Fairy Tales to Folklore: Violence in Children's Literature। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ওয়ানস আপন এ ক্রাইম…

হিংসা যদি প্রকাশ্য হয়, তাহলে চেনার সুবিধা হয়। কিন্তু শিশুসাহিত্যের ডিসকোর্স এই হিংসাকে অনেক সময় নৈতিকতা দেয়, ন্যায্য বলে প্রতিষ্ঠা করে– সব মিলিয়ে এক ধরনের বৈধতা দান করে। এমনভাবে করে যে, তখন সেই আচরণ বা মনোভাবকে আমরা ‘হিংসা’ বলে চিনতেই পারি না।

শেষ আপডেট: জুলাই ২৫, ২০২৬, ২০:২৭   
Facebook WhatsApp Messenger

একদা প্রমথ চৌধুরী লিখেছিলেন– ‘শিশুসাহিত্য’ বলে কোনও পদার্থের অস্তিত্ব নেই, কারণ ‘শিশুরা সমাজের উপর আর যে অত্যাচারই করুক না কেন, সাহিত্য রচনা করে না।’ বাস্তবিক, শিশুসাহিত্য শিশু এবং কিশোরদের জন্য লেখা সাহিত্য; শিশু এবং কিশোরদের লেখা সাহিত্য নয়। তাই প্রমথবাবুর মতে, ‘বালপাঠ্য সাহিত্য’-ই এর উচিত গোত্রনাম। নাম যাই হোক না কেন, ‘শিশুসাহিত্য’ নামক এলাকার নিয়ন্ত্রণ যে চিরকালই বড়দের হাতে, এখন সে নিয়ে আর সংশয় নেই। বড়রাই শিশুসাহিত্যের লেখক, প্রকাশক ও অলংকরণ-শিল্পী। তাঁরাই ছোটদের জন্য বই পছন্দকারী, বইয়ের ক্রেতা। আবার শিশু পাঠকের সুবিধার জন্যে বহুক্ষেত্রে তাঁরাই বই সশব্দে পাঠ করেন, যত্ন করে বুঝিয়েও দেন। সুতরাং, ছোটদের সাহিত্যরচনা তথা অর্থনির্মাণে বড়দের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সেই ভূমিকা নিয়ন্ত্রকের। তাই শিশুসাহিত্যে আমরা যখন হিংসার কথা বলি, তখন ধরে নেওয়া চলে এই হিংসার নির্মাণ, অনুমোদন এবং উপভোগের ব্যাপারে বড়দের ইচ্ছে-অনিচ্ছে বিশেষভাবে সক্রিয়। ছোট পাঠকরাও সম্ভবত তাদের নিজেদের মতো করে এই হিংসাকে খেয়াল করে, আস্বাদন করে এবং প্রতিক্রিয়া জানায়। কিন্তু তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের বর্তমান আলোচনার বিষয় নয়।

‘হিংসা’ শব্দটির সাধারণ অর্থ হল, এমন আচরণ বা মনোভাব, যা অন্য কোনও মানুষ, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের দৈহিক ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি করতে পারে, এমনকী, মৃত্যুও ঘটাতে পারে। শিশুসাহিত্যে দৈহিক ও মনস্তাত্ত্বিক– এই দুই ধরনের হিংসাই প্রাসঙ্গিক। এইরকম একটি বাক্য পড়া-মাত্র আমরা হয়তো একটু হোঁচট খাই। মানবসভ্যতার ইতিহাসে হিংসা ‘দুর্লভ’ জিনিস নয়। বরং চারপাশের পৃথিবীর দিকে তাকালে মনে হয় হিংসাই মানবজীবনের সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। বড়দের সাহিত্যে হিংসার উপস্থিতি নিতান্তই স্বাভাবিক। সেই নিয়ে আমরা কখনও প্রশ্ন তুলি না। কিন্তু শিশুসাহিত্যের ক্ষেত্রে তুলি। কারণ আমরা অনেকেই মনে করি, বড়দের জগতের আরও কিছু খারাপ জিনিসের মতো হিংসাকেও শিশুসাহিত্যের এলাকা থেকে প্রত্যাহার করা উচিত। পুরোপুরি করা না গেলেও সেখানে যেন হিংসার বাড়াবাড়ি না-থাকে। অন্তত, যারা শিশুসাহিত্যের নায়ক-নায়িকা (এবং কথক) তারা যেন হিংসার পক্ষে না-দাঁড়ায়, অন্যের ক্ষতি না-করে। অথচ শিশুসাহিত্যের বজ্র আঁটুনি শিথিল হয়ে মাঝে-মধ্যেই হিংসার অনুপ্রবেশ ঘটে। কাঙ্ক্ষিত সমীকরণে গোলমাল বাঁধিয়ে দেয়।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মরণের ডঙ্কা বাজে’ আমাদের পরিচিত আখ্যান। কিশোরপাঠ্য এই রচনার প্রেক্ষাপট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে দ্বিতীয় চিন-জাপান যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে জাপানি সামরিক আগ্রাসনে– উড়োজাহাজ থেকে ফেলা বোমায়, কামানের গোলায়, মেশিনগানের গুলিতে লক্ষ-লক্ষ চিনা মানুষ মারা যায়, উজাড় হয় একের-পর-এক জনপদ। সেই হিংসা, নিষ্ঠুরতা ও ধ্বংসলীলার যে ব্যাপ্ত পৌনঃপুনিক বর্ণনা এই আখ্যানে আমরা পাই, আজকের অডিও-ভিস্যুয়াল যুগে তা ‘অভিনব’ না-হলেও সেই মুদ্রণ-প্রযুক্তির যুগে, বিশেষ করে এক কিশোর উপন্যাসে তা যে অভূতপূর্ব ছিল, সে-কথা বলা বাহল্য! বয়স্ক পাঠক হিসেবে হিংসার প্রায়-নিরবচ্ছিন্ন এই উপস্থাপনাকে মাঝেমাঝে অস্বস্তিকর মনে হলেও শেষ পর্যন্ত আমরা হয়তো ‘অমূলক’ বলতে পারি না, কারণ এই হিংসা ও ধ্বংসযজ্ঞ ইতিহাসসম্মত। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা– এই ধ্বংসযজ্ঞ মূলত আখ্যানের প্রেক্ষাপট, যে-পটে একদল মানুষের জাতপাত, ধর্ম, এমনকী, দেশ-অতিক্রমী ভালোবাসা ও মানবসেবার গল্পই এখানে বলা হয়েছে।

মরণের ডঙ্কা বাজে-তে হিংসার এই প্রয়োগ লেখক সচেতনভাবে করেন, আখ্যানের প্রয়োজনেই করেন। কিন্তু শিশুসাহিত্যের ক্ষেত্রে হিংসার অনুপ্রবেশ অনেক সময় লেখকের অজ্ঞাতসারে ঘটে। বাংলা শিশুসাহিত্যের প্রাথমিক পর্বে আমরা যখন ছড়া, রূপকথা বা লোককথার মতো মৌখিক সাহিত্য থেকে উপাদান সংগ্রহ করেছি তখন এমনটাই ঘটেছে।

লেখকেরা সযত্ন সেইসব রচনাকে শিশুমনের উপযুক্ত করে তৈরির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁদের নজর এড়িয়ে হিংসার অনুষঙ্গ চুপিসারে রয়ে গিয়েছে। ঠাকুরমার ঝুলির ‘সাত ভাই চম্পা’ গল্পটি আমরা প্রত্যেকেই জানি। সতীনদের ষড়যন্ত্রে ছোটরানি আর তার সন্তানদের দুর্ভোগের শেষ নেই। গল্পের শেষে সেই ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হল, বড়রানিদের মুখোশ খুলে গেল। ছোটরানি ও তার সন্তানদের সঙ্গে রাজার পুনরায় মিলন হল। তবে তার আগে আরেকটি ঘটনা ঘটল– ‘রাজা তখন বড়রাণীদিগে হেঁটে কাঁটা উপরে কাঁটা দিয়া পুঁতিয়া ফেলিতে আজ্ঞা দিয়া, সাত-রাজপুত্র, পারুল, মেয়ে আর ছোটোরাণীকে লইয়া রাজপুরীতে গেলেন।’ উপরে-নিচে কাঁটা বিঁধে এতগুলো মানুষকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলার আদেশের কথা এখানে কত সহজভাবে বলা হল। পাঠকের মনে হতে পারে এই রানিরাই তো জন্মমুহূর্তে আট ভাইবোনকে পাঁশগাদায় পুঁতে দিয়েছিল। অতএব, চোখের বদলে চোখ নেওয়া হল; এতদিনে ন্যায় পাওয়া গেল। অর্থাৎ, পুরনো কালের রাষ্ট্র-অনুমোদিত হিংসার মনোভাব যেন চুপিসারে মুদ্রিত হল আধুনিক শিশুপাঠে।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর টুনটুনির বই পূর্ববঙ্গীয় লোককথার পুনর্গঠন। এই বইয়ের বিখ্যাত গল্প ‘টুনটুনি আর রাজার কথা’ আমাদের জানা। এই গল্পে রাজা যখন জানতে পারলেন যে, সাতরানি তাঁকে টুনটুনির পরিবর্তে ব্যাঙভাজা খাইয়েছে– তিনি রেগে গিয়ে সাতরানির নাক কাটার হুকুম দিলেন। ‘অমনি জল্লাদ এসে সাত রানীর নাক কেটে ফেললে।’ কত অবলীলায় এই বীভৎস কাজটি সম্পন্ন হল! তার থেকেও বড় কথা– এরপরই টুনটুনি বলছে–এক টুনিতে টুনটুনাল/ সাত রানীর নাক কাটাল’। একথা শুধু যে টুনটুনিই মজা করে বলছে, তা তো নয়, টুনটুনির সঙ্গে খুদে পাঠকরাও বলছে। এই গল্পে পাঠকের মন তো টুনটুনির সঙ্গেই ওড়ে, তার মতো করেই আমরা গল্পটাকে বুঝি। সাত রানির নাক কেটে ফেলার মধ্যে যে নিষ্ঠুরতা আছে, তা যেন বীভৎস হয়ে ওঠে টুনটুনির রসিকতায়। শিশু পাঠকের মন যখন এই রসিকতায় ন্যস্ত হয়, তখন সে-ও কি লেখকের অজান্তেই এক হিংসার শরিক হয়ে ওঠে না?

অবশ্য এহেন হিংসা উনিশ শতকের বাংলা প্রাইমারেও ঠাঁই পায়। বর্ণপরিচয় ২য় ভাগের দশম পাঠে আমরা ভুবনের গল্পটি পড়েছি। মাসির আশকারায় ভুবন পাকা চোর হয়ে ওঠে এবং একদিন তার পাপ কাজের শাস্তি হিসেবে ফাঁসির সাজা হয়। ফাঁসির আগে ভুবন আসে মাসির সঙ্গে দেখা করতে। তারপর সে কী কাণ্ড ঘটায়, তা কারওরই অজানা নয়। ভুবন দাঁত দিয়ে মাসির কান কেটে ফেলে। দৃশ্যটি কল্পনা করাও কঠিন! কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল, এই ঘটনাকে আমরা ছোটবেলায় মাসির অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি হিসেবেই গ্রহণ করেছি। একপ্রকার ন্যায়রূপে বিবেচনা করেছি। সুতরাং, আমাদের নীতিশিক্ষা ও আনন্দ দেওয়ার জন্য লেখা শিশুসাহিত্যের শরীরে নানাভাবে হিংসার স্পর্শ জেগে থাকে। প্রশ্ন হল, আমরা সেই টুকরোগুলোকে চিনতে পারি কি না।

হিংসা যদি প্রকাশ্য হয়, তাহলে চেনার সুবিধা হয়। কিন্তু শিশুসাহিত্যের ডিসকোর্স এই হিংসাকে অনেক সময় নৈতিকতা দেয়, ন্যায্য বলে প্রতিষ্ঠা করে– সব মিলিয়ে এক ধরনের বৈধতা দান করে। এমনভাবে করে যে, তখন সেই আচরণ বা মনোভাবকে আমরা ‘হিংসা’ বলে চিনতেই পারি না। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাজকাহিনী’ আমাদের অনেকেরই প্রিয়। ‘রাজকাহিনী’র কিশোর রাজপুত নায়কদের অন্যতম হাম্বির। খুদে পাঠকের মনে হাম্বিরের বীরত্ব পাকাপোক্ত হয় মুঞ্জ ডাকাতের বিরুদ্ধে তার রোমহর্ষক অভিযানের সূত্রে। মুঞ্জ অবশ্য ‘ডাকাত’ নয়, ভিল সর্দার। ভিলেদের সর্দার থেকে সে কীভাবে ডাকাত হয়ে ওঠে, সেই গল্পটাই গুরুত্বপূর্ণ।

‘রাজকাহিনী’-তে রাজপুত রাজা এবং ভিলেদের সম্পর্ক শাসক এবং অনুগত প্রজার। মজা হল, প্রজা যতক্ষণ অনুগত, ততক্ষণই সে সহজ-সরল ভালো মানুষ, যখনই সে আনুগত্যে চিড় ধরে– তখনই তার কপালে জোটে শাসকের ঘৃণা। মুঞ্জ অস্ত্রের জোরে নিজেকে রাজা ঘোষণা করে, একবার রাজপুত রাজার কেল্লাও লুঠ করে। ফলে রাজপুত-সহ কথকের সম্বোধনে ভিল সর্দার মুঞ্জ হয়ে ওঠে ‘মুঞ্জ ডাকাত’, ‘কৃতঘ্ন ভীল’ কিংবা ‘শেয়াল রাজা’। হাম্বির ছদ্মবেশে মুঞ্জর দরবারে হাজির হয়, তার বিশ্বাস অর্জন করে। তারপর এক উৎসবের রাতে ভিলেদের আকণ্ঠ মহুয়া খাইয়ে মাতাল করে, ছদ্মবেশী রাজপুত সেনার সাহায্যে তাদের রাজবাড়ি জ্বালিয়ে, মুঞ্জর গলা কেটে আনে।

খেয়াল করে দেখার বিষয়, এই গল্পের যে বয়ানে শাসিতের বীরত্ব অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, সেই বয়ানেই শাসকের হিংসা বীরত্বের মহিমা পায়। অবশ্য আমরা তাকে ‘হিংসা’ বলে চিনতেই পারি না।

children's literature dark fairy tales folklore and violence hidden themes in literature Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on