন বিভা চৌধুরী। ওই বছর ‘ম্যানচেস্টার হেরেল্ডস’ নামে একটি স্থানীয় পত্রিকায় তাঁর এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল।

zoom
সিসেল পাওয়েল

১৯৪৯ সালে ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা ‘টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ’-এ কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানান বিভাকে। ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে ‘সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে’ও গবেষণা করেছেন। কিছু সময়ের জন্য বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেও যোগদান করেছিলেন। এরপর আহমেদাবাদের ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিতেও নিযুক্ত হন বিভা চৌধুরী। সেই সময় ওখানকার ডিরেক্টর ছিলেন বিক্রম সারাভাই। তাঁর তত্ত্বাবধানে কোলার গোল্ড ফিলস-এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, এই কাজের সমস্ত নথি সংস্থার কাছ থেকে হারিয়ে যায়। বিক্রম সারাভাই-এর মৃত্যুর পর স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেছিলেন বিভা চৌধুরী।

পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণার কাজেই নিজেকে নিয়োজিত করে রাখতেন। এমনকী নিজের কাজ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতেও স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। কাজের সঙ্গে তাঁর বন্ধন ছিল গভীর। জীবনে আর কোনও বন্ধনে জড়াননি কখনও। অন্তরালকেই বেছে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়। যে-সময় মেয়েদের বিজ্ঞানচর্চাকে একটি বিস্ময় বলে ধরে নেওয়া হত, সেই সময় নিজের ইচ্ছায় অন্তরালে থেকেই গবেষণাকে আপন করে নিয়েছিলেন। পারিবারিক সমর্থন তাঁকে আরও দৃঢ়চেতা করে তুলেছিল। জীবনী প্রকাশিত হওয়ার পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছিল বিভা চৌধুরীকে নিয়ে।

২০১৯ সালে এই বাঙালি মহিলা বিজ্ঞানী, বিভা চৌধুরীকে সম্মান জানাতে প্যারিসের ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল ইউনিয়ন’ তাঁর নামে একটি নক্ষত্রের নাম রাখে। ভারত থেকে বিভার স্মৃতিস্বরূপ এই নামটি রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়। এই নক্ষত্রটির আগে নাম ছিল ‘এইচডি এইট সিক্স জিরো এইট ওয়ান’। এটি যে শ্রেণির নক্ষত্র তাঁর নাম ‘সান্তামাসা’। শব্দটি সংস্কৃত। অর্থ মেঘে ঢাকা। ইতিহাসের বুকে যে মেধাবিনীর ঠাঁই হয়নি, যাঁর কথা এখনও নিভৃতেই ঢাকা, সেই নক্ষত্রের সঙ্গে এভাবেই জুড়ে গিয়েছে বিভা চৌধুরীর নাম।

১৯৯১ সালের ২ জুন মারা যান বিভা চৌধুরী। তাঁর কোনও গবেষণাপত্রই সুরক্ষিত নেই। তাই কাজের মাধ্যমে বেঁচে থাকার পরিসরটুকুও অবশিষ্ট নেই। অথচ মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে কাজ করা প্রথম বাঙালি মহিলা বিজ্ঞানী তিনি। মৃত্যুর ৩০ বছর পরও বিভা চৌধুরী যেন প্রকৃত অর্থেই মেঘে ঢাকা তারা।

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন পায়েল চট্টোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা

………………….

Biva Chowdhury Cecil Powell Cosmic ray Debendra Mohan Bose Homi J. Bhabha International Astronomical Union Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on