
পরিতোষ সেনের হাতে থাকা চারকোলের টুকরোটি কেবল অঙ্কনের উপকরণ নয়—তা যেন তাঁর নিজের জীবনের শেষ লগ্নকে নথিবদ্ধ করার প্রধান উপকরণ। যার রেখার রঙ হল কালো। ২০০৭ সালে গ্যালারি ৮৮-তে তাঁর ৮৮তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনীতে এই ছবিটি প্রদর্শিত হয়। এই ছবিটি দেখে মনে হয় ঠিক যেমনভাবে মুঘল শিল্পী মৃত্যুর ভয়াবহতাকে জয় করে শিল্পসৃষ্টি করেছিলেন, তেমন ভাবেই পরিতোষ সেন নিজে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শিল্পকে সঙ্গে নিয়েই।
শিল্পের ইতিহাসে বারবার লক্ষ করা যায়, প্রায় প্রত্যেক শিল্পীরই পছন্দের তালিকায় থাকে কিছু নির্বাচিত শিল্পকর্ম– যেগুলির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল দর্শকের নয়, বরং গভীর আত্মীয়তার। অন্য শিল্পীর সৃষ্ট সেই ছবি বা ভাস্কর্যের প্রতি শিল্পীর এই আকর্ষণ আসলে এক ধরনের সৃজনশীল দুর্বলতা; এমন দুর্বলতা, যা তাকে বারবার সেই রচনার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এই ফিরে যাওয়া নিছক অনুকরণ নয়, বরং আত্মস্থ করার প্রক্রিয়া– যেখানে পূর্ববর্তী শিল্পকর্ম নতুন ভাবনার জন্ম দেয়, নতুন পাঠের সম্ভাবনা খুলে দেয় এবং শিল্পীকে নিজের ভাষায় নতুন সৃষ্টিতে ব্রতী হতে প্ররোচিত করে।
এই ধরনের সৃজনশীল পুনরাগমনের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় পরিতোষ সেনের ‘আলেখ্য মঞ্জরী’ গ্রন্থে। এখানে তিনি একটি লেখায় মুঘল চিত্রকলার জাহাঙ্গীরি ধারার এক অনন্য নিদর্শন ‘মৃত্যুপথযাত্রী এনায়েত খাঁ’ শীর্ষক ছবিটির কাছে ফিরে গেছেন। এই ফিরে যাওয়া কেবল একজন শিল্প-ইতিহাসবিদের বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নয়; বরং একজন সমকালীন শিল্পীর সংবেদনশীল ও অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ সংলাপ– একটি ছবি, একটি মৃত্যু এবং একটি শিল্পভাষার সঙ্গে। পরিতোষ সেনের লেখায় সেই চিত্র আর নিছক ঐতিহাসিক নিদর্শন হয়ে থাকে না; তা হয়ে ওঠে সময়, ক্ষমতা, শরীর এবং শিল্পীর দৃষ্টির জটিল আন্তঃসম্পর্কের এক জীবন্ত দলিল।

শিল্পী পরিতোষ সেনের একটি বিস্মৃতপ্রায় গ্রন্থ ‘আলেখ্য মঞ্জরী’-তে অন্তর্ভুক্ত ‘এনায়েত খাঁর মৃত্যু অথবা একটি মহান শিল্পকর্মের জন্ম’ শীর্ষক প্রবন্ধটি কেবল একটি মুঘল মিনিয়েচারের আলোচনা নয়; এটি একই সঙ্গে শিল্প, মৃত্যু ও শিল্পীর চেতনার মধ্যবর্তী এক গভীর নন্দনতাত্ত্বিক সংলাপ। লেখক এখানে পাঠককে নিয়ে যান জাহাঙ্গীরি দরবারের অন্তঃপুরে– যেখানে ব্যক্তিগত শোক, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং শিল্পীর দায় একত্রে মিলিত হয়।
পরিতোষ সেনের বর্ণনায় জানা যায়, মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে সংবাদ আসে যে তাঁর প্রিয় সভাসদ এনায়েত খাঁ মৃত্যুপথযাত্রী। খবরটি শোনামাত্র সম্রাট তাঁকে দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন। দরবারে তাঁকে উপস্থিত করা হলে সম্রাট আর সহ্য করতে পারেন না তাঁর প্রিয় সভাসদের ক্ষয়প্রাপ্ত, কঙ্কালসার দেহের দৃশ্য। এই মুহূর্তেই একটি ঐতিহাসিক শিল্পকর্মের জন্মের ইতিহাস সূচিত হয়। ইনায়েত খাঁ-র জীর্ণ দেহের নির্লিপ্ত প্রতিকৃতি অঙ্কনের নির্দেশ দিলেন জাহাঙ্গীর।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্ন উঠে আসে। মুঘল ইতিহাস অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরের শাসনকালে ‘মৃত্যুপথযাত্রী এনায়েত খাঁ’ শীর্ষক বিখ্যাত মিনিয়েচারটি অঙ্কন করেন দরবারি শিল্পী বালচাঁদ, যিনি ‘নাদির-উজ-জামান’ নামেও পরিচিত। কিন্তু পরিতোষ সেন তাঁর প্রবন্ধে এই ছবির শিল্পীর নাম হিসেবে উল্লেখ করেন বিষেণদাস। আসলে একজন শিল্পী ও লেখক হিসেবে পরিতোষ সেন এখানে ইতিহাসকে কঠোর তথ্যের বদলে এক জীবন্ত অভিজ্ঞতার স্তরে নিয়ে যান– যেখানে শিল্পীর নামের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শিল্পীসত্তার অন্তর্গত মনন ও প্রক্রিয়া।
পরিতোষ সেনের বিবরণ অনুযায়ী, বিষেণদাস (বা ঐতিহাসিকভাবে বালচাঁদ) এনায়েত খাঁর দু’টি প্রতিকৃতি অঙ্কন করেন– প্রধান চিত্রটি সাদাকালো রেখায় নির্মিত। এই ছবি আঁকার সময় শিল্পী মানবদেহের কঙ্কালগত গঠন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মনে পড়ে যায় কিছুদিন আগে মসজিদের সামনে দেখা এক রুগ্ন ভিখিরির কথা– যার জীর্ণ দেহ তাঁকে এনায়েত খাঁর প্রতিরূপ বলে মনে করিয়ে দেয়। শিল্পী বহু খোঁজাখুঁজির পর ভিখিরিটির আশ্রয়স্থলে পৌঁছে তাঁকে দাঁড় করিয়ে, বসিয়ে, শুইয়ে একের পর এক স্কেচ করেন। পরিতোষ সেন নিজেই লেখেন–
‘একটা তুচ্ছ ঘাস কিংবা নুড়িকে আঁকিবার বেলায়ও সে এইভাবেই অগ্রসর হইয়াছে।’
এই বাক্যটি শুধু মুঘল শিল্পীর নিষ্ঠাই নয়, শিল্পসাধনার এক চিরন্তন নৈতিক অবস্থানকে চিহ্নিত করে।
এই প্রসঙ্গে পরিতোষ সেন বিশেষভাবে দেখিয়েছেন, কীভাবে এনায়েত খাঁর ক্ষয়িষ্ণু শরীর বিষেণদাসের (বা বালচাঁদের) কাছে সৌন্দর্যের প্রচলিত সংজ্ঞাকে ভেঙে দেয়। মৃত্যু এখানে শুধু মাত্র ভয়াবহ নয়– রেখার স্পর্শে, সংযমী পর্যবেক্ষণে, তা এক আশ্চর্য নান্দনিক সত্যে রূপান্তরিত হয়েছে। মৃত্যুর ভয়াবহতা ঝাপসা হয়ে যায় শিল্পবোধের স্পষ্ট প্রকাশে। এই আলোচনার সঙ্গে পরিতোষ সেনের নিজের জীবন ও শিল্পভাবনা গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। ক্যালকাটা গ্রুপের একজন পরিশ্রমী সদস্য হিসেবে তিনি রং ও তুলির বাইরেও ছিলেন একজন শিল্পশিক্ষক, লেখক ও গভীর সংবেদনশীল মানুষ। মাদ্রাজ আর্ট স্কুল হোক বা ফরাসি শিল্প বিদ্যালয়– সবখানেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন আধুনিকতার ভাষা লুকিয়ে আছে দুর্ভিক্ষ, বন্যা, নগরজীবন ও রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে। অথচ আত্মপ্রতিকৃতিতে ফিরে গেলে দেখা যায়, তিনি নিজেকেই হাজির করেন এক বিদ্রূপাত্মক, আত্মবিশ্লেষণী সত্তা হিসেবে। মুঘল মিনিয়েচারের প্রতি তাঁর আকর্ষণও এই আত্মজীবনীমূলক অনুসন্ধানেরই আরেক রূপ।
এই কারণেই সম্ভবত ‘আলেখ্য মঞ্জরী’-তে আলোচিত ‘মৃত্যুপথযাত্রী এনায়েত খাঁ’ চিত্রটি তাঁর মনে এতটাই গভীর দাগ কেটেছিল যে জীবনের গোধূলি লগ্নে এসে তিনি নিজেই বিষয়টিকে পুনরায় আঁকেন– কিন্তু এক নতুন অবস্থান থেকে। এখানে শয্যাশায়ী এনায়েত খাঁ বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছেন, আর তাঁর সামনে চিত্রকর হিসেবে বসে আছেন স্বয়ং পরিতোষ সেন। ঐতিহাসিক বিষেণদাস বা বালচাঁদের জায়গায় তিনি নিজেকে স্থাপন করেন। শুধু তাই নয়, এনায়েত খাঁর মুখাবয়বেও তিনি নিজেরই এক ধরনের প্রতিচ্ছবি রোপণ করেন– যেন শিল্পী ও মৃত্যুপথযাত্রী একই সত্তার দুই রূপ।

এই ছবিতে পরিতোষ সেনের হাতে থাকা চারকোলের টুকরোটি কেবল অঙ্কনের উপকরণ নয়– তা যেন তাঁর নিজের জীবনের শেষ লগ্নকে নথিবদ্ধ করার প্রধান উপকরণ। যার রেখার রং হল কালো। ২০০৭ সালে গ্যালারি ৮৮-তে তাঁর ৮৮-তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনীতে এই ছবিটি প্রদর্শিত হয়। এই ছবিটি দেখে মনে হয় ঠিক যেমনভাবে মুঘল শিল্পী মৃত্যুর ভয়াবহতাকে জয় করে শিল্পসৃষ্টি করেছিলেন, তেমন ভাবেই পরিতোষ সেন নিজে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শিল্পকে সঙ্গে নিয়েই। আর বিষয় হিসেবে আঁকড়ে ধরেছেন সেই মুঘল ছবিটিকেই যাকে নিয়ে তিনি লিখেছিলেন ‘আলেখ্য মঞ্জরী’-তে।
এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, মৃত্যু কখনোই কোনও শিল্পীর সৃষ্টিচেতনাকে নিঃশেষ করতে পারেনি। বরং ইতিহাস জুড়ে মৃত্যু শিল্পের অন্যতম প্রধান প্রেরণা হয়ে উঠেছে– পিরামিড, ক্যাটাকম্ব, সারকোফেগাস, বৌদ্ধস্তূপ, মাকবারা তার সাক্ষ্য বহন করে। ক্রুশবিদ্ধ যীশু যেমন বারবার শিল্পীদের ক্যানভাসে ফিরে এসেছেন, তেমনই মুমতাজের মৃত্যুর পর শাহজাহান নির্মাণ করেছিলেন তাজমহল। মুঘল মিনিয়েচারেও মৃত্যুর দৃশ্য বহুবার চিত্রিত হয়েছে– যেখানে ভয়াবহতাকে অসম্ভব সংযম ও সৌন্দর্যে রূপান্তরিত করেছেন বালচাঁদের মতো শিল্পীরা।
পরিতোষ সেন সেই ধারারই উত্তরাধিকারী। সময়ের পথ ধরে এসে তিনি নিজেও মৃত্যুকে জয় করেছেন রেখার ভিতর দিয়ে– ব্যথাকে রোমান্টিক সংযমে বেঁধে, শিল্পকে করে তুলেছেন চিরকালীন।
গ্রন্থপঞ্জি:
সেন, পরিতোষ, আলেখ্য মঞ্জরী, কলকাতা: জি এ ই পাবলিশার্স, ১৯৮৪।
চিত্র ঋণ:
গ্যালারী ৮৮, অধ্যাপক অশোক কুমার দাস
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved