activist mahasweta devi and her works in different fields | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

মৃত্যুর পর মহাশ্বেতা দেবীর নামে সেগুনচারা রোপণ করেছিল পুরুলিয়ার মানুষ

বছর ২২-২৪ আগে হঠাৎ শুনলাম শান্তিনিকেতনে খোয়াই ধ্বংস করে একটি আবাসন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে জানার পর, সেই ফলকে লাথি মেরে প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছেন মহাশ্বেতাদি। প্রায় কাছাকাছি সময়েই মেলার মাঠ থেকে ‘কবিগুরু র‍্যালি’ হবে খবর পেয়ে, সেই র‍্যালি বন্ধ করার অনেক চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, শ্যামলীদি (শিল্পী ও পরিবেশ-শান্তি আন্দোলন কর্মী শ্যামলী খাস্তগীর) র‍্যালির দিন প্রথম গাড়িটা ছাড়ার মুহূর্তে গাড়ির সামনে সটান শুয়ে পড়েন।

Published by: Robbar Digital

Posted:January 13, 2026 5:21 pm | Updated:January 27, 2026 4:46 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

১৪ জানুয়ারি এসে পড়ল আবার। ওইদিন আলাদা কোনও উদযাপন চোখে পড়েনি কখনও। জ্যোতির্ময় বসুর গেস্ট হাউসের লোহার ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উঠে সারা দিন অনেকে দেখা করতে যেতেন। অন্যদিনের চেয়ে হয়তো একটু বেশি। অন্য দিনের মতোই রেখার (নাম পরিবর্তিত) হাতে চা-ব্ল্যাক কফি জুটত তাঁদের। রেখার টানটান চেহারা, তাঁর তীক্ষ্ণ উপস্থিতি অনুভব করে আমার কেন জানি না মেরি ওরাওঁয়ের কথা মনে হত– মহাশ্বেতা দেবীর ‘শিকার’ গল্পের কেন্দ্রে থাকা মেরি ওরাওঁ, যে তাঁর নিজের সমাজের সংস্কার ভেঙে বেরিয়ে অন্যরকম জীবন চেয়েছিল। অবশ্য নিয়ম-রীতি-সংস্কারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে লেখকের প্রায় সব নারী চরিত্র– ধৌলি, শনিচেরি, চিন্তা, জোসমিনা, কে নয়!    

জন্মদিনে দেখা করতে গিয়েছি যে ক’বছর, কখনও ফুল নিইনি, কারণ মহাশ্বেতাদি বলতেন, ‘‘আমরা গাছের তলা থেকে ফুল কুড়োতে শিখেছি শান্তিনিকেতনে, ফুল তুলতে নয়। কেনা ফুলের তোড়া আমার দু’চোখের বিষ।” কী আনলে ভালো হয়– জিজ্ঞেস করলে উত্তর ছিল, ‘গরম মোজা বা সুতির মোজা আনতে পারো। উলের ব্লাউজ। অথবা ওষুধ রাখার ছোট ছোট ব্যাগ। এসব জিনিসই আমার কাজে লাগে।’

zoom
লেখার টেবিলে নিমগ্ন মহাশ্বেতা দেবী

আমাদের ধরিয়ে দিতেন তাঁর হাতের কাছে থাকা ‘বর্তিকা’ পত্রিকার সাম্প্রতিক কোনও সংখ্যা। প্রান্তবাসী মানুষের কথা, বিশেষ করে বাংলার দলিত ও আদিবাসী মানুষের কথা তাঁদের ভাষ্যে ধরতে চেয়ে ১৯৮০ সালে ‘বর্তিকা’ সম্পাদনা শুরু করেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। ‘বর্তিকা’র গ্রাহক-সংগ্রহের বিল তাঁর টেবিলের ওপরেই থাকত। অন্যদিনের মতো সেদিনও দু’-চারজন নতুন গ্রাহক জোটানো তাঁর মিশন– শহুরে ‘উচ্চবর্ণ’ মধ্যবিত্ত- উচ্চবিত্ত পাঠিকা-পাঠককে বোঝানো ‘বর্তিকা’র পাতা উল্টে নিজের দেশের মধ্যে কোনও অন্য দেশকে তাঁরা খুঁজে পাবেন। 

যেতে বলতেন ‘শবর মেলা’-য়। কলকাতা শহরে লোধা-শবর ও খেড়িয়া শবরদের হাতের কাজ নিয়ে তিনদিনের ‘শবর মেলা’ তাঁর উদ্যোগেই শুরু হয় যতদূর জানি। মহাশ্বেতাদি সেই মেলায় নিজে শবর শিল্পীদের হাতে বোনা কুলো ও হাতপাখা বিক্রি করছেন, চোখের তারায় এই দৃশ্য লেগে আছে। এটা ‘পাবলিসিটি গিমিক’ ছিল না। কলকাতায় এই মেলা চালু হওয়ার অনেক আগেই ‘জ্ঞানপীঠ পুরস্কার’-এর (১৯৯৬) পুরো টাকা তিনি খেড়িয়া-শবর কল্যাণ সমিতিতে দিয়েছিলেন। তারও বহু আগে থেকে লোধা-শবর ও খেড়িয়া শবরদের ওপর যেখানে যা অন্যায়-অত্যাচারের খবর তাঁর কাছে পৌঁছত জেলার পদাতিক বন্ধু-কর্মীদের থেকে, সেগুলো তিনি খবরের কাগজে তোলার চেষ্টা করতেন বড় করে।  

১৯৮৩-’৮৪ সাল নাগাদ সম্ভবত মহাশ্বেতাদি পুরুলিয়া যান খেড়িয়া শবরদের হাল-হকিকত জানতে। এখানে আবার যোগসূত্র হিসেবে শান্তিনিকেতন এসে পড়ছে কারণ মহাশ্বেতাদির সহপাঠী, শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী সুবোধ বসু রায়ের ডাকেই তিনি পুরুলিয়া গিয়েছিলেন বলে শুনেছি। লোকসংস্কৃতি গবেষক ও ‘ছত্রাক’ পত্রিকা সম্পাদক সুবোধ বসু রায় পুরুলিয়ায় অধ্যাপনা করতেন। বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সেই যে গেলেন, আজীবন সেখানকার আদিবাসী মানুষদের সঙ্গে জুড়ে রইলেন ঘনিষ্ঠভাবে। তাঁর মৃত্যুর পর কলকাতায় যখন গান-স্যালুটের তোড়জোড় চলছে, পুরুলিয়ায় চাকা নদীর ধারে তাঁর কিছু আপনজন একটা সেগুন গাছের চারা পুঁতে ‘মহাশ্বেতা’ নাম দিয়েছিলেন। সে গাছটা এই দশ বছরে কত বড় হল কে জানে!

zoom
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে নেতৃত্বের পুরোভাগে

ক’দিন ধরে এইসব টুকরো কথাই মনে পড়ছে। তার মধ্যে অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানাও আছে। যেমন, বছর ২২-২৪ আগে হঠাৎ শুনলাম শান্তিনিকেতনে খোয়াই ধ্বংস করে একটি আবাসন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে জানার পর, সেই ফলকে লাথি মেরে প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছেন মহাশ্বেতাদি। প্রায় কাছাকাছি সময়েই মেলার মাঠ থেকে ‘কবিগুরু র‍্যালি’ হবে খবর পেয়ে, সেই র‍্যালি বন্ধ করার অনেক চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, শ্যামলীদি (শিল্পী ও পরিবেশ-শান্তি আন্দোলন কর্মী শ্যামলী খাস্তগীর) র‍্যালির দিন প্রথম গাড়িটা ছাড়ার মুহূর্তে গাড়ির সামনে সটান শুয়ে পড়েন। বোলপুরের আশপাশে গ্রামগুলো থেকে আদিবাসী ও দলিত মানুষের জমি হাতিয়ে সেখানে শহুরে মানুষের বিনোদনের নানা উদ্যোগের বিরুদ্ধে দু’জনেই ছিলেন সোচ্চার। দু’জনের মধ্যে বিস্তর অমিল সত্ত্বেও কোথাও যেন একটা বড় মিল ছিল– তাঁরা দুঃসাহসী, খেয়ালি ও প্রতিবাদের বেনজির কিছু দৃষ্টান্ত রেখে যাওয়া দু’জন মানুষ। 

বছর তিরিশেক বয়সে, অর্থাৎ ১৯৫০-এর মাঝামাঝি নাগাদ, সম্ভবত মহাশ্বেতাদির দুঃসাহসিক অভিযানের শুরু।কয়েকজন হিতাকাঙ্খীর থেকে সামান্য কিছু টাকা ধার করে, চার/পাঁচ বছরের ছেলেকে স্বামীর কাছে কলকাতায় রেখে, উঠে পড়েছিলেন হাওড়া থেকে তুফান মেল-এ। একলা মেয়ের ঘোরাঘুরির দিনে নয়, এসি কামরাতেও নয়– তার বহু যুগ আগে। এর কয়েক বছরের মধ্যেই, যে যুগে ভদ্রমহিলাদের বিয়ে ভেঙে বেরিয়ে গিয়ে আরেকটা বিয়ে করা প্রায় অকল্পনীয় ছিল, সেই ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে মহাশ্বেতা দেবী সেটাই করেছিলেন। কিশোর পুত্রকে পিতার কাছে রেখে কেন তিনি চলে গিয়ে আরেকবার বিয়ে করেছিলেন, এটা নিয়ে জীবনের শেষ দু-বছরেও তাঁর কাছে কম জবাবদিহি চাওয়া হয় নি গণমাধ্যমে ও সমাজমাধ্যমে! মায়ের জীবদ্দশায় ছেলের মৃত্যুর পর এ নিয়ে চর্চার ধরন দেখে তাজ্জব হয়েছি। স্বনামধন্য লেখক/শিল্পী অথবা অন্য পেশায় প্রখ্যাত কোনো পুরুষকে আমাদের সমাজ তাঁর সন্তানকে ছেড়ে নতুন সম্পর্কে যাওয়ার কারণে এভাবে কাঠগোড়ায় তুলেছে বলে আমার জানা নেই!

যাই হোক, ঝাঁসীগামী ট্রেনে ওঠার খেয়াল হলো কেন হঠাৎ মহাশ্বেতা দেবীর? তখন ১৮৫৭-র পর প্রায় একশ বছর পার হতে চলেছে। ঝাঁসি যাওয়ার আগে বেশ কিছু ইতিহাসের বইপত্র পড়া হয়ে গিয়েছিল মহাশ্বেতার, ইতিহাসবিদ প্রতুল গুপ্ত’র পরামর্শ অনুযায়ী। তিনি চাইছিলেন ঝাঁসির রাণীর একটা জীবনী লিখবেন–এমন একটা জীবনী যেখানে এক অন্তরঙ্গ লক্ষ্মীবাই ধরা দেবেন। মহাশ্বেতার জানতে ইচ্ছে হয়েছিল ঝাঁসি ও বুন্দেলখণ্ডের মানুষ তাঁদের রাণীকে কীভাবে মনে রেখেছেন! তাঁদের মুখ থেকে রাণীর কথা শুনতে পাড়ি দিলেন ঝাঁসি। সে অভিযানের কথা তাঁর নিজমুখে শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল যখন মহাশ্বেতা দেবীর প্রথম উপন্যাস ‘ঝাঁসির রাণী’র ইংরেজি অনুবাদ সীগাল বুকস্ থেকে বেরোচ্ছে, সেই সময়ে। সেটা বোধহয় ২০০০ সাল। ইংরেজি অনুবাদে মহাশ্বেতা দেবীর রচনা সংগ্রহ সিরিজটা সম্পাদনার কাজে জড়িয়ে আছি তখন। ‘ঝাঁসির রাণী’ লেখা প্রসঙ্গে মহাশ্বেতাদির সঙ্গে একটা কথোপকথন আমার জরুরি মনে হয়। সেই লম্বা কথোপকথন রেকর্ড করে বইয়ের শেষে সেটা জুড়ে দিয়েছিলাম আমরা।

zoom
একাকী ভাবনায় মগ্ন

এলোমেলোভাবে যে স্মৃতিগুলো ভেসে উঠছে, তার মধ্যে আর একটা হল ২০০২-এ গুজরাতে গণহত্যার ঠিক পরের। একদিন শুনলাম মহাশ্বেতাদি সিগালের অফিসে আসবেন, আমাদের কয়েকজনকে জরুরি তলব করেছেন। উনি এসে কোনও গৌরচন্দ্রিকা না করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কী কিছু করার কথা ভেবেছ?’ খুবই অস্থির, বিধ্বস্ত লাগছিল ওঁকে।

আমরা যে যার মতো প্রতিবাদ-সভায় যোগ দিচ্ছি, লেখালিখি করছি, মিছিলে হাঁটছি। মহাশ্বেতাদি বললেন, ‘আমার তো ৭৬ বছর বয়স। তোমরা যদি উঠেপড়ে না লাগো, তাহলে কী করে হবে?’ তারপরেই প্রস্তাব দিলেন, ‘আমি একটা প্রতিবাদ-পত্র লিখে দিচ্ছি আমাদের রাষ্ট্রপতিকে। তোমরা কয়েক হাজার পোস্টকার্ডে সেটা ছাপাও। তারপর প্রত্যেকে দায়িত্ব নিয়ে ১০০০ জনের কাছে গিয়ে হাজারটা পোস্টকার্ডে সই করাও। তোমরা দশজন যদি এটা করতে পারো, তাহলেই তো ১০,০০০টা পোস্ট কার্ড পাঠানো যাবে প্রেসিডেণ্টকে। এভাবে শুরু করা যাক অন্তত।’ 

সে পোস্টকার্ডগুলো ছাপানো হয়েছিল এবং তারপর আমরা একটা সিগনেচার-ক্যাম্পেনও করেছিলাম বড় করে। এখন অবশ্য নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আমরা মাঝেমধ্যে অনলাইন-পিটিশান করে থাকি। তবে কয়েক রাত না ঘুমিয়ে মহাশ্বেতাদির মতো অস্থিরতা নিয়ে, মিটিং ডেকে, আমাদের চারপাশে ঘটে চলা প্রকাণ্ড অন্যায়, যেমন উমার খালিদ ও সারজিল ইমামদের বিরুদ্ধে যে অন্যায় হয়ে চলেছে, তার জন্য জনসভা ও সিগনেচার-ক্যাম্পেনের আর্জি জানানোর মতো পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল আজ আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মহাশ্বেতাদি আজ কী বলতেন, ভাবছি সেটাই।   

birth centenary Gyanpith Award Mahasweta Devi Protest Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shantiniketan Signature Campaign

Share this article on