Robbar

পুতুল নাচিয়ে সীতা উদ্ধারের গল্প বলে চাদর-বাঁধনি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 17, 2026 7:33 pm
  • Updated:January 17, 2026 7:33 pm  

পুতুলনাচ হল জনসাধারণের আপন সন্তান আর শিক্ষিত সমাজের বা ‘কালচার্ড ক্লাসের’ সৎ সন্তান। তাই সভ্যতার কাছে তার আবদার-আবেদন-স্বীকৃতি সবই বাড়ন্ত। যে উত্তাপ আলুকে গলিয়ে দেয়, সেই একই উত্তাপ ডিমকে শক্ত করে ছাড়ে। একইরকম কথা প্রযোজ্য লোককথার ক্ষেত্রে। যে কোনও আদিবাসী সমাজে তার লোককথা যেমন তার শিশুদের জন্য ঘুম-পাড়ানিয়া, তেমনই তা তার যৌবনের জন্য ঘুম-ভাঙানিয়া। সেই লোককথার, সেই মিথের সেলাই চলে তার সমাজদেহে অনবরত।

সীমন্তিনী ভট্টাচার্য

সাম্প্রতিক সময়ে, মানে এই শীতেরই বেলায় কলকাতা শহরে অন্তত দু’টি চাদর-বাঁধনি অনুষ্ঠান মঞ্চস্থ হল। তাও আবার ২৪ দিনের মধ্যে। এমনকী শহর ছাড়িয়ে ইতি-উতি আরও অনুষ্ঠানের খবর আসছে। এ বড় আশার কথা। চাদর-বাঁধনি হল খাঁটি সাঁওতালি পুতুলনাচ চদর-বদরের পোশাকী নাম। ২০২৫ সালে আবার স্থানীয় ও জাতীয় স্তরে অল-চিকি লিপির শতায়ু উদ্‌যাপিত হল। তবে কি ধরে নেওয়া যাচ্ছে যোগ্যতমের দৌড়ে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর উদ্বর্তন ঘটল? এ শহরেরই এক অশোক গাছতলায় দাঁড়িয়ে চদর-বদর শিল্পী সহদেব কিস্কু বলছেন, ‘রামের গায়ের রং আর কৃষ্ণের গায়ের রং আমাদেরই মতন– নীল-নীল কালো। রামের হাতে তীর-ধনুক। আমাদের হাতেও জন্মাবার সময় থেকে তীর-ধনুক। আমরা মরিও উহা হাতে নিয়ে। কৃষ্ণের মতন বাঁশিটি হাতে আমরা ঘুরি কাজে-অকাজে। উহারা আমাদেরই লোক। ডেভলপমেন্ট উহাদের আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। তা নিক। রাগ নাই। আমরা তাও টিকে থাকব। আমরা কি আজকের দিনের?’ তাও কেন তাদের পুতুলের সুতোয় টান পড়লে ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছি?

চাদর-বাঁধনি মঞ্চ

প্রাচীনতম নাটক হল পুতুলনাচ। ভারতবিদ রিচার্ড পেশেলের উল্লেখ এ লেখায় বারবার আসবে। তাঁর ১৯০০ সালের পুতুলনাচ বিষয়ে বক্তৃতাটি বিখ্যাত। সেখানে তিনি বলেন সেই প্রাচীনতম নাটকের যদি মোকাম খুঁজতে হয়, তবে তা ভারতেই খোঁজা ভালো। আর সে আলোচনার শেষে জানান ‘…পুতুলনাচের ভিটে: প্রাচীন বিস্ময়ভূমি ভারত’। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য্যের ব্যাখ্যায় পুতুলনাচে ‘পুতুল থাকিলেও নৃত্য নাই, বরং পুতুলের অভিনয় আছে।… পুতুলের সহায়তায় একটি যাত্রার অভিনয় হইয়া থাকে।’ তাঁর সমালোচনা পড়লে সত্যিই একে পুতুলনাট্য বলাটা সঙ্গত লাগে বেশ। কিন্তু তিনিই বলছেন লোকসংস্কৃতিতে নাচ আর নাটক এতটাই সম্পৃক্ত যে, এদের আলাদা করতে গেলে সম্পূর্ণের গুণটা নষ্ট হয়। তাই নাচ-নাটকের বিবাদ এড়িয়ে যদি ভারতীয় সমাজদেহে এর চলন দেখতে যাই, তবে এখনও পর্যন্ত স্মৃতিপথ বেয়ে চলতে হয়। গুরু-শিষ্য পারম্পর্যে পুতুলনাচও চলত মৌখিক প্রথায়। রীতিমত না লিখে রাখার শপথ নিতে হত শিষ্যকে। সাধারণত দুটো বিপদের ভয়ে; বেহাত হওয়া আর অপব্যবহার। আরেকখানা কারণও সঙ্গত। গান-গল্প লিখে রাখলে তা হয় স্থাবর আর না লিখলে তা জঙ্গম। যতক্ষণ দর্শক চাইবে, নাচ চলবে।

লায়ন ম্যান পাপেট্রি

আমাদের সভ্যতার প্রথম পুতুল বা শিল্পসামগ্রী হল ‘লায়ন-ম্যান’ মূর্তি। তার মাথা সিংহের আর দেহ মানুষের। জার্মানীর স্ট্যাডেল গুহায় খুঁজে পাওয়া ম্যামথ-দাঁতের এই মূর্তির বয়স আনুমানিক ৩৫ হাজার বছর। এর থেকেই পুতুলের শুরু না ধর্ম নামক রাজনীতির– বলা যায়নি এখনও। আর আমাদের পুতুলনাচ তবে কবেকার? পুরাণ পানে চাইলে দেখি এক কারিগর প্রথমে নিজের চেষ্টায় একজোড়া কাঠের পুতুল বানাল। শিব আর পার্বতী তাতে এতটাই আকৃষ্ট হল যে তারা পুতুলে ঢুকে নাচতে লাগল। নাচতে নাচতে ক্লান্ত হলে তারা পুতুল ছেড়ে বেরিয়ে এল। প্রাণ পাওয়া পুতুল আবার প্রাণহীণ হলে কারিগরও দুঃখ পেল। শেষে দৈব আনুকুল্যে কারিগর সুতো দিয়ে পুতুল নাচাবার উপায় আবিষ্কার করল। এখন কথা হল, সুতো দিয়ে পুতুল নাচাতে গেলে মানুষের অস্থিসন্ধি জ্ঞানে পুতুলেরও কয়েকখানা অস্থিসন্ধি থাকতে হয়। সেটা কবে ভাবা হল? সঞ্চালনশীল হাতবিশিষ্ট প্রথম পুতুলটার বয়স সম্ভবত ২৮ হাজার বছর। ম্যামথ-দাঁতের বানানো চেক প্রজাতন্ত্রের প্রত্নবস্তু। সিন্ধু সভ্যতাও আমাদের সুতো দিয়ে যুক্ত সঞ্চালনশীল অঙ্গের টেরাকোটা পুতুল দিয়েছে। 

পৈশাচী ভাষায় লেখা গুণাঢ্যের প্রাচীন ভারতীয় রূপকথা ‘বৃহৎকথা’, ‘কথাসরিৎসাগর’ নামে সংস্কৃতে অনুবাদ করেছিলেন কাশ্মীরী কবি সোমদেব। তিনি ছিলেন এগারো শতকের মানুষ। মূল বইটা পাওয়া না গেলেও কথাসরিৎসাগরের পুতুল আমাদের চমকে দেয়। কারিগর ময়দানবের বানানো সে সব কাঠের পুতুলরা– তাদের গায়ে লাগানো কাঠের পেরেকে চাপ দিলে কেউ উড়ে গিয়ে মালা নিয়ে আসে, কেউ জল আনে, কেউ নাচ দেখায় কেউ বা কথা বলে। ড. পেশেলের মতে কথা-বলা-পুতুল মোটেও কল্পকাহিনি ছিল না। মিথিলায় সে সময় নাকি কথা-বলা-পুতুলের স্টেজ শো হত। কথা-বলা-পুতুলের নকলও করত একদল মানুষ। দশম শতকে প্রাকৃত-সংস্কৃত ভাষার সাহিত্যিক ছিলেন রাজশেখর। তাঁর লেখায় পাই ময়দানবের এক শিষ্যের কথা– বিশারদ। বিশারদ দুটো কাঠের পুতুল বানিয়েছিল– সীতা আর সিন্দুরিকা। সীতা পুতুলের মুখে বসত বুলি শেখানো শালিখ পাখি। সে শালিখ ঝরঝরে প্রাকৃত ভাষায় গদ্য-পদ্য বলতে পারত। সেটাই ছিল কথা বলা পুতুল। ভারতের পৌরাণিক ইতিহাসে ময়দানব আর বিশারদ, এই দু’জন পুতুল কারিগরের উল্লেখ মেলে। 

মোড়ল পুতুলের চোখ নাচানোর লাল সুতো কানের পিছনে দৃশ্যমান

বাংলায় পুতুলনাচ আসে কাকতাড়ুয়া থেকে। এক জনৈক ব্যাপারি কাকতাড়ুয়া কাঁধে নিয়ে খেলা দেখাতেন। সেখান থেকেই আসে ডাং পুতুলনাচ। সারা ভারতে নিজস্ব ছন্দে, শৈলীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পুতুলনাচ শুরু হয়; ডাং, তার, বেনে, ছায়া আর আমাদের চদর-বদর। বলা যায় ডাং পুতুলের ছোট সংস্করণ হল তালপাতার বাঘ পুতুল বা সেপাই পুতুল। তাদেরও একাধিক অস্থিসন্ধি সঞ্চালনশীল। চদর-বদরের ছোট আর সুলভ সংস্করণ হল বেনারসের কাঠের দানা-চিড়িয়াঁ। এটাও মূলত লিভার-চালিত খেলনা। এখানে কাঠের চাকতির ওপরে একদল পাখি বসে থাকে। তাদের ঘাড়ে সুতো বাঁধা। সে সুতো চাকতির নিচে একটা ভারের সাথে বাঁধা থাকে। সে সুতোর গুচ্ছে টান পড়লে পাখিরা চাকতির ওপর ঘাড় নামিয়ে ঠুকরে ঠুকরে দানা খায়। খটর-খটর আওয়াজও হয় চদর-বদরের মতো। গোটাটাই প্রথম শ্রেণির লিভারের কেরামতি। যেমন হয়তো ছিল ময়দানবের পুতুলগুলো। 

প্রথম শ্রেণির লিভারের কেরামতি

চাদর-বাঁধনিও একেবারেই প্রথম শ্রেণির লিভারের নিয়ন্ত্রণে ঘটানো পুতুলনাচ। এটা সাঁওতাল জনজাতির নিজস্ব সৃষ্টি, নিজস্ব কৃষ্টি। বীরভূম, বর্ধমান, দুই দিনাজপুর, বিহার আর ঝাড়খণ্ডে অর্থাৎ সাঁওতাল আদিবাসী অধ্যুষিত জায়গায় আগে এ নাচ রমরমিয়ে হত। কাঠের ফাঁপা লাঠির মাথায় বসানো কাঠেরই মঞ্চ; গোলাকার বা চৌকো। মঞ্চের পরিধি ঘেঁষে চার থেকে ছয় ইঞ্চি মাপের কাঠের পুতুলগুলো বসানো থাকে। মঞ্চ সাধারণত নিরেট নয়, গোলাকার বা চৌকো ফ্রেমে কতকগুলো কাঠের লিভারের সমষ্টি। পুতুলদের ঘাড়, হাত, ঢেঁকিতে রাখা পা– এসব সঞ্চালনশীল অস্থিসন্ধিতে সুতো পরানো থাকে। আর সুতো পরানো থাকে চোখে আর ঢেঁকিতে। অস্থিসিন্ধিগুলো কাঠের পেরেকে দেহের সাথে যুক্ত করা। ইদানীং যদিও লোহার পেরেকের ব্যবহার হয়। এবার ওই সব সুতো একসাথে ওই ফাঁপা লাঠির ভেতর দিয়ে শিল্পী-সূত্রধরের পায়ের বুড়ো আঙুলে বাঁধা পড়ে। ওই অঙ্গুলি-হেলনেই পুতুলেরা যে যার নির্দিষ্ট কাজ করে চলে তালে তালে। কোনও মঞ্চে একদল আদিবাসী মেয়ে দুলে দুলে তাদের সাবেকী নাচ করে, বাজনদারেরা বানাম-বাঁশি-মাদল বাজায়। আবার কোথাও একদল চাল ঝাড়ে কুলোয়, মাথা আঁচড়ায়, ঢেঁকিতে পার দেয়। কোনওটায় আবার সবই থাকে মিলেমিশে। গোলাকার মঞ্চ আবার হাতে ঘোরানো যায়। এখন যদিও মাচা ঘোরাতে আর সুতো টানতে কেউ কেউ দুটো আলাদা মোটরের সাহায্য নেন। মাচার মাথায় চালা করা আর নীচটা চাদরে থাকে। তাই তো নাম চাদর-বাঁধনি। পুরো কাজটায় প্রচুর জোড়া-তাপ্পি থাকে, নিখুঁত হওয়ার চেষ্টাও থাকে না। কাঠটা সাধারণত গামার। তবে আমার সংগ্রহের সহদেব কিস্কুর বানানোটা মেহগিনির। 

শিল্পী সহদেব কিস্কু তার পুতুলদের সাথে

পুতুল এখানে মাটির কাছাকাছি। এখানে কোনও রাজা-রানি, নায়ক-নায়িকা, দেব-দেবী, দৈত্য-দানব নেই। আছে শুধু সাধারণ, প্রান্তিক, খেটে-খাওয়া মানুষ। তাই এর গানেও রোজের দিনের জীবনের ছোট-ছোট চাওয়া-পাওয়ার গল্প; ‘একটা কালো ছোঁড়া, বেল মালা দিল রে। মন গেল গুটা বাজারে’ বা ‘বানাইলাম বানাইলাম, কাঠের পুতুল বানাইলাম। বানাইলাম চাদর-বাঁধনি’ বা ‘হাটে হাটে বেড়াইলাম, গুটা হাটে বেড়াইলাম, মনের মতন মালা পাইলাম না’ বা ‘ছুট ছুট পুকুরি, পানা কেনে এলাই রে, পানারই ভিতর কুমীর সিন্ধাইছে’। এখানে পুতুলেরা পৌরাণিক চরিত্রের না হলেও চদর-বদরের কারণখানা অনন্য। রাবণ সীতাকে চুরি করে গ্রামে লুকিয়ে রেখেছে। তাকে খুঁজে আনতে হবে। স্বাভাবিকভাবে যদি খোঁজা হয় তবে তো আর পাওয়া যাবে না। খুঁজতে হবে ছলনার আশ্রয়ে। পুতুলনাচ উঠোনে এলে বাড়ির কোনও মেয়ে-বউকে ঘরে লুকিয়ে রাখা যাবে না। সে পুতুলনাচের টানে সামনে আসবেই। আর তখনই সূত্রধর বা তার দলের লোক সীতাকে ঠিক চিনে নেবে। সীতা মিললে তারাও বাড়ি ফিরবে। তাই চদর-বদরের সময় হল দুর্গার অকাল-বোধন। শুধু সে সময়ই শিল্পী পায়ে ঘুঙুর বেঁধে, মঞ্চ কাঁধে গ্রামে গ্রামে ঘোরেন। গৃহস্থের দোরে যেটুকু টাকা-কড়ি বা চাল-কলা জোটে সেটুকুই সীতা-সমান। এমনিতে এর সূত্রধর একাই থাকেন কিন্তু অনুষ্ঠানে ডাক পড়লে দল তৈরি হয়; আয়নামণি, নয়নমণি বা সূর্যমণি পুতুলের মতো একদল মহিলা করেন সাঁওতালি নাচ আর একদল বাজনদার বিভিন্ন আদিবাসী বাজনা বাজান।

সহদেব কিস্কু তার পুতুলদের নাচাচ্ছেন

এর জাত শিল্পী ছিলেন দিনাজপুরের ডমন মুর্মু আর বীরভূমের মোহন মুর্মু। এখন সবাই সময় বা সুযোগ মেপে শিল্পী হন। ড. পেশেলের একখানা মূল্যবান পর্যবেক্ষণ হল ‘যখন একজন নিজের মধ্যে একাধিক দক্ষতার সম্মিলন ঘটায়, সে সাধারণত শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের মানুষ হন’। পুতুলনাচের শিল্পীরা পেশায় কেউ কারিগর, কেউ ছুতোর, কেউ দর্জি। অনুষঙ্গটা জানা না গেলেও জানা যায় যে, পুতুলনাচের প্রথম যুগে ইউরোপের বেশ কয়েকজন পুতুলনাচিয়ে পেশায় ছিলেন ডেন্টিস্ট। শান্তিনিকেতনের কাছেই ইলামবাজারের সহদেব কিস্কুরও অন্নসংস্থান মূলত অন্য পেশায়। তাও তিনি এই পুতুলনাচ সারা ভারতে দেখান। তাঁর বানানো আমার চদর-বদর মঞ্চে আমি একখানা আলো লাগিয়ে নিয়েছি, যাতে রাতের আঁধারেও সীতার সন্ধানে বেরনো যায়। 

লেখকের সংগ্রহে থাকা চাদর-বাঁধনি মঞ্চ

ড. পেশেল যথার্থই বলেছিলেন যে, পুতুলনাচ হল জনসাধারণের আপন সন্তান আর শিক্ষিত সমাজের বা ‘কালচার্ড ক্লাসের’ সৎ সন্তান। তাই সভ্যতার কাছে তার আবদার-আবেদন-স্বীকৃতি সবই বাড়ন্ত। যে উত্তাপ আলুকে গলিয়ে দেয়, সেই একই উত্তাপ ডিমকে শক্ত করে ছাড়ে। একইরকম কথা প্রযোজ্য লোককথার ক্ষেত্রে। যে কোনও আদিবাসী সমাজে তার লোককথা যেমন তার শিশুদের জন্য ঘুম-পাড়ানিয়া, তেমনই তা তার যৌবনের জন্য ঘুম-ভাঙানিয়া। সেই লোককথার, সেই মিথের সেলাই চলে তার সমাজদেহে অনবরত। সাঁওতাল জনসমষ্টিও এর ব্যাতিক্রম নয়। কিন্তু চদর-বদরকে দর্শকের কাছে বা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বেঁধে-বেঁধে রাখার জন্য কোনও মিথের আঠা নেই। এটা এর বড় সমস্যা। এই পুতুলরা নিজেদের শরীর ও অবস্থানকে ছাপিয়ে গিয়ে অন্য কোনও রূপকল্প বা দৃশ্যপট রচনা করতে পারে না। মালা না পাওয়ার গানে এরা যা যা করে, কালো ছেলের প্রেমের গানেও এরা তা-ই করে। এদের নিয়ে গল্প ফাঁদলে শুধু মোড়ল গল্পের সাথে সুতোর টানে চোখ নাচায়। চদর-বদর টিকে আছে সাঁওতাল জনজাতির কাছে সীতা-খোঁজা প্রথায়; আর কালচার্ড ক্লাসের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে প্রযুক্তির অনন্যতায়। কিন্তু সেই অনন্য প্রযুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যন্ত্র নিজের জায়গা করতে শুরু করেছে। মোটর চালু করলে পুতুলনাচ চালু হচ্ছে। তবে গান বা গল্পের সাথে এই পুতুলদের পাল্লা দিতে না পারার একটা সুফল অবশ্য আছে; কুরুচির দাবিতে এরা কোনওভাবেই অশ্লীল হতে পারে না, চটুল হতে পারে না, পারে না খ্যামটা নাচতে। 

নৃত্যরত মিহিলার খোঁপা

গ্রিসের জেনোফোন (৪৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) তাঁর গল্পের সূত্রধরকে দিয়ে বলান যে, বোকা মানুষেরাই তাঁর প্রিয়। কারণ তাঁরাই মূলত পুতুলনাচ দেখে তাঁর অন্ন জোটান। তবে আমরা না হয় দলবেঁধে একটু বোকা হলাম। না হলে যে সীতা হারাতে বসেছে চিরতরে! শিশুরা তো পাঠ্যবইয়ের পাতায় পড়ে, ‘প্রথম শ্রেণির লিভার হল এক সরল যন্ত্রবিশেষ। এখানে একটি স্থির বিন্দু বা আলম্ব নির্ভর একটি দণ্ড থাকে যার এক প্রান্তে বল প্রযুক্ত হলে, আপর প্রান্তে ভার উত্তোলিত হয়। আলম্ব থেকে বলবিন্দু হল বলবাহু, আর আলম্ব থেকে ভারবিন্দু হল রোধবাহু’। আর তার উদাহরণে তারা নয় পড়ুক ‘চাদর-বাঁধনি পুতুল’।  

তথ্যঋণ:

১. The Home of The Puppet-play, Richard Pischel, Translated by Mildred C. Tawney, Luzac & Co. Publishers to the India Office, 1902, London
২. বাংলার লোক-সাহিত্য, ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য্য, তৃতীয় খণ্ড, ক্যালকাটা বুক হাউস, কলিকাতা, ১৯৫৪