Robbar

রঙ্গজীবনের অঙ্গ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 4, 2026 6:05 pm
  • Updated:April 4, 2026 6:06 pm  

ব্যবহার করা এবং ব্যবহৃত হওয়া আমাদের সমাজ জীবনের ক্ষমতার খেলা ও একইসঙ্গে তার তারতম্যের সবথেকে বড় অংশ। সমাজব্যবস্থা আসলে ঠিকই আছে সেই হায়ারার্কির মধ্য দিয়েই, যেখানে ক্ষমতাবান শুধু ব্যবহার করে চলেন আর অপেক্ষাকৃত নিচের তলার মানুষেরা ক্রমাগত ব্যবহৃত হয়ে যান। সভ্যতার (?) গতিপথ যত এগচ্ছে ততই সমাজের মধ্যে একে অন্যকে এভাবেই পণ্য বানানোর চাহিদা ক্রমশ তুঙ্গে উঠছে। যেভাবে আজ আমরা তেল সাবান কিংবা টয়লেট পেপার ব্যবহার করি, মানুষ মানুষকে সেভাবেই ব্যবহারের খেলায় মত্ত।

প্রচ্ছদ অলংকরণ: দীপঙ্কর ভৌমিক

শুভজিৎ নস্কর

আমাদের বাড়ির উঠোনে একখানা জলের কল আছে। বিকেল হলে পাড়ার প্রচুর মহিলা বালতি হাতে ভিড় করে সেখানে জল ভরার জন্য। পরশু বিকেলে হঠাৎ সকলকে অবাক করে দিয়ে পাড়ার এক উঠতি রাজনৈতিক নেতা এসে হাজির– জল ভরতে না, বরং বাকিদের জলের বালতি ভরে দিতে।

বাংলার ভোট এলেই ছোটবেলায় দেখতাম ভোটপ্রার্থীরা বেশ হাত জড়ো করে, কেমন একটা কাঁচুমাচু মুখে, গোবেচারা ভাব নিয়ে বাড়ি-বাড়ি ভোট চাইতে আসতেন– কারওর কারওর মধ্যে তো এমন ভাবও থাকত যে, তাদের থেকে সজ্জন, স্বচ্ছ মানুষ বোধহয় এই দুনিয়ায় আর দ্বিতীয়টি নেই। কোনও কোনও রাজনৈতিক প্রার্থী তো বাড়ি এসে আবদার জুটিয়েই বসতেন– ‘আজ কিন্তু পাত পেড়ে এখানেই খাব’।

বিগত কয়েক বছরে বাংলার ভোট রাজনীতিতে এ দৃশ্যের সঙ্গে আরও কয়েকটি দৃশ্যের সংযোজন ঘটেছে বলা চলে। ভোটপ্রার্থীরা বাড়ি এসে সটান বাড়ির অন্দরমহলে জায়গা করে নিতে চাইছেন। তারপর বাড়ির দৈনন্দিন কাজে (কেউ কেউ যথেষ্ট পটু, আবার কেউ কেউ একেবারেই অপটু হাতে) হাত লাগাচ্ছেন। কেউ এসে সটান বাসন মেজে দিচ্ছেন, কেউ রান্নায় সাহায্য করার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠছেন। কেউ চাষের কাজে সাহায্য করছেন। কেউ ঘুঁটে সাজিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ তো সেসবের সীমানা অতিক্রম করে একেবারে ঢুকে পড়ছেন সাবান মাখাতে কিংবা দাড়ি কামিয়ে দিতে।

ভোটারের দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছেন দুবরাজপুরের প্রার্থী অনুপ কুমার সাহা

আসলে ভোট এলেই নেতারা অদ্ভুত রকমের মাটির মানুষ হয়ে ওঠেন। তাঁরা বোঝাতে চেষ্টা করেন, দুর্জনেরা আর যাই বলুক, তারা আসলেই আমাদেরই লোক, আমাদের প্রতিনিধি। আমরা যেন তাকে ভোটে জিতিয়ে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাকে ব্যবহার করে, আমাদের কথা প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দিতে পারি, সে জন্যই তাঁদের আসা– এটুকুই। সেজন্যই এই বাসন মাজা থেকে শুরু করে দাড়ি কামানোর সংযোজন।

ভোট রাজনীতিতে এরকম মজার কর্মকাণ্ডের সংযোজন হলেও একটা বিষয়ের কিন্তু কোনও বদল ঘটেনি– ভোট হয়ে গেলে ভোটপ্রার্থীর টিকিটির খোঁজ যেমন সেকালেও পাওয়া যেত না, একালেও পাওয়া যায় না। 

একবারটি ভোট হয়ে গেলেই বোঝা যায়, কে যে কার আপন। কে যে আসলেই কাকে ব্যবহার করছে, আর কে যে সত্যিই ব্যবহৃত হয়ে যাচ্ছে অনবরত– তা পরিষ্কার হয়ে যায়। 

এই ব্যবহার করা এবং ব্যবহৃত হওয়া, আমাদের সমাজ জীবনের ক্ষমতার খেলা ও একইসঙ্গে তার তারতম্যের সবথেকে বড় অংশ। সমাজব্যবস্থা আসলে ঠিকই আছে সেই হায়ারার্কির মধ্য দিয়েই, যেখানে ক্ষমতাবান শুধু ব্যবহার করে চলেন আর অপেক্ষাকৃত নিচের তলার মানুষেরা ক্রমাগত ব্যবহৃত হয়ে যান। সভ্যতার (?) গতিপথ যত এগচ্ছে, ততই সমাজের মধ্যে একে অন্যকে এভাবেই পণ্য বানানোর চাহিদা ক্রমশ তুঙ্গে উঠছে। যেভাবে আজ আমরা তেল সাবান কিংবা টয়লেট পেপার ব্যবহার করি, মানুষ মানুষকে সেভাবেই ব্যবহারের খেলায় মত্ত।

রুটি বেলছেন বালির প্রার্থী কৈলাস মিত্র

নইলে অদ্ভুতভাবে ভেবে দেখুন, যে রাজনৈতিক নেতা ভোটের বাজারে এসে একজন চাষির খেত থেকে আলু তুলে দিচ্ছে, ভোট হয়ে যাওয়ার পরে সেই আলুর চাষির দুর্দশার কথা সংসদে বা বিধানসভায় কতখানি জায়গা পায়? একথা তো আলাদা করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই যে, প্রতি বছর আমাদের দেশে লোকসানের বোঝা সামলাতে না পেরে দেনার দায়ে অজস্র আলুচাষি আত্মহননের পথ বেছে নেন।

বরং এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে একজন ভোটপ্রার্থী ভোটে জিতে সংসদ কিংবা বিধানসভায় যাওয়ার পরেই দিনের পর দিন অনুপস্থিত থেকেছেন কিংবা নিশ্চুপ থেকেছেন। নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনি আদতেই তার ভোটকেন্দ্রের মানুষকে ব্যবহার করে সেই জায়গায় পৌঁছেছেন। 

ক্ষমতার এই তারতম্য ব্যবহার করা ও ব্যবহৃত হওয়ারই খেলাকে অনবরত রসদ জুগিয়ে এসেছে। যে গৃহকর্তা বাড়িতে ফিরে মুখের সামনে গরম চা থেকে গরম ভাতের জোগান পেয়ে যান, তিনি কিন্তু বুঝেই ওঠেন না তাঁর স্ত্রীর বা পরিবারের অন্য মহিলার কতখানি শ্রম খরচ হয় সেই খাবার বানাতে। আর যে মহিলারা গোটা জীবন প্রাণপাত করে সংসারের জন্য খাবারের জোগান দিয়ে যান, তারাও অনেকেই বোধহয় ঠিক বুঝে ওঠেন না কতখানি বিনা পারিশ্রমিকে পরিশ্রম করে গেলেন, শুধুমাত্র সমাজের চাপিয়ে দেওয়া দায়ের তাগিদ থেকে।

নারী-পুরুষের সম্পর্কে এই খেলা কি ব্যবহার ও ব্যবহৃত হওয়ার সমীকরণ নয়? 

বৃদ্ধাকে কোলে নিয়ে নৃত্যরত প্রার্থী মিতালী বাগ

আজকাল শহর জুড়ে পার্ক, দোকান, রেস্তরাঁ, খেলার মাঠ সর্বত্র দেখি এক ধরনের ডাস্টবিন ব্যবহার হয় যেখানে কোনও বন্যপ্রাণীর মূর্তি সেই ডাস্টবিনটিকে ধরে থাকে, আর তার গায়ে লেখা থাকে ‘USE ME’ অর্থাৎ আমাকে ব্যবহার করুন। ক্ষমতার বৈষম্যের থেকে যে ব্যবহারের খেলার কথা এতক্ষণ ধরে বলছি, তার সব থেকে প্রকৃষ্ট উদাহরণ বোধহয় এটি, যেখানে মানুষ অদ্ভুতভাবে একটি বন্যপ্রাণকে জঞ্জাল ধরে রাখার উপকরণ ভাবতে পারে এবং অদ্ভুত ক্ষমতার লিপ্সা নিয়ে তার বুকের ওপর লিখে দিতে পারে– ‘আমাকে ব্যবহার করুন’।

যেন সেই প্রাণীটির জন্মই হয়েছে মানুষের ব্যবহারের সামগ্রীর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতে। যন্ত্রনির্ভর মানবসমাজের ক্ষমতালোভী মন সবসময় চেয়ে এসেছে প্রকৃতিকে করায়ত্ত করতে। সে নিজেকে কোনওভাবেই প্রকৃতির অংশ ভাবে না, বরং মানুষ যতবার বলে এসেছে যে, সে শ্রেষ্ঠ জীব, আসলেই সে প্রকৃতির ওপর নিজের অধিকার কায়েম করার স্পর্ধা দেখাতে চেয়েছে– প্রকৃতিকে ব্যবহারের সামগ্রী ভাবতে চেয়েছে। 

মানুষ বারবার ভাবতে চায় যে, প্রকৃতি তার জীবনের অঙ্গ এবং বারবার ভুলতে চায় যে, আসলে সে প্রকৃতির জীবনের অঙ্গ। যে প্রকৃতি তাকে সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে, তাকে ধ্বংস করার ক্ষমতাও রাখে। কিন্তু প্রকৃতি কখনও ক্ষমতার আগ্রাসন এবং তারতম্যের বহিঃপ্রকাশের ইঙ্গিত দেয় না। মানুষ প্রকৃতির থেকে এই শিক্ষাটুকু নিতে পারল না। নিতে পারল না তার কারণ, তার প্রতি মুহূর্তে অন্যকে ব্যবহার করে শ্রেষ্ঠ জীব হওয়ার তাগিদ কাজ করে। 

মানুষ যতদিন না প্রকৃতির থেকে সাম্যের শিক্ষা শিখতে পারবে, ততদিন এই ব্যবহার ও ব্যবহৃত হওয়ার রাজনীতি পৃথিবী জুড়ে চলতেই থাকবে। যতই ভোট আসুক, যতই সরকার বদলাক, শুধুই মুখ বদলাবে। প্রতি বছর কেউ এসে আপনার দাড়ি কামিয়ে দিয়ে যাবে আর প্রতিবারেই আপনি ঠকে যাবেন, আপনি ‘Used’ হয়ে যাবেন।